কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(নিজেকে আবিষ্কার)

আমি ঠিক মনে করতে পারি না,
প্রথম কবে লজ্জা পেয়েছিলাম!

হয়তো ভুল উত্তর দিয়েছিলাম,
হয়তো সবার সামনে হোঁচট খেয়েছিলাম,
হয়তো কাউকে খুব সরল একটি কথা বলেছিলাম,
আর সবাই হেসে উঠেছিল।
ঘটনাটি মনে নেই।
কিন্তু সেই অনুভূতিটি
এখনও আমার ভেতরে বেঁচে আছে।

সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম—
পৃথিবীতে শুধু আমি নেই,
আরও অনেক চোখ আছে,
আর সেই চোখগুলো আমাকে দেখে।

শৈশবে আমরা নিজেদের জন্য বাঁচি,
তারপর একদিন হঠাৎ বুঝি—
অন্যের দৃষ্টিও আমাদের জীবন
লিখতে শুরু করেছে,
সেদিনই লজ্জার জন্ম।

আমি আগে যেমন দৌড়াতাম,
সেদিন থেকে একটু ভেবে দৌড়াতে শিখলাম।
আগে যেমন হাসতাম,
সেদিন থেকে একটু মেপে হাসতে শিখলাম।
আগে যেমন কাঁদতাম,
সেদিন থেকে চোখের জল
লুকিয়ে রাখতে শিখলাম।

মানুষের ভেতরে প্রথম যে দেয়ালটি ওঠে,
তার নাম অহংকার নয়,
তার নাম লজ্জা।
সেই দেয়ালের ওপাশে থেকে যায়
অসংখ্য স্বতঃস্ফূর্ত হাসি,
অকারণ কান্না,
অদ্ভুত প্রশ্ন,
এবং এমন সব স্বপ্ন,
যেগুলো আমরা আর কাউকে বলি না।

একদিন স্কুলে একটি কবিতা আবৃত্তি
করতে উঠেছিলাম।
প্রথম দুটি লাইন বলার পর
বাকিটা ভুলে গিয়েছিলাম।
ঘরভর্তি মানুষ।
নীরবতা।
তারপর কারও হাসি।
সেদিন মনে হয়েছিল,
পৃথিবীর সব দরজা
একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে!

আজ এত বছর পরে বুঝি,
মানুষ কবিতা ভুলে যাওয়ার জন্য
লজ্জা পায় না।
সে লজ্জা পায়—
যখন মনে হয়,
সে আর অন্যদের প্রত্যাশার মানুষটি
হয়ে থাকতে পারল না।

লজ্জা খুব অদ্ভুত একটি অনুভূতি।
সে বাইরে থেকে আসে না,
সে জন্মায় ভেতরে।
একটি ছোট শিশু
নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা পায় না,
নিজের কান্না নিয়ে লজ্জা পায় না,
নিজের প্রশ্ন নিয়ে লজ্জা পায় না।
আমরাই তাকে শেখাই—
কোন হাসি চেপে রাখতে হয়,
কোন কান্না লুকাতে হয়,
কোন স্বপ্ন বলা যায় না।
তারপর একদিন সে বড় হয়ে যায়।
এবং নিজের সত্যটাকেও
ধীরে ধীরে লুকিয়ে ফেলতে শেখে।

আমি এখন ভাবি,
মানুষের জীবনের অনেক সাহস
প্রথম লজ্জার দিনেই হারিয়ে যায়।
যে গানটি সে গাইতে চেয়েছিল,
সে আর গায় না।
যে মানুষটিকে ভালোবাসার কথা
বলতে চেয়েছিল,
সে আর বলে না।
যে প্রশ্নটি করতে চেয়েছিল,
সে চুপ করে যায়।

পৃথিবীর বহু অসমাপ্ত জীবনের শুরু
হয়তো এইভাবেই,
একটি ছোট্ট লজ্জা থেকে।

আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
আমি সেই ছোট্ট শিশুটির কথা ভাবি।
যে ভুল করলে লজ্জা পেত,
কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার দৌড়ে যেত,
আবার হাসত,
আবার চেষ্টা করত।
সে জানত না,
মানুষের মর্যাদা
কখনো নিখুঁত হওয়ার মধ্যে নয়।
বারবার ব্যর্থ হয়েও
আবার শুরু করতে লাগে বুক ভরা সাহস!
হয়তো সেই শিশুটি
আমার চেয়ে অনেক সাহসী ছিল,
কারণ সে তখনও শেখেনি—
পৃথিবীর চোখকে ভয় করতে!

আজ আমি আমার প্রথম লজ্জাকে
ক্ষমা করে দিয়েছি।
কারণ বুঝেছি,
যেদিন মানুষ লজ্জা পায়,
সেদিন সে শুধু নিজের দুর্বলতা দেখে না,
সে প্রথমবার অনুভব করে—
তার ভেতরে এমন একটি সত্য আছে,
যাকে সে পৃথিবীর সামনে
উন্মুক্ত করতে ভয় পায়।

আর সেই অদৃশ্য সত্যটিই
হয়তো একদিন হয়ে ওঠে
তার সবচেয়ে সুন্দর কবিতা !

প্রথম লজ্জা

(নিজেকে আবিষ্কার)

মানুষ একদিনে একা হয় না।

একাকীত্ব কোনো দুর্ঘটনা নয়,
সে ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে ঘর বাঁধে।
প্রথমে একটি বিকেল কমে যায়,
তারপর একটি কণ্ঠস্বর,
তারপর একটি দরজা,
তারপর একটি অপেক্ষা,
একদিন হঠাৎ মানুষ বুঝতে পারে—
সে অনেক দিন ধরেই একা!

আমি মনে করতে পারি না,
সেই দিন কোনটি ছিল,
কেননা-
কোনো ক্যালেন্ডারে তারিখটি লেখা নেই!

কেউ আমাকে এসে বলেনি,
"আজ থেকে তুমি একা।"
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলো
ঘোষণার মধ্য দিয়ে আসে না,
তারা নীরবে মানুষের জীবন বদলে দেয়!

হয়তো সেদিন
প্রথম স্কুল থেকে ফিরে দেখেছিলাম,
মা রান্নাঘরে ব্যস্ত,
আমি নিজের জুতো নিজেই খুলেছিলাম।
হয়তো সেদিন
প্রথম বাবা বলেছিলেন,
"এটা এবার তুই নিজেই পারবি।"
হয়তো সেদিন বুঝিনি—
ভালোবাসার একটি ভাষা হলো
ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দেওয়া!

শৈশবে আমরা একা থাকতে চাই না।
বড় হতে হতে আমরা
একা থাকার অভিনয় করি।
আর আরও বড় হলে বুঝি—
অভিনয়টা সত্যি হয়ে গেছে!

মানুষের চারপাশে যত মানুষ বাড়ে,
তার ভেতরের নীরবতাও
তত গভীর হয়!

আমি ভিড়ের মধ্যে
একা মানুষ দেখেছি,
পারিবারিক ছবির মাঝখানে
একা মানুষ দেখেছি,
হাসতে হাসতে একা মানুষ দেখেছি,
কারণ একাকীত্ব মানে
মানুষের পাশে মানুষ
না থাকা নয়!
একাকীত্ব হলো—
যেখানে সবচেয়ে সত্য কথাটি বলার মতো
একজন মানুষও থাকে না।

একদিন আমি খুব আনন্দের
একটি খবর পেয়েছিলাম।
ফোন হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম,
কাকে বলব?
যার কথা প্রথম মনে পড়ল,
সে আর আমার জীবনে নেই।
সেদিন বুঝলাম,
সুখও একা হতে পারে।

আমরা সবসময় দুঃখের
একাকীত্বের কথা বলি,
কিন্তু আনন্দেরও একাকীত্ব আছে!
কিছু কিছু আনন্দ এমনও হয়,
যা কাউকে বলার আগেই
অজানায় মিলিয়ে যায়!

একদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল,
ঘর অন্ধকার।
জানালার বাইরে দূরের একটি বাড়িতে
আলো জ্বলছিল।
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম,
মানুষ কখনো শুধু নিজের ঘরের জন্য
আলো জ্বালে না,
সে আলো জ্বালে—
যেন কোথাও কোনো অচেনা মানুষ
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে,
পৃথিবীতে এখনও আলো আছে।

সেদিন আমার একাকীত্ব একটু বদলে গেল,
আমি বুঝলাম,
একা হওয়া মানে পৃথিবী থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়,
একা হওয়া মানে
নিজের ভেতরের মানুষের সঙ্গে
প্রথমবার দেখা হওয়া!

যে মানুষটিকে আমি এত দিন
শব্দের ভিড়ে শুনতে পাইনি,
নীরবতা তাকে ধীরে ধীরে
আমার সামনে এনে দাঁড় করাল,
সে কিছু বলল না,
আমিও না!

তবু সেই নীরব সাক্ষাতে আমি বুঝলাম,
মানুষের জীবনে কিছু পথ আছে,
যেখানে কেউ পাশে হাঁটতে পারে না!
মা পারে না,
বাবা পারে না,
প্রেম পারে না,
সন্তানও না,
সেই পথ মানুষকে একাই হাঁটতে হয়!

হয়তো সেই কারণেই
মানুষের সবচেয়ে বড় একাকীত্বের
সময়ে নিকটে আসে
স্রষ্টা এবং নীরবতা,
কবিতা জন্ম নেয়!

আজ আমি একা হতে ভয় পাই না!
কারণ আমি জানি,
একাকীত্ব সবসময় শূন্যতা নয়,
কখনো কখনো সে একটি দরজা,
যার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে
সেই মানুষটি,
যার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কথা ছিল
অনেক বছর আগে!

আমি সারাজীবন
পৃথিবীর মানুষের কাছে যেতে চেয়েছি,
আজ বুঝি,
সবচেয়ে দীর্ঘ পথটি
পৃথিবীর দিকে নয়,
নিজের দিকে!

আর সেই পথের প্রথম পদক্ষেপের নাম—
**একা হওয়ার দিন।**

একা হওয়ার দিন

(নিজেকে আবিষ্কার)


পৃথিবীতে যত মানুষ আমাকে চেনে,
তারা কেউ আমাকে চেনে না!

তারা আমার নাম জানে,
আমার মুখ চিনে,
আমার কণ্ঠ শুনেছে,
আমার লেখা পড়েছে,
আমার সঙ্গে হেসেছে,
কেউ কেউ আমার কান্নাও দেখেছে।
তবু তারা যে মানুষটিকে চেনে,
সে আমার সম্পূর্ণ জীবন নয়,
সে শুধু আমার প্রকাশিত অংশ।

আমার ভেতরে আরেকজন মানুষ আছে,
তার কোনো পরিচয়পত্র নেই,
কোনো ছবি নেই,
কোনো সাক্ষাৎকার নেই,
সে কখনো ভিড়ের মধ্যে কথা বলে না,
সে শুধু গভীর রাতে
আমার পাশে এসে বসে,
আমি তাকে কোনোদিন
পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারিনি!

কারণ,
সে অনুভব জানে,
ভাষা জানে না!

আমার জীবনের সবচেয়ে বড়
আনন্দগুলো সে দেখেছে,
দেখেছে সবচেয়ে গভীর অপমানও।
আমি কোথায় ভেঙে পড়েছিলাম,
কোথায় নিজেকে নতুন করে গড়েছিলাম,
কোথায় কাউকে ক্ষমা করতে পারিনি,
কোথায় কাউকে হারিয়ে ফেলবো জেনেও
হাসিমুখে বিদায় দিয়েছি—
সব তার জানা।

মানুষ ভাবে,
সে তার জীবনের সাক্ষী।
না।...
মানুষের প্রকৃত সাক্ষী আরেকজন!
যে কখনো আদালতে দাঁড়ায় না,
কখনো কোনো বই লেখে না,
কখনো নিজের পক্ষে যুক্তি দেয় না,
সে শুধু নীরবে বেঁচে থাকে
তার ভেতরে।

আমি বহুবার
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজেকে দেখেছি,
বহুবার মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে
নিজেকে পরিচয় দিয়েছি,
বহুবার নিজের গল্প বলেছি,-
তবু প্রতিবারই মনে হয়েছে,
সবচেয়ে সত্য অংশটি বাদ পড়ে গেছে,
মনের অজান্তে!

একজন মানুষের জীবন কখনো
তার জীবনীতে লেখা থাকে না।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়গুলো
লেখা থাকে—
যে চিঠি সে লেখেনি,
যে ফোন সে করেনি,
যে ক্ষমা সে চাইতে পারেনি,
যে ভালোবাসা সে স্বীকার করেনি,
যে স্বপ্ন সে কাউকে বলেনি।

এখন বুঝি,
আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি
হয়তো আমি নিজেই।
কিন্তু তার সঙ্গে
আমার পরিচয়ই সবচেয়ে কম!

কখনো কখনো মাঝরাতে মনে হয়,
আমি যদি নিজের ভেতরের সেই মানুষটির সঙ্গে
একবার বসে কথা বলতে পারতাম,
আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম—
তুমি কি এখনও আমাকে বিশ্বাস করো?
আমি কি তোমাকে খুব বেশি
একা করে ফেলেছি?
তুমি কি এখনও সেই স্বপ্নগুলো
মনে রেখেছ,
যেগুলো আমরা ছোটবেলায় দেখেছিলাম?
আমি কোনো উত্তর শুনতে পাই না,
তবু নীরবতার ভেতরে
একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ভেসে আসে!

মনে হয়,
সে এখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা
এক শহর থেকে আরেক শহরে নয়,
এক দেশ থেকে আরেক দেশে নয়,
এক জীবন থেকে আরেক জীবনেও নয়,
সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা—
নিজের প্রকাশিত মানুষ থেকে
নিজের অপ্রকাশিত মানুষের কাছে পৌঁছানো!

যেদিন দেখা হবে,
সেদিন পৃথিবী আমাকে
নতুন করে চিনবে না,
কিন্তু আমি প্রথমবার
নিজেকে চিনব!

আর হয়তো সেই একটিমাত্র পরিচয়ই—
একটি সম্পূর্ণ জীবন।

যে আমাকে কেউ দেখেনি

হাসান বলছি,
মনিষা শুনছো?
আমি চলে আসছি এক নক্ষত্রের রাতে
হাজার মাইলের পথ অতিক্রম করে অনেক দূরে।
সৌন্দর্যের খোঁজ পেয়েছি বহুবার।
পৃথিবীর রূপ দেখে দেখে আমি ক্লান্ত,
আজকাল তোমায় খুব মনে পড়ে,
আমায় কি সহৃদয়ে একবারও মনে পড়ে তোমার?
জানি এ উড়ো চিঠির উত্তর পাবো না,
তবু লিখে যাই,

মনে আছে তোমার?
সেদিনের আমাকে বলা তোমার শেষ লাইনগুলো,
" হাসান সাহেব,আমি আপনাকে যেতে দিবো না,
কক্ষনো না,কক্ষনো না, সারাজীবন আমার সাথে থাকতে হবে"
আমি বলেছিলাম,
" ছায়ময়, মায়াময় পৃথিবীটা অনেক চমৎকার ও গভীর বিষ্ময়কর,
অনেক কাজ করতে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
মৃত্যুর আগে বহুকাজে বহুদূর যেতে হবে"

তোমার লাইনগুলো আমার কানে টিংটং শব্দ করে প্রতিনিয়ত, তোমার মনের রূপের কাছে পৃথিবীর সব রুপ এখন বিষন্ন মনে হয়,
আমার চর্মচক্ষুতে দেখা,
তোমার মতো জ্ঞানী, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতি মেয়ে আমি দেখিনি।
তোমার রুচিশীল সংলাপগুলো,পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা, দুঃখকে গাছের মতো বরণ করে নেওয়া এ এক শক্তিশালী চরিত্র।

তোমার শক্তিশালী চরিত্রের কাছে আমি আজ পরাজিত সৈনিক,
তোমার স্বরণে হৃৎপিণ্ড ছুঁয়ে যায়,
মনের গহীনে উথাল-পাতাল সবকিছু,
তোমারো কি এমন হয়?
নাকি সংসার ধর্ম পালন করতে ব্যস্ত,
নাকি হাসান চরিত্রটা রাতে দেখা স্বপ্নের মতো ভুলে গেছো?
আজ বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে।
সহৃদয়ে স্বরণ হচ্ছে খুব,
দুলাভাই, আপু,মুবিন, রঞ্জু,ভাবী এনারা কেমন আছেন?
এখনও কি ঝগড়ার সিচুয়েশন ডিমান্ড করে দুলাভাইয়ের?
নাকি আশ্রম নিয়ে বড়ই ব্যস্ত দিন যাচ্ছে?
পলিনের হাসান মামা ডাকটা খুব মনে পড়ে,
পাতার বাঁশি আর বাঁজাতে ইচ্ছে করে না।
রঞ্জু ভাই কি এখনো মাঝে মাঝে কবিতা লেখে?
আজ বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে।

আমি এখন কল্পনায় ছুটে চলি তোমাদের সুখগৃহটায়,
তোমাদের সমৃদ্ধ চরিত্রে ভরা পরিবারের
সুখ সংলাপগুলো, মাঝে মাঝে আওড়াই মনের ভিতর,
আহ, কি সুখ! বলতে পারছি না শব্দ সীমাবদ্ধতায়,
গম্ভীর হয়ে আমার উদ্দেশ্যে বলা তোমার সংলাপগুলো, মনে হলে খুব করে হাসি।
আবার মুহূর্তেই মন খারাপ হয়ে যায়,
যখন দেখি অনেক সময় পরে অনেক দূরে আমি।

কল্পনা করি,হয়তো আবার একদিন দেখা হবে
শিমুল গাছের নিচে,
একটা শিমুল ফুল তোমার কানে গুঁজে দিয়ে,
আমরা চলে যাবো নক্ষত্রের রাতে
বনে,পাহাড়ে,সাগরে পার্কে,
যেথায় জমা আছে পৃথিবীর সমস্থ বিষ্ময়।

হাসান বলছি

বাছাইকৃত কবিতা

প্রথম লজ্জা

- মোঃ আবু তালেব

(নিজেকে আবিষ্কার)

আমি ঠিক মনে করতে পারি না,
প্রথম কবে লজ্জা পেয়েছিলাম!

হয়তো ভুল উত্তর দিয়েছিলাম,
হয়তো সবার সামনে হোঁচট খেয়েছিলাম,
হয়তো কাউকে খুব সরল একটি কথা বলেছিলাম,
আর সবাই হেসে উঠেছিল।
ঘটনাটি মনে নেই।
কিন্তু সেই অনুভূতিটি
এখনও আমার ভেতরে বেঁচে আছে।

সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম—
পৃথিবীতে শুধু আমি নেই,
আরও অনেক চোখ আছে,
আর সেই চোখগুলো আমাকে দেখে।

শৈশবে আমরা নিজেদের জন্য বাঁচি,
তারপর একদিন হঠাৎ বুঝি—
অন্যের দৃষ্টিও আমাদের জীবন
লিখতে শুরু করেছে,
সেদিনই লজ্জার জন্ম।

আমি আগে যেমন দৌড়াতাম,
সেদিন থেকে একটু ভেবে দৌড়াতে শিখলাম।
আগে যেমন হাসতাম,
সেদিন থেকে একটু মেপে হাসতে শিখলাম।
আগে যেমন কাঁদতাম,
সেদিন থেকে চোখের জল
লুকিয়ে রাখতে শিখলাম।

মানুষের ভেতরে প্রথম যে দেয়ালটি ওঠে,
তার নাম অহংকার নয়,
তার নাম লজ্জা।
সেই দেয়ালের ওপাশে থেকে যায়
অসংখ্য স্বতঃস্ফূর্ত হাসি,
অকারণ কান্না,
অদ্ভুত প্রশ্ন,
এবং এমন সব স্বপ্ন,
যেগুলো আমরা আর কাউকে বলি না।

একদিন স্কুলে একটি কবিতা আবৃত্তি
করতে উঠেছিলাম।
প্রথম দুটি লাইন বলার পর
বাকিটা ভুলে গিয়েছিলাম।
ঘরভর্তি মানুষ।
নীরবতা।
তারপর কারও হাসি।
সেদিন মনে হয়েছিল,
পৃথিবীর সব দরজা
একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে!

আজ এত বছর পরে বুঝি,
মানুষ কবিতা ভুলে যাওয়ার জন্য
লজ্জা পায় না।
সে লজ্জা পায়—
যখন মনে হয়,
সে আর অন্যদের প্রত্যাশার মানুষটি
হয়ে থাকতে পারল না।

লজ্জা খুব অদ্ভুত একটি অনুভূতি।
সে বাইরে থেকে আসে না,
সে জন্মায় ভেতরে।
একটি ছোট শিশু
নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা পায় না,
নিজের কান্না নিয়ে লজ্জা পায় না,
নিজের প্রশ্ন নিয়ে লজ্জা পায় না।
আমরাই তাকে শেখাই—
কোন হাসি চেপে রাখতে হয়,
কোন কান্না লুকাতে হয়,
কোন স্বপ্ন বলা যায় না।
তারপর একদিন সে বড় হয়ে যায়।
এবং নিজের সত্যটাকেও
ধীরে ধীরে লুকিয়ে ফেলতে শেখে।

আমি এখন ভাবি,
মানুষের জীবনের অনেক সাহস
প্রথম লজ্জার দিনেই হারিয়ে যায়।
যে গানটি সে গাইতে চেয়েছিল,
সে আর গায় না।
যে মানুষটিকে ভালোবাসার কথা
বলতে চেয়েছিল,
সে আর বলে না।
যে প্রশ্নটি করতে চেয়েছিল,
সে চুপ করে যায়।

পৃথিবীর বহু অসমাপ্ত জীবনের শুরু
হয়তো এইভাবেই,
একটি ছোট্ট লজ্জা থেকে।

আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
আমি সেই ছোট্ট শিশুটির কথা ভাবি।
যে ভুল করলে লজ্জা পেত,
কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার দৌড়ে যেত,
আবার হাসত,
আবার চেষ্টা করত।
সে জানত না,
মানুষের মর্যাদা
কখনো নিখুঁত হওয়ার মধ্যে নয়।
বারবার ব্যর্থ হয়েও
আবার শুরু করতে লাগে বুক ভরা সাহস!
হয়তো সেই শিশুটি
আমার চেয়ে অনেক সাহসী ছিল,
কারণ সে তখনও শেখেনি—
পৃথিবীর চোখকে ভয় করতে!

আজ আমি আমার প্রথম লজ্জাকে
ক্ষমা করে দিয়েছি।
কারণ বুঝেছি,
যেদিন মানুষ লজ্জা পায়,
সেদিন সে শুধু নিজের দুর্বলতা দেখে না,
সে প্রথমবার অনুভব করে—
তার ভেতরে এমন একটি সত্য আছে,
যাকে সে পৃথিবীর সামনে
উন্মুক্ত করতে ভয় পায়।

আর সেই অদৃশ্য সত্যটিই
হয়তো একদিন হয়ে ওঠে
তার সবচেয়ে সুন্দর কবিতা !
বিস্তারিত...

একা হওয়ার দিন

- মোঃ আবু তালেব

(নিজেকে আবিষ্কার)

মানুষ একদিনে একা হয় না।

একাকীত্ব কোনো দুর্ঘটনা নয়,
সে ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে ঘর বাঁধে।
প্রথমে একটি বিকেল কমে যায়,
তারপর একটি কণ্ঠস্বর,
তারপর একটি দরজা,
তারপর একটি অপেক্ষা,
একদিন হঠাৎ মানুষ বুঝতে পারে—
সে অনেক দিন ধরেই একা!

আমি মনে করতে পারি না,
সেই দিন কোনটি ছিল,
কেননা-
কোনো ক্যালেন্ডারে তারিখটি লেখা নেই!

কেউ আমাকে এসে বলেনি,
"আজ থেকে তুমি একা।"
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলো
ঘোষণার মধ্য দিয়ে আসে না,
তারা নীরবে মানুষের জীবন বদলে দেয়!

হয়তো সেদিন
প্রথম স্কুল থেকে ফিরে দেখেছিলাম,
মা রান্নাঘরে ব্যস্ত,
আমি নিজের জুতো নিজেই খুলেছিলাম।
হয়তো সেদিন
প্রথম বাবা বলেছিলেন,
"এটা এবার তুই নিজেই পারবি।"
হয়তো সেদিন বুঝিনি—
ভালোবাসার একটি ভাষা হলো
ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দেওয়া!

শৈশবে আমরা একা থাকতে চাই না।
বড় হতে হতে আমরা
একা থাকার অভিনয় করি।
আর আরও বড় হলে বুঝি—
অভিনয়টা সত্যি হয়ে গেছে!

মানুষের চারপাশে যত মানুষ বাড়ে,
তার ভেতরের নীরবতাও
তত গভীর হয়!

আমি ভিড়ের মধ্যে
একা মানুষ দেখেছি,
পারিবারিক ছবির মাঝখানে
একা মানুষ দেখেছি,
হাসতে হাসতে একা মানুষ দেখেছি,
কারণ একাকীত্ব মানে
মানুষের পাশে মানুষ
না থাকা নয়!
একাকীত্ব হলো—
যেখানে সবচেয়ে সত্য কথাটি বলার মতো
একজন মানুষও থাকে না।

একদিন আমি খুব আনন্দের
একটি খবর পেয়েছিলাম।
ফোন হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম,
কাকে বলব?
যার কথা প্রথম মনে পড়ল,
সে আর আমার জীবনে নেই।
সেদিন বুঝলাম,
সুখও একা হতে পারে।

আমরা সবসময় দুঃখের
একাকীত্বের কথা বলি,
কিন্তু আনন্দেরও একাকীত্ব আছে!
কিছু কিছু আনন্দ এমনও হয়,
যা কাউকে বলার আগেই
অজানায় মিলিয়ে যায়!

একদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল,
ঘর অন্ধকার।
জানালার বাইরে দূরের একটি বাড়িতে
আলো জ্বলছিল।
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম,
মানুষ কখনো শুধু নিজের ঘরের জন্য
আলো জ্বালে না,
সে আলো জ্বালে—
যেন কোথাও কোনো অচেনা মানুষ
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে,
পৃথিবীতে এখনও আলো আছে।

সেদিন আমার একাকীত্ব একটু বদলে গেল,
আমি বুঝলাম,
একা হওয়া মানে পৃথিবী থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়,
একা হওয়া মানে
নিজের ভেতরের মানুষের সঙ্গে
প্রথমবার দেখা হওয়া!

যে মানুষটিকে আমি এত দিন
শব্দের ভিড়ে শুনতে পাইনি,
নীরবতা তাকে ধীরে ধীরে
আমার সামনে এনে দাঁড় করাল,
সে কিছু বলল না,
আমিও না!

তবু সেই নীরব সাক্ষাতে আমি বুঝলাম,
মানুষের জীবনে কিছু পথ আছে,
যেখানে কেউ পাশে হাঁটতে পারে না!
মা পারে না,
বাবা পারে না,
প্রেম পারে না,
সন্তানও না,
সেই পথ মানুষকে একাই হাঁটতে হয়!

হয়তো সেই কারণেই
মানুষের সবচেয়ে বড় একাকীত্বের
সময়ে নিকটে আসে
স্রষ্টা এবং নীরবতা,
কবিতা জন্ম নেয়!

আজ আমি একা হতে ভয় পাই না!
কারণ আমি জানি,
একাকীত্ব সবসময় শূন্যতা নয়,
কখনো কখনো সে একটি দরজা,
যার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে
সেই মানুষটি,
যার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কথা ছিল
অনেক বছর আগে!

আমি সারাজীবন
পৃথিবীর মানুষের কাছে যেতে চেয়েছি,
আজ বুঝি,
সবচেয়ে দীর্ঘ পথটি
পৃথিবীর দিকে নয়,
নিজের দিকে!

আর সেই পথের প্রথম পদক্ষেপের নাম—
**একা হওয়ার দিন।**
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4575
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1653
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1629
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1544
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1542
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1466
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1437
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1431
রমণী মোঃ আবু তালেব 1404
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1370
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1369
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1360
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1333
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1330
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1329
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1326
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1321
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1300
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1299
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1290
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
প্রথম লজ্জা মোঃ আবু তালেব 0
একা হওয়ার দিন মোঃ আবু তালেব 14
যে আমাকে কেউ দেখেনি মোঃ আবু তালেব 16
আমার ছায়া মোঃ আবু তালেব 18
আয়নার ভেতরের মানুষ মোঃ আবু তালেব 27
প্রথম প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 29
প্রথম ভয় মোঃ আবু তালেব 35
প্রথম আকাশ মোঃ আবু তালেব 36
বাবার হাত মোঃ আবু তালেব 43
মায়ের চোখ মোঃ আবু তালেব 42
যে ভাষা ছিল না মোঃ আবু তালেব 36
প্রথম কান্না মোঃ আবু তালেব 55
জন্মের পূর্বে মোঃ আবু তালেব 68
নামহীন স্পন্দন মোঃ আবু তালেব 52
প্রথম অন্ধকার মোঃ আবু তালেব 51
মায়ের নীরবতা মোঃ আবু তালেব 61
পৃথিবীর আগে মোঃ আবু তালেব 68
তোমার প্রতি মোঃ আবু তালেব 76
জুলাইয়ের কংক্রিট ও নক্ষত্রের ইশতেহার মো: আবু তালেব 120
ভাঙা মাটির খেলা মো: আবু তালেব 132
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
ইতিহাস যুবক অনার্য 407
অবিকল প্রেমিক যুবক অনার্য 402
কাকভেজা প্রেম যুবক অনার্য 379
পরকিয়া বৃষ্টি যুবক অনার্য 343
রক্তরঞ্জিত বালুকায় আতাউল হাকিম আরিফ 421
বুকের ভেতর জেগে উঠে নীলাভ চোখ আতাউল হাকিম আরিফ 369
বিষণ্ন সন্ধ্যার গান আতাউল হাকিম আরিফ 423
অতীন্দ্রিয় অগাধ সলিলে ডুব দিয়ে আতাউল হাকিম আরিফ 375
ছাদদেয়াল কিংবা অদৃশ্য কার্নিশে আতাউল হাকিম আরিফ 351
স্রোতের কণ্ঠে চন্দ্রাবিষ্ট জ্যোৎস্না আজাহার রাজা 338
তুমুল অপ্রেমের কবিতা যুবক অনার্য 456
ভুল ভালোবাসা যুবক অনার্য 358
তুমি চলে গিয়েছিলে যুবক অনার্য 516
সহানুভূতির দাহে গড়ে নতুন সকাল আজাহার রাজা 443
রক্তে জ্বলে সত্যের দীপ আজাহার রাজা 452
ছায়ার মতো নিঃশব্দ প্রতীক্ষা আজাহার রাজা 542
ভাইয়া Umm Abrar 635
শূন্যে লেখা প্রেমের শপথ আজাহার রাজা 659
চেষ্টা আফরোজ মেহরুবা 655
শুদ্ধতার অন্তিম আহ্বান আজাহার রাজা 592
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে