প্রথম প্রশ্ন
- মোঃ আবু তালেব
(শৈশব)
আমি জানি না,
আমার প্রথম প্রশ্ন কী ছিল।
হয়তো তখনো কথা বলতে শিখিনি।
তবু প্রশ্ন ছিল।
কারণ প্রশ্ন
শব্দের পরে জন্মায় না।
প্রশ্ন জন্মায়
বিস্ময়ের ভেতর।
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম —
এত দূর কোথায় শেষ হয়?
নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম —
সব পানি কোথায় যায়?
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম —
তিনি আমাকে এত ভালোবাসেন কেন?
বাবার হাতের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম —
এই হাত সবসময় শক্ত থাকে কীভাবে?
আমি একটাও প্রশ্ন উচ্চারণ করিনি।
তবু পৃথিবী
আমার চোখের ভেতর থেকে
প্রশ্নগুলো পড়ে ফেলেছিল।
শৈশবের সৌন্দর্য কি জানো? —
তখন উত্তর পাওয়ার তাড়া থাকে না।
একটা প্রজাপতির পেছনে
দৌড়াতে দৌড়াতে
শিশুটা হঠাৎ থেমে যায়।
সে প্রজাপতিকে ধরে না।
সে শুধু দেখে।
কারণ দেখাও
এক ধরনের প্রশ্ন!
বড় হতে হতে
আমরা প্রশ্নের ভাষা বদলে ফেলি।
ছোটবেলায় জিজ্ঞেস করতাম —
আকাশ নীল কেন?
আজ জিজ্ঞেস করি —
জীবন এত কঠিন কেন?
তখন জানতে চাইতাম —
পাখি কোথায় যায়?
এখন জানতে চাই —
যারা চলে যায়,
তারা কি সত্যিই চলে যায়?
প্রশ্ন বদলায়।
মানুষ বদলায়।
কিন্তু প্রশ্ন করার ক্ষুধা
বদলায় না।
আমি বহু মানুষ দেখেছি।
কেউ অনেক উত্তর জানে।
কেউ অনেক বই পড়েছে।
কেউ অনেক দেশ ঘুরেছে।
কিন্তু খুব কম মানুষ দেখেছি,
যারা এখনো বিস্মিত হতে পারে।
যে মানুষ বিস্মিত হতে পারে না,
সে আর প্রশ্নও করতে পারে না।
আর যে প্রশ্ন করতে পারে না,
সে বেঁচে থেকেও
জীবনের বাইরে চলে যায়।
একদিন আমার শিক্ষক বলেছিলেন,
"সঠিক উত্তর খুঁজে বের করো।"
আজ এত বছর পরে মনে হয় —
জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
সঠিক উত্তর নয়,
সঠিক প্রশ্ন।
কারণ একটা সত্য প্রশ্ন
শতটা সহজ উত্তরকে অতিক্রম করে।
মানুষ পৃথিবীতে
উত্তর নিয়ে জন্মায় না।
সে জন্মায় প্রশ্ন নিয়ে।
একটা শিশু যখন প্রথমবার আকাশ দেখে —
সে একটা প্রশ্ন।
প্রথমবার মায়ের মুখ ছুঁয়ে দেখে —
সে একটা প্রশ্ন।
প্রথমবার মৃত্যুর কথা শোনে —
সে একটা প্রশ্ন।
প্রথমবার ভালোবাসে —
সে একটা প্রশ্ন।
আমরা সারাজীবন
উত্তর খুঁজতে খুঁজতে
ক্লান্ত হয়ে পড়ি।
অথচ হয়তো জীবন
আমাদের উত্তর হতে বলেনি।
জীবন শুধু বলেছিল —
প্রশ্ন করে যাও।
কারণ যে মানুষ প্রশ্ন হারিয়ে ফেলে,
সে একদিন
নিজের ভেতরের শিশুটিকেও
হারিয়ে ফেলে।
আজ এত পথ হেঁটে,
এত মানুষ দেখে,
এত বিদায় সহ্য করে —
আমি আবার
আমার শৈশবের কাছে
ফিরে যেতে চাই।
সেখানে
একটা শিশু
আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
তার হাতে কোনো বই নেই।
কোনো দর্শন নেই।
কোনো ধর্ম নেই।
কোনো পরিচয় নেই।
শুধু দুটি বিস্মিত চোখ।
আর একটা প্রশ্ন।
যে প্রশ্নের উত্তর সে চায় না।
সে শুধু চায় —
পৃথিবী যেন
তার বিস্ময় কেড়ে না নেয়।
হয়তো মানুষের প্রথম প্রশ্ন
কোনো বাক্য ছিল না।
হয়তো তা ছিল একটা দৃষ্টি।
যেখানে প্রথমবার মানুষ
পৃথিবীকে দেখে
মনে মনে বলেছিল —
"তুমি কে?"
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই
মানুষ সভ্যতা গড়েছে,
ধর্ম এনেছে,
বিজ্ঞান সৃষ্টি করেছে,
প্রেমে পড়েছে,
কবিতা লিখেছে —
এবং একদিন
নিজের জীবনটাকেও
একটা দীর্ঘ প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো
পৃথিবীর বুকে রেখে
অজানায় চলে গেছে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।