মায়ের চোখ
- মোঃ আবু তালেব
(শৈশব)
আমি পৃথিবীকে দেখার আগে
দুটি চোখ আমাকে দেখে নিয়েছিল।
সেই চোখের ইতিহাস আমি জানি না —
জানি না, আমার জন্মের আগে
কত রাত সে একা জেগেছিল,
কত ভয় নিঃশব্দে গিলে ফেলেছিল,
কত অসমাপ্ত স্বপ্ন ভাঁজ করে
তুলে রেখেছিল আমার জন্য।
শুধু জানি —
আমি যখন প্রথম তাকাই পৃথিবীর দিকে,
পৃথিবী তখন
মায়ের চোখ দিয়েই আমাকে দেখছিল।
শিশু পৃথিবীকে সরাসরি বিশ্বাস করে না।
সে আগে একজন মানুষকে বিশ্বাস করে।
আমার কাছে সেই মানুষ ছিল মা।
তিনি হাসলে
পৃথিবীকে নিরাপদ মনে হতো।
তিনি চুপ হয়ে গেলে
ঘরের বাতাসও ভারী হয়ে আসত।
তখনো আমি দুঃখ শব্দটা জানতাম না।
কিন্তু মায়ের চোখে
দুঃখ চিনতে শিখে গিয়েছিলাম।
মানুষের প্রথম বিদ্যালয় কোনো স্কুল নয়।
মানুষের প্রথম বিদ্যালয়
তার মায়ের চোখ।
সেখানেই সে শেখে —
ভালোবাসা কীভাবে কাউকে ছুঁয়ে থাকে,
অপেক্ষা কীভাবে একটা বিকেলকে দীর্ঘ করে,
আর ভয় কীভাবে
নিজের মুখ লুকিয়ে রাখে।
আমি কখনো মাকে বড় বড় কথা বলতে শুনিনি।
জীবন নিয়ে তিনি কোনো বক্তৃতা দেননি।
শুধু দেখেছি —
ভাত কম পড়লে
নিজের থালাটা নিঃশব্দে ছোট করে নিতেন।
দেখেছি —
জ্বরের রাতে আমার কপালে হাত রেখে
আকাশের দিকে তাকাতেন,
কাউকে কিছু না বলে।
দেখেছি —
সবচেয়ে কঠিন দিনেও
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
সন্ধ্যার আলো নিভে যেতে দেখতেন।
তখন বুঝিনি।
এখন বুঝি —
কেউ কাঁদে চোখের জলে।
কেউ কাঁদে
চোখের ভেতরের আলো
একটু একটু করে নিভিয়ে।
আমার মা ছিলেন দ্বিতীয় দলে।
বড় হতে হতে অনেক চোখ দেখেছি।
সাফল্যের চোখ। অহংকারের চোখ।
লোভের চোখ। প্রেমের চোখ।
পরাজয়ের চোখ।
কিন্তু মায়ের চোখের মতো চোখ
আর দেখিনি।
সেখানে বিচার ছিল না।
ছিল আশ্রয়।
ভুল করলে তিনি প্রথমে রাগ করতেন না —
প্রথমে শুধু তাকিয়ে থাকতেন।
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো
শব্দে করা হয় না।
কিছু প্রশ্ন
শুধু একটা দৃষ্টি হয়ে দাঁড়ায় সামনে।
আর কিছু উত্তর
শুধু মাথা নিচু করে দেওয়া যায়।
আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা
কোনো বাড়ি ছিল না।
ছিল দুটি চোখ —
যেখানে আমি ব্যর্থ হতে পারতাম,
কাঁদতে পারতাম,
ভেঙে পড়তে পারতাম,
তবু আমাকে ছোট হতে হতো না।
সময় বড় নিষ্ঠুর।
একদিন সন্তান বড় হয়ে যায়।
মায়ের হাত কাঁপতে থাকে,
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।
যে চোখ একদিন আমাকে পথ চিনিয়েছিল,
সে-ই একদিন
আমার মুখ চিনতে একটু সময় নেয়।
সেদিন মানুষের ভেতরে
আরেকটা শৈশব জন্মায়।
সে প্রথমবার বোঝে —
যার চোখে ভর করে সে পৃথিবী দেখেছিল,
আজ সেই চোখই
তার ভরসা খুঁজছে।
মাঝে মাঝে আয়নায়
নিজের চোখের দিকে তাকাই।
অদ্ভুত লাগে —
আমার চোখের ভেতরে
ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে
আরেক জোড়া চোখ।
তখন বুঝি,
মানুষ শুধু রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না।
সে বহন করে
দৃষ্টিরও উত্তরাধিকার।
হয়তো একদিন
আমার চোখেও কেউ আশ্রয় খুঁজবে।
হয়তো সেদিন বুঝব —
একজন মা
সন্তানের জন্ম শুধু শরীরে দেন না।
তিনি তাঁর চোখের ভেতরেও
আরেকটা পৃথিবীর জন্ম দেন।
আর সেই পৃথিবী —
মা চলে যাওয়ার বহু বছর পরেও —
সন্তানের ভেতরে
আলো জ্বালিয়ে রাখে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।