জুলাইয়ের কংক্রিট ও নক্ষত্রের ইশতেহার
- মো: আবু তালেব
১.
গ্রীষ্মের বাতাস তখন কেবল তপ্ত হতে শুরু করেছে, কিন্তু বাতাস নয়—মানুষের হাড়ের ভেতর জমে থাকা এক শতাব্দী প্রাচীন নীরবতা প্রথম ভাঙতে শুরু করল। আমরা যারা প্রতিদিন ট্রাফিকের জ্যামে, বাজারের ফর্দ হাতে আর কেরানির টেবিলের কোণে নিজেদের যৌবনকে সস্তা কয়েনের মতো খরচ করে ফেলছিলাম, আমরাই হঠাৎ আবিষ্কার করলাম—আমাদের মেরুদণ্ডের ভেতর একটা করে প্রাচীন তরবারি লুকানো ছিল।
জলকামান থেকে যখন প্রথম বিষাক্ত নীল জল ছিটকে এলো, তখন মনে হলো ওটা কোনো সাধারণ তরল নয়; ওটা আসলে এক স্বৈরাচারের জমাট বাঁধা অহংকার, যা আমাদের পবিত্র চামড়াকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা জানত না, এই মাটির গভীরে এমন এক শিকড় আছে যা রক্তের স্বাদ পেলে আরও তীব্রভাবে জেগে ওঠে।
২.
তারপর একটি দুপুর এলো। সেই দুপুরটি আর কোনোদিন ঘড়ির কাঁটায় ফিরে আসবে না। উত্তরবঙ্গের এক ধূসর রাজপথে একটা ছেলে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে গেল। তার কোনো বর্ম ছিল না, কোনো ঢাল ছিল না; শুধু বুকের ভেতর ছিল এক বিশাল আকাশের সমান সাহস। ঝাঁক ঝাঁক বুলেট যখন তার বুক চিরে চলে গেল, তখন মনে হলো একঝাঁক পরিযায়ী পাখি কেবল তার ডানা পাল্টে নক্ষত্রের দিকে উড়ে গেল।
তার পতনের শব্দে এই উপত্যকার প্রতিটি পাথর কেঁদে ওঠেনি, বরং প্রতিটি পাথর একেকটি কামাখ্যা হয়ে উঠল। মায়েরা তাদের রান্নাঘরের উনুন নিভিয়ে দিয়ে জানালার গ্রিল ধরে তাকাল আকাশের দিকে। সেই আকাশে তখন মেঘ ছিল না, ছিল কেবল হাজারো যুবকের চোখের মণি থেকে ছিটকে পড়া স্ফুলিঙ্গ।
"ওরা ভেবেছিল লোহার বুট দিয়ে পিষে দেবে যে ঘাস,
সেই ঘাসই আজ উপড়ে ফেলেছে তাদের প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর।"
৩.
শহরের দেয়ালে দেয়ালে তখন নতুন এক ভাষার জন্ম হচ্ছে। যুবকেরা চুন আর রঙের কৌটো নিয়ে মেতে উঠেছে এক মহাজাগতিক উৎসবে। যে দেয়ালে লেখা ছিল লাঞ্ছনার ইতিহাস, সেখানে তারা ফুটিয়ে তুলল মুক্তির জ্যামিতি। কোনো নোবেলজয়ী কবি যা কখনো ভাবেননি, এই দেশের সাধারণ ঘরের ছেলেরা সেই কবিতার লাইনগুলো স্প্রে পেইন্ট দিয়ে লিখে দিল পিচঢালা রাস্তার বুকে—"বিকল্প কে? বিকল্প এই জনতা।"
একটি ছেলে তৃষ্ণার্ত গলার আকুতি নিয়ে ধাবমান বুলেটের সামনে পানির বোতল বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে হয়তো জানত না, তার সেই শেষ তৃষ্ণা এই গোটা জাতির শতাব্দীর তৃষ্ণাকে এক নিমেষে মিটিয়ে দেবে। তার নিথর দেহটা যখন ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল, তখন বাতাস থমকে গিয়েছিল, মেঘেরা পথ হারিয়েছিল, আর দূর সমুদ্রের ঢেউয়েরা এসে এই পললভূমির পায়ে চুমু খেয়েছিল।
৪.
এখন মধ্যরাত। কারফিউর খাঁচা ভেঙে, সাঁজোয়া যানের লোহাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক বিশাল সমুদ্র হেঁটে আসছে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে। এই সমুদ্রের কোনো জোয়ার-ভাটা নেই, এর নাম—জনতা। স্বৈরাচারী শাসক যখন তার হেলিকপ্টারে চড়ে মেঘের আড়ালে পালিয়ে যাচ্ছে, তখন এই দেশের মাটির কণাগুলো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলছিল: 'আমরা মুক্ত। আমরা আবারও আমাদের নিজস্ব নিঃশ্বাসের মালিক।'
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।