(মানুষ)
আমার ভেতরে
শুধু আমি থাকি না,
আরও কয়েকজন মানুষ থাকে।
একজন
সমুদ্রের ধারে একটা ছোট্ট বাতিঘরে
সারা জীবন
আলো জ্বালিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখত।
আরেকজন
অচেনা শহরের গলিতে
পুরোনো বই বিক্রি করতে চাইত,
যেন প্রতিটি বই
একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঋতু।
আরেকজন
কোনো পাহাড়ি গ্রামে
শিশুদের আকাশের নাম শেখাত।
আরেকজন
প্রতিদিন সন্ধ্যায়
একটা বেহালা বাজিয়ে
অন্ধকারকে একটু কোমল করত।
তারা কেউ
জন্ম নেয়নি।
তারা শুধু
আমার ভেতরে
অপেক্ষা করেছে।
আমি
অন্য একটা জীবন বেছে নিয়েছি।
সকালগুলো
সময়ের কাছে বন্ধক রেখেছি।
বিকেলগুলো
দায়িত্বের কাছে।
রাতগুলো
অপূর্ণতার কাছে।
তবু
মাঝে মাঝে
হঠাৎ কোনো বৃষ্টির গন্ধে,
কোনো ট্রেনের হুইসেলে,
কোনো অচেনা মুখের হাসিতে,
আমার ভেতরের
অন্য মানুষগুলো
ধীরে ধীরে
চোখ খুলে তাকায়।
তারা আমাকে
দোষ দেয় না।
শুধু
এমনভাবে হাসে,
যেন জানে —
একটা জীবনে
সব জীবন বাঁচা যায় না।
একদিন
একটা পুরোনো স্টেশনে
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
একের পর এক ট্রেন এল।
চলে গেল।
আমি উঠলাম না।
হঠাৎ মনে হলো,
জীবনও এমনই।
আমরা
যে ট্রেনে উঠেছি,
তার জন্যই
অসংখ্য ট্রেন
চিরদিনের মতো
ছেড়ে দিয়েছি।
সেই ছেড়ে দেওয়া ট্রেনগুলোর
জানালায়
আজও হয়তো
আমারই মুখ বসে আছে।
সে অন্য আকাশ দেখেছে।
অন্য নদী।
অন্য ভালোবাসা।
অন্য ব্যর্থতা।
অন্য মৃত্যু।
কখনো কখনো
আমি রাতে
স্বপ্ন দেখি —
আমি এমন একটা বাড়িতে ফিরেছি,
যেখানে আমি
কোনোদিন থাকিনি।
দরজা খুলতেই
একটা শিশু দৌড়ে এসে
আমাকে বাবা বলে জড়িয়ে ধরে।
একজন বৃদ্ধা
আমার জন্য ভাত বাড়েন।
জানালার পাশে
একটা কুকুর
লেজ নাড়ে।
ঘুম ভেঙে যায়।
আমি বুঝি,
ওরা কেউ
বাস্তব নয়।
তবু
তাদের জন্য
আমার বুকের ভেতর
একটা সত্যিকারের শূন্যতা জন্মায়।
হয়তো
মানুষের সবচেয়ে গভীর কান্না
যাদের হারিয়েছি,
তাদের জন্য নয়।
যে জীবনগুলো
আমাদের ভেতরেই
জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায়নি,
তাদের জন্য।
তবু আজ
আমি আর
সেই অজন্মা জীবনগুলোর কাছে
ক্ষমা চাই না।
কারণ
তাদের নীরবতাই
আমাকে মানুষ করেছে।
যে কবিতা লেখা হয়নি,
সে-ই আমাকে
লিখতে শিখিয়েছে।
যে পথে হাঁটিনি,
সে-ই আমাকে
পথের মূল্য বুঝিয়েছে।
যে ভালোবাসা
আমার হয়নি,
সে-ই
আমার হৃদয়ে
স্থান তৈরি করেছে।
আজ আমি জানি,
মানুষ
একটা জীবন নিয়ে জন্মায়,
কিন্তু
অসংখ্য সম্ভাবনার মৃত্যু
বয়ে বেড়ায়।
আমরা
যে জীবন বাঁচি,
তার চেয়েও বড়
যে জীবন বাঁচি না।
কারণ
আমাদের ভেতরে
নিঃশব্দে বসে থাকা
সেই অদেখা মানুষগুলোর চোখেই
হয়তো
ঈশ্বর
প্রতিদিন
আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
আর তাই
আমি যখন আয়নায় দেখি,
শুধু নিজের মুখ দেখি না।
দেখি —
অসংখ্য অজন্মা জীবনের
শান্ত, দীপ্ত, ক্ষমাশীল
প্রতিফলন।
বিস্তারিত...