কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(অপ্রকাশ)

সব কান্নার শব্দ হয় না।
সব অশ্রু চোখ দিয়ে নামে না।

মানুষের সবচেয়ে গভীর কান্নাগুলো
প্রায়ই মুখে হাসি নিয়ে
বেঁচে থাকে।

ছোটবেলায় ভাবতাম,
যে কাঁদে, সেই দুঃখী।

পরে দেখলাম —
অনেক মানুষ কাঁদে না বলেই
তাদের দুঃখ সবচেয়ে দীর্ঘ হয়।

একবার বাবাকে দেখেছিলাম
একটা পুরোনো চেয়ারে
চুপ করে বসে থাকতে।

তার চোখে জল ছিল না।
কিন্তু সেদিন ঘরের নীরবতাই
তার হয়ে কেঁদেছিল।

একবার মাকে দেখেছিলাম,
রান্না করতে করতে
হঠাৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে।
কয়েক মুহূর্ত।
তারপর আবার
আগের মতো কাজে ফিরে গেলেন।

সেদিন বুঝিনি,
আজ বুঝি —
কিছু মানুষ
কান্নার জন্যও সময় পায় না।

আমরা মানুষের চোখ দেখি,
কিন্তু তার ভেতরের সমুদ্র দেখি না।

আমরা তার হাসি শুনি,
কিন্তু সেই হাসির নিচে
কতগুলো ভাঙা স্বপ্ন
চাপা পড়ে আছে,
তার হিসাব রাখি না!

পৃথিবীতে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটা
সে নয়,
যার পাশে কেউ নেই।
সে —
যার কান্না দেখার মতো
একজন মানুষও নেই।

একদিন খুব ইচ্ছে করছিল কাঁদতে।
কারণও ছিল।
শব্দও ছিল।
অশ্রুও ছিল।

কিন্তু চারপাশে এত মানুষ ছিল
যে আমি কাঁদতে পারিনি।
সেদিন প্রথম বুঝলাম —
ভিড়ও মানুষের কান্না চুরি করে।

সেই রাতে
আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম,
চোখ দুটো শুকনো।
তবু মনে হচ্ছিল,
আমার ভেতরে কোথাও
অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
মানুষ কান্নার
নতুন নতুন পদ্ধতি শিখে ফেলে।

কেউ অতিরিক্ত কাজ করে,
কেউ সারারাত জেগে থাকে,
কেউ অকারণে হেসে ওঠে,
কেউ হঠাৎ খুব নীরব হয়ে যায়।

আমরা ভাবি,
তারা শুধু বদলে গেছে।
আসলে তারা কাঁদছে —
শুধু চোখ দিয়ে নয়,
জীবন দিয়ে।

আমি এখন বিশ্বাস করি,
অশ্রু মানুষের একমাত্র কান্না নয়,
একটা অসমাপ্ত চিঠিও কান্না,
একটা ফাঁকা চেয়ারও কান্না,
পুরোনো জামার পকেটে পাওয়া
একটা বাসের টিকিটও কান্না,
বহু বছর পর হঠাৎ
একটা পরিচিত গন্ধে
থেমে যাওয়াও কান্না।

মানুষ যতদিন ভালোবাসবে,
ততদিন কাঁদবে।
আর যতদিন কাঁদবে,
ততদিন সব কান্না
পৃথিবী দেখতে পাবে না।
কারণ কিছু কান্না
স্রষ্টার জন্য নয়,
মানুষের জন্যও নয়।

সেগুলো জন্মায়
একটা হৃদয়ের গভীরে,
এবং সেখানেই
নিঃশব্দে মিশে যায়।

আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে,
আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর কান্না কোনটি?
আমি কোনো দিনের কথা বলব না।
কোনো মানুষের নামও না।

আমি শুধু বলব —
সেই কান্নাটি,
যার কথা কেউ জানে না,
যে কান্নার কোনো ছবি নেই,
কোনো সাক্ষী নেই,
কোনো সমবেদনা নেই,
তবু সেই কান্নাই
আমাকে সবচেয়ে বেশি
মানুষ করেছে।

হয়তো মানুষ
চোখের জলে বড় হয় না,
মানুষ বড় হয়
তার অদেখা কান্নাগুলোর
ভেতর দিয়ে।

আর সেই কান্নাগুলোই
নিঃশব্দে
তার আত্মার ভাষা
লিখে যায়।

অদেখা কান্না

(অপ্রকাশ)

আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি
আমি কোনোদিন বলিনি।

সে আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে।
তার কোনো উচ্চারণ নেই,
কোনো ভাষা নেই,
কোনো শ্রোতাও নেই।

তবু সে প্রতিদিন
আমার সঙ্গে ঘুম থেকে ওঠে,
আমার সঙ্গে পথ হাঁটে,
আমার সঙ্গে রাতের অন্ধকারে
ফিরে আসে।

জীবনে অনেক কথা বলেছি।
প্রয়োজনের কথা।
দায়িত্বের কথা।
ভদ্রতার কথা।
ভালো থাকার কথা।
ভালোবাসার কথাও বলেছি।

কিন্তু সবচেয়ে সত্য কথাগুলো
অদ্ভুতভাবে
ঠোঁট পর্যন্ত এসে থেমে গেছে।

একদিন মাকে বলতে চেয়েছিলাম —
**"তুমি ক্লান্ত হয়ে গেছ।
এবার একটু বিশ্রাম নাও।"**

বলিনি।
ভাবলাম, আরও সময় আছে।

একদিন বাবাকে বলতে চেয়েছিলাম —
**"আমি তোমার মতো
শক্ত হতে পারিনি।"**

বলিনি।
মনে হলো,
পুরুষেরা এসব কথা বলে না।

একদিন একজন মানুষকে বলতে চেয়েছিলাম —
**"তুমি চলে গেলে
আমার ভেতরের একটা ঋতু
শেষ হয়ে যাবে।"**

সেটাও বলিনি।
কারণ বিদায়ের মুহূর্তে
মানুষ সত্যের চেয়ে
সাহস কম খুঁজে পায়।

তারপর দিন কেটে গেছে।
বছর কেটে গেছে।
মানুষ বদলেছে।
ঠিকানা বদলেছে।
ঋতু বদলেছে।

কিন্তু যে কথাগুলো আমি বলিনি,
তারা বদলায়নি।

তারা সময়ের সঙ্গে বুড়ো হয় না।
তারা শুধু
আরও গভীরে নেমে যায়।

আমরা ভাবি,
উচ্চারিত বাক্যই ইতিহাস লেখে।
আমি তা মনে করি না।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ইতিহাস
লেখা থাকে —
যে চিঠি পাঠানো হয়নি,
যে ফোনটা করা হয়নি,
যে দরজায় কড়া নাড়া হয়নি,
যে ক্ষমাটা চাওয়া হয়নি,
যে ভালোবাসাটা স্বীকার করা হয়নি।

কিছু বাক্যের নিয়তি
উচ্চারিত হওয়া নয়।

তারা মানুষের রক্তে মিশে যায়।
চোখের দৃষ্টিতে বদলে যায়।
নীরবতার রঙ হয়ে ওঠে।

কখনো কখনো ভাবি —
যদি একদিন
পৃথিবীর সব মানুষের
না-বলা কথাগুলো
একসঙ্গে শোনা যেত,
তবে হয়তো এই পৃথিবী
আরও কোমল হতো,
আরও বিনয়ী হতো।

কারণ আমরা যতটা নিষ্ঠুর,
তার চেয়ে অনেক বেশি
অপ্রকাশিত।

আজ বুঝি,
সব কথা বলে ফেলাই সাহস নয়।
কিছু কথা
সারাজীবন বয়ে নিয়ে চলার মধ্যেও
এক ধরনের সাহস আছে।

কারণ কিছু অনুভূতি
ভাষার চেয়ে বড়।
কিছু সম্পর্ক
ব্যাখ্যার চেয়ে গভীর।
কিছু ভালোবাসা
স্বীকৃতির চেয়েও সত্য।

আজ যদি জিজ্ঞেস করা হয় —
আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বাক্য কোনটি?

আমি কোনো কবিতার লাইন বলব না।
কোনো প্রার্থনাও না।

আমি বলব —
সেই কথাটি,
যা আমি বলতে পারিনি।

কারণ মানুষের পরিচয়
সে যা বলেছে,
তা দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না।

মানুষের পরিচয়
সে যা বলতে পারেনি,
যা লুকিয়ে রেখেছে,
যা বুকের ভেতর বহন করেছে,
যা নীরবতার কাছে সমর্পণ করেছে —
সেগুলো দিয়েও তৈরি হয়।

হয়তো সেই কারণেই
আমাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি
কোনো উচ্চারিত শব্দের নয়।

একটা বাক্যের —
যে বাক্যটি
আজও পৃথিবীর কোথাও
শোনা যায়নি,
তবু প্রতিদিন
আমার ভেতরে
নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়।

যে কথাটি বলিনি

আকাশের মেঘেরা কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই
এক দেশ হতে আরেক দেশে গিয়ে বৃষ্টি বিলায়।

পৃথিবীর কোনো নদীর জলও সীমানা চিনে না
এপার ভেঙে অনায়াসে ওপারে চলে যায়।

পাখিদের ডানায় কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই
মুক্ত বিহঙ্গের মতো তারা উড়ে বেড়ায় দূর অজানায়।

গাছের শেকড়েও কোনো নিষেধাজ্ঞা আইন নেই
জলের খোঁজে মাটির তলে ছড়িয়ে পড়ে অবলীলায়।

বাতাস কি কখনো রাষ্ট্রের সীমানারেখা দেইখা বহে? না।
ফুলগাছে কাঁটা থাকলেও, ফুলের সুবাসে কোনো কাঁটাতার নেই,
নাক ঢেকে না-রাখলে আপনার কাছে সুঘ্রাণ ছড়াবেই।

রইদের আলো কখনোই গণ্ডি দেইখা আলো দেয় না,
নির্দিষ্ট সময়ে তার ভাগ সবাই পায় সমানহারে।
জলের মাছেরাও কোনো তল্লাশিচৌকি ছাড়াই
এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভেসে বেড়াতে পারে।

এই যে রাত হইলে দুজনে পাশাপাশি বসে চাঁদ দেখি
সেই চাঁদের আলোও সকল দেশে সমানভাবে ঝরে পড়ে।

বুনো লতাপাতাও কোনো বেড়া চিনে বেড়ে ওঠে না,
সীমানায় গিয়ে দেখি, এপারওপার দুইপারেই তাদের বসবাস, আমায় দেখে হাসছে তারা খিলখিল করে।

আমার তখন ভীষণ লজ্জা পেল,
মাথা নিচু করে যমীনের দিকে তাকালাম,
একটা অদ্ভুত আওয়াজ আমার কানে টের পেলাম,

ফেরদাউস!
তোমরা নিজেদের অনেক চালাক মনে করো, তাই না?
অথচ বোকার মতো চারিদিকে কাঁটাতার দিয়ে এমন এক খাঁচা বানিয়েছো, যেখানে তোমরা নিজেরাই বন্দি! হাহ হাহ হাহ হাহ হা।

কাঁটাতার

(নিজেকে আবিষ্কার)

জন্মের পর থেকেই মানুষ
আমাকে একটি নাম দিয়েছে,
সেই নাম ধরে আমাকে ডাকা হয়েছে,
আমি সাড়া দিয়েছি।
ধীরে ধীরে বিশ্বাসও করেছি—
এই নামটিই আমি!

তারপর
আমাকে একটি ভাষা দেওয়া হলো,
একটি পরিবার,
একটি দেশ,
একটি ধর্ম,
একটি ইতিহাস,
একটি পরিচয়।

একদিন দেখলাম,
আমার চারপাশে যত পরিচয় জমেছে,
আমার ভেতরের মানুষটি
তত দূরে সরে গেছে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজের মুখ চিনতে পারি,
কিন্তু এই মুখটিই কি আমি?

একটি পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবি—
সেই ছোট্ট শিশুটি কোথায় গেল?
তার চোখ তো আমারই ছিল,
তার স্বপ্নও,
তার বিস্ময়ও,
তবু সে আমি নয়!

তাহলে আমি কে?

আমি কি আমার শরীর?
শরীর তো প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে।
আমি কি আমার স্মৃতি?
স্মৃতিও তো মুছে যায় প্রতিদিন।
আমি কি আমার সাফল্য?
একদিন সেগুলোরও
আর কোনো মূল্য থাকবে না।
আমি কি আমার ব্যর্থতা?
সেগুলোও তো আমার সঙ্গে জন্মায়নি।

আমি দীর্ঘদিন ভেবেছি,
মানুষ তার অর্জনের সমষ্টি।
আজ মনে হয়,
মানুষ তার হারিয়ে ফেলা
জিনিসগুলোরও যোগফল।

যাদের আর ছুঁতে পারি না,
তারা এখনও আমাকে গড়ে।
যে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি,
তারা এখনও আমাকে জাগিয়ে রাখে।
যে মানুষগুলো চলে গেছে,
তারা এখনও আমার ভেতরে হেঁটে বেড়ায়।

তাহলে আমি কোথায়?

একদিন নদীর ধারে বসেছিলাম,
জল বয়ে যাচ্ছিল,
আমি হাত ডুবিয়ে ভাবলাম,
একই নদীতে কি দ্বিতীয়বার হাত রাখা যায়?
জল বদলে যায়,
হাতও বদলে যায়,
তবু নদীকে আমরা একই নামে ডাকি।

হয়তো মানুষও তেমন,
প্রতিদিন বদলাতে বদলাতে
সে নিজের নামটি বহন করে চলে,
আর ভেবে নেয়—
সে একই মানুষ।

আমি অনেকবার
নিজেকে খুঁজতে বেরিয়েছি—
বইয়ের ভেতর,
ধর্মের ভেতর,
প্রেমের ভেতর,
সাফল্যের ভেতর,
পরাজয়ের ভেতর,
প্রশংসার ভেতর,
নিন্দার ভেতর,
প্রতিবারই কিছু পেয়েছি।

কিন্তু নিজেকে পাইনি।

তারপর একদিন
উত্তর খোঁজা ছেড়ে দিলাম,
চুপচাপ বসে রইলাম,
বাতাস বইছিল,
দূরে একটি পাখি ডাকছিল,
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে
গাছের গায়ে নেমে আসছিল।
সেই প্রথম মনে হলো—
হয়তো আমাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য
দৌড়ানোর দরকার নেই,
থেমে যাওয়ার দরকার।

কারণ মানুষ নিজেকে সামনে খুঁজে পায় না।
নিজেকে পায়
যখন সে আর কোথাও পৌঁছাতে চায় না।

আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,
"তুমি কে?"
আমি হয়তো আমার নাম বলব,
আমার পেশার কথা বলব,
আমার ঠিকানাও বলব,
কিন্তু জানব,
এসবের কোনোটাই সম্পূর্ণ উত্তর নয়।

আমার ভেতরে এখনও একটি শিশু
আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,
একজন কিশোর
নিজের ছায়াকে বুঝতে শিখছে,
একজন তরুণ প্রথম ভালোবাসার
ভাঙা শব্দ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে,
একজন মানুষ
প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে,
আর তাদের প্রত্যেকেই আমি,
আবার কেউই আমি নই।

হয়তো মানুষ কোনো স্থির পরিচয় নয়,
সে একটি চলমান প্রশ্ন,
একটি অসমাপ্ত যাত্রা,
একটি নদী,
যে সমুদ্রে পৌঁছেও
নিজের উৎসকে ঠিকঠাক মনে রাখে।

তাই আজ আর জানতে চাই না—
আমি কে?
শুধু জানতে চাই—
আমি কি প্রতিদিন
গতকালের চেয়ে
একটু বেশি সত্য হয়ে উঠছি?
কারণ নাম মানুষকে পরিচয় দেয়।
কিন্তু সত্য—
মানুষকে জন্ম দেয়।

হয়তো এটাই আমার উত্তর।

আমি কোনো সম্পূর্ণ মানুষ নই।
আমি সম্পূর্ণ হওয়ার পথে
একটি দীর্ঘ, নীরব,
অবিরাম যাত্রা।

আমি কে?

(নিজেকে আবিষ্কার)

আমি প্রথম কবে নীরব হয়েছিলাম,
মনে নেই!

হয়তো এমন একদিন,
যেদিন আমার কথা কেউ শোনেনি।
হয়তো এমন এক বিকেলে,
যেদিন আমি যা বলতে চেয়েছিলাম,
তার কোনো শব্দ খুঁজে পাইনি।
হয়তো কোনো অকারণ অভিমানে,
হয়তো প্রথম কোনো বিদায়ের ক্ষণে!

শুধু মনে আছে—
একদিন আমি আগের মতো কথা বলিনি,
আর তা টের পায়নি পৃথিবীও!

মানুষ ভাবে,
নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি।
আমি তা মনে করি না।
নীরবতা হলো সেই জায়গা,
যেখানে শব্দ পৌঁছাতে পারে না।

ছোটবেলায়
আমি খুব সহজে কথা বলতাম।
যা মনে হতো,
তাই বলতাম।
যা ভালো লাগত,
তাই চাইতাম।
কষ্ট পেলে,
সহজেই কেঁদে ফেলতাম,
তারপর ধীরে ধীরে বড় হলাম!

মানুষ আমাকে ভাষা শিখিয়েছে,
তারও আগে শিখিয়েছে—
কোন কথা বলতে নেই,
কোন কান্না লুকিয়ে রাখতে হয়,
কোন ভালোবাসা প্রকাশ করা যায় না,
কোন প্রশ্ন করলে সবাই অস্বস্তি বোধ করবে,
সেদিনই আমার ভেতরে
প্রথম নীরবতার জন্ম।

আমি দেখেছি,
সবচেয়ে গভীর মানুষগুলো
খুব বেশি কথা বলে না।
তারা নদীর মতো।
নদী কখনো নিজের গভীরতা নিয়ে
ঘোষণা দেয় না,
শুধু বয়ে যায়।

একদিন বাবা অনেকক্ষণ
চুপ করে বসে ছিলেন।
আমি ভেবেছিলাম,
তিনি রাগ করেছেন।
আজ বুঝি,
সব নীরবতা রাগ নয়,
কিছু নীরবতা ক্লান্তি,
কিছু নীরবতা ভালোবাসা,
কিছু নীরবতা এমন এক দুঃখ,
যার কোনো ভাষা এখনো পৃথিবী জানেনা!

মা কখনো কখনো
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
ডাকলেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতেন না।
তখন মনে হতো,
তিনি হয়তো দূরের কোনো গাছ দেখছেন।
এখন বুঝি,
মানুষ কখনো বাইরে তাকিয়ে থাকে না,
সে তাকিয়ে থাকে নিজের ভেতরে!

নীরবতারও ঋতু আছে,
শৈশবের নীরবতা বিস্ময়ের,
কৈশোরের নীরবতা সংকোচের,
যৌবনের নীরবতা দ্বন্দ্বের,
আর বার্ধক্যের নীরবতা স্মৃতির।

আমরা প্রত্যেকে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বয়সে
একই নীরবতাকে ভিন্ন নামে ডাকি।
আমি একদিন আবিষ্কার করলাম,
যে কথাগুলো আমি কাউকে বলতে পারিনি,
সেগুলো হারিয়ে যায়নি,
তারা আমার ভেতরে বসে
ধীরে ধীরে আমাকে বদলে দিয়েছে!

মানুষ তার উচ্চারিত বাক্য দিয়ে
যতটা গড়ে ওঠে,
তার চেয়ে অনেক বেশি গড়ে ওঠে
না-বলা বাক্য দিয়ে।
হয়তো সেই কারণেই
কিছু মানুষের পাশে বসলে
কথা বলতে ইচ্ছে করে না,
শুধু থাকতে ইচ্ছে করে।
কারণ সত্যিকারের সান্নিধ্য
শব্দের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না,
থাকে বিশ্বাসের ওপর।

আজ আমি আর নীরবতাকে
ভয় পাই না।
আগে ভাবতাম,
চুপ করে থাকা মানে
শূন্য হয়ে যাওয়া।
এখন জানি,
চুপ করে থাকা মানে
নিজের শব্দগুলোর
মর্মার্থ খুঁজে নেওয়ার ফুরসত!

একদিন,
পৃথিবীর সব শব্দ
শেষ হয়ে যাবে,
সব তর্ক থেমে যাবে,
সব পরিচয় মুছে যাবে,
থেকে যাবে কেবল
নিরবতা!

হয়তো একটি দীর্ঘ নীরবতা—
যেখানে মানুষ প্রথমবার
নিজের কণ্ঠ নয়,
শুধু নিজের অস্তিত্বকে শুনতে পায়!

আমি আজও সেই
প্রথম নীরবতার
কাছে ফিরে যাই।
যখন পৃথিবী খুব কোলাহলপূর্ণ হয়ে ওঠে,
যখন মানুষ খুব দ্রুত বিচার করে,
যখন শব্দ সত্যের চেয়ে বড় হয়ে যায়।
আমি চোখ বন্ধ করি
আর শুনতে পাই—
আমার ভেতরে এখনও
একটি শিশু বসে আছে!
সে কিছু বলছে না,
তার বলার দরকারও নেই।
কারণ সে জানে,
মানুষের জীবনের সবচেয়ে সত্য বাক্যগুলো
উচ্চারণ করা যায় না,
শুধু বেঁচে থাকা যায়।
আর সেই বেঁচে থাকার
প্রথম ভাষার নামই—

**নীরবতা।**

প্রথম নীরবতা

বাছাইকৃত কবিতা

অদেখা কান্না

- মোঃ আবু তালেব

(অপ্রকাশ)

সব কান্নার শব্দ হয় না।
সব অশ্রু চোখ দিয়ে নামে না।

মানুষের সবচেয়ে গভীর কান্নাগুলো
প্রায়ই মুখে হাসি নিয়ে
বেঁচে থাকে।

ছোটবেলায় ভাবতাম,
যে কাঁদে, সেই দুঃখী।

পরে দেখলাম —
অনেক মানুষ কাঁদে না বলেই
তাদের দুঃখ সবচেয়ে দীর্ঘ হয়।

একবার বাবাকে দেখেছিলাম
একটা পুরোনো চেয়ারে
চুপ করে বসে থাকতে।

তার চোখে জল ছিল না।
কিন্তু সেদিন ঘরের নীরবতাই
তার হয়ে কেঁদেছিল।

একবার মাকে দেখেছিলাম,
রান্না করতে করতে
হঠাৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে।
কয়েক মুহূর্ত।
তারপর আবার
আগের মতো কাজে ফিরে গেলেন।

সেদিন বুঝিনি,
আজ বুঝি —
কিছু মানুষ
কান্নার জন্যও সময় পায় না।

আমরা মানুষের চোখ দেখি,
কিন্তু তার ভেতরের সমুদ্র দেখি না।

আমরা তার হাসি শুনি,
কিন্তু সেই হাসির নিচে
কতগুলো ভাঙা স্বপ্ন
চাপা পড়ে আছে,
তার হিসাব রাখি না!

পৃথিবীতে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটা
সে নয়,
যার পাশে কেউ নেই।
সে —
যার কান্না দেখার মতো
একজন মানুষও নেই।

একদিন খুব ইচ্ছে করছিল কাঁদতে।
কারণও ছিল।
শব্দও ছিল।
অশ্রুও ছিল।

কিন্তু চারপাশে এত মানুষ ছিল
যে আমি কাঁদতে পারিনি।
সেদিন প্রথম বুঝলাম —
ভিড়ও মানুষের কান্না চুরি করে।

সেই রাতে
আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম,
চোখ দুটো শুকনো।
তবু মনে হচ্ছিল,
আমার ভেতরে কোথাও
অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
মানুষ কান্নার
নতুন নতুন পদ্ধতি শিখে ফেলে।

কেউ অতিরিক্ত কাজ করে,
কেউ সারারাত জেগে থাকে,
কেউ অকারণে হেসে ওঠে,
কেউ হঠাৎ খুব নীরব হয়ে যায়।

আমরা ভাবি,
তারা শুধু বদলে গেছে।
আসলে তারা কাঁদছে —
শুধু চোখ দিয়ে নয়,
জীবন দিয়ে।

আমি এখন বিশ্বাস করি,
অশ্রু মানুষের একমাত্র কান্না নয়,
একটা অসমাপ্ত চিঠিও কান্না,
একটা ফাঁকা চেয়ারও কান্না,
পুরোনো জামার পকেটে পাওয়া
একটা বাসের টিকিটও কান্না,
বহু বছর পর হঠাৎ
একটা পরিচিত গন্ধে
থেমে যাওয়াও কান্না।

মানুষ যতদিন ভালোবাসবে,
ততদিন কাঁদবে।
আর যতদিন কাঁদবে,
ততদিন সব কান্না
পৃথিবী দেখতে পাবে না।
কারণ কিছু কান্না
স্রষ্টার জন্য নয়,
মানুষের জন্যও নয়।

সেগুলো জন্মায়
একটা হৃদয়ের গভীরে,
এবং সেখানেই
নিঃশব্দে মিশে যায়।

আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে,
আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর কান্না কোনটি?
আমি কোনো দিনের কথা বলব না।
কোনো মানুষের নামও না।

আমি শুধু বলব —
সেই কান্নাটি,
যার কথা কেউ জানে না,
যে কান্নার কোনো ছবি নেই,
কোনো সাক্ষী নেই,
কোনো সমবেদনা নেই,
তবু সেই কান্নাই
আমাকে সবচেয়ে বেশি
মানুষ করেছে।

হয়তো মানুষ
চোখের জলে বড় হয় না,
মানুষ বড় হয়
তার অদেখা কান্নাগুলোর
ভেতর দিয়ে।

আর সেই কান্নাগুলোই
নিঃশব্দে
তার আত্মার ভাষা
লিখে যায়।
বিস্তারিত...

যে কথাটি বলিনি

- মোঃ আবু তালেব

(অপ্রকাশ)

আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি
আমি কোনোদিন বলিনি।

সে আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে।
তার কোনো উচ্চারণ নেই,
কোনো ভাষা নেই,
কোনো শ্রোতাও নেই।

তবু সে প্রতিদিন
আমার সঙ্গে ঘুম থেকে ওঠে,
আমার সঙ্গে পথ হাঁটে,
আমার সঙ্গে রাতের অন্ধকারে
ফিরে আসে।

জীবনে অনেক কথা বলেছি।
প্রয়োজনের কথা।
দায়িত্বের কথা।
ভদ্রতার কথা।
ভালো থাকার কথা।
ভালোবাসার কথাও বলেছি।

কিন্তু সবচেয়ে সত্য কথাগুলো
অদ্ভুতভাবে
ঠোঁট পর্যন্ত এসে থেমে গেছে।

একদিন মাকে বলতে চেয়েছিলাম —
**"তুমি ক্লান্ত হয়ে গেছ।
এবার একটু বিশ্রাম নাও।"**

বলিনি।
ভাবলাম, আরও সময় আছে।

একদিন বাবাকে বলতে চেয়েছিলাম —
**"আমি তোমার মতো
শক্ত হতে পারিনি।"**

বলিনি।
মনে হলো,
পুরুষেরা এসব কথা বলে না।

একদিন একজন মানুষকে বলতে চেয়েছিলাম —
**"তুমি চলে গেলে
আমার ভেতরের একটা ঋতু
শেষ হয়ে যাবে।"**

সেটাও বলিনি।
কারণ বিদায়ের মুহূর্তে
মানুষ সত্যের চেয়ে
সাহস কম খুঁজে পায়।

তারপর দিন কেটে গেছে।
বছর কেটে গেছে।
মানুষ বদলেছে।
ঠিকানা বদলেছে।
ঋতু বদলেছে।

কিন্তু যে কথাগুলো আমি বলিনি,
তারা বদলায়নি।

তারা সময়ের সঙ্গে বুড়ো হয় না।
তারা শুধু
আরও গভীরে নেমে যায়।

আমরা ভাবি,
উচ্চারিত বাক্যই ইতিহাস লেখে।
আমি তা মনে করি না।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ইতিহাস
লেখা থাকে —
যে চিঠি পাঠানো হয়নি,
যে ফোনটা করা হয়নি,
যে দরজায় কড়া নাড়া হয়নি,
যে ক্ষমাটা চাওয়া হয়নি,
যে ভালোবাসাটা স্বীকার করা হয়নি।

কিছু বাক্যের নিয়তি
উচ্চারিত হওয়া নয়।

তারা মানুষের রক্তে মিশে যায়।
চোখের দৃষ্টিতে বদলে যায়।
নীরবতার রঙ হয়ে ওঠে।

কখনো কখনো ভাবি —
যদি একদিন
পৃথিবীর সব মানুষের
না-বলা কথাগুলো
একসঙ্গে শোনা যেত,
তবে হয়তো এই পৃথিবী
আরও কোমল হতো,
আরও বিনয়ী হতো।

কারণ আমরা যতটা নিষ্ঠুর,
তার চেয়ে অনেক বেশি
অপ্রকাশিত।

আজ বুঝি,
সব কথা বলে ফেলাই সাহস নয়।
কিছু কথা
সারাজীবন বয়ে নিয়ে চলার মধ্যেও
এক ধরনের সাহস আছে।

কারণ কিছু অনুভূতি
ভাষার চেয়ে বড়।
কিছু সম্পর্ক
ব্যাখ্যার চেয়ে গভীর।
কিছু ভালোবাসা
স্বীকৃতির চেয়েও সত্য।

আজ যদি জিজ্ঞেস করা হয় —
আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বাক্য কোনটি?

আমি কোনো কবিতার লাইন বলব না।
কোনো প্রার্থনাও না।

আমি বলব —
সেই কথাটি,
যা আমি বলতে পারিনি।

কারণ মানুষের পরিচয়
সে যা বলেছে,
তা দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না।

মানুষের পরিচয়
সে যা বলতে পারেনি,
যা লুকিয়ে রেখেছে,
যা বুকের ভেতর বহন করেছে,
যা নীরবতার কাছে সমর্পণ করেছে —
সেগুলো দিয়েও তৈরি হয়।

হয়তো সেই কারণেই
আমাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিধ্বনি
কোনো উচ্চারিত শব্দের নয়।

একটা বাক্যের —
যে বাক্যটি
আজও পৃথিবীর কোথাও
শোনা যায়নি,
তবু প্রতিদিন
আমার ভেতরে
নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4592
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1667
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1638
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1556
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1556
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1482
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1448
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1439
রমণী মোঃ আবু তালেব 1415
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1379
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1379
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1378
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1344
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1339
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1338
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1335
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1334
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1311
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1309
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1306
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
অদেখা কান্না মোঃ আবু তালেব 1
যে কথাটি বলিনি মোঃ আবু তালেব 3
আমি কে? মোঃ আবু তালেব 55
প্রথম নীরবতা মোঃ আবু তালেব 44
প্রথম মিথ্যা মোঃ আবু তালেব 46
প্রথম লজ্জা মোঃ আবু তালেব 42
একা হওয়ার দিন মোঃ আবু তালেব 44
যে আমাকে কেউ দেখেনি মোঃ আবু তালেব 49
আমার ছায়া মোঃ আবু তালেব 54
আয়নার ভেতরের মানুষ মোঃ আবু তালেব 57
প্রথম প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 65
প্রথম ভয় মোঃ আবু তালেব 67
প্রথম আকাশ মোঃ আবু তালেব 87
বাবার হাত মোঃ আবু তালেব 67
মায়ের চোখ মোঃ আবু তালেব 63
যে ভাষা ছিল না মোঃ আবু তালেব 60
প্রথম কান্না মোঃ আবু তালেব 76
জন্মের পূর্বে মোঃ আবু তালেব 83
নামহীন স্পন্দন মোঃ আবু তালেব 67
প্রথম অন্ধকার মোঃ আবু তালেব 70
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 40
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 47
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 52
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 48
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 64
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 92
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 131
কিংবদন্তির বাহন আজাহার রাজা 119
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 122
ভালো মানুষ ইবনে আলী 225
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 130
শিকল ইবনে আলী 202
পৃথিবীতে কেবল ক্ষুধাই সত্য আজাহার রাজা 217
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 228
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 215
বসন্ত জয়দীপ রায় 236
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 153
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 289
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 269
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 283
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে