কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

আকাশের মেঘেরা কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই
এক দেশ হতে আরেক দেশে গিয়ে বৃষ্টি বিলায়।

পৃথিবীর কোনো নদীর জলও সীমানা চিনে না
এপার ভেঙে অনায়াসে ওপারে চলে যায়।

পাখিদের ডানায় কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই
মুক্ত বিহঙ্গের মতো তারা উড়ে বেড়ায় দূর অজানায়।

গাছের শেকড়েও কোনো নিষেধাজ্ঞা আইন নেই
জলের খোঁজে মাটির তলে ছড়িয়ে পড়ে অবলীলায়।

বাতাস কি কখনো রাষ্ট্রের সীমানারেখা দেইখা বহে? না।
ফুলগাছে কাঁটা থাকলেও, ফুলের সুবাসে কোনো কাঁটাতার নেই,
নাক ঢেকে না-রাখলে আপনার কাছে সুঘ্রাণ ছড়াবেই।

রইদের আলো কখনোই গণ্ডি দেইখা আলো দেয় না,
নির্দিষ্ট সময়ে তার ভাগ সবাই পায় সমানহারে।
জলের মাছেরাও কোনো তল্লাশিচৌকি ছাড়াই
এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভেসে বেড়াতে পারে।

এই যে রাত হইলে দুজনে পাশাপাশি বসে চাঁদ দেখি
সেই চাঁদের আলোও সকল দেশে সমানভাবে ঝরে পড়ে।

বুনো লতাপাতাও কোনো বেড়া চিনে বেড়ে ওঠে না,
সীমানায় গিয়ে দেখি, এপারওপার দুইপারেই তাদের বসবাস, আমায় দেখে হাসছে তারা খিলখিল করে।

আমার তখন ভীষণ লজ্জা পেল,
মাথা নিচু করে যমীনের দিকে তাকালাম,
একটা অদ্ভুত আওয়াজ আমার কানে টের পেলাম,

ফেরদাউস!
তোমরা নিজেদের অনেক চালাক মনে করো, তাই না?
অথচ বোকার মতো চারিদিকে কাঁটাতার দিয়ে এমন এক খাঁচা বানিয়েছো, যেখানে তোমরা নিজেরাই বন্দি! হাহ হাহ হাহ হাহ হা।

কাঁটাতার

(নিজেকে আবিষ্কার)

জন্মের পর থেকেই মানুষ
আমাকে একটি নাম দিয়েছে,
সেই নাম ধরে আমাকে ডাকা হয়েছে,
আমি সাড়া দিয়েছি।
ধীরে ধীরে বিশ্বাসও করেছি—
এই নামটিই আমি!

তারপর
আমাকে একটি ভাষা দেওয়া হলো,
একটি পরিবার,
একটি দেশ,
একটি ধর্ম,
একটি ইতিহাস,
একটি পরিচয়।

একদিন দেখলাম,
আমার চারপাশে যত পরিচয় জমেছে,
আমার ভেতরের মানুষটি
তত দূরে সরে গেছে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজের মুখ চিনতে পারি,
কিন্তু এই মুখটিই কি আমি?

একটি পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবি—
সেই ছোট্ট শিশুটি কোথায় গেল?
তার চোখ তো আমারই ছিল,
তার স্বপ্নও,
তার বিস্ময়ও,
তবু সে আমি নয়!

তাহলে আমি কে?

আমি কি আমার শরীর?
শরীর তো প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে।
আমি কি আমার স্মৃতি?
স্মৃতিও তো মুছে যায় প্রতিদিন।
আমি কি আমার সাফল্য?
একদিন সেগুলোরও
আর কোনো মূল্য থাকবে না।
আমি কি আমার ব্যর্থতা?
সেগুলোও তো আমার সঙ্গে জন্মায়নি।

আমি দীর্ঘদিন ভেবেছি,
মানুষ তার অর্জনের সমষ্টি।
আজ মনে হয়,
মানুষ তার হারিয়ে ফেলা
জিনিসগুলোরও যোগফল।

যাদের আর ছুঁতে পারি না,
তারা এখনও আমাকে গড়ে।
যে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি,
তারা এখনও আমাকে জাগিয়ে রাখে।
যে মানুষগুলো চলে গেছে,
তারা এখনও আমার ভেতরে হেঁটে বেড়ায়।

তাহলে আমি কোথায়?

একদিন নদীর ধারে বসেছিলাম,
জল বয়ে যাচ্ছিল,
আমি হাত ডুবিয়ে ভাবলাম,
একই নদীতে কি দ্বিতীয়বার হাত রাখা যায়?
জল বদলে যায়,
হাতও বদলে যায়,
তবু নদীকে আমরা একই নামে ডাকি।

হয়তো মানুষও তেমন,
প্রতিদিন বদলাতে বদলাতে
সে নিজের নামটি বহন করে চলে,
আর ভেবে নেয়—
সে একই মানুষ।

আমি অনেকবার
নিজেকে খুঁজতে বেরিয়েছি—
বইয়ের ভেতর,
ধর্মের ভেতর,
প্রেমের ভেতর,
সাফল্যের ভেতর,
পরাজয়ের ভেতর,
প্রশংসার ভেতর,
নিন্দার ভেতর,
প্রতিবারই কিছু পেয়েছি।

কিন্তু নিজেকে পাইনি।

তারপর একদিন
উত্তর খোঁজা ছেড়ে দিলাম,
চুপচাপ বসে রইলাম,
বাতাস বইছিল,
দূরে একটি পাখি ডাকছিল,
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে
গাছের গায়ে নেমে আসছিল।
সেই প্রথম মনে হলো—
হয়তো আমাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য
দৌড়ানোর দরকার নেই,
থেমে যাওয়ার দরকার।

কারণ মানুষ নিজেকে সামনে খুঁজে পায় না।
নিজেকে পায়
যখন সে আর কোথাও পৌঁছাতে চায় না।

আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,
"তুমি কে?"
আমি হয়তো আমার নাম বলব,
আমার পেশার কথা বলব,
আমার ঠিকানাও বলব,
কিন্তু জানব,
এসবের কোনোটাই সম্পূর্ণ উত্তর নয়।

আমার ভেতরে এখনও একটি শিশু
আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,
একজন কিশোর
নিজের ছায়াকে বুঝতে শিখছে,
একজন তরুণ প্রথম ভালোবাসার
ভাঙা শব্দ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে,
একজন মানুষ
প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে,
আর তাদের প্রত্যেকেই আমি,
আবার কেউই আমি নই।

হয়তো মানুষ কোনো স্থির পরিচয় নয়,
সে একটি চলমান প্রশ্ন,
একটি অসমাপ্ত যাত্রা,
একটি নদী,
যে সমুদ্রে পৌঁছেও
নিজের উৎসকে ঠিকঠাক মনে রাখে।

তাই আজ আর জানতে চাই না—
আমি কে?
শুধু জানতে চাই—
আমি কি প্রতিদিন
গতকালের চেয়ে
একটু বেশি সত্য হয়ে উঠছি?
কারণ নাম মানুষকে পরিচয় দেয়।
কিন্তু সত্য—
মানুষকে জন্ম দেয়।

হয়তো এটাই আমার উত্তর।

আমি কোনো সম্পূর্ণ মানুষ নই।
আমি সম্পূর্ণ হওয়ার পথে
একটি দীর্ঘ, নীরব,
অবিরাম যাত্রা।

আমি কে?

(নিজেকে আবিষ্কার)

আমি প্রথম কবে নীরব হয়েছিলাম,
মনে নেই!

হয়তো এমন একদিন,
যেদিন আমার কথা কেউ শোনেনি।
হয়তো এমন এক বিকেলে,
যেদিন আমি যা বলতে চেয়েছিলাম,
তার কোনো শব্দ খুঁজে পাইনি।
হয়তো কোনো অকারণ অভিমানে,
হয়তো প্রথম কোনো বিদায়ের ক্ষণে!

শুধু মনে আছে—
একদিন আমি আগের মতো কথা বলিনি,
আর তা টের পায়নি পৃথিবীও!

মানুষ ভাবে,
নীরবতা শব্দের অনুপস্থিতি।
আমি তা মনে করি না।
নীরবতা হলো সেই জায়গা,
যেখানে শব্দ পৌঁছাতে পারে না।

ছোটবেলায়
আমি খুব সহজে কথা বলতাম।
যা মনে হতো,
তাই বলতাম।
যা ভালো লাগত,
তাই চাইতাম।
কষ্ট পেলে,
সহজেই কেঁদে ফেলতাম,
তারপর ধীরে ধীরে বড় হলাম!

মানুষ আমাকে ভাষা শিখিয়েছে,
তারও আগে শিখিয়েছে—
কোন কথা বলতে নেই,
কোন কান্না লুকিয়ে রাখতে হয়,
কোন ভালোবাসা প্রকাশ করা যায় না,
কোন প্রশ্ন করলে সবাই অস্বস্তি বোধ করবে,
সেদিনই আমার ভেতরে
প্রথম নীরবতার জন্ম।

আমি দেখেছি,
সবচেয়ে গভীর মানুষগুলো
খুব বেশি কথা বলে না।
তারা নদীর মতো।
নদী কখনো নিজের গভীরতা নিয়ে
ঘোষণা দেয় না,
শুধু বয়ে যায়।

একদিন বাবা অনেকক্ষণ
চুপ করে বসে ছিলেন।
আমি ভেবেছিলাম,
তিনি রাগ করেছেন।
আজ বুঝি,
সব নীরবতা রাগ নয়,
কিছু নীরবতা ক্লান্তি,
কিছু নীরবতা ভালোবাসা,
কিছু নীরবতা এমন এক দুঃখ,
যার কোনো ভাষা এখনো পৃথিবী জানেনা!

মা কখনো কখনো
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
ডাকলেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতেন না।
তখন মনে হতো,
তিনি হয়তো দূরের কোনো গাছ দেখছেন।
এখন বুঝি,
মানুষ কখনো বাইরে তাকিয়ে থাকে না,
সে তাকিয়ে থাকে নিজের ভেতরে!

নীরবতারও ঋতু আছে,
শৈশবের নীরবতা বিস্ময়ের,
কৈশোরের নীরবতা সংকোচের,
যৌবনের নীরবতা দ্বন্দ্বের,
আর বার্ধক্যের নীরবতা স্মৃতির।

আমরা প্রত্যেকে জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বয়সে
একই নীরবতাকে ভিন্ন নামে ডাকি।
আমি একদিন আবিষ্কার করলাম,
যে কথাগুলো আমি কাউকে বলতে পারিনি,
সেগুলো হারিয়ে যায়নি,
তারা আমার ভেতরে বসে
ধীরে ধীরে আমাকে বদলে দিয়েছে!

মানুষ তার উচ্চারিত বাক্য দিয়ে
যতটা গড়ে ওঠে,
তার চেয়ে অনেক বেশি গড়ে ওঠে
না-বলা বাক্য দিয়ে।
হয়তো সেই কারণেই
কিছু মানুষের পাশে বসলে
কথা বলতে ইচ্ছে করে না,
শুধু থাকতে ইচ্ছে করে।
কারণ সত্যিকারের সান্নিধ্য
শব্দের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না,
থাকে বিশ্বাসের ওপর।

আজ আমি আর নীরবতাকে
ভয় পাই না।
আগে ভাবতাম,
চুপ করে থাকা মানে
শূন্য হয়ে যাওয়া।
এখন জানি,
চুপ করে থাকা মানে
নিজের শব্দগুলোর
মর্মার্থ খুঁজে নেওয়ার ফুরসত!

একদিন,
পৃথিবীর সব শব্দ
শেষ হয়ে যাবে,
সব তর্ক থেমে যাবে,
সব পরিচয় মুছে যাবে,
থেকে যাবে কেবল
নিরবতা!

হয়তো একটি দীর্ঘ নীরবতা—
যেখানে মানুষ প্রথমবার
নিজের কণ্ঠ নয়,
শুধু নিজের অস্তিত্বকে শুনতে পায়!

আমি আজও সেই
প্রথম নীরবতার
কাছে ফিরে যাই।
যখন পৃথিবী খুব কোলাহলপূর্ণ হয়ে ওঠে,
যখন মানুষ খুব দ্রুত বিচার করে,
যখন শব্দ সত্যের চেয়ে বড় হয়ে যায়।
আমি চোখ বন্ধ করি
আর শুনতে পাই—
আমার ভেতরে এখনও
একটি শিশু বসে আছে!
সে কিছু বলছে না,
তার বলার দরকারও নেই।
কারণ সে জানে,
মানুষের জীবনের সবচেয়ে সত্য বাক্যগুলো
উচ্চারণ করা যায় না,
শুধু বেঁচে থাকা যায়।
আর সেই বেঁচে থাকার
প্রথম ভাষার নামই—

**নীরবতা।**

প্রথম নীরবতা

(নিজেকে আবিষ্কার)

আমি প্রথম কবে মিথ্যা বলেছিলাম,
মনে নেই।

হয়তো একটি ভাঙা কাঁচের জন্য,
হয়তো একটি হারিয়ে যাওয়া পেন্সিলের জন্য,
হয়তো এমন কোনো দুষ্টুমির জন্য,
যার কথা আজ আর কেউ মনে রাখেনি।

ঘটনাটি ভুলে গেছি,
কিন্তু সেই দিনের নীরবতাটি ভুলিনি।
কারণ মানুষ প্রথম মিথ্যাটি মুখ দিয়ে বলে না,
প্রথম মিথ্যাটি সে বলে নিজের হৃদয়ের কাছে।
আমি বলেছিলাম,
"আমি করিনি।"
আমার মুখ কথা বলছিল,
কিন্তু আমার বুকের ভেতরে
একটি ছোট্ট শিশু মাথা নিচু করে
দাঁড়িয়ে ছিল।

সেদিন প্রথম বুঝলাম,
একজন মানুষের ভেতরে দুজন মানুষ থাকে।
একজন পৃথিবীর সঙ্গে কথা বলে,
আরেকজন সত্যের সঙ্গে।
দুজনের কথা সব সময় এক হয় না।
মিথ্যার সবচেয়ে বড় শাস্তি ধরা পড়া নয়,
মিথ্যার সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো—
নিজের ভেতরের মানুষটির
চোখের দিকে তাকাতে না পারা।

আমার মনে আছে,
সেদিন মা খুব বেশি রাগ করেননি,
বাবাও না।
তারা শুধু আমার দিকে
কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন।
সেই দৃষ্টির ভেতরে কোনো চিৎকার ছিল না,
কোনো অপমান ছিল না,
ছিল শুধু একটি নীরব প্রশ্ন—
**"তুই কি নিজেকেও বিশ্বাস করাতে পারলি?"**

সেদিন আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি,
আজও পারি না।
আমরা ভাবি,
মিথ্যা অন্য মানুষকে ঠকানোর জন্য বলা হয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বুঝেছি,
মানুষের অধিকাংশ মিথ্যা
অন্যকে বোকা বানানোর জন্য নয়,
নিজেকেই বাঁচিয়ে রাখার জন্য!

"আমি ভালো আছি।"
"কষ্ট হচ্ছে না।"
"আমি ভুলে গেছি।"
"আমি তাকে আর ভালোবাসি না।"
এই কথাগুলো আমরা কত সহজে বলি।

তারপর গভীর রাতে,
নিজের নীরবতার সামনে দাঁড়িয়ে
জেনে যাই—
সব কথাই সত্য ছিল না।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
মিথ্যাগুলো আরও ভদ্র হয়ে যায়।
তারা আর চিৎকার করে না,
তারা হাসে,
হাত মেলায়,
অভিনন্দন জানায়,
ছবি তোলে।

তারপর একা ঘরে ফিরে
ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

আমি এমন মানুষ দেখেছি,
যারা সারাজীবন সত্য কথা বলেছে,
তবু নিজের কাছে একটি সত্য
স্বীকার করতে পারেনি!

আবার এমন মানুষও দেখেছি,
যারা পৃথিবীর কাছে মিথ্যা বলেছে,
কিন্তু নিজের হৃদয়ের সামনে
এক মুহূর্তও অসৎ হয়নি।
তখন বুঝেছি,
সত্য শুধু বাক্যের বিষয় নয়,
সত্য একটি জীবনযাপনের নাম।

আমার প্রথম মিথ্যা
আজ আর আমাকে অপরাধী করে না,
সে আমাকে সতর্ক করে।

যেদিন সে প্রথম মিথ্যা বলে
মানুষের পতন সেদিন শুরু হয় না,
শুরু হয় সেদিন-
যেদিন সে নিজের মিথ্যাকে সত্য বলে
বিশ্বাস করতে শেখে!

আমি এখন আর নিখুঁত মানুষ হতে চাই না।
আমি এমন একজন মানুষ হতে চাই,
যে ভুল করলে তা স্বীকার করতে পারে।
কারণ স্বীকারোক্তি
মানুষকে কখনো ছোট করে না।

আজও মাঝে মাঝে
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
আমি সেই ছোট্ট শিশুটিকে দেখি।
সে এখনও ভয় পায়,
ভুল করে,
লুকাতে চায়,
তারপর ধীরে ধীরে
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে—
"আমি করেছিলাম।"
সেই একটিমাত্র বাক্যে
যতটা সত্য আছে,
হয়তো পৃথিবীর সব
নির্ভুল জীবনের চেয়েও বেশি!

হয়তো মানুষ সত্যবাদী হয়ে জন্মায় না,
সে সত্যের দিকে হাঁটতে হাঁটতেই
মানুষ হয়ে ওঠে।

আর সেই দীর্ঘ পথের
সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ছিল—
আমার প্রথম মিথ্যা।

প্রথম মিথ্যা

(নিজেকে আবিষ্কার)

আমি ঠিক মনে করতে পারি না,
প্রথম কবে লজ্জা পেয়েছিলাম!

হয়তো ভুল উত্তর দিয়েছিলাম,
হয়তো সবার সামনে হোঁচট খেয়েছিলাম,
হয়তো কাউকে খুব সরল একটি কথা বলেছিলাম,
আর সবাই হেসে উঠেছিল।
ঘটনাটি মনে নেই।
কিন্তু সেই অনুভূতিটি
এখনও আমার ভেতরে বেঁচে আছে।

সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম—
পৃথিবীতে শুধু আমি নেই,
আরও অনেক চোখ আছে,
আর সেই চোখগুলো আমাকে দেখে।

শৈশবে আমরা নিজেদের জন্য বাঁচি,
তারপর একদিন হঠাৎ বুঝি—
অন্যের দৃষ্টিও আমাদের জীবন
লিখতে শুরু করেছে,
সেদিনই লজ্জার জন্ম।

আমি আগে যেমন দৌড়াতাম,
সেদিন থেকে একটু ভেবে দৌড়াতে শিখলাম।
আগে যেমন হাসতাম,
সেদিন থেকে একটু মেপে হাসতে শিখলাম।
আগে যেমন কাঁদতাম,
সেদিন থেকে চোখের জল
লুকিয়ে রাখতে শিখলাম।

মানুষের ভেতরে প্রথম যে দেয়ালটি ওঠে,
তার নাম অহংকার নয়,
তার নাম লজ্জা।
সেই দেয়ালের ওপাশে থেকে যায়
অসংখ্য স্বতঃস্ফূর্ত হাসি,
অকারণ কান্না,
অদ্ভুত প্রশ্ন,
এবং এমন সব স্বপ্ন,
যেগুলো আমরা আর কাউকে বলি না।

একদিন স্কুলে একটি কবিতা আবৃত্তি
করতে উঠেছিলাম।
প্রথম দুটি লাইন বলার পর
বাকিটা ভুলে গিয়েছিলাম।
ঘরভর্তি মানুষ।
নীরবতা।
তারপর কারও হাসি।
সেদিন মনে হয়েছিল,
পৃথিবীর সব দরজা
একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে!

আজ এত বছর পরে বুঝি,
মানুষ কবিতা ভুলে যাওয়ার জন্য
লজ্জা পায় না।
সে লজ্জা পায়—
যখন মনে হয়,
সে আর অন্যদের প্রত্যাশার মানুষটি
হয়ে থাকতে পারল না।

লজ্জা খুব অদ্ভুত একটি অনুভূতি।
সে বাইরে থেকে আসে না,
সে জন্মায় ভেতরে।
একটি ছোট শিশু
নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা পায় না,
নিজের কান্না নিয়ে লজ্জা পায় না,
নিজের প্রশ্ন নিয়ে লজ্জা পায় না।
আমরাই তাকে শেখাই—
কোন হাসি চেপে রাখতে হয়,
কোন কান্না লুকাতে হয়,
কোন স্বপ্ন বলা যায় না।
তারপর একদিন সে বড় হয়ে যায়।
এবং নিজের সত্যটাকেও
ধীরে ধীরে লুকিয়ে ফেলতে শেখে।

আমি এখন ভাবি,
মানুষের জীবনের অনেক সাহস
প্রথম লজ্জার দিনেই হারিয়ে যায়।
যে গানটি সে গাইতে চেয়েছিল,
সে আর গায় না।
যে মানুষটিকে ভালোবাসার কথা
বলতে চেয়েছিল,
সে আর বলে না।
যে প্রশ্নটি করতে চেয়েছিল,
সে চুপ করে যায়।

পৃথিবীর বহু অসমাপ্ত জীবনের শুরু
হয়তো এইভাবেই,
একটি ছোট্ট লজ্জা থেকে।

আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
আমি সেই ছোট্ট শিশুটির কথা ভাবি।
যে ভুল করলে লজ্জা পেত,
কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার দৌড়ে যেত,
আবার হাসত,
আবার চেষ্টা করত।
সে জানত না,
মানুষের মর্যাদা
কখনো নিখুঁত হওয়ার মধ্যে নয়।
বারবার ব্যর্থ হয়েও
আবার শুরু করতে লাগে বুক ভরা সাহস!
হয়তো সেই শিশুটি
আমার চেয়ে অনেক সাহসী ছিল,
কারণ সে তখনও শেখেনি—
পৃথিবীর চোখকে ভয় করতে!

আজ আমি আমার প্রথম লজ্জাকে
ক্ষমা করে দিয়েছি।
কারণ বুঝেছি,
যেদিন মানুষ লজ্জা পায়,
সেদিন সে শুধু নিজের দুর্বলতা দেখে না,
সে প্রথমবার অনুভব করে—
তার ভেতরে এমন একটি সত্য আছে,
যাকে সে পৃথিবীর সামনে
উন্মুক্ত করতে ভয় পায়।

আর সেই অদৃশ্য সত্যটিই
হয়তো একদিন হয়ে ওঠে
তার সবচেয়ে সুন্দর কবিতা !

প্রথম লজ্জা

বাছাইকৃত কবিতা

কাঁটাতার

- ফেরদাউস সরকার

আকাশের মেঘেরা কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই
এক দেশ হতে আরেক দেশে গিয়ে বৃষ্টি বিলায়।

পৃথিবীর কোনো নদীর জলও সীমানা চিনে না
এপার ভেঙে অনায়াসে ওপারে চলে যায়।

পাখিদের ডানায় কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই
মুক্ত বিহঙ্গের মতো তারা উড়ে বেড়ায় দূর অজানায়।

গাছের শেকড়েও কোনো নিষেধাজ্ঞা আইন নেই
জলের খোঁজে মাটির তলে ছড়িয়ে পড়ে অবলীলায়।

বাতাস কি কখনো রাষ্ট্রের সীমানারেখা দেইখা বহে? না।
ফুলগাছে কাঁটা থাকলেও, ফুলের সুবাসে কোনো কাঁটাতার নেই,
নাক ঢেকে না-রাখলে আপনার কাছে সুঘ্রাণ ছড়াবেই।

রইদের আলো কখনোই গণ্ডি দেইখা আলো দেয় না,
নির্দিষ্ট সময়ে তার ভাগ সবাই পায় সমানহারে।
জলের মাছেরাও কোনো তল্লাশিচৌকি ছাড়াই
এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভেসে বেড়াতে পারে।

এই যে রাত হইলে দুজনে পাশাপাশি বসে চাঁদ দেখি
সেই চাঁদের আলোও সকল দেশে সমানভাবে ঝরে পড়ে।

বুনো লতাপাতাও কোনো বেড়া চিনে বেড়ে ওঠে না,
সীমানায় গিয়ে দেখি, এপারওপার দুইপারেই তাদের বসবাস, আমায় দেখে হাসছে তারা খিলখিল করে।

আমার তখন ভীষণ লজ্জা পেল,
মাথা নিচু করে যমীনের দিকে তাকালাম,
একটা অদ্ভুত আওয়াজ আমার কানে টের পেলাম,

ফেরদাউস!
তোমরা নিজেদের অনেক চালাক মনে করো, তাই না?
অথচ বোকার মতো চারিদিকে কাঁটাতার দিয়ে এমন এক খাঁচা বানিয়েছো, যেখানে তোমরা নিজেরাই বন্দি! হাহ হাহ হাহ হাহ হা।
বিস্তারিত...

আমি কে?

- মোঃ আবু তালেব

(নিজেকে আবিষ্কার)

জন্মের পর থেকেই মানুষ
আমাকে একটি নাম দিয়েছে,
সেই নাম ধরে আমাকে ডাকা হয়েছে,
আমি সাড়া দিয়েছি।
ধীরে ধীরে বিশ্বাসও করেছি—
এই নামটিই আমি!

তারপর
আমাকে একটি ভাষা দেওয়া হলো,
একটি পরিবার,
একটি দেশ,
একটি ধর্ম,
একটি ইতিহাস,
একটি পরিচয়।

একদিন দেখলাম,
আমার চারপাশে যত পরিচয় জমেছে,
আমার ভেতরের মানুষটি
তত দূরে সরে গেছে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজের মুখ চিনতে পারি,
কিন্তু এই মুখটিই কি আমি?

একটি পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবি—
সেই ছোট্ট শিশুটি কোথায় গেল?
তার চোখ তো আমারই ছিল,
তার স্বপ্নও,
তার বিস্ময়ও,
তবু সে আমি নয়!

তাহলে আমি কে?

আমি কি আমার শরীর?
শরীর তো প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে।
আমি কি আমার স্মৃতি?
স্মৃতিও তো মুছে যায় প্রতিদিন।
আমি কি আমার সাফল্য?
একদিন সেগুলোরও
আর কোনো মূল্য থাকবে না।
আমি কি আমার ব্যর্থতা?
সেগুলোও তো আমার সঙ্গে জন্মায়নি।

আমি দীর্ঘদিন ভেবেছি,
মানুষ তার অর্জনের সমষ্টি।
আজ মনে হয়,
মানুষ তার হারিয়ে ফেলা
জিনিসগুলোরও যোগফল।

যাদের আর ছুঁতে পারি না,
তারা এখনও আমাকে গড়ে।
যে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি,
তারা এখনও আমাকে জাগিয়ে রাখে।
যে মানুষগুলো চলে গেছে,
তারা এখনও আমার ভেতরে হেঁটে বেড়ায়।

তাহলে আমি কোথায়?

একদিন নদীর ধারে বসেছিলাম,
জল বয়ে যাচ্ছিল,
আমি হাত ডুবিয়ে ভাবলাম,
একই নদীতে কি দ্বিতীয়বার হাত রাখা যায়?
জল বদলে যায়,
হাতও বদলে যায়,
তবু নদীকে আমরা একই নামে ডাকি।

হয়তো মানুষও তেমন,
প্রতিদিন বদলাতে বদলাতে
সে নিজের নামটি বহন করে চলে,
আর ভেবে নেয়—
সে একই মানুষ।

আমি অনেকবার
নিজেকে খুঁজতে বেরিয়েছি—
বইয়ের ভেতর,
ধর্মের ভেতর,
প্রেমের ভেতর,
সাফল্যের ভেতর,
পরাজয়ের ভেতর,
প্রশংসার ভেতর,
নিন্দার ভেতর,
প্রতিবারই কিছু পেয়েছি।

কিন্তু নিজেকে পাইনি।

তারপর একদিন
উত্তর খোঁজা ছেড়ে দিলাম,
চুপচাপ বসে রইলাম,
বাতাস বইছিল,
দূরে একটি পাখি ডাকছিল,
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে
গাছের গায়ে নেমে আসছিল।
সেই প্রথম মনে হলো—
হয়তো আমাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য
দৌড়ানোর দরকার নেই,
থেমে যাওয়ার দরকার।

কারণ মানুষ নিজেকে সামনে খুঁজে পায় না।
নিজেকে পায়
যখন সে আর কোথাও পৌঁছাতে চায় না।

আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,
"তুমি কে?"
আমি হয়তো আমার নাম বলব,
আমার পেশার কথা বলব,
আমার ঠিকানাও বলব,
কিন্তু জানব,
এসবের কোনোটাই সম্পূর্ণ উত্তর নয়।

আমার ভেতরে এখনও একটি শিশু
আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,
একজন কিশোর
নিজের ছায়াকে বুঝতে শিখছে,
একজন তরুণ প্রথম ভালোবাসার
ভাঙা শব্দ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে,
একজন মানুষ
প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে,
আর তাদের প্রত্যেকেই আমি,
আবার কেউই আমি নই।

হয়তো মানুষ কোনো স্থির পরিচয় নয়,
সে একটি চলমান প্রশ্ন,
একটি অসমাপ্ত যাত্রা,
একটি নদী,
যে সমুদ্রে পৌঁছেও
নিজের উৎসকে ঠিকঠাক মনে রাখে।

তাই আজ আর জানতে চাই না—
আমি কে?
শুধু জানতে চাই—
আমি কি প্রতিদিন
গতকালের চেয়ে
একটু বেশি সত্য হয়ে উঠছি?
কারণ নাম মানুষকে পরিচয় দেয়।
কিন্তু সত্য—
মানুষকে জন্ম দেয়।

হয়তো এটাই আমার উত্তর।

আমি কোনো সম্পূর্ণ মানুষ নই।
আমি সম্পূর্ণ হওয়ার পথে
একটি দীর্ঘ, নীরব,
অবিরাম যাত্রা।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4583
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1661
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1634
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1551
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1550
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1475
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1441
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1435
রমণী মোঃ আবু তালেব 1411
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1377
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1373
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1369
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1340
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1335
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1335
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1331
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1330
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1307
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1305
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1299
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
আমি কে? মোঃ আবু তালেব 28
প্রথম নীরবতা মোঃ আবু তালেব 28
প্রথম মিথ্যা মোঃ আবু তালেব 29
প্রথম লজ্জা মোঃ আবু তালেব 29
একা হওয়ার দিন মোঃ আবু তালেব 32
যে আমাকে কেউ দেখেনি মোঃ আবু তালেব 32
আমার ছায়া মোঃ আবু তালেব 40
আয়নার ভেতরের মানুষ মোঃ আবু তালেব 45
প্রথম প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 55
প্রথম ভয় মোঃ আবু তালেব 51
প্রথম আকাশ মোঃ আবু তালেব 59
বাবার হাত মোঃ আবু তালেব 60
মায়ের চোখ মোঃ আবু তালেব 55
যে ভাষা ছিল না মোঃ আবু তালেব 50
প্রথম কান্না মোঃ আবু তালেব 66
জন্মের পূর্বে মোঃ আবু তালেব 76
নামহীন স্পন্দন মোঃ আবু তালেব 60
প্রথম অন্ধকার মোঃ আবু তালেব 62
মায়ের নীরবতা মোঃ আবু তালেব 70
পৃথিবীর আগে মোঃ আবু তালেব 74
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 8
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 33
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 40
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 35
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 50
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 87
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 127
কিংবদন্তির বাহন আজাহার রাজা 117
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 116
ভালো মানুষ ইবনে আলী 219
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 128
শিকল ইবনে আলী 197
পৃথিবীতে কেবল ক্ষুধাই সত্য আজাহার রাজা 204
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 216
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 206
বসন্ত জয়দীপ রায় 228
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 149
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 285
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 261
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 275
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে