কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(মানুষ)

শেষ চুম্বনের কথা
কেউ মনে রাখতে পারে না।

মানুষ মনে রাখে
প্রথম স্পর্শ।
প্রথম কাঁপুনি।
প্রথমবার
অন্য একজনের চোখে
নিজের নাম শুনে ফেলা।

শেষ চুম্বন
কোনোদিন
শেষ হওয়ার সময়
নিজেকে শেষ বলে
পরিচয় দেয় না।

সে আসে
অন্য দিনের মতোই।
একটা বিকেল।
একটু বাতাস।
একটু আলো।
একটু নীরবতা।

দুই মানুষ
পাশাপাশি বসে থাকে।
তারা ভবিষ্যতের কথা বলে।

শীত এলে কোথায় যাবে,
বৃষ্টির রাতে
কোন জানালার পাশে বসবে,
বার্ধক্যে
কে আগে চশমা খুঁজে পাবে —

এসব তুচ্ছ কথায়
জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাস
অদৃশ্য হয়ে ফুটে থাকে।

তারপর
বিদায়।

একটা ক্ষণস্থায়ী স্পর্শ।
ঠোঁটের চেয়ে
কপালে বেশি।
শব্দের চেয়ে
নিঃশ্বাসে বেশি।

কেউ জানে না,
এইটাই শেষ।

পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ঘটনাগুলো
সবসময়
অঘোষিত থাকে।

যেদিন বাবা
শেষবারের মতো
আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন,
আমি জানতাম না।

যেদিন মা
শেষবার বলেছিলেন,
"সাবধানে যাস" —
সেদিনও
আমি তাড়াহুড়োয় ছিলাম।

জীবন
শেষবারের মুহূর্তগুলোকে
ইচ্ছে করেই
সাধারণ দিনের পোশাক পরিয়ে রাখে।

হয়তো
মানুষ জানলে
সে আর বাঁচতে পারত না।

একটা পুরোনো স্কার্ফে
আজও
একটা সুগন্ধ লেগে আছে।

গন্ধেরও কি স্মৃতি থাকে?
নাকি
ভালোবাসা
কাপড়ের ভাঁজে
নিজেকে লুকিয়ে রাখতে শেখে?

অনেক বছর পরে
একটা বই খুলতে গিয়ে
একটা শুকনো শিউলি ফুল পেলাম।

হঠাৎ মনে হলো,
সময়
সবকিছু নিয়ে যায় না।

কিছু কিছু জিনিসকে
সে কাগজের ভেতর,
গন্ধের ভেতর,
আলোর ভেতর,
স্পর্শের ভেতর
অদৃশ্য করে রেখে দেয়।

আমরা তাকে
স্মৃতি বলি।
আমি তাকে বলি —
স্থির সময়।

আজ বুঝি,
চুম্বন
শুধু ঠোঁটের ঘটনা নয়।

একজন মানুষ
যখন অন্য একজনের
সব ভয়কে
এক মুহূর্তের জন্য
নিঃশব্দ করে দেয় —
সেখানেও
একটা চুম্বন ঘটে।

যখন
একজন মা
ঘুমিয়ে পড়া শিশুর কপালে
রাত রেখে যান —
সেখানেও
একটা চুম্বন জন্মায়।

যখন
একজন বৃদ্ধ
মৃত স্ত্রীর ছবিতে
প্রতিদিন ধুলো মুছে দেন —
সেখানেও
একটা চুম্বন
শেষ হতে পারে না।

হয়তো
শেষ চুম্বন বলে
কিছু নেই।

শুধু
একটা স্পর্শ থাকে,
যা শরীর ছেড়ে
সময়ের ভেতরে
বাস করতে শুরু করে।

একদিন
আমরা কেউই থাকব না।
আমাদের মুখ
ধীরে ধীরে
পৃথিবীর স্মৃতি থেকে
মুছে যাবে।

কিন্তু
যদি কোনো সন্ধ্যায়
হঠাৎ বাতাস
কোনো অকারণ কোমলতা নিয়ে
কারও কপাল ছুঁয়ে যায়,

যদি সে
এক মুহূর্তের জন্য
কারণ ছাড়াই
নিজেকে ভালোবাসা মানুষ বলে
মনে করে —

তবে বুঝবে,
পৃথিবীর কোথাও
একটা শেষ চুম্বন
এখনো শেষ হয়নি।

মানুষের ঠোঁটে নয়,
মানুষের অস্তিত্বে
নিঃশব্দে
বেঁচে আছে।

শেষ চুম্বন

(মানুষ)

বিকেলের রোদ
বৃদ্ধ মানুষের গায়ে
অন্যরকম পড়ে।

সকালের আলো
যেখানে চোখে ঝলক তোলে,
বিকেলের আলো
সেখানে স্মৃতি হয়ে
বসে থাকে।

আমি তাকে
প্রতিদিন একই বেঞ্চে দেখি।
পার্কের পুরোনো কৃষ্ণচূড়ার নিচে।

তিনি বসে থাকেন,
যেন কোনো ট্রেনের অপেক্ষায় নন,
কোনো মানুষেরও নয় —
শুধু একটা দীর্ঘ জীবনের
শেষ আলোর পাশে।
তার হাতে
একটা লাঠি।
কাঠের নয়।
সময়ের।
লাঠির মাথায়
যত আঁচড়,
তার চেয়েও বেশি পথ
হেঁটেছে তার নীরবতা।

তার চোখে
কোনো তাড়া নেই।
শুধু দূরে উড়ে যাওয়া পাখিদের দিকে
এক ধরনের কোমল দৃষ্টি।
মনে হয়,
তিনি আর পাখিদের দেখছেন না।
নিজের উড়ে যাওয়া দিনগুলোকে দেখছেন।

বাতাস এলে
কৃষ্ণচূড়ার শুকনো ফুল
তার কাঁধে পড়ে।
তিনি ঝেড়ে ফেলেন না।
হয়তো জানেন,
শেষ বয়সে
সব পতনকেই
সম্মান করতে হয়।

একটা ছোট ছেলে
দৌড়ে এসে
তার পাশে বসে।
কিছু জিজ্ঞেস করে।
বৃদ্ধ হাসেন।
কোনো উত্তর দেন না।
তবু ছেলেটা
হেসে চলে যায়।

আমি বুঝলাম,
কিছু মানুষের নীরবতা
বইয়ের চেয়েও বেশি
শিক্ষা দেয়।

তার মুখের ভাঁজগুলো
আমি একদিন গুনতে চেয়েছিলাম।
পারিনি।
কারণ
প্রতিটি রেখা
একটা নদী।
কোথাও প্রথম প্রেমের জল।
কোথাও যুদ্ধের ধুলো।
কোথাও সন্তানের জন্মের আলো।
কোথাও একটা নামহীন কবরের নীরবতা।

বিকেল আরও নেমে আসে।
সূর্য
গাছের ডালে
শেষ সোনালি চিঠিটা রেখে যায়।
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করেন।
মনে হয়, তিনি ঘুমোচ্ছেন।
হয়তো না।
হয়তো
নিজের ভেতরের উঠোনে
ফিরে গেছেন।
যেখানে
তার মা এখনো
ডেকে বলেন,
"খেতে আয়।"
তার বাবা
ক্ষেত থেকে ফিরছেন।
একটা কিশোর
প্রথমবার
স্বপ্ন দেখতে শিখছে।

সময়
অদ্ভুত এক বৃত্ত।
শেষ প্রান্তে এসে
সে আবার
শুরুর হাত ধরে।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে থাকি।
হঠাৎ মনে হয়,
বৃদ্ধ মানুষরা
আসলে ভবিষ্যৎ নন।
তারা
অতীতের শেষ প্রদীপ।

যতদিন তারা জ্বলে,
আমাদের শৈশবও
পুরোপুরি অন্ধকারে হারায় না।
সূর্য ডুবে যায়।
পার্ক ফাঁকা হয়।
তিনি ধীরে ধীরে ওঠেন।
লাঠি
মাটিতে একটা ক্ষুদ্র শব্দ তোলে।
মনে হয়,
পৃথিবী
আরেকটা দিনের ইতিহাসে
একটা পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিল।

আমি তাকে চলে যেতে দেখি।
না —
একজন বৃদ্ধকে নয়।
একটা দীর্ঘ ঋতুকে।
একটা জীবন্ত গ্রন্থাগারকে।
একটা সন্ধ্যাকে,
যে সারাদিন আলো বিলিয়ে
এখন
নিজের অন্ধকারের দিকে
নিঃশব্দে হাঁটছে।
আর তখন
আমার মনে হয় —
বৃদ্ধ হওয়া মানে
বয়স বাড়া নয়।
বৃদ্ধ হওয়া মানে,
এত জীবন বেঁচে ফেলা
যে শেষে
তোমার নীরবতার ভেতরেও
অনেক মানুষের কণ্ঠস্বর
ধীরে ধীরে
বাড়ি ফিরে আসে।

বৃদ্ধের বিকেল

(মানুষ)

শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত মোড়ে
একজন ভিখারি বসে ছিল।

তার সামনে
একটা টিনের বাটি।
আকাশের মতো ফাঁকা।

তবু
সেই ফাঁকা বাটির ভেতর
কত মানুষের মুখ
এসে পড়ছিল।

কেউ একটা মুদ্রা ফেলল।
কেউ চোখ ফিরিয়ে নিল।
কেউ পকেট হাতড়ে
নিজের অস্বস্তিকে খুঁজল।
কেউ আবার
এক মুহূর্তের জন্য
নিজের ভেতরের মানুষটাকে দেখল —
তারপর দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
ভিখারির দিকে নয় —
তার চারপাশে
যে অদৃশ্য রাজ্যটা তৈরি হয়েছে,
তার দিকে।

আমরা ভাবি,
সে ভিক্ষা চায়।
আমি দেখলাম,
সে মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে
তার ভেতরের শব্দ শুনছে।

একটা শিশুর হাত
তার দিকে বাড়ল।
মায়ের হাত
শিশুটাকে টেনে নিল।

মুদ্রাটা
বাটিতে পড়ল না।
কিন্তু শিশুটার চোখে
একটা প্রশ্ন
সারাজীবনের জন্য থেকে গেল।

সেদিন
দারিদ্র্য
ভিখারির পাশে বসেনি।
সে দাঁড়িয়েছিল
আমাদের ভেতরে।

ভিখারির গায়ে
ছেঁড়া কাপড়।
কিন্তু
তার আকাশটা
আমার চেয়ে ছোট ছিল না।

সে একই সূর্য পায়।
একই বৃষ্টি।
একই চাঁদ।
একই মৃত্যু।

শুধু
আমরা তাকে
একই সম্মান দিই না।

একটা কাক
উড়ে এসে
তার পাশে বসে
রুটির টুকরো কুড়োতে লাগল।

ভিখারি
হেসে
শেষ টুকরোটাও
কাকটার দিকে ছুড়ে দিল।

আমি হঠাৎ বুঝলাম —
যার কিছুই নেই,
তারও
দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে।

আর
যার সবকিছু আছে,
সে কখনো কখনো
একটা দৃষ্টিও দিতে পারে না।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব
রুটির নয়।
চোখের।

যে চোখ
আরেকজন মানুষকে
মানুষ বলে দেখতে
ভুলে গেছে।

সন্ধ্যা নামছিল।
রাস্তার বাতিগুলো
এক এক করে জ্বলে উঠল।

ভিখারির মুখে
একটা অদ্ভুত আলো পড়ল।
মনে হলো,
সে যেন
কোনো সিংহাসনে বসে আছে।

তার রাজ্য
মুদ্রার নয়।
মানুষের বিবেকের।

প্রতিদিন
হাজার মানুষ
সেই রাজ্যের ভেতর দিয়ে যায়।

কেউ কর দেয়।
কেউ ঋণ বাড়ায়।
কেউ
নিজের দারিদ্র্য
আরও গোপন করে চলে যায়।

আমি তখন বুঝলাম,
ভিখারি
রাস্তার ধারে বসে থাকে না।
সে বসে থাকে
মানুষের আত্মার দরজায়।

সে হাত বাড়ায়
টাকার জন্য নয়।
একটা প্রশ্নের জন্য।

**"তোমার ভেতরে
এখনো কতটা মানুষ
বেঁচে আছে?"**

যেদিন
এই প্রশ্নের উত্তর
আমরা সহজে দিতে পারব,
সেদিন
পৃথিবীতে
কোনো ভিখারির রাজ্য থাকবে না।

কারণ
সেদিন
কেউ কারও কাছে
রুটি চাইবে না।
আর কেউ
কারও কাছ থেকে
মানুষ হওয়ার অনুমতিও
চাইবে না।

ততদিন পর্যন্ত
শহরের ব্যস্ত মোড়ে
একটা টিনের বাটি
নিঃশব্দে পড়ে থাকবে।

মানুষ ভাববে,
ওখানে কয়েন জমছে।

আমি জানি —
ওখানে
জমে থাকে
সভ্যতার অসমাপ্ত বিবেক।

ভিখারির রাজ্য

(মানুষ)

আমি একদিন
একটা মুখ খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।

ভাবলাম,
হয়তো পৃথিবীতে
এমন একজন মানুষ আছে,
যার চোখে
আমার সব প্রশ্নের উত্তর লেখা।

অনেক পথ হাঁটলাম।

স্টেশনের বেঞ্চে
একজন ঘুমিয়ে থাকা শ্রমিককে দেখলাম।

তার কপালে
রোদের পুরোনো ফাটল।
হাতে লোহার গন্ধ।

ঘুমের ভেতরেও
তার আঙুলগুলো
মুঠো হয়ে আছে —
মনে হলো,
স্বপ্নেও সে
রুটির জন্য কাজ করছে।

আমি তার মুখে
আমার বাবাকে দেখলাম।

নদীর ঘাটে
একজন বৃদ্ধা
ভাঙা কলস ধুচ্ছিলেন।

জল
তার কুঁচকে যাওয়া হাতের ভেতর দিয়ে
ধীরে ধীরে
সময়ের মতো গড়িয়ে পড়ছিল।

তিনি বারবার
খালি কলসটা ধুয়ে নিচ্ছিলেন।
মনে হলো,
মানুষ কখনো কখনো
জল নয় —
অপেক্ষাকেই
ধুয়ে পরিষ্কার করতে চায়।

আমি তার মুখে
আমার মাকে দেখলাম।

একটা শিশুর হাসি
আকাশের মতো
হঠাৎ খুলে গেল।

সে একটা প্রজাপতির পেছনে ছুটছে।
প্রজাপতিটা ধরা পড়তে চায় না।
শিশুটাও হার মানতে জানে না।

সেদিন বুঝলাম,
আনন্দ
ধরে ফেলার নাম নয়।
পিছন পিছন
দৌড়ে যাওয়ার নাম।

আমি তার মুখে
আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে দেখলাম।

একজন ভিখারি
রাস্তার ধারে বসে
শুকনো রুটির টুকরো
আরও ক্ষুধার্ত একটা কুকুরের দিকে
ছুড়ে দিল।

সেই মুহূর্তে বুঝলাম,
অভাব
মানুষকে ছোট করে না।
ছোট করে
ভয়ের ভেতরে আটকে থাকা হৃদয়।

আমি তার মুখে
আমার অদেখা ভবিষ্যৎকে দেখলাম।

হাসপাতালের করিডোরে
একজন যুবক
সারা রাত
চেয়ারে বসে ছিল।

তার দুই চোখে
ঘুম ছিল না।
শুধু
একটা মানুষের বেঁচে থাকার
নিঃশব্দ প্রার্থনা।

ভোর হলে
জানালার কাচে
প্রথম আলো পড়ল।
দেখলাম,
আলোরও
কখনো কখনো
ক্লান্ত মুখ হয়।

আমি তার মুখে
আমার ভালোবাসাকে দেখলাম।

তারপর
আমি একটা আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।
নিজের মুখের দিকে
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।

অদ্ভুত!
সেখানে
শুধু আমাকেই দেখলাম না।

দেখলাম —
একজন কৃষকের ধুলো।
একজন জেলের নদী।
একজন মায়ের দুধের গন্ধ।
একজন সৈনিকের দীর্ঘ নীরবতা।
একজন কবির অসমাপ্ত পঙ্‌ক্তি।
একজন অন্ধ মানুষের
আলোর প্রতি বিশ্বাস।
একজন শিশুর
অকারণ বিস্ময়।
একজন বৃদ্ধের
ফিরে না-পাওয়া বিকেল।

আমার মুখ
শুধু আমার ছিল না।

হাজার মানুষের
অদৃশ্য আঙুল
তার রেখাগুলো এঁকেছে।

আমার হাসির ভেতরে
অসংখ্য কান্নার উত্তরাধিকার।
আমার সাহসের নিচে
অগণিত ভয়ের শেকড়।
আমার উচ্চারণে
অসংখ্য নীরব মানুষের
অপ্রকাশিত ভাষা।

সেদিন
আমি আর
কাউকে অপরিচিত বলতে পারলাম না।

কারণ
প্রতিটি মুখ
একটা ভাঙা আয়না।

আমরা
একজন আরেকজনের মধ্যে
নিজেদেরই
হারিয়ে যাওয়া টুকরো দেখি।

হয়তো এই কারণেই
কোনো মানুষের মৃত্যু
শুধু তার নিজের মৃত্যু নয়।

আমাদের ভেতরের
একটা অদেখা মুখও
সেদিন
চিরতরে অন্ধ হয়ে যায়।

আর কোনো নবজাতক
পৃথিবীতে এলে
শুধু একটা শিশুর জন্ম হয় না।
মানবতার আয়নায়
আরও একটা মুখ
জেগে ওঠে।

তাই আজ
আমি যখন
কোনো মানুষের দিকে তাকাই,
তার নাম জিজ্ঞেস করি না।

আমি অপেক্ষা করি।

কারণ জানি,
তার চোখের গভীরে
একদিন
আমি হয়তো
নিজেকেই
আবার খুঁজে পাব।

সকল মানুষের মুখ

(অপ্রকাশ)

আমি আজ আর বিশ্বাস করি না
মানুষ তার বলা কথাগুলোর সমষ্টি।

আমি বিশ্বাস করি,
মানুষ তৈরি হয়
যে কথাগুলো সে কোনোদিন
বলতে পারেনি,
সেগুলো দিয়ে।

একটা জীবন
যতটা উচ্চারিত,
তার চেয়ে অনেক বেশি
অপ্রকাশিত।

আমরা জন্মের পর
ভাষা শিখি।
কিন্তু তারও আগে
অনুভব করতে শিখি।

আর মৃত্যুর আগে
আবার ভাষা হারাতে শুরু করি।

দেখো —
একটা নবজাতক
কথা বলতে পারে না।
একজন মৃত্যুপথযাত্রীও
অনেক সময় পারে না।

জীবনের শুরু আর শেষ —
দু'প্রান্তেই
অপ্রকাশ দাঁড়িয়ে থাকে।

হয়তো
ভাষা শুধু মাঝের সেতু।

মানুষের প্রকৃত দেশ
শব্দ নয়।
অনুভব।

আমি বহু বছর ধরে
নিজেকে প্রকাশ করতে চেয়েছি।
কবিতায়।
কথায়।
নীরবতায়।
ভালোবাসায়।
ক্ষমায়।

তারপর একদিন বুঝলাম,
আমি যতই লিখি,
আমার ভেতরে
আরও অনেক লেখা
থেকে যায়।

যে কবিতাটা
আমি শেষ করতে পারিনি,
সেটাও আমার।
যে ভালোবাসাটা
আমি স্বীকার করিনি,
সেটাও আমার।
যে কান্নাটা
আমি লুকিয়ে রেখেছি,
সেটাও আমার।

যে ক্ষমাটা
আমি চাইতে পারিনি,
যে ক্ষমাটা
আমি পাইনি,
যে নামটা
সময় মুছে দিয়েছে,
যে যুদ্ধটা
কেউ দেখেনি,
যে সমুদ্রটা
শুধু আমি শুনেছি —

সব মিলিয়েই
আমি।

পৃথিবী মানুষকে
তার সাফল্য দিয়ে মাপে।
আমি তা মানি না।

আমি একজন মানুষকে
তার অপ্রকাশ দিয়ে
পড়তে চাই।

কারণ
যে মানুষ
কখনো কাউকে বলেনি
সে কতটা ভেঙে গেছে,
তবু অন্যের কাঁধে হাত রেখেছে —
তার ভেতরেই
মানবতার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো জ্বলে।

যে নারী
নিজের স্বপ্ন
চুপচাপ ভাঁজ করে
সন্তানের ব্যাগে
দুপুরের খাবার রেখে দেয়,
তার নীরবতার ভেতরেও
একটা মহাকাব্য লেখা থাকে।

যে বৃদ্ধ
প্রতিদিন একই দরজার দিকে
তাকিয়ে থাকে,
কিন্তু কাউকে ডাকে না,
তার অপেক্ষারও
একটা ভাষা আছে।

পৃথিবী
সেই ভাষা শেখেনি।
আমি সেই ভাষার
শিক্ষার্থী হতে চাই।

আমি জানি,
আমার ভেতরের সব কথা
আমি কোনোদিন লিখতে পারব না।

এই বইও
আমাকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করবে না।
কোনো কবিতা পারে না।
কোনো দর্শনও নয়।

কারণ
মানুষ
তার প্রকাশে শেষ হয় না।
সে শুরু হয়
তার অপ্রকাশে।

হয়তো
একদিন আমার নামও
ভুলে যাবে পৃথিবী।
আমার বই
ধুলোর নিচে ঘুমিয়ে থাকবে।
আমার কণ্ঠ
কেউ মনে রাখবে না।

তবু যদি
কোনো এক অচেনা মানুষ
রাতের গভীরে
নিজের বুকের ভেতর
একটা অজানা শূন্যতা অনুভব করে,
আর এই কবিতার একটা বাক্য পড়ে
হঠাৎ মনে হয় —

**"এ তো আমারই কথা।"**

তাহলে
আমার সমস্ত লেখা
সার্থক হবে।

কারণ
আমি কোনো নতুন মানুষ
সৃষ্টি করতে চাই না।

আমি শুধু
মানুষকে
তার নিজের ভেতরে
লুকিয়ে থাকা
অপ্রকাশিত মানুষটির সঙ্গে
পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।

সেখানেই আমার কবিতা।
সেখানেই আমার দর্শন।
সেখানেই আমার সমস্ত জীবন।

অপ্রকাশ

বাছাইকৃত কবিতা

শেষ চুম্বন

- মোঃ আবু তালেব

(মানুষ)

শেষ চুম্বনের কথা
কেউ মনে রাখতে পারে না।

মানুষ মনে রাখে
প্রথম স্পর্শ।
প্রথম কাঁপুনি।
প্রথমবার
অন্য একজনের চোখে
নিজের নাম শুনে ফেলা।

শেষ চুম্বন
কোনোদিন
শেষ হওয়ার সময়
নিজেকে শেষ বলে
পরিচয় দেয় না।

সে আসে
অন্য দিনের মতোই।
একটা বিকেল।
একটু বাতাস।
একটু আলো।
একটু নীরবতা।

দুই মানুষ
পাশাপাশি বসে থাকে।
তারা ভবিষ্যতের কথা বলে।

শীত এলে কোথায় যাবে,
বৃষ্টির রাতে
কোন জানালার পাশে বসবে,
বার্ধক্যে
কে আগে চশমা খুঁজে পাবে —

এসব তুচ্ছ কথায়
জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাস
অদৃশ্য হয়ে ফুটে থাকে।

তারপর
বিদায়।

একটা ক্ষণস্থায়ী স্পর্শ।
ঠোঁটের চেয়ে
কপালে বেশি।
শব্দের চেয়ে
নিঃশ্বাসে বেশি।

কেউ জানে না,
এইটাই শেষ।

পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ঘটনাগুলো
সবসময়
অঘোষিত থাকে।

যেদিন বাবা
শেষবারের মতো
আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন,
আমি জানতাম না।

যেদিন মা
শেষবার বলেছিলেন,
"সাবধানে যাস" —
সেদিনও
আমি তাড়াহুড়োয় ছিলাম।

জীবন
শেষবারের মুহূর্তগুলোকে
ইচ্ছে করেই
সাধারণ দিনের পোশাক পরিয়ে রাখে।

হয়তো
মানুষ জানলে
সে আর বাঁচতে পারত না।

একটা পুরোনো স্কার্ফে
আজও
একটা সুগন্ধ লেগে আছে।

গন্ধেরও কি স্মৃতি থাকে?
নাকি
ভালোবাসা
কাপড়ের ভাঁজে
নিজেকে লুকিয়ে রাখতে শেখে?

অনেক বছর পরে
একটা বই খুলতে গিয়ে
একটা শুকনো শিউলি ফুল পেলাম।

হঠাৎ মনে হলো,
সময়
সবকিছু নিয়ে যায় না।

কিছু কিছু জিনিসকে
সে কাগজের ভেতর,
গন্ধের ভেতর,
আলোর ভেতর,
স্পর্শের ভেতর
অদৃশ্য করে রেখে দেয়।

আমরা তাকে
স্মৃতি বলি।
আমি তাকে বলি —
স্থির সময়।

আজ বুঝি,
চুম্বন
শুধু ঠোঁটের ঘটনা নয়।

একজন মানুষ
যখন অন্য একজনের
সব ভয়কে
এক মুহূর্তের জন্য
নিঃশব্দ করে দেয় —
সেখানেও
একটা চুম্বন ঘটে।

যখন
একজন মা
ঘুমিয়ে পড়া শিশুর কপালে
রাত রেখে যান —
সেখানেও
একটা চুম্বন জন্মায়।

যখন
একজন বৃদ্ধ
মৃত স্ত্রীর ছবিতে
প্রতিদিন ধুলো মুছে দেন —
সেখানেও
একটা চুম্বন
শেষ হতে পারে না।

হয়তো
শেষ চুম্বন বলে
কিছু নেই।

শুধু
একটা স্পর্শ থাকে,
যা শরীর ছেড়ে
সময়ের ভেতরে
বাস করতে শুরু করে।

একদিন
আমরা কেউই থাকব না।
আমাদের মুখ
ধীরে ধীরে
পৃথিবীর স্মৃতি থেকে
মুছে যাবে।

কিন্তু
যদি কোনো সন্ধ্যায়
হঠাৎ বাতাস
কোনো অকারণ কোমলতা নিয়ে
কারও কপাল ছুঁয়ে যায়,

যদি সে
এক মুহূর্তের জন্য
কারণ ছাড়াই
নিজেকে ভালোবাসা মানুষ বলে
মনে করে —

তবে বুঝবে,
পৃথিবীর কোথাও
একটা শেষ চুম্বন
এখনো শেষ হয়নি।

মানুষের ঠোঁটে নয়,
মানুষের অস্তিত্বে
নিঃশব্দে
বেঁচে আছে।
বিস্তারিত...

বৃদ্ধের বিকেল

- মোঃ আবু তালেব

(মানুষ)

বিকেলের রোদ
বৃদ্ধ মানুষের গায়ে
অন্যরকম পড়ে।

সকালের আলো
যেখানে চোখে ঝলক তোলে,
বিকেলের আলো
সেখানে স্মৃতি হয়ে
বসে থাকে।

আমি তাকে
প্রতিদিন একই বেঞ্চে দেখি।
পার্কের পুরোনো কৃষ্ণচূড়ার নিচে।

তিনি বসে থাকেন,
যেন কোনো ট্রেনের অপেক্ষায় নন,
কোনো মানুষেরও নয় —
শুধু একটা দীর্ঘ জীবনের
শেষ আলোর পাশে।
তার হাতে
একটা লাঠি।
কাঠের নয়।
সময়ের।
লাঠির মাথায়
যত আঁচড়,
তার চেয়েও বেশি পথ
হেঁটেছে তার নীরবতা।

তার চোখে
কোনো তাড়া নেই।
শুধু দূরে উড়ে যাওয়া পাখিদের দিকে
এক ধরনের কোমল দৃষ্টি।
মনে হয়,
তিনি আর পাখিদের দেখছেন না।
নিজের উড়ে যাওয়া দিনগুলোকে দেখছেন।

বাতাস এলে
কৃষ্ণচূড়ার শুকনো ফুল
তার কাঁধে পড়ে।
তিনি ঝেড়ে ফেলেন না।
হয়তো জানেন,
শেষ বয়সে
সব পতনকেই
সম্মান করতে হয়।

একটা ছোট ছেলে
দৌড়ে এসে
তার পাশে বসে।
কিছু জিজ্ঞেস করে।
বৃদ্ধ হাসেন।
কোনো উত্তর দেন না।
তবু ছেলেটা
হেসে চলে যায়।

আমি বুঝলাম,
কিছু মানুষের নীরবতা
বইয়ের চেয়েও বেশি
শিক্ষা দেয়।

তার মুখের ভাঁজগুলো
আমি একদিন গুনতে চেয়েছিলাম।
পারিনি।
কারণ
প্রতিটি রেখা
একটা নদী।
কোথাও প্রথম প্রেমের জল।
কোথাও যুদ্ধের ধুলো।
কোথাও সন্তানের জন্মের আলো।
কোথাও একটা নামহীন কবরের নীরবতা।

বিকেল আরও নেমে আসে।
সূর্য
গাছের ডালে
শেষ সোনালি চিঠিটা রেখে যায়।
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করেন।
মনে হয়, তিনি ঘুমোচ্ছেন।
হয়তো না।
হয়তো
নিজের ভেতরের উঠোনে
ফিরে গেছেন।
যেখানে
তার মা এখনো
ডেকে বলেন,
"খেতে আয়।"
তার বাবা
ক্ষেত থেকে ফিরছেন।
একটা কিশোর
প্রথমবার
স্বপ্ন দেখতে শিখছে।

সময়
অদ্ভুত এক বৃত্ত।
শেষ প্রান্তে এসে
সে আবার
শুরুর হাত ধরে।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে থাকি।
হঠাৎ মনে হয়,
বৃদ্ধ মানুষরা
আসলে ভবিষ্যৎ নন।
তারা
অতীতের শেষ প্রদীপ।

যতদিন তারা জ্বলে,
আমাদের শৈশবও
পুরোপুরি অন্ধকারে হারায় না।
সূর্য ডুবে যায়।
পার্ক ফাঁকা হয়।
তিনি ধীরে ধীরে ওঠেন।
লাঠি
মাটিতে একটা ক্ষুদ্র শব্দ তোলে।
মনে হয়,
পৃথিবী
আরেকটা দিনের ইতিহাসে
একটা পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিল।

আমি তাকে চলে যেতে দেখি।
না —
একজন বৃদ্ধকে নয়।
একটা দীর্ঘ ঋতুকে।
একটা জীবন্ত গ্রন্থাগারকে।
একটা সন্ধ্যাকে,
যে সারাদিন আলো বিলিয়ে
এখন
নিজের অন্ধকারের দিকে
নিঃশব্দে হাঁটছে।
আর তখন
আমার মনে হয় —
বৃদ্ধ হওয়া মানে
বয়স বাড়া নয়।
বৃদ্ধ হওয়া মানে,
এত জীবন বেঁচে ফেলা
যে শেষে
তোমার নীরবতার ভেতরেও
অনেক মানুষের কণ্ঠস্বর
ধীরে ধীরে
বাড়ি ফিরে আসে।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4601
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1676
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1644
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1567
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1562
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1488
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1454
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1445
রমণী মোঃ আবু তালেব 1424
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1388
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1388
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1387
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1350
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1345
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1344
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1341
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1341
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1326
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1315
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1314
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
শেষ চুম্বন মোঃ আবু তালেব 6
বৃদ্ধের বিকেল মোঃ আবু তালেব 7
ভিখারির রাজ্য মোঃ আবু তালেব 60
সকল মানুষের মুখ মোঃ আবু তালেব 18
অপ্রকাশ মোঃ আবু তালেব 25
ভেতরের সমুদ্র মোঃ আবু তালেব 26
নীরব যুদ্ধ মোঃ আবু তালেব 28
হারিয়ে যাওয়া নাম মোঃ আবু তালেব 65
যে ক্ষমা পাইনি মোঃ আবু তালেব 26
যে ক্ষমা চাইনি মোঃ আবু তালেব 25
অসমাপ্ত চিঠি মোঃ আবু তালেব 34
গোপন প্রেম মোঃ আবু তালেব 35
অদেখা কান্না মোঃ আবু তালেব 31
যে কথাটি বলিনি মোঃ আবু তালেব 28
আমি কে? মোঃ আবু তালেব 69
প্রথম নীরবতা মোঃ আবু তালেব 60
প্রথম মিথ্যা মোঃ আবু তালেব 59
প্রথম লজ্জা মোঃ আবু তালেব 53
একা হওয়ার দিন মোঃ আবু তালেব 60
যে আমাকে কেউ দেখেনি মোঃ আবু তালেব 60
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 59
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 54
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 68
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 61
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 68
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 107
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 135
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 135
ভালো মানুষ ইবনে আলী 234
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 134
শিকল ইবনে আলী 207
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 246
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 220
বসন্ত জয়দীপ রায় 240
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 157
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 296
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 273
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 288
সোনার দেশ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 306
মুসলিম সংখ্যালঘু শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 249
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে