কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

দিনের বেলা মানুষ যা পাহারা দেয়,
রাত বারোটার পর তার সব দরজা খুলে যায়।
অফিসের মেকি হাসি, সামাজিক ভদ্রতা, সফলতার মুখোশ—
সব খুলে পড়ে থাকে খাটের নিচে, জুতোজোড়ার পাশে।
ঘরজুড়ে তখন শুধু একজন খাঁটি, পরাজিত মানুষ একা দাঁড়িয়ে থাকে।

চারিপাশে কোনো শব্দ নেই।
কেবল ফ্রিজের একটা দীর্ঘ একটানা গুঞ্জন
আর দূর রাজপথ দিয়ে হঠাৎ ছুটে যাওয়া কোনো একলা ট্রাকের চাকার ঘর্ষণ।
অন্ধকার কোনো কালো পর্দা নয়;
সে যেন এক বিশাল স্বচ্ছ কাচ—
যার সামনে দাঁড়ালে নিজের ফেলে আসা দিনগুলো
খুব নির্দয়ভাবে স্পষ্ট দেখা যায়।

ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিন অন করা হয়, আবার নিভিয়ে রাখা হয়।
নোটিফিকেশন প্যানেল সম্পূর্ণ ফাঁকা।
হাজারো মানুষের কনট্যাক্ট লিস্টে নাম আছে,
অথচ এই নিঃশব্দ প্রহরে
‘আমি ভালো নেই’—
এটুকু লিখে পাঠানোর মতো কোনো গন্তব্য পাওয়া যায় না।

স্মৃতিগুলো তখন চামড়ার নিচে পোকার মতো নড়াচড়া করে।
যে ভুলগুলোর কথা মানুষ ভুলে গেছে বলে দাবি করে দিনে,
তারা এসে বিছানার চারপাশে নিঃশব্দে বসে।
কাউকে একটু বেশি বিশ্বাস করার আক্ষেপ,
কাউকে ক্ষমা না করতে পারার অপরাধবোধ—
বাতাসটাকে এক নিমেষে বিষাক্ত করে তোলে।

মানুষ ঘুমোতে চায় ক্লান্তি মেটানোর জন্য নয়;
সে ঘুমোতে চায় নিজের উপস্থিতি থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে।
কারণ সে জানে—
পৃথিবীর যে-কোনো কারাগার থেকে পালানো সহজ,
কিন্তু মধ্যরাতে নিজের একলা মনের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে
ভয়ংকর শাস্তি মানুষের জন্য আর কিছুই হতে পারে না।

মধ্যরাতের একাকীত্ব

কাচের টেবিলের ওপর
ধোঁয়া ওঠা একটা সাদা সিরামিকের কাপ।
ক্যাফের আবছা আলো আর মৃদু সুরের ভেতর
তার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে আড়াইশো টাকা।
অথচ এই তেতো তরলটুকুর জন্ম হয়েছিল
কোনো এক দূর পাহাড়ি ঢালে—
রোদে পোড়া যে শ্রমিকের হাতে কফির লাল ফলগুলো জমা হয়েছিল,
তার দিনের মজুরি হয়তো এর অর্ধেকও নয়।

কাপের ভেতর ছোট একটা ঘূর্ণি।
চিনি আর দুধের অনুপাতে মানুষ মেপে নেয় নিজের রুচি।
ঠিক সামনের মানুষটির চোখের দিকে না তাকিয়ে
আমরা কাপের কিনারে চোখ রাখি,
চামচ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় নাড়াচাড়া করি—
কেবল নীরবতার অস্বস্তিটুকু কাটানোর জন্য।

ধোঁয়া ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যায়।
গরমের তেজ কমে আসে,
যেমন কমে আসে প্রথম আলাপের উত্তেজনা।
যে কাপটা একটু আগেও হাতে উষ্ণতা দিচ্ছিল,
কথার শেষে সে পড়ে থাকে একেবারে ঠান্ডা, বিবর্ণ—
তলানিতে এক ফোঁটা কালচে দাগ নিয়ে।

ওয়েটার এসে নিপুণ হাতে কাপটা তুলে নেয় ট্রেতে।
সেখানে জমা হয় আরও অনেকগুলো খালি কাপ—
প্রতিটিতে অন্য কারও আঙুলের ছাপ,
অন্য কারও না-বলা কথার অবশেষ।

আমরা কত সম্পর্ক শেষ করে উঠে দাঁড়াই,
বিল মিটিয়ে বেরিয়ে যাই রাজপথের ভিড়ে।
আর টেবিলের ওপর পড়ে থাকে সেই উচ্ছিষ্ট চিনামাটি—
যেন দুটি মানুষের দূরত্বের
এক নীরব, চাক্ষুষ দলিল।

কফি কাপ

লোহার চাকা ঘোরে,
সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতি নিয়ম করে জ্বলে আর নেভে।
এই শহরে কোনো কিছু থামে না—
না অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন,
না মেট্রোর গতি,
না ফুটপাতে শুয়ে থাকা একলা কুকুরটার শীতের কাঁপুনি।

সবাই ছুটছে।
কারও হাতে ফাইল, কারও কাঁধে ভারী ব্যাকপ্যাক,
কারও মুঠোয় চেপে ধরা বাসের হ্যান্ডেল।
মানুষের চোখগুলোর দিকে তাকালে ভয় হয়—
সেখানে কোনো রাগ নেই, কোনো কান্না নেই, কোনো বিস্ময় নেই;
আছে কেবল পরবর্তী স্টপেজে নেমে পড়ার এক অন্ধ তাড়া।

এখানে মাটির কোনো ঘ্রাণ নেই।
গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে ফুটপাতের কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি হয়ে,
প্রতিটি পাতায় ধুলোর পুরু আস্তরণ—
ঠিক যেমন মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকে
বহুদিনের অপূর্ণ ক্লান্তির ছাই।

কাচের বহুতল ভবনে আলো জ্বলে মধ্যরাতেও।
ভেতরে বসে থাকা টাই-পরা যুবকটি
কিবোর্ডে আঙুল চালায় একটানা।
তার স্ক্রিনে হাজার কোটি টাকার লেনদেন ভেসে ওঠে,
অথচ ড্রয়ারে পড়ে থাকা প্রেসক্রিপশনের ওষুধ কেনার টাকা
তার পকেটে থাকে না।

এই শহর কাউকে ভালোবাসে না,
আবার কাউকে তাড়িয়েও দেয় না।
সে কেবল মানুষের সমস্ত রক্ত আর ঘাম শুষে নেয়,
তারপর দিনশেষে তাকে উগরে দেয় একটা ছোট্ট অন্ধকার কামরায়—
যেখানে মানুষ বালিশে মাথা রেখে বুঝতে পারে:
সে আসলে বেঁচে নেই,
সে কেবল এই বিশাল কারখানার একটি সচল নাটবল্টু মাত্র।

যান্ত্রিক শহর

যা বলা হয়ে যায়, তা ফুরিয়ে যায়।
বাতাসে ধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে যায় শব্দগুলো,
কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে, কিছুটা সান্ত্বনা দেয়,
তারপর একদিন পুরোনো কাগজের মতো পচে যায় স্মৃতিতে।

কিন্তু যা বলা হয়নি—
সে কোনোদিন মরে না।
সে মানুষের বুকের একপাশে নিঃশব্দে বাসা বাঁধে।
রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের বাঁশি বাজার ঠিক আগের মুহূর্তে,
কিংবা দরজার হাতল ধরে বিদায় নেওয়ার শেষ সেকেন্ডে
গলার কাছে যে কথাটি এসে থমকে দাঁড়িয়েছিল,
তার ওজন হিমালয়ের চেয়েও বেশি।

আমরা কত কিছু গোপন রাখি ভদ্রতার নামে।
কখনো অপমানের জবাবে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলি—‘ঠিক আছে,’
কখনো চরম ভালোবাসার মুহূর্তে হাত শক্ত করে ধরেও
শুধু বলি—‘পৌঁছে একটা মেসেজ দিও।’
অথচ সেই সামান্য বাক্যের পেছনে
একটি আস্ত সমুদ্র আছড়ে পড়ে বুকভাঙা গর্জনে।

না-বলা কথাগুলো জমা হতে হতে
মানুষের হাঁটার ভঙ্গি বদলে যায়,
তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের কুয়াশা নামে।
বাইরে থেকে মনে হয় মানুষটি নির্বিকার, গম্ভীর, পাথরের মতো শান্ত।
কেউ টের পায় না—
ভেতরে সে প্রতিনিয়ত একটা অসমাপ্ত সংলাপে
নিজের সাথেই কথা বলে চলেছে আজীবন।

পৃথিবীর সমস্ত চিঠি যদি বিলি হয়ে যেত,
সব না-বলা কথা যদি ঠোঁটের ডগায় মুক্তি পেত,
তবে হয়তো অনেক ঘর ভাঙত,
অনেক সাজানো সংসার ভেঙে গুঁড়িয়ে যেত এক নিমেষে।

মানুষ তাই চুপ করে থাকে।
পৃথিবীকে শান্ত রাখার জন্য
প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ
নিজের ভেতরে এক-একটি নীরব কঙ্কাল পুঁতে রেখে বাড়ি ফেরে।

না বলা কথা

১.
জীবন কোনো সম্পূর্ণ উত্তর নয়—
সে কেবল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রেখে যাওয়া একটি অসমাপ্ত প্রশ্ন।

২.
আমরা যে পথে প্রতিদিন হেঁটে বাড়ি ফিরি,
সে পথ চেনে আমাদের পায়ের শব্দ, কিন্তু চেনে না ক্লান্তির গভীরতা।

৩.
মানুষ বদলায় না;
মানুষ কেবল সময়ের চাপে নিজের আসল মুখটা প্রকাশ করে ফেলে।

৪.
কিছু ভুল মানুষকে ধ্বংস করে দেয়,
আর কিছু ভুল না করলে মানুষ কোনোদিনই মানুষ হতে পারত না।

৫.
অভাব কেবল ভাতের থালায় থাকে না;
সবচেয়ে বড় অভাব হলো—এমন একজন থাকা, যাকে কোনো শর্ত ছাড়াই বিশ্বাস করা যায়।

৬.
আমরা ঘড়ি দেখে সময় মাপি,
অথচ জীবন ফুরিয়ে যায় অন্য কারো অপেক্ষায় বসে থেকে।

৭.
সব পাওয়ার পর মানুষ যে শূন্যতা অনুভব করে,
জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা ঠিক সেখানেই লুকিয়ে থাকে।

জীবনের ছোট পঙক্তি

বাছাইকৃত কবিতা

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কাব্যগ্রন্থ কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ কীর্তনাঙ্গ মোঃ আবু তালেব 4756
চোখের নেশার ভালবাসা অবিনব মোঃ আবু তালেব 1778
পল্লী স্মৃতি পল্লী সুফিয়া কামাল 1718
চোখের কাজল কীর্তনাঙ্গ মোঃ আবু তালেব 1641
তবে কেন আমি অপরাধী অবিনব মোঃ আবু তালেব 1630
তোকে নিয়ে… এলোমেলো তোকে নিয়ে হাবীব কাশফি 1579
কর্মফল চতুষ্পদী কাব্য মোঃ আবু তালেব 1572
নবী দ্বীনের রাসুল অন্তরে ইসলাম মোঃ আবু তালেব 1527
রমণী চতুষ্পদী কাব্য মোঃ আবু তালেব 1494
চাঁদবদনী অবিনব মোঃ আবু তালেব 1478
জন্মান্তর অবিনব মোঃ আবু তালেব 1468
পার্থক্য চতুষ্পদী কাব্য মোঃ আবু তালেব 1462
তোমাকে ভালোবেসে তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1437
জরুরী বিষয় অন্তরে ইসলাম মোঃ আবু তালেব 1425
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে অবিনব মোঃ আবু তালেব 1424
করিব আজ রঙ্গ লীলা কীর্তনাঙ্গ মোঃ আবু তালেব 1415
অবিলাষ চতুষ্পদী কাব্য মোঃ আবু তালেব 1414
রাধা প্রেমের প্রেমিক কীর্তনাঙ্গ মোঃ আবু তালেব 1399
শ্যাম তোমারে ভালবেসে কীর্তনাঙ্গ মোঃ আবু তালেব 1390
 সুপ্ত-প্রিয়া অবিনব মোঃ আবু তালেব 1386
শিরোনাম কাব্যগ্রন্থ কবি পঠিত হয়েছে
মধ্যরাতের একাকীত্ব শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 12
কফি কাপ শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 10
যান্ত্রিক শহর শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 15
না বলা কথা শহর সমাচার মো: আবু তালেব 15
জীবনের ছোট পঙক্তি প্রেমের শায়েরী কবি ও কাব্য 15
দুই লাইনের কবিতা প্রেমের শায়েরী কবি ও কাব্য 12
ক্যাপশন শায়েরী প্রেমের শায়েরী কবি ও কাব্য 12
প্রেমের শায়েরী ২০২৬ প্রেমের শায়েরী কবি ও কাব্য 14
অচেনা দূরত্ব শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 16
নীরবতা শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 17
স্মৃতির খাতা শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 22
একাকী দুপুর শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 22
অশ্রুর জল শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 23
না-বলা ব্যথা শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 21
চোখের ভাষা শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 21
মায়াবী হাসি শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 23
প্রথম প্রেম শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 23
নীল আকাশ শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 27
মনের আঙিনা শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 22
আলতো ছোঁয়া শহর সমাচার মোঃ আবু তালেব 28
শিরোনাম কাব্যগ্রন্থ কবি পঠিত হয়েছে
নাফা নাফা মেহেদী হাসান আইয়ুশ 43
শালা শালা মেহেদী হাসান আইয়ুশ 45
অথচঃ কেউ জানেনা। অথচঃ কেউ জানেনা। মেহেদী হাসান আইয়ুশ 31
দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘশ্বাস মেহেদী হাসান আইয়ুশ 39
তোমার নেশা তোমার নেশা মেহেদী হাসান আইয়ুশ 40
ভালোবাসার বিদ্যে.. ভালোবাসার বিদ্যে.. মেহেদী হাসান আইয়ুশ 38
একটা তুমি হোক তুমি মেহেদী হাসান আইয়ুশ 28
মেয়ে, আমার সাথে সমুদ্রে যাবে? সমুদ্র মেহেদী হাসান আইয়ুশ 31
অর্জন অর্জন মেহেদী হাসান আইয়ুশ 38
অভিমান অভিমান মেহেদী হাসান আইয়ুশ 39
ঋণ ঋণ মেহেদী হাসান আইয়ুশ 51
মৃত্যুর পরও তুমি মৃত্যুর পরও তুমি মেহেদী হাসান আইয়ুশ 35
অনুভূতির স্পর্শ স্পর্শ মেহেদী হাসান আইয়ুশ 37
লিখিত, অলিখিত ঋণ লিখিত, অলিখিত ঋণ মেহেদী হাসান আইয়ুশ 33
অশ্রু অশ্রু মেহেদী হাসান আইয়ুশ 47
কাটাবিহীন ঘড়ি কাটাবিহীন ঘড়ি মেহেদী হাসান আইয়ুশ 40
স্টেজ ফোর স্টেজ ফোর মেহেদী হাসান আইয়ুশ 41
তবুও তুমি আছো তবুও তুমি আছো মেহেদী হাসান আইয়ুশ 30
মুগ্ধ বিষন্নতা মুগ্ধ বিষন্নতা মেহেদী হাসান আইয়ুশ 39
ভুলে যাবো ভুলে যাবো মেহেদী হাসান আইয়ুশ 49
শিরোনাম কাব্যগ্রন্থ< কবি পঠিত হয়েছে
No poem found