যে ভাষা ছিল না
- মোঃ আবু তালেব
(শৈশব)
কথা বলতে শেখার আগেই
আমি পৃথিবীকে চিনতাম।
মায়ের বুকে মাথা রাখলে
যে নিশ্চিন্ততা নামত —
তার কোনো নাম ছিল না।
বাবার কোলে যে নিরাপত্তা
চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত —
তার কোনো অভিধান ছিল না।
ভোরের আলো
জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকত,
আমি তাকিয়ে থাকতাম।
আলো আমাকে কিছু বলত না,
আমিও তাকে কিছু বলতাম না —
তবু আমাদের ভুল হতো না কখনো।
শিশু ক্ষুধার কথা বলতে পারে না,
তবু মা বুঝে যায়।
বৃদ্ধ মুখে হাসি রাখেন,
তবু মেয়ে তাঁর হাত ছুঁয়ে বোঝে —
বাবা আজ বড় ক্লান্ত।
দুই বন্ধু হাঁটে পাশাপাশি,
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো কথা নেই;
তবু বিদায়ের বেলায় মনে হয় —
সব কথা হয়ে গেছে।
পৃথিবীর গভীরতম ভাষাগুলোর
কোনো বর্ণমালা নেই।
আমরা বড় হই।
শব্দ শিখি, বাক্য শিখি, যুক্তি শিখি।
তারপর একদিন —
যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি
তার সামনে দাঁড়িয়ে
একটি কথাও বলতে পারি না।
শব্দ গলায় এসে জমে যায়,
অথচ বুকের ভেতর তখন
একটা গোটা মহাবিশ্ব কথা বলছে।
ভাষা সবসময় পাশে থাকে না।
অনুভব থাকে।
আজ আমার কাছে অনেক শব্দ।
চাইলে একটা বই লিখে ফেলতে পারি।
তবু আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য মুহূর্তগুলোর
কোনো ভাষা নেই।
মায়ের শেষবার আমার দিকে তাকানো।
বাবার নীরবে কাঁধে হাত।
প্রথম ভালোবাসার বিদায়।
বন্ধুর অকারণে চলে যাওয়া।
সন্তানের প্রথম হাসি।
এসবের কিছুই
শব্দে সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না।
শব্দ শুধু চারপাশে ঘোরে —
ভেতরে ঢুকতে পারে না।
হয়তো তাই
পৃথিবীর সব কবিতা শেষমেশ
একটা হারানো ভাষাকেই খোঁজে।
সেই ভাষা,
জন্মের আগে যা আমরা জানতাম।
যেখানে ধর্ম ছিল না, জাতি ছিল না,
অহংকার ছিল না —
ছিল শুধু
একটা হৃদয়ের কাছে
আরেকটা হৃদয়ের
ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া।
মানুষ মারা গেলে কোথায় যায় —
জানি না।
শুধু বিশ্বাস করতে চাই,
যদি কোথাও ফিরে যাওয়া বলে কিছু থাকে,
আমরা কোনো নতুন ভাষা শিখতে যাই না।
আমরা ফিরে যাই
সেই প্রথম ভাষায় —
যেখানে একটা স্পর্শ
একটা বইয়ের চেয়েও দীর্ঘ,
এক ফোঁটা অশ্রু
একটা জীবনের চেয়েও সত্য,
আর নীরবতা —
সমস্ত উচ্চারণের আগে —
মানুষের প্রথম মাতৃভাষা।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।