কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(মানুষ)

আমার ভেতরে
শুধু আমি থাকি না,
আরও কয়েকজন মানুষ থাকে।

একজন
সমুদ্রের ধারে একটা ছোট্ট বাতিঘরে
সারা জীবন
আলো জ্বালিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখত।
আরেকজন
অচেনা শহরের গলিতে
পুরোনো বই বিক্রি করতে চাইত,
যেন প্রতিটি বই
একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঋতু।
আরেকজন
কোনো পাহাড়ি গ্রামে
শিশুদের আকাশের নাম শেখাত।
আরেকজন
প্রতিদিন সন্ধ্যায়
একটা বেহালা বাজিয়ে
অন্ধকারকে একটু কোমল করত।

তারা কেউ
জন্ম নেয়নি।
তারা শুধু
আমার ভেতরে
অপেক্ষা করেছে।
আমি
অন্য একটা জীবন বেছে নিয়েছি।
সকালগুলো
সময়ের কাছে বন্ধক রেখেছি।
বিকেলগুলো
দায়িত্বের কাছে।
রাতগুলো
অপূর্ণতার কাছে।

তবু
মাঝে মাঝে
হঠাৎ কোনো বৃষ্টির গন্ধে,
কোনো ট্রেনের হুইসেলে,
কোনো অচেনা মুখের হাসিতে,
আমার ভেতরের
অন্য মানুষগুলো
ধীরে ধীরে
চোখ খুলে তাকায়।
তারা আমাকে
দোষ দেয় না।
শুধু
এমনভাবে হাসে,
যেন জানে —
একটা জীবনে
সব জীবন বাঁচা যায় না।

একদিন
একটা পুরোনো স্টেশনে
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
একের পর এক ট্রেন এল।
চলে গেল।
আমি উঠলাম না।
হঠাৎ মনে হলো,
জীবনও এমনই।
আমরা
যে ট্রেনে উঠেছি,
তার জন্যই
অসংখ্য ট্রেন
চিরদিনের মতো
ছেড়ে দিয়েছি।

সেই ছেড়ে দেওয়া ট্রেনগুলোর
জানালায়
আজও হয়তো
আমারই মুখ বসে আছে।
সে অন্য আকাশ দেখেছে।
অন্য নদী।
অন্য ভালোবাসা।
অন্য ব্যর্থতা।
অন্য মৃত্যু।

কখনো কখনো
আমি রাতে
স্বপ্ন দেখি —
আমি এমন একটা বাড়িতে ফিরেছি,
যেখানে আমি
কোনোদিন থাকিনি।
দরজা খুলতেই
একটা শিশু দৌড়ে এসে
আমাকে বাবা বলে জড়িয়ে ধরে।
একজন বৃদ্ধা
আমার জন্য ভাত বাড়েন।
জানালার পাশে
একটা কুকুর
লেজ নাড়ে।
ঘুম ভেঙে যায়।
আমি বুঝি,
ওরা কেউ
বাস্তব নয়।
তবু
তাদের জন্য
আমার বুকের ভেতর
একটা সত্যিকারের শূন্যতা জন্মায়।

হয়তো
মানুষের সবচেয়ে গভীর কান্না
যাদের হারিয়েছি,
তাদের জন্য নয়।
যে জীবনগুলো
আমাদের ভেতরেই
জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায়নি,
তাদের জন্য।
তবু আজ
আমি আর
সেই অজন্মা জীবনগুলোর কাছে
ক্ষমা চাই না।
কারণ
তাদের নীরবতাই
আমাকে মানুষ করেছে।
যে কবিতা লেখা হয়নি,
সে-ই আমাকে
লিখতে শিখিয়েছে।
যে পথে হাঁটিনি,
সে-ই আমাকে
পথের মূল্য বুঝিয়েছে।
যে ভালোবাসা
আমার হয়নি,
সে-ই
আমার হৃদয়ে
স্থান তৈরি করেছে।

আজ আমি জানি,
মানুষ
একটা জীবন নিয়ে জন্মায়,
কিন্তু
অসংখ্য সম্ভাবনার মৃত্যু
বয়ে বেড়ায়।
আমরা
যে জীবন বাঁচি,
তার চেয়েও বড়
যে জীবন বাঁচি না।

কারণ
আমাদের ভেতরে
নিঃশব্দে বসে থাকা
সেই অদেখা মানুষগুলোর চোখেই
হয়তো
ঈশ্বর
প্রতিদিন
আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আর তাই
আমি যখন আয়নায় দেখি,
শুধু নিজের মুখ দেখি না।
দেখি —
অসংখ্য অজন্মা জীবনের
শান্ত, দীপ্ত, ক্ষমাশীল
প্রতিফলন।

অন্য আমি

(মানুষ)

পৃথিবীতে আসার আগে
আমি কোনো ভাষা জানতাম না।
আলো চিনতাম না,
আকাশও না।

শুধু একটা ছন্দ চিনতাম।
ধীর।
উষ্ণ।
অবিরাম।
সে ছিল
আমার মায়ের নিঃশ্বাস।

আমার প্রথম পৃথিবী
কোনো দেশ ছিল না,
কোনো মানচিত্রও নয়।
একটা বুকের ভেতর
জলের মতো দুলতে থাকা
একটা অন্ধকার আশ্রয়।

সেখানে
দিন ছিল না,
রাতও না।
শুধু
একটা নিঃশ্বাসের ওঠানামায়
সময় তার প্রথম দোলনা বানিয়েছিল।

মা কখনো জানেননি,
তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে
আমি পৃথিবীর ব্যাকরণ শিখছিলাম।

কীভাবে ভয় থেমে যায়।
কীভাবে নীরবতাও
একটা আশ্রয় হতে পারে।
কীভাবে
কোনো শব্দ না বলেও
একজন মানুষ
আরেকজন মানুষকে
বাঁচিয়ে রাখে।

জন্মের পরে
আমাকে অনেক ভাষা শেখানো হয়েছে।
বর্ণমালা।
ব্যাকরণ।
ইতিহাস।
রাষ্ট্র।
ধর্ম।

কিন্তু
যে ভাষায়
মা গভীর রাতে
আমার জ্বর ছুঁয়ে বলতেন,
"আমি আছি" —
সেই ভাষার
কোনো অভিধান
আজও লেখা হয়নি।

একদিন লক্ষ্য করলাম,
মায়েরা ক্লান্ত হলে
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন না।
তারা
নিঃশব্দে
আরও ধীরে শ্বাস নেন।
যেন
নিজের ক্লান্তিকে
সন্তানের ঘুমের বাইরে
রেখে আসতে চান।

মায়ের নিঃশ্বাস
বাতাসের মতো নয়।
বাতাস
সবাইকে ছুঁয়ে যায়।
মায়ের নিঃশ্বাস
শুধু একজন মানুষকে
তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব দিয়ে
ডেকে রাখে।

শৈশবে
আমি ঘুমিয়ে পড়তাম
মায়ের বুকের পাশে।
আজ এত বছর পরেও
কোনো অজানা শহরের
হোটেলঘরে
রাতের শেষে
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে
আমি কখনো কখনো
একটা অদৃশ্য ছন্দ শুনতে পাই।

জানালার বাইরে
কেউ নেই,
ঘরের ভেতরেও না।
তবু মনে হয়,
পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে
একটা নিঃশ্বাস
এখনো আমাকে
বাড়ি বলে ডাকে।

সময়
মায়ের চুলে
রূপোর ধুলো ছিটিয়ে দিয়েছে।
হাতের শিরাগুলো
নদীর মতো স্পষ্ট।
হাঁটার ভেতর
ধীরে ধীরে
বিকেলের আলো নেমে এসেছে।
কিন্তু অদ্ভুত —
আমি যখনই
তার পাশে বসি,
মনে হয়,
আমি আবার
একটা অনাগত শিশু।

আমার সব বয়স
তার একটিমাত্র নিঃশ্বাসের কাছে
নীরবে মাথা নত করে।

আমি জানি,
একদিন
এই পৃথিবীতে
মায়ের নিঃশ্বাস থাকবে না,
ঘর থাকবে।
জানালা থাকবে।
তার ব্যবহার করা চশমা,
শাড়ির ভাঁজ,
প্রার্থনার চাদর,
রান্নাঘরের মশলার গন্ধ —
সবই থাকবে।
শুধু
যে অদৃশ্য ছন্দে
আমার প্রথম পৃথিবী দুলেছিল,
সে আর শোনা যাবে না।

সেদিন
পৃথিবীর বাতাস
একই রকম থাকবে।
তবু
আমি বুঝব,
কিছু একটা
চিরতরে বদলে গেছে।
কারণ
মা কখনো
শুধু একজন মানুষ নন।
তিনি
সন্তানের জীবনে
ঈশ্বরের সবচেয়ে নীরব উচ্চারণ।

আর তাঁর নিঃশ্বাস —
সেই প্রথম কবিতা,
যা কোনো কাগজে লেখা হয় না,
কোনো ভাষায়
সম্পূর্ণ অনুবাদ হয় না,
তবু
মানুষ
সারাজীবন
নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে
পুনরায় পড়তে থাকে।

মায়ের নিঃশ্বাস

(মানুষ)

শেষ চুম্বনের কথা
কেউ মনে রাখতে পারে না।

মানুষ মনে রাখে
প্রথম স্পর্শ।
প্রথম কাঁপুনি।
প্রথমবার
অন্য একজনের চোখে
নিজের নাম শুনে ফেলা।

শেষ চুম্বন
কোনোদিন
শেষ হওয়ার সময়
নিজেকে শেষ বলে
পরিচয় দেয় না।

সে আসে
অন্য দিনের মতোই।
একটা বিকেল।
একটু বাতাস।
একটু আলো।
একটু নীরবতা।

দুই মানুষ
পাশাপাশি বসে থাকে।
তারা ভবিষ্যতের কথা বলে।

শীত এলে কোথায় যাবে,
বৃষ্টির রাতে
কোন জানালার পাশে বসবে,
বার্ধক্যে
কে আগে চশমা খুঁজে পাবে —

এসব তুচ্ছ কথায়
জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাস
অদৃশ্য হয়ে ফুটে থাকে।

তারপর
বিদায়।

একটা ক্ষণস্থায়ী স্পর্শ।
ঠোঁটের চেয়ে
কপালে বেশি।
শব্দের চেয়ে
নিঃশ্বাসে বেশি।

কেউ জানে না,
এইটাই শেষ।

পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ঘটনাগুলো
সবসময়
অঘোষিত থাকে।

যেদিন বাবা
শেষবারের মতো
আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন,
আমি জানতাম না।

যেদিন মা
শেষবার বলেছিলেন,
"সাবধানে যাস" —
সেদিনও
আমি তাড়াহুড়োয় ছিলাম।

জীবন
শেষবারের মুহূর্তগুলোকে
ইচ্ছে করেই
সাধারণ দিনের পোশাক পরিয়ে রাখে।

হয়তো
মানুষ জানলে
সে আর বাঁচতে পারত না।

একটা পুরোনো স্কার্ফে
আজও
একটা সুগন্ধ লেগে আছে।

গন্ধেরও কি স্মৃতি থাকে?
নাকি
ভালোবাসা
কাপড়ের ভাঁজে
নিজেকে লুকিয়ে রাখতে শেখে?

অনেক বছর পরে
একটা বই খুলতে গিয়ে
একটা শুকনো শিউলি ফুল পেলাম।

হঠাৎ মনে হলো,
সময়
সবকিছু নিয়ে যায় না।

কিছু কিছু জিনিসকে
সে কাগজের ভেতর,
গন্ধের ভেতর,
আলোর ভেতর,
স্পর্শের ভেতর
অদৃশ্য করে রেখে দেয়।

আমরা তাকে
স্মৃতি বলি।
আমি তাকে বলি —
স্থির সময়।

আজ বুঝি,
চুম্বন
শুধু ঠোঁটের ঘটনা নয়।

একজন মানুষ
যখন অন্য একজনের
সব ভয়কে
এক মুহূর্তের জন্য
নিঃশব্দ করে দেয় —
সেখানেও
একটা চুম্বন ঘটে।

যখন
একজন মা
ঘুমিয়ে পড়া শিশুর কপালে
রাত রেখে যান —
সেখানেও
একটা চুম্বন জন্মায়।

যখন
একজন বৃদ্ধ
মৃত স্ত্রীর ছবিতে
প্রতিদিন ধুলো মুছে দেন —
সেখানেও
একটা চুম্বন
শেষ হতে পারে না।

হয়তো
শেষ চুম্বন বলে
কিছু নেই।

শুধু
একটা স্পর্শ থাকে,
যা শরীর ছেড়ে
সময়ের ভেতরে
বাস করতে শুরু করে।

একদিন
আমরা কেউই থাকব না।
আমাদের মুখ
ধীরে ধীরে
পৃথিবীর স্মৃতি থেকে
মুছে যাবে।

কিন্তু
যদি কোনো সন্ধ্যায়
হঠাৎ বাতাস
কোনো অকারণ কোমলতা নিয়ে
কারও কপাল ছুঁয়ে যায়,

যদি সে
এক মুহূর্তের জন্য
কারণ ছাড়াই
নিজেকে ভালোবাসা মানুষ বলে
মনে করে —

তবে বুঝবে,
পৃথিবীর কোথাও
একটা শেষ চুম্বন
এখনো শেষ হয়নি।

মানুষের ঠোঁটে নয়,
মানুষের অস্তিত্বে
নিঃশব্দে
বেঁচে আছে।

শেষ চুম্বন

(মানুষ)

বিকেলের রোদ
বৃদ্ধ মানুষের গায়ে
অন্যরকম পড়ে।

সকালের আলো
যেখানে চোখে ঝলক তোলে,
বিকেলের আলো
সেখানে স্মৃতি হয়ে
বসে থাকে।

আমি তাকে
প্রতিদিন একই বেঞ্চে দেখি।
পার্কের পুরোনো কৃষ্ণচূড়ার নিচে।

তিনি বসে থাকেন,
যেন কোনো ট্রেনের অপেক্ষায় নন,
কোনো মানুষেরও নয় —
শুধু একটা দীর্ঘ জীবনের
শেষ আলোর পাশে।
তার হাতে
একটা লাঠি।
কাঠের নয়।
সময়ের।
লাঠির মাথায়
যত আঁচড়,
তার চেয়েও বেশি পথ
হেঁটেছে তার নীরবতা।

তার চোখে
কোনো তাড়া নেই।
শুধু দূরে উড়ে যাওয়া পাখিদের দিকে
এক ধরনের কোমল দৃষ্টি।
মনে হয়,
তিনি আর পাখিদের দেখছেন না।
নিজের উড়ে যাওয়া দিনগুলোকে দেখছেন।

বাতাস এলে
কৃষ্ণচূড়ার শুকনো ফুল
তার কাঁধে পড়ে।
তিনি ঝেড়ে ফেলেন না।
হয়তো জানেন,
শেষ বয়সে
সব পতনকেই
সম্মান করতে হয়।

একটা ছোট ছেলে
দৌড়ে এসে
তার পাশে বসে।
কিছু জিজ্ঞেস করে।
বৃদ্ধ হাসেন।
কোনো উত্তর দেন না।
তবু ছেলেটা
হেসে চলে যায়।

আমি বুঝলাম,
কিছু মানুষের নীরবতা
বইয়ের চেয়েও বেশি
শিক্ষা দেয়।

তার মুখের ভাঁজগুলো
আমি একদিন গুনতে চেয়েছিলাম।
পারিনি।
কারণ
প্রতিটি রেখা
একটা নদী।
কোথাও প্রথম প্রেমের জল।
কোথাও যুদ্ধের ধুলো।
কোথাও সন্তানের জন্মের আলো।
কোথাও একটা নামহীন কবরের নীরবতা।

বিকেল আরও নেমে আসে।
সূর্য
গাছের ডালে
শেষ সোনালি চিঠিটা রেখে যায়।
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করেন।
মনে হয়, তিনি ঘুমোচ্ছেন।
হয়তো না।
হয়তো
নিজের ভেতরের উঠোনে
ফিরে গেছেন।
যেখানে
তার মা এখনো
ডেকে বলেন,
"খেতে আয়।"
তার বাবা
ক্ষেত থেকে ফিরছেন।
একটা কিশোর
প্রথমবার
স্বপ্ন দেখতে শিখছে।

সময়
অদ্ভুত এক বৃত্ত।
শেষ প্রান্তে এসে
সে আবার
শুরুর হাত ধরে।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে থাকি।
হঠাৎ মনে হয়,
বৃদ্ধ মানুষরা
আসলে ভবিষ্যৎ নন।
তারা
অতীতের শেষ প্রদীপ।

যতদিন তারা জ্বলে,
আমাদের শৈশবও
পুরোপুরি অন্ধকারে হারায় না।
সূর্য ডুবে যায়।
পার্ক ফাঁকা হয়।
তিনি ধীরে ধীরে ওঠেন।
লাঠি
মাটিতে একটা ক্ষুদ্র শব্দ তোলে।
মনে হয়,
পৃথিবী
আরেকটা দিনের ইতিহাসে
একটা পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিল।

আমি তাকে চলে যেতে দেখি।
না —
একজন বৃদ্ধকে নয়।
একটা দীর্ঘ ঋতুকে।
একটা জীবন্ত গ্রন্থাগারকে।
একটা সন্ধ্যাকে,
যে সারাদিন আলো বিলিয়ে
এখন
নিজের অন্ধকারের দিকে
নিঃশব্দে হাঁটছে।
আর তখন
আমার মনে হয় —
বৃদ্ধ হওয়া মানে
বয়স বাড়া নয়।
বৃদ্ধ হওয়া মানে,
এত জীবন বেঁচে ফেলা
যে শেষে
তোমার নীরবতার ভেতরেও
অনেক মানুষের কণ্ঠস্বর
ধীরে ধীরে
বাড়ি ফিরে আসে।

বৃদ্ধের বিকেল

(মানুষ)

শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত মোড়ে
একজন ভিখারি বসে ছিল।

তার সামনে
একটা টিনের বাটি।
আকাশের মতো ফাঁকা।

তবু
সেই ফাঁকা বাটির ভেতর
কত মানুষের মুখ
এসে পড়ছিল।

কেউ একটা মুদ্রা ফেলল।
কেউ চোখ ফিরিয়ে নিল।
কেউ পকেট হাতড়ে
নিজের অস্বস্তিকে খুঁজল।
কেউ আবার
এক মুহূর্তের জন্য
নিজের ভেতরের মানুষটাকে দেখল —
তারপর দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
ভিখারির দিকে নয় —
তার চারপাশে
যে অদৃশ্য রাজ্যটা তৈরি হয়েছে,
তার দিকে।

আমরা ভাবি,
সে ভিক্ষা চায়।
আমি দেখলাম,
সে মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে
তার ভেতরের শব্দ শুনছে।

একটা শিশুর হাত
তার দিকে বাড়ল।
মায়ের হাত
শিশুটাকে টেনে নিল।

মুদ্রাটা
বাটিতে পড়ল না।
কিন্তু শিশুটার চোখে
একটা প্রশ্ন
সারাজীবনের জন্য থেকে গেল।

সেদিন
দারিদ্র্য
ভিখারির পাশে বসেনি।
সে দাঁড়িয়েছিল
আমাদের ভেতরে।

ভিখারির গায়ে
ছেঁড়া কাপড়।
কিন্তু
তার আকাশটা
আমার চেয়ে ছোট ছিল না।

সে একই সূর্য পায়।
একই বৃষ্টি।
একই চাঁদ।
একই মৃত্যু।

শুধু
আমরা তাকে
একই সম্মান দিই না।

একটা কাক
উড়ে এসে
তার পাশে বসে
রুটির টুকরো কুড়োতে লাগল।

ভিখারি
হেসে
শেষ টুকরোটাও
কাকটার দিকে ছুড়ে দিল।

আমি হঠাৎ বুঝলাম —
যার কিছুই নেই,
তারও
দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে।

আর
যার সবকিছু আছে,
সে কখনো কখনো
একটা দৃষ্টিও দিতে পারে না।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব
রুটির নয়।
চোখের।

যে চোখ
আরেকজন মানুষকে
মানুষ বলে দেখতে
ভুলে গেছে।

সন্ধ্যা নামছিল।
রাস্তার বাতিগুলো
এক এক করে জ্বলে উঠল।

ভিখারির মুখে
একটা অদ্ভুত আলো পড়ল।
মনে হলো,
সে যেন
কোনো সিংহাসনে বসে আছে।

তার রাজ্য
মুদ্রার নয়।
মানুষের বিবেকের।

প্রতিদিন
হাজার মানুষ
সেই রাজ্যের ভেতর দিয়ে যায়।

কেউ কর দেয়।
কেউ ঋণ বাড়ায়।
কেউ
নিজের দারিদ্র্য
আরও গোপন করে চলে যায়।

আমি তখন বুঝলাম,
ভিখারি
রাস্তার ধারে বসে থাকে না।
সে বসে থাকে
মানুষের আত্মার দরজায়।

সে হাত বাড়ায়
টাকার জন্য নয়।
একটা প্রশ্নের জন্য।

**"তোমার ভেতরে
এখনো কতটা মানুষ
বেঁচে আছে?"**

যেদিন
এই প্রশ্নের উত্তর
আমরা সহজে দিতে পারব,
সেদিন
পৃথিবীতে
কোনো ভিখারির রাজ্য থাকবে না।

কারণ
সেদিন
কেউ কারও কাছে
রুটি চাইবে না।
আর কেউ
কারও কাছ থেকে
মানুষ হওয়ার অনুমতিও
চাইবে না।

ততদিন পর্যন্ত
শহরের ব্যস্ত মোড়ে
একটা টিনের বাটি
নিঃশব্দে পড়ে থাকবে।

মানুষ ভাববে,
ওখানে কয়েন জমছে।

আমি জানি —
ওখানে
জমে থাকে
সভ্যতার অসমাপ্ত বিবেক।

ভিখারির রাজ্য

বাছাইকৃত কবিতা

অন্য আমি

- মোঃ আবু তালেব

(মানুষ)

আমার ভেতরে
শুধু আমি থাকি না,
আরও কয়েকজন মানুষ থাকে।

একজন
সমুদ্রের ধারে একটা ছোট্ট বাতিঘরে
সারা জীবন
আলো জ্বালিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখত।
আরেকজন
অচেনা শহরের গলিতে
পুরোনো বই বিক্রি করতে চাইত,
যেন প্রতিটি বই
একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঋতু।
আরেকজন
কোনো পাহাড়ি গ্রামে
শিশুদের আকাশের নাম শেখাত।
আরেকজন
প্রতিদিন সন্ধ্যায়
একটা বেহালা বাজিয়ে
অন্ধকারকে একটু কোমল করত।

তারা কেউ
জন্ম নেয়নি।
তারা শুধু
আমার ভেতরে
অপেক্ষা করেছে।
আমি
অন্য একটা জীবন বেছে নিয়েছি।
সকালগুলো
সময়ের কাছে বন্ধক রেখেছি।
বিকেলগুলো
দায়িত্বের কাছে।
রাতগুলো
অপূর্ণতার কাছে।

তবু
মাঝে মাঝে
হঠাৎ কোনো বৃষ্টির গন্ধে,
কোনো ট্রেনের হুইসেলে,
কোনো অচেনা মুখের হাসিতে,
আমার ভেতরের
অন্য মানুষগুলো
ধীরে ধীরে
চোখ খুলে তাকায়।
তারা আমাকে
দোষ দেয় না।
শুধু
এমনভাবে হাসে,
যেন জানে —
একটা জীবনে
সব জীবন বাঁচা যায় না।

একদিন
একটা পুরোনো স্টেশনে
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
একের পর এক ট্রেন এল।
চলে গেল।
আমি উঠলাম না।
হঠাৎ মনে হলো,
জীবনও এমনই।
আমরা
যে ট্রেনে উঠেছি,
তার জন্যই
অসংখ্য ট্রেন
চিরদিনের মতো
ছেড়ে দিয়েছি।

সেই ছেড়ে দেওয়া ট্রেনগুলোর
জানালায়
আজও হয়তো
আমারই মুখ বসে আছে।
সে অন্য আকাশ দেখেছে।
অন্য নদী।
অন্য ভালোবাসা।
অন্য ব্যর্থতা।
অন্য মৃত্যু।

কখনো কখনো
আমি রাতে
স্বপ্ন দেখি —
আমি এমন একটা বাড়িতে ফিরেছি,
যেখানে আমি
কোনোদিন থাকিনি।
দরজা খুলতেই
একটা শিশু দৌড়ে এসে
আমাকে বাবা বলে জড়িয়ে ধরে।
একজন বৃদ্ধা
আমার জন্য ভাত বাড়েন।
জানালার পাশে
একটা কুকুর
লেজ নাড়ে।
ঘুম ভেঙে যায়।
আমি বুঝি,
ওরা কেউ
বাস্তব নয়।
তবু
তাদের জন্য
আমার বুকের ভেতর
একটা সত্যিকারের শূন্যতা জন্মায়।

হয়তো
মানুষের সবচেয়ে গভীর কান্না
যাদের হারিয়েছি,
তাদের জন্য নয়।
যে জীবনগুলো
আমাদের ভেতরেই
জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায়নি,
তাদের জন্য।
তবু আজ
আমি আর
সেই অজন্মা জীবনগুলোর কাছে
ক্ষমা চাই না।
কারণ
তাদের নীরবতাই
আমাকে মানুষ করেছে।
যে কবিতা লেখা হয়নি,
সে-ই আমাকে
লিখতে শিখিয়েছে।
যে পথে হাঁটিনি,
সে-ই আমাকে
পথের মূল্য বুঝিয়েছে।
যে ভালোবাসা
আমার হয়নি,
সে-ই
আমার হৃদয়ে
স্থান তৈরি করেছে।

আজ আমি জানি,
মানুষ
একটা জীবন নিয়ে জন্মায়,
কিন্তু
অসংখ্য সম্ভাবনার মৃত্যু
বয়ে বেড়ায়।
আমরা
যে জীবন বাঁচি,
তার চেয়েও বড়
যে জীবন বাঁচি না।

কারণ
আমাদের ভেতরে
নিঃশব্দে বসে থাকা
সেই অদেখা মানুষগুলোর চোখেই
হয়তো
ঈশ্বর
প্রতিদিন
আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আর তাই
আমি যখন আয়নায় দেখি,
শুধু নিজের মুখ দেখি না।
দেখি —
অসংখ্য অজন্মা জীবনের
শান্ত, দীপ্ত, ক্ষমাশীল
প্রতিফলন।
বিস্তারিত...

মায়ের নিঃশ্বাস

- মোঃ আবু তালেব

(মানুষ)

পৃথিবীতে আসার আগে
আমি কোনো ভাষা জানতাম না।
আলো চিনতাম না,
আকাশও না।

শুধু একটা ছন্দ চিনতাম।
ধীর।
উষ্ণ।
অবিরাম।
সে ছিল
আমার মায়ের নিঃশ্বাস।

আমার প্রথম পৃথিবী
কোনো দেশ ছিল না,
কোনো মানচিত্রও নয়।
একটা বুকের ভেতর
জলের মতো দুলতে থাকা
একটা অন্ধকার আশ্রয়।

সেখানে
দিন ছিল না,
রাতও না।
শুধু
একটা নিঃশ্বাসের ওঠানামায়
সময় তার প্রথম দোলনা বানিয়েছিল।

মা কখনো জানেননি,
তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে
আমি পৃথিবীর ব্যাকরণ শিখছিলাম।

কীভাবে ভয় থেমে যায়।
কীভাবে নীরবতাও
একটা আশ্রয় হতে পারে।
কীভাবে
কোনো শব্দ না বলেও
একজন মানুষ
আরেকজন মানুষকে
বাঁচিয়ে রাখে।

জন্মের পরে
আমাকে অনেক ভাষা শেখানো হয়েছে।
বর্ণমালা।
ব্যাকরণ।
ইতিহাস।
রাষ্ট্র।
ধর্ম।

কিন্তু
যে ভাষায়
মা গভীর রাতে
আমার জ্বর ছুঁয়ে বলতেন,
"আমি আছি" —
সেই ভাষার
কোনো অভিধান
আজও লেখা হয়নি।

একদিন লক্ষ্য করলাম,
মায়েরা ক্লান্ত হলে
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন না।
তারা
নিঃশব্দে
আরও ধীরে শ্বাস নেন।
যেন
নিজের ক্লান্তিকে
সন্তানের ঘুমের বাইরে
রেখে আসতে চান।

মায়ের নিঃশ্বাস
বাতাসের মতো নয়।
বাতাস
সবাইকে ছুঁয়ে যায়।
মায়ের নিঃশ্বাস
শুধু একজন মানুষকে
তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব দিয়ে
ডেকে রাখে।

শৈশবে
আমি ঘুমিয়ে পড়তাম
মায়ের বুকের পাশে।
আজ এত বছর পরেও
কোনো অজানা শহরের
হোটেলঘরে
রাতের শেষে
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে
আমি কখনো কখনো
একটা অদৃশ্য ছন্দ শুনতে পাই।

জানালার বাইরে
কেউ নেই,
ঘরের ভেতরেও না।
তবু মনে হয়,
পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে
একটা নিঃশ্বাস
এখনো আমাকে
বাড়ি বলে ডাকে।

সময়
মায়ের চুলে
রূপোর ধুলো ছিটিয়ে দিয়েছে।
হাতের শিরাগুলো
নদীর মতো স্পষ্ট।
হাঁটার ভেতর
ধীরে ধীরে
বিকেলের আলো নেমে এসেছে।
কিন্তু অদ্ভুত —
আমি যখনই
তার পাশে বসি,
মনে হয়,
আমি আবার
একটা অনাগত শিশু।

আমার সব বয়স
তার একটিমাত্র নিঃশ্বাসের কাছে
নীরবে মাথা নত করে।

আমি জানি,
একদিন
এই পৃথিবীতে
মায়ের নিঃশ্বাস থাকবে না,
ঘর থাকবে।
জানালা থাকবে।
তার ব্যবহার করা চশমা,
শাড়ির ভাঁজ,
প্রার্থনার চাদর,
রান্নাঘরের মশলার গন্ধ —
সবই থাকবে।
শুধু
যে অদৃশ্য ছন্দে
আমার প্রথম পৃথিবী দুলেছিল,
সে আর শোনা যাবে না।

সেদিন
পৃথিবীর বাতাস
একই রকম থাকবে।
তবু
আমি বুঝব,
কিছু একটা
চিরতরে বদলে গেছে।
কারণ
মা কখনো
শুধু একজন মানুষ নন।
তিনি
সন্তানের জীবনে
ঈশ্বরের সবচেয়ে নীরব উচ্চারণ।

আর তাঁর নিঃশ্বাস —
সেই প্রথম কবিতা,
যা কোনো কাগজে লেখা হয় না,
কোনো ভাষায়
সম্পূর্ণ অনুবাদ হয় না,
তবু
মানুষ
সারাজীবন
নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে
পুনরায় পড়তে থাকে।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4604
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1680
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1644
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1569
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1563
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1495
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1457
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1446
রমণী মোঃ আবু তালেব 1426
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1391
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1391
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1390
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1355
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1347
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1346
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1346
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1344
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1331
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1319
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1316
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
অন্য আমি মোঃ আবু তালেব 13
মায়ের নিঃশ্বাস মোঃ আবু তালেব 14
শেষ চুম্বন মোঃ আবু তালেব 23
বৃদ্ধের বিকেল মোঃ আবু তালেব 22
ভিখারির রাজ্য মোঃ আবু তালেব 76
সকল মানুষের মুখ মোঃ আবু তালেব 26
অপ্রকাশ মোঃ আবু তালেব 27
ভেতরের সমুদ্র মোঃ আবু তালেব 34
নীরব যুদ্ধ মোঃ আবু তালেব 38
হারিয়ে যাওয়া নাম মোঃ আবু তালেব 72
যে ক্ষমা পাইনি মোঃ আবু তালেব 33
যে ক্ষমা চাইনি মোঃ আবু তালেব 30
অসমাপ্ত চিঠি মোঃ আবু তালেব 43
গোপন প্রেম মোঃ আবু তালেব 43
অদেখা কান্না মোঃ আবু তালেব 40
যে কথাটি বলিনি মোঃ আবু তালেব 34
আমি কে? মোঃ আবু তালেব 70
প্রথম নীরবতা মোঃ আবু তালেব 63
প্রথম মিথ্যা মোঃ আবু তালেব 64
প্রথম লজ্জা মোঃ আবু তালেব 57
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 61
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 55
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 68
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 64
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 68
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 112
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 137
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 135
ভালো মানুষ ইবনে আলী 236
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 135
শিকল ইবনে আলী 210
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 256
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 221
বসন্ত জয়দীপ রায় 241
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 157
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 302
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 276
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 288
সোনার দেশ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 307
মুসলিম সংখ্যালঘু শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 250
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে