কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(মুখ ও মুখোশ)

ছোটবেলায়
আমি জানতাম না
আমি আসলে কেমন।

আয়নায় তাকালে
শুধু একটি মুখ দেখতাম—
আমার নিজের।
তারপর একদিন
কেউ বলল,
“তুমি সুন্দর।”
আরেকদিন কেউ বলল,
“তুমি তেমন কিছু নও।”
সেদিন থেকেই
আমি নিজের মুখের ওপর
অন্যের চোখ বসাতে শুরু করলাম।

যে আমাকে ভালোবাসে,
তার চোখে নিজেকে দেখলাম—
আমি ভালো।
যে আমাকে অপছন্দ করে,
তার চোখে তাকালাম—
আমি খারাপ।
যে আমাকে সম্মান করে,
আমি তার চোখে
নিজেকে বড় করলাম।
যে আমাকে তুচ্ছ করে,
তার চোখে
নিজেকে ছোট করলাম।
এভাবে একদিন
আমার নিজের কোনো চোখ
রইল না।

আমি পোশাক পরি—
মানুষ কী বলবে তা ভেবে।
কথা বলি—
কে কী ভাববে তা ভেবে।
চুপ থাকি—
চুপ থাকলে কে কী ভাববে তা ভেবে।
হাসি—
হাসিটা সুন্দর দেখাচ্ছে কি না তা ভেবে।
কাঁদি না—
কেউ আমাকে দুর্বল ভাববে তা ভেবে।
ধীরে ধীরে
আমি আর জীবন যাপন করিনি;
আমি শুধু
নিজেকে প্রদর্শন করেছি।

আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পাশে
একজন অদৃশ্য দর্শক বসে থাকত।
সে বলত—
“এটা করলে মানুষ কী বলবে?”
আমি শুনতাম।
সে বলত—
“ওরা তোমাকে পছন্দ করবে তো?”
আমি বদলে যেতাম।
সে বলত—
“তুমি কি যথেষ্ট?”
আমি সারারাত
নিজেকে মাপতাম।

একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ বুঝলাম—
আয়নায় যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে,
তাকে আমি চিনি না।
তার মুখে
হাজার মানুষের মতামত।
তার চোখে
অন্যের প্রত্যাশা।
তার হাসিতে
অনুমোদনের ক্ষুধা।
তার নীরবতায়
অস্বীকৃতির ভয়।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম—
“তুমি কে?”
সে উত্তর দিল না।
কারণ তার নিজের কোনো উত্তর ছিল না।
সে শুধু জানত—
মানুষ তাকে কী ভাবে।

সেদিন প্রথমবার
আমি আয়নাটি সরিয়ে রাখলাম।
কোনো প্রশংসা নয়,
কোনো নিন্দা নয়,
কোনো তুলনা নয়।
শুধু নিজের সঙ্গে
একটি দীর্ঘ নীরবতা।

সেই নীরবতায়
ধীরে ধীরে
একটি অপরিচিত কণ্ঠ শুনলাম।
কণ্ঠটি বলল—
“তুমি যা,
তা দেখার জন্য
অন্যের চোখ ধার করতে হবে না।”

আমি অনেকক্ষণ
চুপ করে রইলাম।
তারপর প্রথমবার
নিজের চোখে
নিজেকে দেখলাম।
দেখলাম—
আমি নিখুঁত নই।
আমি অসাধারণও নই।
আমি ব্যর্থ,
আমি সফল,
আমি ভাঙি,
আমি আবার দাঁড়াই।
কখনো ভুল করি,
কখনো ক্ষমা চাইতে পারি না,
কখনো নিজেকেই বুঝি না।

তবু—
এই অসম্পূর্ণ মানুষটিই আমি।
সেদিন বুঝলাম,
অন্যের চোখে
নিজেকে সুন্দর করতে করতে
আমি নিজের চোখেই
অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলাম।

আর নিজেকে ফিরে পাওয়ার প্রথম মুহূর্তটি ছিল—
যখন পৃথিবী কী দেখছে
সেটা ভুলে,
আমি প্রথমবার
নিজের দিকে তাকিয়েছিলাম।

অন্যের চোখে আমি

(মুখ ও মুখোশ)

সবাই আমাকে চেনে।

পাড়ার মানুষ জানে
আমি কখন বাড়ি ফিরি,
অফিসের মানুষ জানে
আমি কী কাজ করি,
আত্মীয়রা জানে
আমার পরিবারের গল্প।

কেউ জানে
আমি কত টাকা উপার্জন করি,
কেউ জানে
আমি কোথায় থাকি,
কেউ জানে
কীভাবে কথা বলি,
কী পোশাক পরি,
কাদের সঙ্গে চলি।

সবাই আমাকে চেনে।

শুধু—
আমি যখন একা হই,
তখন আমাকে কেউ চেনে না।
মানুষ আমার হাসিটা চেনে,
কিন্তু হাসার কারণটা নয়।
আমার কথাগুলো চেনে,
কিন্তু যে কথাগুলো
আমি কোনোদিন বলিনি—
সেগুলো চেনে না।
তারা আমার সাফল্য গুনেছে,
ব্যর্থতাগুলো বিচার করেছে,
ভুলগুলোর নাম দিয়েছে,
অভ্যাসগুলোর ব্যাখ্যা বানিয়েছে।
কেউ একবারও জিজ্ঞেস করেনি—
“তুমি নিজের কাছে
কেমন মানুষ?”

আমার চারপাশে
আমার সম্পর্কে
হাজারটা গল্প আছে।
কেউ আমাকে ভালো মানুষ বলে,
কেউ অহংকারী,
কেউ সফল,
কেউ ব্যর্থ,
কেউ স্বার্থপর,
কেউ উদার।

আমি অবাক হয়ে দেখি—
একজন মানুষকে নিয়ে
কত সহজে
এতগুলো মানুষ
এতগুলো সত্য বানিয়ে ফেলে।
কিন্তু আমার ভিতরে
একটি ছোট ঘর আছে।
সেখানে কোনো পরিচয় নেই।

নেই পদবি,
নেই পেশা,
নেই সম্মান,
নেই অপমান।
সেখানে আমি
কাউকে কিছু প্রমাণ করি না।
সেখানে আমার
সব না-বলা কথা
চুপচাপ বসে থাকে।

একদিন খুব ইচ্ছে হলো
ঘরটির দরজা খুলে বলি—
“এসো,
আজ আমাকে সত্যি করে চেনো।”
কিন্তু দরজার বাইরে
অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।
তারা ইতিমধ্যে
আমার পরিচয় লিখে ফেলেছে।
তাদের হাতে
আমার জীবন নিয়ে
সম্পূর্ণ একটি বই।
শুধু বইটির
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাতাটি
খালি—
আমি ভিতরে
আসলে কে।

তাই আজকাল
কেউ যখন বলে,
“আমি তোমাকে খুব ভালো করে চিনি,”
আমি শুধু হাসি।
কারণ মানুষ
আমার মুখ চিনতে পারে,
আমার নাম বলতে পারে,
আমার অতীত বলতে পারে—
কিন্তু যে মানুষটি
প্রতিদিন রাতে
নিজের ভিতরের অন্ধকারে
নিজের সঙ্গে কথা বলে,
সেই মানুষটির সঙ্গে
আজও কারও পরিচয় হয়নি।

হয়তো কোনোদিন হবে না!
হয়তো মানুষকে চেনা মানেই
তার সম্পর্কে সব জানা নয়।
হয়তো সত্যিকারের চেনা
শুরু হয় সেখানেই—
যেখানে একজন মানুষ
তার সব পরিচয় নামিয়ে রেখে
নীরবে দাঁড়ায়,
আর অন্যজন
তাকে ব্যাখ্যা না করে
শুধু পাশে থাকে।

সেদিনই হয়তো
প্রথমবার
কেউ আমাকে চিনবে।

সবাই আমাকে চেনে

এ শহর আমার নয়


সব কটা সূচকেই করে নির্দেশ—
এ শহর আমার নয়,
যানজট, জলজট, ধূলি-দূষণের কোলাহলে
পড়ে থাকে কঙ্কাল আর বিষণ্ন স্বদেশ।

রাহাজানির নির্ধারিত চাপাতির কোপে সর্বদা খেলা করে ভয়,
অনায়াসে বসা যায় মসনদে; গলি-ঘুচি-মহল্লা হয় না কারো জয়।

ফুটপাতে হকারের বাড়িঘর—পৈতৃক সম্পদ!
চাঁদাবাজি, নয় কোনো ডাকাতি;
সমঝোতা হলে পরে কেনা যায় ঝাড়বাতি?
পথে-ঘাটে, রাজপথে মানুষ নয়; ভরে থাকে লম্পট।

বর্ষায় চলে খোঁড়াখুঁড়ি,
পথে চলে ভাসমান টানাগাড়ি।
রাস্তাও খোলা নেই,
ম্যানহোল ঢাকা নেই;
বেঘোরে হারায় প্রাণ পথচারী,
প্রতিদিন ঘটে দুর্ঘটনা—এসেছে কঠিন মহামারী!

ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক—আয়তনে তিন গুণ,
ফুটপাত, রেলপথ, রাজপথ আয়তনে বহু গুণ।
জনগণের অকুন্ঠ সেবায় আছে মেয়র একজন—নাম তার মামদানি।
শহর হলেও ছোট, আমরা পেয়েছি মেয়র মাত্র দু’জন; তারা বড়ই ’খানদানি’।

উত্তরে একজন, দক্ষিণে একজন;
দু’দিকেই থাকেন দু’জন।
পূর্ব-পশ্চিম আছে ফাঁকা—বসতে পারো সুজন,
কিংবা আসতে পারো নতুন কোনো ’মহাজন’।।


মো: মুস্তাফিজুর রহমান
ঢাকা ২১.০৭.২০২৬

এ শহর আমার নয়

(মুখ ও মুখোশ)

আমার নাম জিজ্ঞেস করো না—
নামটি আমি জন্মের সাথে পাইনি,
পেয়েছি কোন প্রিয় মানুষের মুখ থেকে।

তারা আমাকে একটি নাম দিল,
তারপর নামটির চারপাশে
চারটি দেয়াল বানাল।

তারপর জিজ্ঞেস করল—
“তুমি কী?”
আমি বললাম—
“মানুষ।”
তারা হাসল।
বলল,
“না, সেটা যথেষ্ট নয়।”
তাই আমার কপালে এটে দিল
ধর্মের সীল,
বুকে ঝুলিয়ে দিল শ্রেণির পরিচয়,
হাতে ধরিয়ে দিল পেশার সনদ,
পকেটে গুঁজে দিল অর্থের হিসাব।
তারপর বলল—
“এবার তোমাকে—
স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে।”
আমি চুপ করে রইলাম!
কারণ তারা বুঝতে পারেনি—
আমার ভেতরে যে মানুষটি আছে,
সে কোনো ফর্মের ঘরে
টিক চিহ্ন দেওয়ার মতো নয়।

আমি যখন শিশু ছিলাম,
আমার কোনো পেশা ছিল না,
কোনো পদ ছিল না,
কোনো সম্পদ ছিল না,
কোনো শ্রেণি ছিল না,
তবু আমি পূর্ণ ছিলাম।
বড় হতে হতে
মানুষ আমাকে পরিচয় দিল—
আর প্রতিটি পরিচয়ের সঙ্গে
আমার ভেতর থেকে
একটি করে জানালা বন্ধ হয়ে গেল।

একদিন দেখলাম,
আমি আর আকাশ দেখি না,
দেখি শুধু
আমার পরিচয়ের ছাদ।
আমি আর মানুষ দেখি না,
দেখি—
কে আমার,
কে পর।
কে ধনী,
কে দরিদ্র।
কে শিক্ষিত,
কে অশিক্ষিত।
কে উচ্চ,
কে নিচু।
কে আমাদের,
কে তাদের।

অদ্ভুত এই কারাগারে
লোহার শিক নেই—
আছে শুধু শব্দ।
“তুমি এই।”
“তুমি ওই।”
“তুমি আমাদের।”
“তুমি ওদের।”
মানুষ শব্দ দিয়ে
মানুষকে বন্দি করে,
তারপর সেই বন্দিত্বের নাম দেয়—
পরিচয়।

একদিন আমি
সব পরিচয়ের জামা খুলে
নগ্ন হয়ে দাঁড়ালাম
একটি আয়নার সামনে।
আয়না কিছু বলল না।
শুধু একজন মানুষকে দেখাল।
নামহীন নয়—
নামের চেয়েও বড়।
ধর্মহীন নয়—
ধর্মের দেয়ালের চেয়েও বিস্তৃত।
গরিব-ধনী নয়—
শ্রেণির মাপের বাইরে।
পেশাহীন নয়—
পেশার আগের সেই পূর্ণাঙ্গ মানুষ।

আমি তখন বুঝলাম—
পরিচয় আমাদের জানায়
আমরা কে নই।
আর নীরবতা
প্রথমবার জিজ্ঞেস করে—
“তুমি আসলে কে?”

সেই প্রশ্নের সামনে
আমার সব পরিচয়
একদিন ভেঙে পড়ল।
নামটি পড়ে রইল মাটিতে।
পেশাটি দরজার বাইরে।
ধর্মটি দেয়ালের পাশে।
অর্থটি টেবিলের ওপর।
শ্রেণিটি সিঁড়ির নিচে।
আর আমি—
সবকিছুর ভেতর দিয়ে
প্রথমবার
নিজের কাছে ফিরে এলাম।

সেদিন বুঝলাম,
কারাগারটি বাইরে ছিল না।
আমি নিজেই
আমার পরিচয়গুলোর
কারারক্ষী ছিলাম।

আর যেদিন আমি
নিজেকে আর কোনো বাক্সে
রাখতে অস্বীকার করেছিলাম,
সেদিনই প্রথম খুলেছিল—
আমার
মুক্তির দরজা।

পরিচয়ের কারাগার

(মুখ ও মুখোশ)

লোকটি আজও হাসছিল!

চায়ের দোকানে বসে
বন্ধুর কৌতুকে এমনভাবে হেসে উঠল,
যেন পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ
তারই পকেটে জমা আছে।

দোকানদার বলল,
“ভাই, আজ খুব খুশি মনে হচ্ছে!”

সে আরও একটু হাসল।

কেউ জানল না—
সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
সে নিজের মুখটাকে কিছুক্ষণ চিনতে পারেনি।
তার হাসির ভাঁজে
একটা অসমাপ্ত কথোপকথন ছিল,
চোখের কোণে ছিল
ফিরে না-আসা একজন মানুষের ছায়া।
তবু সে হাসছিল,
কারণ মানুষজন
হাসি দেখতে পছন্দ করে,
কিন্তু হাসির ভেতর
কী ভেঙে যাচ্ছে—
সেটা দেখতে তাদের সময় নেই।

বিকেলে সে রাস্তায় হাঁটল,
পরিচিত সবাইকে সালাম দিল,
দু-একজনের কাঁধে হাত রাখল,
আর এমনভাবে বলল—
“কী খবর?”

রাতে বাড়ি ফিরে
জুতো খুলে দরজার পাশে রাখল।
আলো জ্বালাল না।
অন্ধকারে বসে
সারাদিনের হাসিগুলো
এক এক করে খুলে রাখল টেবিলের ওপর।

কিছু হাসি ছিল মানুষের জন্য,
কিছু ছিল অভ্যাসের জন্য,
আর একটা হাসি—
শুধু নিজেকে বোঝানোর জন্য:
“আমি ঠিক আছি।”
কেউ শুনল না!

পরদিন সকালে
আবার সেই মানুষটিকে দেখা গেল।
সে হাসছিল।
সবাই ভাবল,
মানুষটি খুব ভালো আছে।

যে মানুষটি হাসছিল

বাছাইকৃত কবিতা

অন্যের চোখে আমি

- মোঃ আবু তালেব

(মুখ ও মুখোশ)

ছোটবেলায়
আমি জানতাম না
আমি আসলে কেমন।

আয়নায় তাকালে
শুধু একটি মুখ দেখতাম—
আমার নিজের।
তারপর একদিন
কেউ বলল,
“তুমি সুন্দর।”
আরেকদিন কেউ বলল,
“তুমি তেমন কিছু নও।”
সেদিন থেকেই
আমি নিজের মুখের ওপর
অন্যের চোখ বসাতে শুরু করলাম।

যে আমাকে ভালোবাসে,
তার চোখে নিজেকে দেখলাম—
আমি ভালো।
যে আমাকে অপছন্দ করে,
তার চোখে তাকালাম—
আমি খারাপ।
যে আমাকে সম্মান করে,
আমি তার চোখে
নিজেকে বড় করলাম।
যে আমাকে তুচ্ছ করে,
তার চোখে
নিজেকে ছোট করলাম।
এভাবে একদিন
আমার নিজের কোনো চোখ
রইল না।

আমি পোশাক পরি—
মানুষ কী বলবে তা ভেবে।
কথা বলি—
কে কী ভাববে তা ভেবে।
চুপ থাকি—
চুপ থাকলে কে কী ভাববে তা ভেবে।
হাসি—
হাসিটা সুন্দর দেখাচ্ছে কি না তা ভেবে।
কাঁদি না—
কেউ আমাকে দুর্বল ভাববে তা ভেবে।
ধীরে ধীরে
আমি আর জীবন যাপন করিনি;
আমি শুধু
নিজেকে প্রদর্শন করেছি।

আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তের পাশে
একজন অদৃশ্য দর্শক বসে থাকত।
সে বলত—
“এটা করলে মানুষ কী বলবে?”
আমি শুনতাম।
সে বলত—
“ওরা তোমাকে পছন্দ করবে তো?”
আমি বদলে যেতাম।
সে বলত—
“তুমি কি যথেষ্ট?”
আমি সারারাত
নিজেকে মাপতাম।

একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ বুঝলাম—
আয়নায় যে মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে,
তাকে আমি চিনি না।
তার মুখে
হাজার মানুষের মতামত।
তার চোখে
অন্যের প্রত্যাশা।
তার হাসিতে
অনুমোদনের ক্ষুধা।
তার নীরবতায়
অস্বীকৃতির ভয়।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম—
“তুমি কে?”
সে উত্তর দিল না।
কারণ তার নিজের কোনো উত্তর ছিল না।
সে শুধু জানত—
মানুষ তাকে কী ভাবে।

সেদিন প্রথমবার
আমি আয়নাটি সরিয়ে রাখলাম।
কোনো প্রশংসা নয়,
কোনো নিন্দা নয়,
কোনো তুলনা নয়।
শুধু নিজের সঙ্গে
একটি দীর্ঘ নীরবতা।

সেই নীরবতায়
ধীরে ধীরে
একটি অপরিচিত কণ্ঠ শুনলাম।
কণ্ঠটি বলল—
“তুমি যা,
তা দেখার জন্য
অন্যের চোখ ধার করতে হবে না।”

আমি অনেকক্ষণ
চুপ করে রইলাম।
তারপর প্রথমবার
নিজের চোখে
নিজেকে দেখলাম।
দেখলাম—
আমি নিখুঁত নই।
আমি অসাধারণও নই।
আমি ব্যর্থ,
আমি সফল,
আমি ভাঙি,
আমি আবার দাঁড়াই।
কখনো ভুল করি,
কখনো ক্ষমা চাইতে পারি না,
কখনো নিজেকেই বুঝি না।

তবু—
এই অসম্পূর্ণ মানুষটিই আমি।
সেদিন বুঝলাম,
অন্যের চোখে
নিজেকে সুন্দর করতে করতে
আমি নিজের চোখেই
অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলাম।

আর নিজেকে ফিরে পাওয়ার প্রথম মুহূর্তটি ছিল—
যখন পৃথিবী কী দেখছে
সেটা ভুলে,
আমি প্রথমবার
নিজের দিকে তাকিয়েছিলাম।
বিস্তারিত...

সবাই আমাকে চেনে

- মোঃ আবু তালেব

(মুখ ও মুখোশ)

সবাই আমাকে চেনে।

পাড়ার মানুষ জানে
আমি কখন বাড়ি ফিরি,
অফিসের মানুষ জানে
আমি কী কাজ করি,
আত্মীয়রা জানে
আমার পরিবারের গল্প।

কেউ জানে
আমি কত টাকা উপার্জন করি,
কেউ জানে
আমি কোথায় থাকি,
কেউ জানে
কীভাবে কথা বলি,
কী পোশাক পরি,
কাদের সঙ্গে চলি।

সবাই আমাকে চেনে।

শুধু—
আমি যখন একা হই,
তখন আমাকে কেউ চেনে না।
মানুষ আমার হাসিটা চেনে,
কিন্তু হাসার কারণটা নয়।
আমার কথাগুলো চেনে,
কিন্তু যে কথাগুলো
আমি কোনোদিন বলিনি—
সেগুলো চেনে না।
তারা আমার সাফল্য গুনেছে,
ব্যর্থতাগুলো বিচার করেছে,
ভুলগুলোর নাম দিয়েছে,
অভ্যাসগুলোর ব্যাখ্যা বানিয়েছে।
কেউ একবারও জিজ্ঞেস করেনি—
“তুমি নিজের কাছে
কেমন মানুষ?”

আমার চারপাশে
আমার সম্পর্কে
হাজারটা গল্প আছে।
কেউ আমাকে ভালো মানুষ বলে,
কেউ অহংকারী,
কেউ সফল,
কেউ ব্যর্থ,
কেউ স্বার্থপর,
কেউ উদার।

আমি অবাক হয়ে দেখি—
একজন মানুষকে নিয়ে
কত সহজে
এতগুলো মানুষ
এতগুলো সত্য বানিয়ে ফেলে।
কিন্তু আমার ভিতরে
একটি ছোট ঘর আছে।
সেখানে কোনো পরিচয় নেই।

নেই পদবি,
নেই পেশা,
নেই সম্মান,
নেই অপমান।
সেখানে আমি
কাউকে কিছু প্রমাণ করি না।
সেখানে আমার
সব না-বলা কথা
চুপচাপ বসে থাকে।

একদিন খুব ইচ্ছে হলো
ঘরটির দরজা খুলে বলি—
“এসো,
আজ আমাকে সত্যি করে চেনো।”
কিন্তু দরজার বাইরে
অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।
তারা ইতিমধ্যে
আমার পরিচয় লিখে ফেলেছে।
তাদের হাতে
আমার জীবন নিয়ে
সম্পূর্ণ একটি বই।
শুধু বইটির
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাতাটি
খালি—
আমি ভিতরে
আসলে কে।

তাই আজকাল
কেউ যখন বলে,
“আমি তোমাকে খুব ভালো করে চিনি,”
আমি শুধু হাসি।
কারণ মানুষ
আমার মুখ চিনতে পারে,
আমার নাম বলতে পারে,
আমার অতীত বলতে পারে—
কিন্তু যে মানুষটি
প্রতিদিন রাতে
নিজের ভিতরের অন্ধকারে
নিজের সঙ্গে কথা বলে,
সেই মানুষটির সঙ্গে
আজও কারও পরিচয় হয়নি।

হয়তো কোনোদিন হবে না!
হয়তো মানুষকে চেনা মানেই
তার সম্পর্কে সব জানা নয়।
হয়তো সত্যিকারের চেনা
শুরু হয় সেখানেই—
যেখানে একজন মানুষ
তার সব পরিচয় নামিয়ে রেখে
নীরবে দাঁড়ায়,
আর অন্যজন
তাকে ব্যাখ্যা না করে
শুধু পাশে থাকে।

সেদিনই হয়তো
প্রথমবার
কেউ আমাকে চিনবে।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4629
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1711
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1663
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1589
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1580
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1517
কর্মফল মোঃ আবু তালেব 1509
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1472
রমণী মোঃ আবু তালেব 1443
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1416
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1413
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1407
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1370
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1370
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1369
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1363
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1362
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1346
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1338
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1332
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
অন্যের চোখে আমি মোঃ আবু তালেব 7
সবাই আমাকে চেনে মোঃ আবু তালেব 10
পরিচয়ের কারাগার মোঃ আবু তালেব 20
যে মানুষটি হাসছিল মোঃ আবু তালেব 20
দরিদ্রের জামা মোঃ আবু তালেব 24
হাসির শহর মোঃ আবু তালেব 27
সভ্য মানুষেরা মোঃ আবু তালেব 33
মুখের নিচে মুখ মোঃ আবু তালেব 35
ভালোবাসার শেষ দরজা মোঃ আবু তালেব 36
তোমাকে ছাড়া তোমার কাছে মোঃ আবু তালেব 37
যে প্রেম কথা বলেনি মোঃ আবু তালেব 30
আমাদের মাঝখানে রাত মোঃ আবু তালেব 38
অপেক্ষার ঘর মোঃ আবু তালেব 45
তুমি যে ছিলে মোঃ আবু তালেব 50
একটি মানুষকে হারানোর আগে মোঃ আবু তালেব 50
ভালোবাসার পরে মো: আবু তালেব 67
তোমার অনুপস্থিতি মোঃ আবু তালেব 62
যে হাতটি ধরিনি মোঃ আবু তালেব 60
অলৌকিক দুপুর মো: আবু তালেব 49
অস্থায়ী অনন্ত মোঃ আবু তালেব 62
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
এ শহর আমার নয় Md. Mustafizur Rahman 16
বায়তুল মাক্বদিস ফেরদাউস সরকার 29
কবির কলমে নবির ছবি কবি ফেরদাউস সরকার 48
প্রত্যাবর্তন রাফাত আহমেদ 50
মৃত্যুদিন শ্রীমল্লার 69
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 88
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 68
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 85
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 87
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 91
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 129
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 146
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 151
ভালো মানুষ ইবনে আলী 262
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 149
শিকল ইবনে আলী 240
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 284
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 236
বসন্ত জয়দীপ রায় 256
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 171
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে