কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

প্রিয় নবীর ছবি আমি আঁকছি কবিতায়,
দেখতে হলে তাকাও তোমার হৃদয়ের আয়নায়।

চাঁদের মতো মুখখানি তাঁর, কাজল কালো চোখ,
ঈষৎ বাঁকা ভ্রু ছিল তার, পশম ভরা বুক।

ঢেউ খেলানো কেশ ছিল তার, লতি ও কাঁধ তক,
বড় ছিল মাপ মতো তাঁর মাথা মোবারক।

চোখের পাতায় পলক ছিল অতি দীর্ঘকায়,
রক্তিম রেখার টান ছিল তাঁর চোখের শুভ্রতায়।

চমকাতো নূর সর্বদা তাঁর উন্নত নাক-কান,
মূর্তির মতো মসৃণ তার গলা ও গর্দান।

স্ফীত এক রগ ছিল তাঁর ললাট প্রশস্তে,
রাগের সময় উঠত ফুলে ভীষণ ধীরস্থে।

সামনের দুই দন্ত মাঝে ছিল খানিক ফাঁক,
দন্তরাজির জন্য ছিল সুন্নতি মিসওয়াক।

ঈষৎ গোলের মুখখানি তার, গোস্তে গণ্ড ফোলা,
ছিল না তার রঙ চেহারার তামাটে বা ধলা।

চিকন-চিকন দাঁত ছিল তার ভীষণ চমৎকার,
কথার সময় চমকাতো নূর, জমকালো মুখ তাঁর।

ডোরাকাটা লালরঙা এক চাদর ছিল তার,
মাঝারি তার গড়ন ছিল, পরনে ইযার।

সবার থেকে উঁচু তাঁরে দেখলে মনে হয়,
ঝুঁকে ঝুঁকে পা ফেলিতেন, বুক ফুলিয়ে নয়।

হাতের তালুর মতোই ছিল মাংসল পায়ের পাত,
কাঁধের মাঝে ছিল তাঁহার মোহরে নবুওয়াত।

শৌর্যে-বীর্যে প্রভাবশালীর পেট-বক্ষ সমান,
রূপার মতো ছিল তাহার চকচকে গর্দান।

অনাবৃত হইলে তাঁরে লাগত চমৎকার,
সেই চেহারা এঁকে দেবার শব্দ নেই আমার।

হাত-পায়ে তাঁর আঙুল ছিল দীর্ঘ মানানসই,
কবজি হতে কনুই ছিল হুবহু এর মতোই।

হাতের মতো মাংসে ভরা উভয় পায়ের নল,
হাড়ের জোড়া শক্ত ছিল, বাহুর যেমন বল।

রূপ-লাবণ্যে নবী আমার পূর্ণিমারি চাঁদ,
তাঁর প্রতি মোর ভালোবাসা জন্মেছে অগাধ।

তাঁর চেহারার মতো আজও হয় না কোনোই তুল,
তাঁরচে ছিলেন ইউসুফ নবী সুন্দর অপ্রতুল।

শুভ্র হয়নি চুল-দাড়ি তাঁর, হয় যদি এক কুড়ি,
বডি তাহার ছিল বিল্ডার, হয়নি মোটা ভুঁড়ি।

চল্লিশে হন নবী আমাদের, তেষট্টিতে যান চলে,
এই তেইশ বছরের মধ্য দিয়েই দুনিয়া ঝলমলে।

কবির কলমে নবির ছবি - Kobir Kolome Nobir Chobi

(মুখ ও মুখোশ)

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মানুষ প্রথম যে মুখটি দেখে,
সেটি তার নিজের নয়—
সারাদিন পৃথিবীকে দেখানোর জন্য
তৈরি করা একটি মুখ।

আমি দেখেছি তাকে
অফিসের লিফটে,
বাসের ভিড়ে,
চায়ের দোকানের বেঞ্চে,
বিয়ের আসরে,
শোকের ঘরে।

সবাই খুব সুন্দর করে
নিজেকে বহন করে।

যে মানুষটি গতরাতে
বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল,
সকালবেলা সে-ই
সহকর্মীকে বলে—

“ভালো আছি।”

যে বাবা
মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে পারেনি,
সে সন্তানের সামনে
হেসে বলে—
“আগামী মাসে হয়ে যাবে।”

যে নারী
সারাদিন অপমান সহ্য করে,
সন্ধ্যায় অতিথির সামনে
চা বাড়িয়ে দেয়
শান্ত মুখে।

কেউ মিথ্যা বলে না—
তবু শহরটা
মিথ্যায় ভরে থাকে।

কারণ সত্যেরও
একটি সময় আছে,
একটি পোশাক আছে,
একটি সামাজিক অনুমতি আছে।

সব সত্য
টেবিলে রাখা যায় না।
সব কান্না
মানুষের সামনে কাঁদা যায় না।
সব ক্ষুধা
ভদ্রলোকের ভাষায় বলা যায় না।

তাই আমরা মুখ বানাই।
একটি মুখ
মায়ের জন্য,
একটি সন্তানের জন্য,
একটি অফিসের জন্য,
একটি প্রেমের জন্য,
একটি সমাজের জন্য।
আর গভীর রাতে,
সব দরজা বন্ধ হলে,
আলো নিভে গেলে
মানুষ নিজের মুখগুলো
এক এক করে খুলে রাখে।

তখন আয়নায়
যে মুখটি দেখা যায়,
তার কোনো পরিচয় নেই।
সে শুধু ক্লান্ত।
তার চোখের নিচে
ঘুমহীন রাতের দাগ,
ঠোঁটে আটকে থাকা
অনেকগুলো অসমাপ্ত কথা।

আমি একদিন
সেই মুখটির দিকে তাকিয়ে
ভয় পেয়েছিলাম।
কারণ তাকে
আমি চিনতে পারিনি।
এত বছর ধরে
নিজের মুখ বহন করতে করতে
নিজেকেই ভুলে গিয়েছিলাম।

সেদিন বুঝলাম—
মানুষের সবচেয়ে বড় মুখোশ
মুখের ওপর থাকে না;
সে থাকে
নিজের সম্পর্কে
নিজের বিশ্বাসের ভেতর।
আমরা বলি—
আমি ভালো মানুষ।
আমি সৎ।
আমি সাহসী।
আমি কাউকে ঘৃণা করি না।

কিন্তু সুযোগ এলে
আমাদের ভিতরের অন্ধকার
আস্তে করে দরজা খোলে।
তখন দেখা যায়—
মুখের নিচে আরেক মুখ,
তার নিচে আরও একটি।

শেষে
কোনো মুখ নেই।
শুধু একজন মানুষ
দাঁড়িয়ে আছে—
নগ্ন,
ভীত,
অসহায়,
এবং প্রথমবার
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে
ভাবছে—
পৃথিবীর কাছে নয়,
নিজের কাছেই
আমি এতদিন
কিসের অভিনয় করে গেলাম?

মুখের নিচে মুখ

(ভালবাসা)

শেষবার যখন তুমি এলে,
বিকেল তখন প্রায় ফুরিয়ে গেছে।
জানালার কাঁচে
শীতের ম্লান রোদ—
ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল
একটি শুকনো পাতা।

তুমি পাতা তুলে
টেবিলের ওপর রাখলে।
বললে,
“এটা এখানে ছিল?”
আমি বললাম,
“হয়তো বাতাসে এসেছে।”
তুমি হেসে বললে,
“সবকিছুই কি বাতাসে আসে?”

আমি উত্তর দিইনি।

কারণ কিছু জিনিস
বাতাসে আসে না—
ধীরে ধীরে
মানুষের ভিতরে জন্মায়।
আমরা সেদিন
অনেক সাধারণ কথা বলেছিলাম।

চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
ঘড়িতে পাঁচটা বেজে গিয়েছিল।
বাইরে একজন ফেরিওয়ালা
শেষবারের মতো ডাকছিল।
তুমি বারবার
জানালার দিকে তাকাচ্ছিলে।
আমি বুঝেছিলাম।
তবু জিজ্ঞেস করিনি—

তুমি কি সত্যিই চলে যাবে?
তুমি যাওয়ার আগে
ঘরের দিকে একবার তাকালে।

যেন কোনো মানুষ নয়,
একটি পুরোনো জীবন
শেষবার দেখে নিচ্ছিলে।
দরজার কাছে এসে
তুমি বললে,
“ভালো থেকো।”
এই দুটি শব্দ
কত ছোট!

অথচ তাদের ভিতরে
আমাদের সমস্ত দিন
ধীরে ধীরে ডুবে গেল।
তুমি বেরিয়ে গেলে।
দরজা বন্ধ হলো।

আমি টেবিলের কাছে ফিরে এসে
দেখলাম—
শুকনো পাতাটি
এখনও সেখানে।
সেদিন রাতে
আমি পাতাটি ফেলে দিইনি।
পরদিনও না।
তারপর বহুদিন।

অবশেষে এক সকালে
জানালা খুলতেই
হাওয়া এসে
পাতাটিকে মেঝেতে ফেলে দিল।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

তারপর বুঝলাম—
কিছু স্মৃতি
আমরা যত্ন করে রাখি না;
তারা নিজেরাই
আমাদের কাছে থেকে যায়।
আর একদিন
নিজেরাই চলে যায়।

তোমার চলে যাওয়ার পর
আমি ভাবতাম,
ভালোবাসার শেষ কোথায়?
যে দিন মানুষ চলে যায়?
যে দিন তার নাম আর ডাকা হয় না?

নাকি যে দিন
তার কথা মনে পড়লেও
বুকের ভিতর আর ব্যথা করে না?
আজ জানি—
ভালোবাসার শেষ বলে
আসলে কিছু নেই।
শুধু একদিন
তার দরজাটি
অন্যদিকে খুলে যায়।

তার ওপারে থাকে
অভিমানহীন একটি সকাল,
একটি পুরোনো মুখ,
একটি শুকনো পাতা,
আর একজন মানুষ
যে ফিরে তাকিয়ে দেখে—
সে যাকে হারিয়েছিল,
তার চেয়ে বড় কিছু
সে হারায়নি;
সে হারিয়েছিল
নিজের সেই মানুষটিকে,
যে ভালোবাসতে জানত
কোনো শর্ত ছাড়াই।

সেদিন
আমি দরজাটি বন্ধ করিনি।
খোলা রেখেছিলাম।
তোমার জন্য নয়।
যদি কোনোদিন
আমার হারিয়ে যাওয়া মানুষটি
নিজের কাছে ফিরে আসে—
যেন তার ঢোকার পথ থাকে।

ভালোবাসার শেষ দরজা

(ভালবাসা)

তোমার শহরে আর যাই না।

তবু কখনো কখনো
অকারণে বাসের জানালায়
সেই পুরোনো রাস্তা উঠে আসে—
একটি ওষুধের দোকান,
মোড়ের চায়ের স্টল,
বিকেলের ধুলোয়
একটি শিশুর লাল বল।

স্মৃতি বড় অদ্ভুত;
সে কখনো পুরো বাড়িটা ফিরিয়ে আনে না,
শুধু একটি জানালা খুলে দেয়।

সেই জানালায়
তুমি দাঁড়িয়ে থাকো।

আমি তোমাকে ডাকতে যাই,
কিন্তু কণ্ঠস্বরের আগেই
বাসটি মোড় ঘুরে যায়।

বহু বছর হলো
তোমার সঙ্গে কথা হয় না।
তবু
কিছু কথা প্রতিদিনই হয়।

সকালে চা বানাতে গিয়ে
চিনি কম হলে মনে পড়ে—
তুমি কম চিনি খেতে।
বৃষ্টির দিনে
জানালা বন্ধ করতে গিয়ে
মনে পড়ে—
তুমি বৃষ্টির শব্দ শুনতে
জানালা খোলা রাখতে।
শীতের রাতে
কম্বলটা টেনে নিই—
মনে পড়ে,
তুমি পা ঢাকতে ভুলে যেতে।

দেখো,
মানুষ চলে যায় কত সহজে;
তার অভ্যাসগুলো যায় না।
তারা ঘরের জিনিসের মতো
আমাদের জীবনে পড়ে থাকে।

একদিন পুরোনো আলমারি খুলে
তোমার একটি চিঠি পেলাম।
খামটি খালি।
চিঠিটা নেই।
কী লেখা ছিল
মনে নেই।

শুধু তোমার হাতের লেখা
মনে আছে।
আমি অনেকক্ষণ
সেই অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তারপর বুঝলাম—
কখনো কখনো
মানুষের কথা নয়,
তার লেখা থেকে যাওয়ার ভঙ্গিটুকুই
আমাদের কাছে বেঁচে থাকে।

তুমি নেই।

তবু তোমার জন্য
আমার ভিতরে যে জায়গাটি ছিল
সেটি আমি অন্য কাউকে দিইনি।

এটি কোনো প্রতিজ্ঞা নয়।
কোনো অপেক্ষাও নয়।
শুধু একটি খালি ঘর।
যেখানে মাঝে মাঝে
বিকেলের আলো এসে বসে।

আজ যদি তুমি হঠাৎ ফিরে আসো,
আমি হয়তো চিনতে পারব না।
তোমার মুখ বদলে যাবে,
আমার মুখও।
আমরা দুজনেই
অন্য জীবনের মানুষ হয়ে যাব।
তবু
হয়তো এক মুহূর্তের জন্য
দুজনেই বুঝব—
এই চোখদুটি
কোনো এক সময়
একে অন্যের দিকে
খুব গভীরভাবে তাকিয়েছিল।

তারপর তুমি আবার চলে যাবে।
আমি তোমাকে আটকাব না।
শুধু সেই রাতে
নিজের ঘরে ফিরে
জানালাটা খুলে রাখব।
বাইরে যদি বৃষ্টি নামে,
বৃষ্টি আসুক।

যদি বাতাস আসে,
বাতাস আসুক।
যদি কিছুই না আসে—
তবুও থাক।
কারণ এত বছর পরে
আমি শিখেছি,
কাউকে কাছে পাওয়া আর
কারও কাছে থাকা
এক কথা নয়।

তুমি আমার কাছে নেই।
তবু
তোমার চলে যাওয়ার পর
আমার যে মানুষটি বেঁচে আছে—
সে আজও তোমার কাছেই থাকে।

তোমাকে ছাড়া তোমার কাছে

(ভালবাসা)

তোমাকে ভালোবাসি—
এই কথাটি
তোমার সামনে কোনোদিন
আমার বলা হয়ে ওঠেনি।

কতবার ঠোঁটের কাছে এসে
ফিরে গেছে ঠোঁট—
যেমন সন্ধ্যার পাখি
শেষ আলো ছুঁয়ে
অন্ধকারের দিকে ফিরে যায়।

তুমি ছিলে আমার পাশে।
একই টেবিলে দুজনের চা,
একই জানালায় বৃষ্টি,
একই রাস্তায় হাঁটা—
কত সহজ ছিল আমাদের দিনগুলি।

শুধু হৃদয়টা
ছিল ভীষণ অসহায়।

তুমি যখন হাসতে,
আমি অন্যদিকে তাকাতাম।
তুমি যখন চুপ করতে,
আমি আরও চুপ হয়ে যেতাম।

আমাদের মধ্যে
কোনো অভিমান ছিল না—
ছিল একটি অদ্ভুত সংকোচ,
যেন ভালোবাসার নাম নিলে
ভালোবাসাটাই ভেঙে যাবে।

একদিন তুমি বলেছিলে,
“আমাকে কিছু বলবে?”
জানালার বাইরে তখন
বিকেল ধীরে ধীরে
পুরোনো বাড়িগুলোর গায়ে
তার শেষ রং মাখাচ্ছিল।
আমি বলেছিলাম,
“না, কিছু না।”

তুমি আর জিজ্ঞেস করোনি।

সেদিন বুঝিনি—
একটি মানুষ
কখনো কখনো
দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করে না।

তারপর তুমি চলে গেলে।
তোমার যাওয়ার পর
ঘরটা আগের মতোই ছিল—
চেয়ার, টেবিল, বই,
জানালার ধারে রাখা ফুলদানিটিও।
শুধু একটি জিনিস ছিল না—
তোমার অন্যমনস্ক হয়ে
আমার দিকে তাকিয়ে থাকা।

বছর পেরিয়ে গেল।

আমি অন্য জীবন পেলাম,
অন্য মানুষের সঙ্গে কথা বললাম,
অন্য শহরে ঘুমালাম।
কিন্তু কোনো কোনো দুপুরে
হঠাৎ থেমে যাই।
কারণ কোনো অচেনা মেয়ের হাসিতে
তোমার হাসির একটি অক্ষর
ফিরে আসে।
তখন মনে হয়—
ভালোবাসা কি সত্যিই শেষ হয়?
নাকি
যে কথাটি বলা হয়নি,
সে মানুষের ভিতর
আরও দীর্ঘ জীবন পায়?

আজ তোমার কাছে
আমার কোনো দাবি নেই।
তুমি কোথায় আছ,
কাকে ভালোবাসো,
আমাকে মনে রেখেছ কি না—
কিছুই জানতে চাই না।

শুধু মাঝে মাঝে
পুরোনো সেই বিকেলটি
মনে পড়ে।
তুমি সামনে ছিলে।
আমি বলতে পারতাম।
বলিনি।

জীবন কত অদ্ভুত—
একটি শব্দের জন্য
কখনো কখনো
একটি সম্পূর্ণ জীবন
অপেক্ষা করে থাকে।
আর সেই শব্দটি
যেদিন আর বলা সম্ভব নয়,
সেদিন তার অর্থ
আরও গভীর হয়ে যায়।

তাই আজও
রাতের শেষে
যখন পৃথিবী খুব নিঃশব্দ,
আমি নিজের ভিতর
সেই কথাটি শুনতে পাই—
তোমাকে ভালোবাসি।
কেউ শোনে না,
তুমিও না।

তবু
এত বছর পরেও
কথাটি মিথ্যে হয়নি।

যে প্রেম কথা বলেনি

বাছাইকৃত কবিতা

কবির কলমে নবির ছবি - Kobir Kolome Nobir Chobi

- কবি ফেরদাউস সরকার

প্রিয় নবীর ছবি আমি আঁকছি কবিতায়,
দেখতে হলে তাকাও তোমার হৃদয়ের আয়নায়।

চাঁদের মতো মুখখানি তাঁর, কাজল কালো চোখ,
ঈষৎ বাঁকা ভ্রু ছিল তার, পশম ভরা বুক।

ঢেউ খেলানো কেশ ছিল তার, লতি ও কাঁধ তক,
বড় ছিল মাপ মতো তাঁর মাথা মোবারক।

চোখের পাতায় পলক ছিল অতি দীর্ঘকায়,
রক্তিম রেখার টান ছিল তাঁর চোখের শুভ্রতায়।

চমকাতো নূর সর্বদা তাঁর উন্নত নাক-কান,
মূর্তির মতো মসৃণ তার গলা ও গর্দান।

স্ফীত এক রগ ছিল তাঁর ললাট প্রশস্তে,
রাগের সময় উঠত ফুলে ভীষণ ধীরস্থে।

সামনের দুই দন্ত মাঝে ছিল খানিক ফাঁক,
দন্তরাজির জন্য ছিল সুন্নতি মিসওয়াক।

ঈষৎ গোলের মুখখানি তার, গোস্তে গণ্ড ফোলা,
ছিল না তার রঙ চেহারার তামাটে বা ধলা।

চিকন-চিকন দাঁত ছিল তার ভীষণ চমৎকার,
কথার সময় চমকাতো নূর, জমকালো মুখ তাঁর।

ডোরাকাটা লালরঙা এক চাদর ছিল তার,
মাঝারি তার গড়ন ছিল, পরনে ইযার।

সবার থেকে উঁচু তাঁরে দেখলে মনে হয়,
ঝুঁকে ঝুঁকে পা ফেলিতেন, বুক ফুলিয়ে নয়।

হাতের তালুর মতোই ছিল মাংসল পায়ের পাত,
কাঁধের মাঝে ছিল তাঁহার মোহরে নবুওয়াত।

শৌর্যে-বীর্যে প্রভাবশালীর পেট-বক্ষ সমান,
রূপার মতো ছিল তাহার চকচকে গর্দান।

অনাবৃত হইলে তাঁরে লাগত চমৎকার,
সেই চেহারা এঁকে দেবার শব্দ নেই আমার।

হাত-পায়ে তাঁর আঙুল ছিল দীর্ঘ মানানসই,
কবজি হতে কনুই ছিল হুবহু এর মতোই।

হাতের মতো মাংসে ভরা উভয় পায়ের নল,
হাড়ের জোড়া শক্ত ছিল, বাহুর যেমন বল।

রূপ-লাবণ্যে নবী আমার পূর্ণিমারি চাঁদ,
তাঁর প্রতি মোর ভালোবাসা জন্মেছে অগাধ।

তাঁর চেহারার মতো আজও হয় না কোনোই তুল,
তাঁরচে ছিলেন ইউসুফ নবী সুন্দর অপ্রতুল।

শুভ্র হয়নি চুল-দাড়ি তাঁর, হয় যদি এক কুড়ি,
বডি তাহার ছিল বিল্ডার, হয়নি মোটা ভুঁড়ি।

চল্লিশে হন নবী আমাদের, তেষট্টিতে যান চলে,
এই তেইশ বছরের মধ্য দিয়েই দুনিয়া ঝলমলে।
বিস্তারিত...

মুখের নিচে মুখ

- মোঃ আবু তালেব

(মুখ ও মুখোশ)

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মানুষ প্রথম যে মুখটি দেখে,
সেটি তার নিজের নয়—
সারাদিন পৃথিবীকে দেখানোর জন্য
তৈরি করা একটি মুখ।

আমি দেখেছি তাকে
অফিসের লিফটে,
বাসের ভিড়ে,
চায়ের দোকানের বেঞ্চে,
বিয়ের আসরে,
শোকের ঘরে।

সবাই খুব সুন্দর করে
নিজেকে বহন করে।

যে মানুষটি গতরাতে
বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল,
সকালবেলা সে-ই
সহকর্মীকে বলে—

“ভালো আছি।”

যে বাবা
মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে পারেনি,
সে সন্তানের সামনে
হেসে বলে—
“আগামী মাসে হয়ে যাবে।”

যে নারী
সারাদিন অপমান সহ্য করে,
সন্ধ্যায় অতিথির সামনে
চা বাড়িয়ে দেয়
শান্ত মুখে।

কেউ মিথ্যা বলে না—
তবু শহরটা
মিথ্যায় ভরে থাকে।

কারণ সত্যেরও
একটি সময় আছে,
একটি পোশাক আছে,
একটি সামাজিক অনুমতি আছে।

সব সত্য
টেবিলে রাখা যায় না।
সব কান্না
মানুষের সামনে কাঁদা যায় না।
সব ক্ষুধা
ভদ্রলোকের ভাষায় বলা যায় না।

তাই আমরা মুখ বানাই।
একটি মুখ
মায়ের জন্য,
একটি সন্তানের জন্য,
একটি অফিসের জন্য,
একটি প্রেমের জন্য,
একটি সমাজের জন্য।
আর গভীর রাতে,
সব দরজা বন্ধ হলে,
আলো নিভে গেলে
মানুষ নিজের মুখগুলো
এক এক করে খুলে রাখে।

তখন আয়নায়
যে মুখটি দেখা যায়,
তার কোনো পরিচয় নেই।
সে শুধু ক্লান্ত।
তার চোখের নিচে
ঘুমহীন রাতের দাগ,
ঠোঁটে আটকে থাকা
অনেকগুলো অসমাপ্ত কথা।

আমি একদিন
সেই মুখটির দিকে তাকিয়ে
ভয় পেয়েছিলাম।
কারণ তাকে
আমি চিনতে পারিনি।
এত বছর ধরে
নিজের মুখ বহন করতে করতে
নিজেকেই ভুলে গিয়েছিলাম।

সেদিন বুঝলাম—
মানুষের সবচেয়ে বড় মুখোশ
মুখের ওপর থাকে না;
সে থাকে
নিজের সম্পর্কে
নিজের বিশ্বাসের ভেতর।
আমরা বলি—
আমি ভালো মানুষ।
আমি সৎ।
আমি সাহসী।
আমি কাউকে ঘৃণা করি না।

কিন্তু সুযোগ এলে
আমাদের ভিতরের অন্ধকার
আস্তে করে দরজা খোলে।
তখন দেখা যায়—
মুখের নিচে আরেক মুখ,
তার নিচে আরও একটি।

শেষে
কোনো মুখ নেই।
শুধু একজন মানুষ
দাঁড়িয়ে আছে—
নগ্ন,
ভীত,
অসহায়,
এবং প্রথমবার
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে
ভাবছে—
পৃথিবীর কাছে নয়,
নিজের কাছেই
আমি এতদিন
কিসের অভিনয় করে গেলাম?
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4627
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1706
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1659
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1587
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1579
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1515
কর্মফল মোঃ আবু তালেব 1501
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1469
রমণী মোঃ আবু তালেব 1440
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1414
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1411
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1405
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1368
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1367
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1366
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1362
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1360
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1342
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1338
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1329
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
মুখের নিচে মুখ মোঃ আবু তালেব 13
ভালোবাসার শেষ দরজা মোঃ আবু তালেব 23
তোমাকে ছাড়া তোমার কাছে মোঃ আবু তালেব 22
যে প্রেম কথা বলেনি মোঃ আবু তালেব 21
আমাদের মাঝখানে রাত মোঃ আবু তালেব 28
অপেক্ষার ঘর মোঃ আবু তালেব 26
তুমি যে ছিলে মোঃ আবু তালেব 35
একটি মানুষকে হারানোর আগে মোঃ আবু তালেব 39
ভালোবাসার পরে মো: আবু তালেব 60
তোমার অনুপস্থিতি মোঃ আবু তালেব 52
যে হাতটি ধরিনি মোঃ আবু তালেব 50
অলৌকিক দুপুর মো: আবু তালেব 38
অস্থায়ী অনন্ত মোঃ আবু তালেব 53
প্রথম নীরবতায় ফেরা মোঃ আবু তালেব 58
শেষ প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 61
অন্য আমি মোঃ আবু তালেব 57
মায়ের নিঃশ্বাস মোঃ আবু তালেব 55
শেষ চুম্বন মোঃ আবু তালেব 71
বৃদ্ধের বিকেল মোঃ আবু তালেব 71
ভিখারির রাজ্য মোঃ আবু তালেব 119
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
কবির কলমে নবির ছবি - Kobir Kolome Nobir Chobi কবি ফেরদাউস সরকার 5
প্রত্যাবর্তন রাফাত আহমেদ 43
মৃত্যুদিন শ্রীমল্লার 59
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 80
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 66
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 82
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 83
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 85
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 128
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 145
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 151
ভালো মানুষ ইবনে আলী 256
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 147
শিকল ইবনে আলী 236
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 279
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 233
বসন্ত জয়দীপ রায় 252
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 169
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 322
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 288
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে