কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(ভালবাসা)

শেষবার যখন তুমি এলে,
বিকেল তখন প্রায় ফুরিয়ে গেছে।
জানালার কাঁচে
শীতের ম্লান রোদ—
ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল
একটি শুকনো পাতা।

তুমি পাতা তুলে
টেবিলের ওপর রাখলে।
বললে,
“এটা এখানে ছিল?”
আমি বললাম,
“হয়তো বাতাসে এসেছে।”
তুমি হেসে বললে,
“সবকিছুই কি বাতাসে আসে?”

আমি উত্তর দিইনি।

কারণ কিছু জিনিস
বাতাসে আসে না—
ধীরে ধীরে
মানুষের ভিতরে জন্মায়।
আমরা সেদিন
অনেক সাধারণ কথা বলেছিলাম।

চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
ঘড়িতে পাঁচটা বেজে গিয়েছিল।
বাইরে একজন ফেরিওয়ালা
শেষবারের মতো ডাকছিল।
তুমি বারবার
জানালার দিকে তাকাচ্ছিলে।
আমি বুঝেছিলাম।
তবু জিজ্ঞেস করিনি—

তুমি কি সত্যিই চলে যাবে?
তুমি যাওয়ার আগে
ঘরের দিকে একবার তাকালে।

যেন কোনো মানুষ নয়,
একটি পুরোনো জীবন
শেষবার দেখে নিচ্ছিলে।
দরজার কাছে এসে
তুমি বললে,
“ভালো থেকো।”
এই দুটি শব্দ
কত ছোট!

অথচ তাদের ভিতরে
আমাদের সমস্ত দিন
ধীরে ধীরে ডুবে গেল।
তুমি বেরিয়ে গেলে।
দরজা বন্ধ হলো।

আমি টেবিলের কাছে ফিরে এসে
দেখলাম—
শুকনো পাতাটি
এখনও সেখানে।
সেদিন রাতে
আমি পাতাটি ফেলে দিইনি।
পরদিনও না।
তারপর বহুদিন।

অবশেষে এক সকালে
জানালা খুলতেই
হাওয়া এসে
পাতাটিকে মেঝেতে ফেলে দিল।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

তারপর বুঝলাম—
কিছু স্মৃতি
আমরা যত্ন করে রাখি না;
তারা নিজেরাই
আমাদের কাছে থেকে যায়।
আর একদিন
নিজেরাই চলে যায়।

তোমার চলে যাওয়ার পর
আমি ভাবতাম,
ভালোবাসার শেষ কোথায়?
যে দিন মানুষ চলে যায়?
যে দিন তার নাম আর ডাকা হয় না?

নাকি যে দিন
তার কথা মনে পড়লেও
বুকের ভিতর আর ব্যথা করে না?
আজ জানি—
ভালোবাসার শেষ বলে
আসলে কিছু নেই।
শুধু একদিন
তার দরজাটি
অন্যদিকে খুলে যায়।

তার ওপারে থাকে
অভিমানহীন একটি সকাল,
একটি পুরোনো মুখ,
একটি শুকনো পাতা,
আর একজন মানুষ
যে ফিরে তাকিয়ে দেখে—
সে যাকে হারিয়েছিল,
তার চেয়ে বড় কিছু
সে হারায়নি;
সে হারিয়েছিল
নিজের সেই মানুষটিকে,
যে ভালোবাসতে জানত
কোনো শর্ত ছাড়াই।

সেদিন
আমি দরজাটি বন্ধ করিনি।
খোলা রেখেছিলাম।
তোমার জন্য নয়।
যদি কোনোদিন
আমার হারিয়ে যাওয়া মানুষটি
নিজের কাছে ফিরে আসে—
যেন তার ঢোকার পথ থাকে।

ভালোবাসার শেষ দরজা

(ভালবাসা)

তোমার শহরে আর যাই না।

তবু কখনো কখনো
অকারণে বাসের জানালায়
সেই পুরোনো রাস্তা উঠে আসে—
একটি ওষুধের দোকান,
মোড়ের চায়ের স্টল,
বিকেলের ধুলোয়
একটি শিশুর লাল বল।

স্মৃতি বড় অদ্ভুত;
সে কখনো পুরো বাড়িটা ফিরিয়ে আনে না,
শুধু একটি জানালা খুলে দেয়।

সেই জানালায়
তুমি দাঁড়িয়ে থাকো।

আমি তোমাকে ডাকতে যাই,
কিন্তু কণ্ঠস্বরের আগেই
বাসটি মোড় ঘুরে যায়।

বহু বছর হলো
তোমার সঙ্গে কথা হয় না।
তবু
কিছু কথা প্রতিদিনই হয়।

সকালে চা বানাতে গিয়ে
চিনি কম হলে মনে পড়ে—
তুমি কম চিনি খেতে।
বৃষ্টির দিনে
জানালা বন্ধ করতে গিয়ে
মনে পড়ে—
তুমি বৃষ্টির শব্দ শুনতে
জানালা খোলা রাখতে।
শীতের রাতে
কম্বলটা টেনে নিই—
মনে পড়ে,
তুমি পা ঢাকতে ভুলে যেতে।

দেখো,
মানুষ চলে যায় কত সহজে;
তার অভ্যাসগুলো যায় না।
তারা ঘরের জিনিসের মতো
আমাদের জীবনে পড়ে থাকে।

একদিন পুরোনো আলমারি খুলে
তোমার একটি চিঠি পেলাম।
খামটি খালি।
চিঠিটা নেই।
কী লেখা ছিল
মনে নেই।

শুধু তোমার হাতের লেখা
মনে আছে।
আমি অনেকক্ষণ
সেই অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তারপর বুঝলাম—
কখনো কখনো
মানুষের কথা নয়,
তার লেখা থেকে যাওয়ার ভঙ্গিটুকুই
আমাদের কাছে বেঁচে থাকে।

তুমি নেই।

তবু তোমার জন্য
আমার ভিতরে যে জায়গাটি ছিল
সেটি আমি অন্য কাউকে দিইনি।

এটি কোনো প্রতিজ্ঞা নয়।
কোনো অপেক্ষাও নয়।
শুধু একটি খালি ঘর।
যেখানে মাঝে মাঝে
বিকেলের আলো এসে বসে।

আজ যদি তুমি হঠাৎ ফিরে আসো,
আমি হয়তো চিনতে পারব না।
তোমার মুখ বদলে যাবে,
আমার মুখও।
আমরা দুজনেই
অন্য জীবনের মানুষ হয়ে যাব।
তবু
হয়তো এক মুহূর্তের জন্য
দুজনেই বুঝব—
এই চোখদুটি
কোনো এক সময়
একে অন্যের দিকে
খুব গভীরভাবে তাকিয়েছিল।

তারপর তুমি আবার চলে যাবে।
আমি তোমাকে আটকাব না।
শুধু সেই রাতে
নিজের ঘরে ফিরে
জানালাটা খুলে রাখব।
বাইরে যদি বৃষ্টি নামে,
বৃষ্টি আসুক।

যদি বাতাস আসে,
বাতাস আসুক।
যদি কিছুই না আসে—
তবুও থাক।
কারণ এত বছর পরে
আমি শিখেছি,
কাউকে কাছে পাওয়া আর
কারও কাছে থাকা
এক কথা নয়।

তুমি আমার কাছে নেই।
তবু
তোমার চলে যাওয়ার পর
আমার যে মানুষটি বেঁচে আছে—
সে আজও তোমার কাছেই থাকে।

তোমাকে ছাড়া তোমার কাছে

(ভালবাসা)

তোমাকে ভালোবাসি—
এই কথাটি
তোমার সামনে কোনোদিন
আমার বলা হয়ে ওঠেনি।

কতবার ঠোঁটের কাছে এসে
ফিরে গেছে ঠোঁট—
যেমন সন্ধ্যার পাখি
শেষ আলো ছুঁয়ে
অন্ধকারের দিকে ফিরে যায়।

তুমি ছিলে আমার পাশে।
একই টেবিলে দুজনের চা,
একই জানালায় বৃষ্টি,
একই রাস্তায় হাঁটা—
কত সহজ ছিল আমাদের দিনগুলি।

শুধু হৃদয়টা
ছিল ভীষণ অসহায়।

তুমি যখন হাসতে,
আমি অন্যদিকে তাকাতাম।
তুমি যখন চুপ করতে,
আমি আরও চুপ হয়ে যেতাম।

আমাদের মধ্যে
কোনো অভিমান ছিল না—
ছিল একটি অদ্ভুত সংকোচ,
যেন ভালোবাসার নাম নিলে
ভালোবাসাটাই ভেঙে যাবে।

একদিন তুমি বলেছিলে,
“আমাকে কিছু বলবে?”
জানালার বাইরে তখন
বিকেল ধীরে ধীরে
পুরোনো বাড়িগুলোর গায়ে
তার শেষ রং মাখাচ্ছিল।
আমি বলেছিলাম,
“না, কিছু না।”

তুমি আর জিজ্ঞেস করোনি।

সেদিন বুঝিনি—
একটি মানুষ
কখনো কখনো
দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করে না।

তারপর তুমি চলে গেলে।
তোমার যাওয়ার পর
ঘরটা আগের মতোই ছিল—
চেয়ার, টেবিল, বই,
জানালার ধারে রাখা ফুলদানিটিও।
শুধু একটি জিনিস ছিল না—
তোমার অন্যমনস্ক হয়ে
আমার দিকে তাকিয়ে থাকা।

বছর পেরিয়ে গেল।

আমি অন্য জীবন পেলাম,
অন্য মানুষের সঙ্গে কথা বললাম,
অন্য শহরে ঘুমালাম।
কিন্তু কোনো কোনো দুপুরে
হঠাৎ থেমে যাই।
কারণ কোনো অচেনা মেয়ের হাসিতে
তোমার হাসির একটি অক্ষর
ফিরে আসে।
তখন মনে হয়—
ভালোবাসা কি সত্যিই শেষ হয়?
নাকি
যে কথাটি বলা হয়নি,
সে মানুষের ভিতর
আরও দীর্ঘ জীবন পায়?

আজ তোমার কাছে
আমার কোনো দাবি নেই।
তুমি কোথায় আছ,
কাকে ভালোবাসো,
আমাকে মনে রেখেছ কি না—
কিছুই জানতে চাই না।

শুধু মাঝে মাঝে
পুরোনো সেই বিকেলটি
মনে পড়ে।
তুমি সামনে ছিলে।
আমি বলতে পারতাম।
বলিনি।

জীবন কত অদ্ভুত—
একটি শব্দের জন্য
কখনো কখনো
একটি সম্পূর্ণ জীবন
অপেক্ষা করে থাকে।
আর সেই শব্দটি
যেদিন আর বলা সম্ভব নয়,
সেদিন তার অর্থ
আরও গভীর হয়ে যায়।

তাই আজও
রাতের শেষে
যখন পৃথিবী খুব নিঃশব্দ,
আমি নিজের ভিতর
সেই কথাটি শুনতে পাই—
তোমাকে ভালোবাসি।
কেউ শোনে না,
তুমিও না।

তবু
এত বছর পরেও
কথাটি মিথ্যে হয়নি।

যে প্রেম কথা বলেনি

(ভালবাসা)

রাতটা খুব সাধারণ ছিল—
বিদ্যুৎ ছিল না,
বারান্দায় মাটির প্রদীপ,
দূরের রাস্তায়
শেষ বাসটির শব্দ।

তুমি খাটের এক পাশে,
আমি অন্য পাশে।
মাঝখানে
এক হাতের বেশি দূরত্ব নয়—
তবু মনে হচ্ছিল,
দুই তীরের মাঝখানে
বর্ষার নদী।

তুমি বলেছিলে,
“ঘুম আসছে?”
আমি বলেছিলাম,
“না।”

তারপর আর কিছু নয়।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল
টিনের চালে।
মাঝে মাঝে
কোনো অচেনা কুকুর ডাকছিল,
তারপর চারপাশ
নিজের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল।

তোমার চুলের কাছে
একটু বৃষ্টির গন্ধ ছিল।
আমি হাত বাড়াতে চেয়েছিলাম,
বাড়াইনি।
কেন মানুষ
যে হাতের কাছে থাকে,
তার হাত ধরতে এত ভয় পায়?

সেদিন যদি বলতাম—
“থাকো,”
তুমি কি থাকতে?

আজও জানি না।

তুমি হয়তো
আমার দিকে তাকিয়েছিলে।
অন্ধকারে চোখ দেখা যায় না,
শুধু বোঝা যায়—
কেউ জেগে আছে।

আমরা দুজনেই জেগে ছিলাম।

কেউ কাউকে
হারাতে চাইনি।
কেউ কাউকে
রাখতেও পারিনি।

ভোরের দিকে
বৃষ্টি থেমে গেল।
জানালার ফাঁক দিয়ে
ফ্যাকাসে আলো ঢুকল।
তুমি উঠে
চুল বাঁধলে।

আমি দেখলাম—
তোমার আঙুলে
আমার দেওয়া সেই ছোট্ট আংটিটি নেই।
জিজ্ঞেস করিনি।
তুমিও কিছু বলোনি।
দরজার কাছে গিয়ে
তুমি একবার পেছনে তাকালে।
সেই দৃষ্টিটুকু
আজও আমার কাছে আছে।

কোনো ছবি নয়—
বরং এমন একটি ক্ষত,
যাকে ছুঁলে
রক্ত বেরোয় না বটে,
শুধু পুরোনো একটি সকাল
জেগে ওঠে।

তারপর তুমি চলে যাবার পর,
অনেক বছর কেটে গেছে।
এখন আমার ঘরে
বিদ্যুৎ থাকে,
ঘড়ি চলে,
জানালায় পর্দা আছে,
রাতে শহরও আগের চেয়ে
অনেক বেশি আলোয় ভরা।

তবু কোনো কোনো রাতে
সব আলো নিভিয়ে দিলে
সেই পুরোনো রাতটি
আবার ফিরে আসে।
খাটের এক পাশে
তুমি,
অন্য পাশে
আমি।
মাঝখানে
এক হাতের দূরত্ব।
শুধু এবারের একহাত
সমান
পুরো একটি জীবন।

আমি এখন বুঝি—
কিছু বিচ্ছেদ
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে হয় না,
কখনো
দুজন মানুষ পাশাপাশি শুয়ে থাকে,
একজন আরেকজনকে
ভালোবাসে,
তবু
কথা না বলা একটি রাত
সারাজীবনের সমান
দূরত্ব হয়।

আমাদের মাঝখানে রাত

(ভালবাসা)

বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে বহুদিন।
নতুন মালিক দেয়ালে সাদা রং করেছে,
পুরোনো ক্যালেন্ডার নামিয়ে
তার জায়গায় টাঙিয়েছে অন্য একটি বছর।

শুধু রান্নাঘরের তাকের কোণে
একটি নীল কাপ পড়ে আছে—
কেউ জানে না,
কার জন্য।

আমি জানি...

এক দুপুরে
তুমি সেই কাপে চা খেতে খেতে বলেছিলে,
“চিনি একটু কম হয়েছে।”
আমি হেসে বলেছিলাম,
“তবু তো খাচ্ছ।”

তুমি বলেছিলে,
“তোমার বানানো বলে।”

কথাটা এত সাধারণ ছিল
যে সেদিন
তার ভেতরে কোনো ভবিষ্যৎ খুজিনি।

এখন বুঝি,
জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বাক্যগুলো
সাধারণ কথার পোশাক পরেই আসে।

সেই বাড়িতে
একটি ঘড়ি ছিল।
ঘড়িটি এখনো চলছে কি না জানি না।
কিন্তু মাঝরাতে কখনো কখনো
আমার মনে হয়,
তার কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে
সেই একই দেয়ালের ওপর দিয়ে
যেখানে তুমি শেষবার
তোমার ওড়না শুকোতে দিয়েছিলে।

কত অদ্ভুত—
মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তার ব্যবহার করা জিনিসগুলো
কিছুদিন পৃথিবীর কাছে
তার হয়ে বেঁচে থাকে।

একটি কাপ,
একটি চিরুনি,
বালিশের নিচে ভুলে যাওয়া চুলের ক্লিপ,
বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে যাওয়া একটি পাতা।

তারপর একদিন
এসবও অচেনা হয়ে যায়,
শুধু অপেক্ষা ছাড়া!

আজও কোনো দরজায়
দুবার কড়া নাড়ার শব্দ শুনলে
আমার বুকের ভেতর
একটি পুরোনো ঘর জেগে ওঠে,
আমি দরজা খুলি না।
কারণ জানি,
যে মানুষটির জন্য
দরজা একদিন খুলতে চেয়েছিলাম,
সে এখন আর আমার দরজার
ঠিকানা জানে না।
তবু আশ্চর্য—
কোনো কোনো বিকেলে
সূর্যের আলো যখন
মেঝের ওপর এসে পড়ে,
আমি সেই আলোর মধ্যে
একটি চেয়ার দেখি।

চেয়ারটি খালি।
তবু মনে হয়
কেউ বসে আছে।
হয়তো স্মৃতি এমনই—
যাকে আমরা হারিয়েছি
তার শরীর নয়,
তার বসে থাকার ভঙ্গিটুকু
আমাদের মধ্যে রেখে যায়।

সন্ধ্যা নামে।
দোকানগুলো
এক এক করে বন্ধ হয়।
কেউ বাড়ি ফেরে
সবজি হাতে,
কেউ শিশুর হাত ধরে,
কেউ দিনের ক্লান্তি
কাঁধে নিয়ে।

আর আমি ভাবি—
একটি মানুষকে হারানোর পর
তার জন্য অপেক্ষা করা
আসলে কি তার ফিরে আসার আশা?
নাকি
নিজের জীবনের সেই ঘরটিতে
শেষবারের মতো ফিরে যাওয়া,
যেখানে একদিন
আমরা দুজনেই ছিলাম?

আজ দরজায় তালা।
চাবিটা আমার কাছে নেই।
তবু মাঝে মাঝে
স্বপ্নের মধ্যে
আমি সেই বাড়িতে ঢুকে পড়ি।

নীল কাপটি টেবিলে।
জানালা খোলা।
চুলোর ওপর
চা ফুটছে।
তুমি অন্য ঘর থেকে বলছ—
“এত দেরি করলে কেন?”

আমি কোনো উত্তর দিই না,
শুধু দাঁড়িয়ে থাকি।
কারণ ঘুম ভাঙার আগে
আমি জানি—
এইবারও
আমার যাবার সময় হয়ে গেছে।

অপেক্ষার ঘর

বাছাইকৃত কবিতা

ভালোবাসার শেষ দরজা

- মোঃ আবু তালেব

(ভালবাসা)

শেষবার যখন তুমি এলে,
বিকেল তখন প্রায় ফুরিয়ে গেছে।
জানালার কাঁচে
শীতের ম্লান রোদ—
ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল
একটি শুকনো পাতা।

তুমি পাতা তুলে
টেবিলের ওপর রাখলে।
বললে,
“এটা এখানে ছিল?”
আমি বললাম,
“হয়তো বাতাসে এসেছে।”
তুমি হেসে বললে,
“সবকিছুই কি বাতাসে আসে?”

আমি উত্তর দিইনি।

কারণ কিছু জিনিস
বাতাসে আসে না—
ধীরে ধীরে
মানুষের ভিতরে জন্মায়।
আমরা সেদিন
অনেক সাধারণ কথা বলেছিলাম।

চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
ঘড়িতে পাঁচটা বেজে গিয়েছিল।
বাইরে একজন ফেরিওয়ালা
শেষবারের মতো ডাকছিল।
তুমি বারবার
জানালার দিকে তাকাচ্ছিলে।
আমি বুঝেছিলাম।
তবু জিজ্ঞেস করিনি—

তুমি কি সত্যিই চলে যাবে?
তুমি যাওয়ার আগে
ঘরের দিকে একবার তাকালে।

যেন কোনো মানুষ নয়,
একটি পুরোনো জীবন
শেষবার দেখে নিচ্ছিলে।
দরজার কাছে এসে
তুমি বললে,
“ভালো থেকো।”
এই দুটি শব্দ
কত ছোট!

অথচ তাদের ভিতরে
আমাদের সমস্ত দিন
ধীরে ধীরে ডুবে গেল।
তুমি বেরিয়ে গেলে।
দরজা বন্ধ হলো।

আমি টেবিলের কাছে ফিরে এসে
দেখলাম—
শুকনো পাতাটি
এখনও সেখানে।
সেদিন রাতে
আমি পাতাটি ফেলে দিইনি।
পরদিনও না।
তারপর বহুদিন।

অবশেষে এক সকালে
জানালা খুলতেই
হাওয়া এসে
পাতাটিকে মেঝেতে ফেলে দিল।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

তারপর বুঝলাম—
কিছু স্মৃতি
আমরা যত্ন করে রাখি না;
তারা নিজেরাই
আমাদের কাছে থেকে যায়।
আর একদিন
নিজেরাই চলে যায়।

তোমার চলে যাওয়ার পর
আমি ভাবতাম,
ভালোবাসার শেষ কোথায়?
যে দিন মানুষ চলে যায়?
যে দিন তার নাম আর ডাকা হয় না?

নাকি যে দিন
তার কথা মনে পড়লেও
বুকের ভিতর আর ব্যথা করে না?
আজ জানি—
ভালোবাসার শেষ বলে
আসলে কিছু নেই।
শুধু একদিন
তার দরজাটি
অন্যদিকে খুলে যায়।

তার ওপারে থাকে
অভিমানহীন একটি সকাল,
একটি পুরোনো মুখ,
একটি শুকনো পাতা,
আর একজন মানুষ
যে ফিরে তাকিয়ে দেখে—
সে যাকে হারিয়েছিল,
তার চেয়ে বড় কিছু
সে হারায়নি;
সে হারিয়েছিল
নিজের সেই মানুষটিকে,
যে ভালোবাসতে জানত
কোনো শর্ত ছাড়াই।

সেদিন
আমি দরজাটি বন্ধ করিনি।
খোলা রেখেছিলাম।
তোমার জন্য নয়।
যদি কোনোদিন
আমার হারিয়ে যাওয়া মানুষটি
নিজের কাছে ফিরে আসে—
যেন তার ঢোকার পথ থাকে।
বিস্তারিত...

তোমাকে ছাড়া তোমার কাছে

- মোঃ আবু তালেব

(ভালবাসা)

তোমার শহরে আর যাই না।

তবু কখনো কখনো
অকারণে বাসের জানালায়
সেই পুরোনো রাস্তা উঠে আসে—
একটি ওষুধের দোকান,
মোড়ের চায়ের স্টল,
বিকেলের ধুলোয়
একটি শিশুর লাল বল।

স্মৃতি বড় অদ্ভুত;
সে কখনো পুরো বাড়িটা ফিরিয়ে আনে না,
শুধু একটি জানালা খুলে দেয়।

সেই জানালায়
তুমি দাঁড়িয়ে থাকো।

আমি তোমাকে ডাকতে যাই,
কিন্তু কণ্ঠস্বরের আগেই
বাসটি মোড় ঘুরে যায়।

বহু বছর হলো
তোমার সঙ্গে কথা হয় না।
তবু
কিছু কথা প্রতিদিনই হয়।

সকালে চা বানাতে গিয়ে
চিনি কম হলে মনে পড়ে—
তুমি কম চিনি খেতে।
বৃষ্টির দিনে
জানালা বন্ধ করতে গিয়ে
মনে পড়ে—
তুমি বৃষ্টির শব্দ শুনতে
জানালা খোলা রাখতে।
শীতের রাতে
কম্বলটা টেনে নিই—
মনে পড়ে,
তুমি পা ঢাকতে ভুলে যেতে।

দেখো,
মানুষ চলে যায় কত সহজে;
তার অভ্যাসগুলো যায় না।
তারা ঘরের জিনিসের মতো
আমাদের জীবনে পড়ে থাকে।

একদিন পুরোনো আলমারি খুলে
তোমার একটি চিঠি পেলাম।
খামটি খালি।
চিঠিটা নেই।
কী লেখা ছিল
মনে নেই।

শুধু তোমার হাতের লেখা
মনে আছে।
আমি অনেকক্ষণ
সেই অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তারপর বুঝলাম—
কখনো কখনো
মানুষের কথা নয়,
তার লেখা থেকে যাওয়ার ভঙ্গিটুকুই
আমাদের কাছে বেঁচে থাকে।

তুমি নেই।

তবু তোমার জন্য
আমার ভিতরে যে জায়গাটি ছিল
সেটি আমি অন্য কাউকে দিইনি।

এটি কোনো প্রতিজ্ঞা নয়।
কোনো অপেক্ষাও নয়।
শুধু একটি খালি ঘর।
যেখানে মাঝে মাঝে
বিকেলের আলো এসে বসে।

আজ যদি তুমি হঠাৎ ফিরে আসো,
আমি হয়তো চিনতে পারব না।
তোমার মুখ বদলে যাবে,
আমার মুখও।
আমরা দুজনেই
অন্য জীবনের মানুষ হয়ে যাব।
তবু
হয়তো এক মুহূর্তের জন্য
দুজনেই বুঝব—
এই চোখদুটি
কোনো এক সময়
একে অন্যের দিকে
খুব গভীরভাবে তাকিয়েছিল।

তারপর তুমি আবার চলে যাবে।
আমি তোমাকে আটকাব না।
শুধু সেই রাতে
নিজের ঘরে ফিরে
জানালাটা খুলে রাখব।
বাইরে যদি বৃষ্টি নামে,
বৃষ্টি আসুক।

যদি বাতাস আসে,
বাতাস আসুক।
যদি কিছুই না আসে—
তবুও থাক।
কারণ এত বছর পরে
আমি শিখেছি,
কাউকে কাছে পাওয়া আর
কারও কাছে থাকা
এক কথা নয়।

তুমি আমার কাছে নেই।
তবু
তোমার চলে যাওয়ার পর
আমার যে মানুষটি বেঁচে আছে—
সে আজও তোমার কাছেই থাকে।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4625
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1701
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1658
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1586
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1579
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1512
কর্মফল মোঃ আবু তালেব 1497
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1466
রমণী মোঃ আবু তালেব 1437
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1410
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1407
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1402
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1367
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1365
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1362
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1358
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1358
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1339
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1337
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1327
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
ভালোবাসার শেষ দরজা মোঃ আবু তালেব 8
তোমাকে ছাড়া তোমার কাছে মোঃ আবু তালেব 19
যে প্রেম কথা বলেনি মোঃ আবু তালেব 17
আমাদের মাঝখানে রাত মোঃ আবু তালেব 21
অপেক্ষার ঘর মোঃ আবু তালেব 22
তুমি যে ছিলে মোঃ আবু তালেব 30
একটি মানুষকে হারানোর আগে মোঃ আবু তালেব 37
ভালোবাসার পরে মো: আবু তালেব 52
তোমার অনুপস্থিতি মোঃ আবু তালেব 48
যে হাতটি ধরিনি মোঃ আবু তালেব 46
অলৌকিক দুপুর মো: আবু তালেব 37
অস্থায়ী অনন্ত মোঃ আবু তালেব 52
প্রথম নীরবতায় ফেরা মোঃ আবু তালেব 53
শেষ প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 59
অন্য আমি মোঃ আবু তালেব 56
মায়ের নিঃশ্বাস মোঃ আবু তালেব 54
শেষ চুম্বন মোঃ আবু তালেব 69
বৃদ্ধের বিকেল মোঃ আবু তালেব 68
ভিখারির রাজ্য মোঃ আবু তালেব 116
সকল মানুষের মুখ মোঃ আবু তালেব 55
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
প্রত্যাবর্তন রাফাত আহমেদ 40
মৃত্যুদিন শ্রীমল্লার 59
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 79
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 66
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 80
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 79
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 84
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 127
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 145
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 143
ভালো মানুষ ইবনে আলী 252
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 146
শিকল ইবনে আলী 233
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 277
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 233
বসন্ত জয়দীপ রায় 252
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 167
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 320
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 287
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 306
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে