প্রথম নীরবতা
- মোঃ আবু তালেব
(নিজেকে আবিষ্কার)
আমি প্রথম কবে নীরব হয়েছিলাম,
মনে নেই!
হয়তো এমন একদিন,
যেদিন আমার কথা কেউ শোনেনি।
হয়তো এমন এক বিকেলে,
যেদিন আমি যা বলতে চেয়েছিলাম,
তার কোনো শব্দ খুঁজে পাইনি।
হয়তো কোনো অকারণ অভিমানে,
হয়তো প্রথম কোনো বিদায়ের ক্ষণে!
শুধু মনে আছে—
একদিন আমি আগের মতো কথা বলিনি,
আর তা টের পায়নি পৃথিবীও!
মানুষ ভাবে,
নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি।
আমি তা মনে করি না।
নীরবতা হলো সেই জায়গা,
যেখানে শব্দ পৌঁছাতে পারে না।
ছোটবেলায়
আমি খুব সহজে কথা বলতাম।
যা মনে হতো,
তাই বলতাম।
যা ভালো লাগত,
তাই চাইতাম।
কষ্ট পেলে,
সহজেই কেঁদে ফেলতাম,
তারপর ধীরে ধীরে বড় হলাম!
মানুষ আমাকে ভাষা শিখিয়েছে,
তারও আগে শিখিয়েছে—
কোন কথা বলতে নেই,
কোন কান্না লুকিয়ে রাখতে হয়,
কোন ভালোবাসা প্রকাশ করা যায় না,
কোন প্রশ্ন করলে সবাই অস্বস্তি বোধ করবে,
সেদিনই আমার ভেতরে
প্রথম নীরবতার জন্ম।
আমি দেখেছি,
সবচেয়ে গভীর মানুষগুলো
খুব বেশি কথা বলে না।
তারা নদীর মতো।
নদী কখনো নিজের গভীরতা নিয়ে
ঘোষণা দেয় না,
শুধু বয়ে যায়।
একদিন বাবা অনেকক্ষণ
চুপ করে বসে ছিলেন।
আমি ভেবেছিলাম,
তিনি রাগ করেছেন।
আজ বুঝি,
সব নীরবতা রাগ নয়,
কিছু নীরবতা ক্লান্তি,
কিছু নীরবতা ভালোবাসা,
কিছু নীরবতা এমন এক দুঃখ,
যার কোনো ভাষা এখনো পৃথিবী জানেনা!
মা কখনো কখনো
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
ডাকলেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতেন না।
তখন মনে হতো,
তিনি হয়তো দূরের কোনো গাছ দেখছেন।
এখন বুঝি,
মানুষ কখনো বাইরে তাকিয়ে থাকে না,
সে তাকিয়ে থাকে নিজের ভেতরে!
নীরবতারও ঋতু আছে,
শৈশবের নীরবতা বিস্ময়ের,
কৈশোরের নীরবতা সংকোচের,
যৌবনের নীরবতা দ্বন্দ্বের,
আর বার্ধক্যের নীরবতা স্মৃতির।
আমরা প্রত্যেকে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বয়সে
একই নীরবতাকে ভিন্ন নামে ডাকি।
আমি একদিন আবিষ্কার করলাম,
যে কথাগুলো আমি কাউকে বলতে পারিনি,
সেগুলো হারিয়ে যায়নি,
তারা আমার ভেতরে বসে
ধীরে ধীরে আমাকে বদলে দিয়েছে!
মানুষ তার উচ্চারিত বাক্য দিয়ে
যতটা গড়ে ওঠে,
তার চেয়ে অনেক বেশি গড়ে ওঠে
না-বলা বাক্য দিয়ে।
হয়তো সেই কারণেই
কিছু মানুষের পাশে বসলে
কথা বলতে ইচ্ছে করে না,
শুধু থাকতে ইচ্ছে করে।
কারণ সত্যিকারের সান্নিধ্য
শব্দের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না,
থাকে বিশ্বাসের ওপর।
আজ আমি আর নীরবতাকে
ভয় পাই না।
আগে ভাবতাম,
চুপ করে থাকা মানে
শূন্য হয়ে যাওয়া।
এখন জানি,
চুপ করে থাকা মানে
নিজের শব্দগুলোর
মর্মার্থ খুঁজে নেওয়ার ফুরসত!
একদিন,
পৃথিবীর সব শব্দ
শেষ হয়ে যাবে,
সব তর্ক থেমে যাবে,
সব পরিচয় মুছে যাবে,
থেকে যাবে কেবল
নিরবতা!
হয়তো একটি দীর্ঘ নীরবতা—
যেখানে মানুষ প্রথমবার
নিজের কণ্ঠ নয়,
শুধু নিজের অস্তিত্বকে শুনতে পায়!
আমি আজও সেই
প্রথম নীরবতার
কাছে ফিরে যাই।
যখন পৃথিবী খুব কোলাহলপূর্ণ হয়ে ওঠে,
যখন মানুষ খুব দ্রুত বিচার করে,
যখন শব্দ সত্যের চেয়ে বড় হয়ে যায়।
আমি চোখ বন্ধ করি
আর শুনতে পাই—
আমার ভেতরে এখনও
একটি শিশু বসে আছে!
সে কিছু বলছে না,
তার বলার দরকারও নেই।
কারণ সে জানে,
মানুষের জীবনের সবচেয়ে সত্য বাক্যগুলো
উচ্চারণ করা যায় না,
শুধু বেঁচে থাকা যায়।
আর সেই বেঁচে থাকার
প্রথম ভাষার নামই—
**নীরবতা।**
বিস্তারিত...