বাবার হাত
- মোঃ আবু তালেব
(শৈশব)
আমার জীবনের প্রথম ছায়া
ছিল একটা হাত।
সেই হাতে কোনো অলৌকিক শক্তি ছিল না।
ছিল না রাজদণ্ড, ছিল না ক্ষমতা,
ইতিহাসের কোনো গৌরব ছিল না।
ছিল শুধু শক্ত হয়ে ওঠা চামড়া,
আঙুলের ফাঁকে জমে থাকা শ্রম,
আর এমন এক নীরবতা —
যা কোনোদিন নিজের কথা বলেনি।
হাঁটতে শেখার আগে
বাবার হাত আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছিল।
আমি পৃথিবীকে চিনতাম না।
তিনি চিনতেন।
তাই আমি পথকে ভয় পাইনি!
কারণ আমি পথে হাঁটিনি —
আমি একটা হাতের ভেতর দিয়ে
পৃথিবীতে ঢুকেছিলাম।
ছোটবেলায় ভাবতাম,
বাবারা কখনো ক্লান্ত হন না।
সকালে বের হন।
রাতে ফেরেন।
খেয়ে নেন।
চুপ করে বসে থাকেন।
আবার ভোর হয়।
জানতাম না,
মানুষের ক্লান্তিরও একটা ভদ্রতা আছে।
যারা সংসারকে ভালোবাসে,
তারা প্রায়ই নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রাখে।
প্রথম বুঝেছিলাম
এক বর্ষার সন্ধ্যায়।
বাবা ভিজে ফিরেছিলেন,
জামা থেকে টপটপ পানি পড়ছিল।
তিনি প্রথমে নিজের কাপড় বদলাননি —
প্রথমে আমার স্কুলব্যাগটা
শুকনো জায়গায় তুলে রেখেছিলেন।
সেদিন দেখেছিলাম —
একজন মানুষ নিজের শরীরের আগে
আরেকজন মানুষের আগামীকাল
বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
বাবারা হয়তো এভাবেই ভালোবাসেন।
শব্দ দিয়ে নয় —
অগ্রাধিকার দিয়ে।
মনে পড়ে,
রাস্তা পার হওয়ার সময়
বাবা আমার হাত ধরতেন।
আজ এত বছর পরে বুঝি —
তিনি আমার হাত ধরতেন না,
তিনি আমার ভয়টা ধরে রাখতেন।
আমি পড়ে গেলে তুলতেন।
কিন্তু কখনো এমনভাবে তুলতেন না,
যাতে আমি হাঁটতে ভুলে যাই।
তিনি জানতেন —
বেশি আশ্রয় মানুষকে দুর্বল করে।
আর সময়মতো ছেড়ে দেওয়া,
সেও ভালোবাসার একটা ভাষা।
বড় হতে হতে
আমরা বাবার হাত ছেড়ে দিই।
ভাবি — এখন একাই পারব।
তারপর একদিন বুঝি —
হাতটা আমরা ছাড়িনি।
সময় ছাড়িয়ে দিয়েছে।
বাবার হাত
ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করে।
যে হাত একদিন আমাকে কাঁধে তুলে
পৃথিবী দেখিয়েছিল,
সেই হাত একদিন
এক গ্লাস পানি ধরতেও
একটু সময় নেয়।
সেদিন পৃথিবী হঠাৎ বদলে যায়।
আমি প্রথমবার বাবার হাত ধরি।
আর অবাক হয়ে দেখি —
তাঁর হাত এখনো আগের মতোই বড়।
শুধু শক্তিটা বদলে গেছে।
তখন বুঝলাম —
শক্তি কখনো মাংসপেশিতে থাকে না।
শক্তি থাকে দায়িত্বে।
একদিন বাবা আমার পাশে থাকবেন না।
এ কথা আমি জানি।
তবু আজও
কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের আগে
অদ্ভুতভাবে মনে হয় —
যদি একবার সেই হাতটা
আমার কাঁধে এসে পড়ত।
কিছু কথা মানুষ সারাজীবন শোনে না।
কিছু হাত মানুষ সারাজীবন ভুলতে পারে না।
জানি না,
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গার নাম কী!
কিন্তু আমার শৈশবে-
তার একটা আকার ছিল।
পাঁচটা আঙুল ছিল।
কঠিন ছিল।
রুক্ষ ছিল।
উষ্ণ ছিল।
সেই হাত আমাকে
শুধু হাঁটতে শেখায়নি।
শিখিয়েছিল —
ভালোবাসা সবসময় কোমল হয় না।
কখনো কখনো ভালোবাসা
একটা রুক্ষ হাত —
যে নিজের সমস্ত ব্যথা লুকিয়ে রেখে
তোমার পড়ে যাওয়ার আগেই
নিঃশব্দে সামনে এগিয়ে আসে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।