আয়নার ভেতরের মানুষ
- মোঃ আবু তালেব
(শৈশব)
প্রথম কবে আয়নায় নিজেকে দেখেছিলাম,
মনে নেই।
হয়তো খুব ছোট ছিলাম।
কেউ আমাকে কোলে নিয়ে
আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছিল।
আমি ভেবেছিলাম,
ওপাশে আরেকটা শিশু দাঁড়িয়ে আছে।
আমি হাত বাড়ালাম,
সেও হাত বাড়াল।
আমি হাসলাম,
সেও হাসল।
অনেক দিন পরে বুঝলাম —
আয়না কখনো
অন্য কাউকে দেখায় না।
তবু সারাজীবন
আমরা আয়নার ভেতর
অন্য একজন মানুষকেই খুঁজি।
শৈশবে আয়না ছিল খেলনা।
কৈশোরে সে হয়ে উঠল বিচারক।
যৌবনে সাক্ষী।
আর বয়স বাড়তে বাড়তে একদিন —
নীরব ইতিহাস।
আমি প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়াই।
দাড়ি কাটি।
চুল আঁচড়াই।
মুখ ধুই।
কিন্তু খুব কম দিনই
নিজেকে দেখি।
আমি দেখি একটা মুখ।
আর মুখ কখনো মানুষ নয়।
মুখ হলো মানুষের দৃশ্যমান বাহ্যিক খোলস।
ভেতরে যে থাকে,
সে আয়নায় ধরা পড়ে না।
একদিন দীর্ঘক্ষণ
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
অদ্ভুত এক অস্বস্তি জন্ম নিল।
মনে হলো,
আমার চোখের ভেতর
কেউ একজন আমাকে দেখছে।
আমি তাকে চিনি না।
সে আমাকে অনেক দিন ধরে চেনে!
সে জানে
আমি কোথায় মিথ্যা বলেছি,
কোথায় ভয় পেয়েছি,
কোথায় ভালোবাসতে গিয়ে
পিছিয়ে এসেছি,
কোথায় কাঁদতে চেয়েও
বাধ্য হয়ে হেসেছি।
সে সব জানে।
কারণ সে আমার মুখ নয়,
সে আমার জীবন।
মানুষের সবচেয়ে বড় একাকীত্ব
হয়তো তখনই শুরু হয়,
যখন সে বোঝে —
তার পরিচয় আর তার প্রতিচ্ছবি
এক জিনিস নয়।
একদিন বাবা বলেছিলেন,
"মানুষের মুখ দেখে
মানুষ চিনিস না।"
তখন বুঝিনি,
আজ বুঝি —
সেই কথা
আয়নার জন্যও সত্য।
আয়না আমাকে
আমার চেহারা দেয়,
আমার চরিত্র নয়।
আমার বয়স দেখায়,
আমার সময় নয়।
আমার চোখ দেখায়,
আমার দেখা স্বপ্নগুলো নয়।
আমরা প্রতিদিন
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজেদের ঠিক করি।
কিন্তু ক'জন মানুষ
নিজের ভেতরের মানুষটাকে ঠিক করতে
এক মুহূর্ত দাঁড়ায়?
পৃথিবীতে এত সুন্দর মুখ —
তবু এত ক্লান্ত জীবন।
আমি মাঝে মাঝে
আয়না ঢেকে রাখি।
দেখতে চাই,
না দেখে আমি নিজেকে
কতটা চিনতে পারি!
সেই দিনগুলোতে বুঝি —
মানুষ নিজের মুখের ওপর যতটা নির্ভর করে,
তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে
অন্যের চোখের ওপর।
আমরা আয়নায় নিজেকে দেখি না,
আমরা দেখতে চাই —
পৃথিবী আমাদের কীভাবে দেখে।
কিন্তু গভীর রাতে,
সব আলো নিভে গেলে,
সব পরিচয় খুলে গেলে,
সব অভিনয় ক্লান্ত হয়ে পড়লে —
একজন মানুষ নিঃশব্দে এসে
আমার পাশে দাঁড়ায়:
তার কোনো নাম নেই।
কোনো পদবি নেই।
কোনো মুখোশ নেই।
সে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকে,
আমি দেখি শুধু তার চোখ!
কারণ সে আয়নার ভেতরের মানুষ নয়,
সে আমার ভেতরের আয়না।
সেদিন প্রথম বুঝলাম —
আয়না কখনো কাচে ঝোলে না,
আয়না ঝোলে মানুষের বিবেকে।
আর যে মানুষ একদিন
নিজের ভেতরের সেই আয়নার সামনে
দাঁড়াতে পারে —
তার জন্য পৃথিবীর কোনো বিচারক লাগে না।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।