প্রথম ভয়
- মোঃ আবু তালেব
(শৈশব)
আমি ঠিক মনে করতে পারি না,
প্রথম কবে ভয় পেয়েছিলাম।
হয়তো এক বিকেলে
হঠাৎ মাকে চোখের আড়াল করে ফেলেছিলাম।
হয়তো ঘুম ভেঙে দেখেছিলাম —
ঘরে কেউ নেই।
হয়তো বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল,
আর অন্ধকার এক মুহূর্তে
ঘরের সব পরিচিত জিনিসকে
অপরিচিত করে দিয়েছিল।
শিশুরা অন্ধকারকে ভয় পায় না।
তারা ভয় পায় —
যাকে ডাকবে,
যখন সে সাড়া না দেয়!
সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম,
পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া বলে
একটা ঘটনা আছে।
আমি উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলাম।
বেশি দূরে যাইনি,
তবু মনে হচ্ছিল
আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে গেছি।
চারদিকে মানুষ ছিল,
শব্দ ছিল,
আলো ছিল —
শুধু যাকে চাই,
সে ছিল না।
আমার ভয়ের কেন্দ্র অন্ধকার ছিল না,
ছিল অনুপস্থিতি।
মানুষের সবচেয়ে গভীর ভয়গুলো
অধিকাংশই অনুপস্থিতিকে ঘিরে।
মা নেই।
বাবা ফিরছে না।
বন্ধু দূরে চলে গেছে।
ভালোবাসার মানুষটা
আর আগের মতো নেই।
আমরা বলি —
একা হতে ভয় পাই।
আসলে আমরা ভয় পাই,
যাদের উপস্থিতি দিয়ে
নিজের অস্তিত্ব বুঝতাম,
তারা যখন পাশে থাকে না।
ছোটবেলায়
ঘুমানোর আগে
দরজার দিকে তাকাতাম।
মনে হতো,
ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
জানতাম,
কেউ নেই।
তবু কম্বল টেনে
মুখ ঢেকে ফেলতাম।
ভয়ের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে —
সে বাস্তবের চেয়ে
কল্পনার ভেতরে বড় হয়ে ওঠে।
বাবা একদিন বলেছিলেন,
"ভয় পেলে পালিয়ে যাস না,
দাঁড়িয়ে থাক।"
তখন বুঝিনি,
দাঁড়িয়ে থাকলে তো
ভয় আরও কাছে আসে।
এখন বুঝি —
মানুষ ভয়কে জয় করে না।
মানুষ ভয়ের সঙ্গে
দাঁড়িয়ে থাকতে শেখে।
প্রথম যেদিন স্কুলে গেলাম,
সেদিনও ভয় পেয়েছিলাম।
নতুন মুখ,
নতুন ঘর,
নতুন গন্ধ।
বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিলাম —
মা এখনো আছেন কি না,
কিছুক্ষণ পরে তিনি চলে গেলেন।
আমি কাঁদিনি।
কিন্তু বুকের ভেতরে
একটা চেয়ার খালি হয়ে গেল।
সেদিন শিখলাম —
বড় হওয়া মানে
ধীরে ধীরে কিছু পরিচিত হাত
ছেড়ে দেওয়া।
আমরা ভাবি,
শৈশবের ভয় ছোট ছিল।
না...,
শৈশবের ভয় ছিল নির্মল।
সেখানে টাকার চিন্তা ছিল না,
সম্মানের ভয় ছিল না,
ব্যর্থতার হিসাব ছিল না।
ছিল শুধু একটা সহজ আতঙ্ক —
আমি কি একা হয়ে যাব?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
ভয়ের পোশাক বদলায়।
কিন্তু তার মুখ একই থাকে।
আজও গভীর রাতে
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকি।
কোথায় আছি,
কে আছে,
সব ঠিক আছে তো —
মনে মনে যাচাই করি।
তারপর বুঝি,
সেই ছোট্ট শিশুটা
এখনো আমার ভেতরে বেঁচে আছে।
সে এখনো মাঝে মাঝে মাকে খোঁজে,
বাবার পায়ের শব্দ শোনার অপেক্ষা করে,
দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।
হয়তো মানুষের প্রথম ভয়
কখনো পুরোপুরি চলে যায় না।
সে আমাদের ভেতরে
একটা ছোট ঘর বানিয়ে থাকে।
আমরা বড় হই,
শহর বদলাই,
ভাষা বদলাই,
জীবন বদলাই —
কিন্তু সেই ঘরে
একটা শিশু চুপচাপ বসে থাকে।
আর যখন পৃথিবী
খুব অপরিচিত হয়ে যায়,
খুব শীতল হয়ে যায় —
তখন সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে
জিজ্ঞেস করে,
"তুমি আছ তো?"
মানুষের সমস্ত প্রার্থনার
সবচেয়ে প্রাচীন বাক্যও
হয়তো এটাই।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।