কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(অপ্রকাশ)

সব ভুলের বিচার হয় না।
সব অপরাধের শাস্তি হয় না।
আর সব ক্ষমাও
মানুষের ভাগ্যে লেখা থাকে না।

অনেক বছর আগে
একদিন সাহস করে বলেছিলাম —
"ক্ষমা করো।"
শব্দটা বলার আগে
আমার অহংকার ভেঙেছিল।
শব্দটা বলার পরে পৃথিবী দেখেছিল
আমার নীরবতা।

সে দীর্ঘক্ষণ
আমার দিকে তাকিয়ে ছিল,
তার চোখে রাগ ছিল না,
ঘৃণাও না,
ছিল শুধু এমন এক ক্লান্তি,
যা অনেকদিন ধরে
অপেক্ষা করতে করতে জন্মায়।

সে কিছুক্ষণ পরে বলল,
"আমি পারছি না।"
শুধু এই তিনটা শব্দ।
কোনো অভিযোগ নয়,
কোনো তর্ক নয়,
শুধু —
"আমি পারছি না।"
সেদিন প্রথম বুঝলাম,
ক্ষমা
কাউকে বাধ্য করে
আদায় করা যায় না,
ক্ষমা
ভালোবাসার মতোই স্বাধীন।

যে দিতে পারে,
সে দেয়।
যে পারে না,
তারও একটা ইতিহাস থাকে।

আমি অনেকদিন
তার ওপর অভিমান করেছিলাম।
ভাবতাম —
আমি তো ভুল স্বীকার করেছি,
তবু কেন?
আজ বুঝি —
ক্ষমা চাওয়া আমার কাজ।
ক্ষমা করা তার স্বাধীনতা।

মানুষ প্রায়ই
নিজের অনুতাপকে
অন্যের দায়িত্ব বানিয়ে ফেলে,
আমিও করেছিলাম।
আমরা ভুলে যাই,
যে ক্ষত আমি একদিন দিয়েছি,
তার ব্যথার সময়সূচি
আমার হাতে নয়।

আমি তো শুধু
একটা বাক্য বলেছি।
সে বহন করেছে
অনেকগুলো রাত,
অনেকগুলো নিঃশব্দ সকাল,
অনেকগুলো ভাঙা বিশ্বাস।
তাহলে
তার না-পারা কি অন্যায়?

একদিন নদীর ধারে বসে ছিলাম।
দেখলাম,
একটা শুকনো পাতা
বারবার জলে ভাসতে চায়,
কিন্তু একটা পাথরের পাশে
আটকে যাচ্ছে,
নদী তাকে টানছে,
পাথর তাকে ধরে রাখছে।

হয়তো মানুষের হৃদয়ও তেমন,
কিছু মানুষ
ক্ষমা করতে চায়,
কিন্তু স্মৃতি
তাদের হাত ছাড়ে না।

আজ আমি
সেই মানুষটার জন্য
আর কোনো অভিযোগ রাখি না।
কারণ আমি জানি,
যে ক্ষমা পাইনি,
সেটাও আমার শিক্ষকের মতো।
সে আমাকে শিখিয়েছে —
ভুল করার আগে দুবার ভাবতে।
কারণ
সব ভাঙা জিনিস জোড়া লাগে না।
সব ফিরে আসা
ফিরে পাওয়া নয়।

আজও
কখনো কখনো
সেই মুখটা মনে পড়ে।
তবে আমি আর মনে মনে বলি না —
"সে কেন আমাকে ক্ষমা করল না?"
আমি শুধু ভাবি —
"আমি যেন আর
কাউকে এমন জায়গায় না পৌঁছে দিই,
যেখানে ক্ষমা করাও
তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে যায়।"

হয়তো মানুষ
ক্ষমা পেয়েই বড় হয় না,
কখনো কখনো
না-পাওয়া ক্ষমার ভার নিয়েও
সে আরও বিনয়ী হয়ে ওঠে।
আজ আমার ভেতরে
একটা পুরোনো দরজা
চিরদিনের মতো বন্ধ।
আমি আর তাকে খুলি না।
দরজার ওপাশে
একজন মানুষ আছে,
যে আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি।
আর এপাশে
আমি আছি —
যে অবশেষে শিখেছে,
সব অনুতাপের শেষ
ক্ষমা নয়।

কিছু অনুতাপের শেষ দায়িত্ব হলো
নিজেকে এমন মানুষে পরিণত করা,
যার জন্য
আর কোনোদিন কাউকে বলতে না হয় —
"আমি পারছি না।"

যে ক্ষমা পাইনি

(অপ্রকাশ)

মানুষের জীবনে কিছু শব্দ
অদ্ভুতভাবে দেরি করে আসে।

তার মধ্যে সবচেয়ে ভারী শব্দটি —
"ক্ষমা করো।"

শব্দটা ছোট,
কিন্তু কখনো কখনো
একটা পুরো জীবনও
তার জন্য যথেষ্ট হয় না।

আমি অনেক ভুল করেছি,
কিছু ভুল বুঝে,
কিছু না বুঝে,
কিছু রাগে,
কিছু অহংকারে,
আর কিছু —
শুধু নীরব থেকে।

পৃথিবী আমাকে শিখিয়েছিল,
ভুল করলে যুক্তি দাও,
নিজেকে ব্যাখ্যা করো,
নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করো।
কিন্তু কেউ শেখায়নি,
কখন মাথা নিচু করতে হয়।

একদিন একজন মানুষকে
অকারণে কষ্ট দিয়েছিলাম।
সে কিছু বলেনি,
শুধু একটু চুপ হয়ে গিয়েছিল।
আমি ভেবেছিলাম,
চুপ থাকা মানেই
সব ঠিক হয়ে যাওয়া।
আজ বুঝি —
মানুষের সবচেয়ে গভীর ক্ষত
প্রায়ই শব্দহীন হয়।

আমি বলতে পারতাম —
"ক্ষমা করো।",
বলিনি।

ভাবলাম,
সময় নিজেই সব ঠিক করে দেবে।
সময় অনেক কিছু বদলায়,
কিন্তু সব ক্ষত সারায় না।
কিছু ক্ষত
সময়ের ভেতরেই
আরও গভীরে শিকড় গাড়ে।
আমার জীবনে
কিছু মুখ আছে,
যাদের সামনে দাঁড়ালে
আজও মনে হয় —
আমি একটা বাক্য
বহু বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি,
তারা হয়তো
আমাকে ভুলেই গেছে,
কিন্তু আমি
নিজেকে ভুলতে পারিনি।

ক্ষমা চাওয়া
নিজেকে ছোট করা নয়।
বরং
নিজের অহংকারকে
নিজের চেয়ে ছোট করে দেওয়া।
এই কথাটা বুঝতে
আমার অনেক বছর লেগেছে।
আমি দেখেছি
মানুষ ভাঙা সম্পর্ক জোড়ার জন্য
অনেক চেষ্টা করে,
কিন্তু একটা আন্তরিক
"আমি ভুল করেছি"
বলতে পারে না,
কারণ আমরা
হারানোর চেয়ে
নম্র হতে বেশি ভয় পাই।

আজ মনে হয়,
আমার জীবনের সবচেয়ে বড়
ব্যর্থতাগুলোর একটা
কোনো স্বপ্ন অপূর্ণ থাকা নয় —
কোনো মানুষের কাছে
সময় থাকতে
ক্ষমা না চাওয়া।
যাদের কাছে আমি দুঃখিত ছিলাম,
তাদের সবার কাছে
হয়তো আর পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কেউ দূরে চলে গেছে,
কেউ অন্য জীবনে,
কেউ হয়তো
এই পৃথিবীতেই নেই।
তবু আমি জানি,
সত্যিকারের ক্ষমা
শুধু অন্যের কাছে চাওয়া হয় না।
নিজের কাছেও চাইতে হয়।

কারণ অপরাধবোধ
মানুষকে শাস্তি দেয় না।
অস্বীকার করে।

আজ আমি
আমার ভেতরের সেই মানুষটার সামনে দাঁড়াই,
যে এত বছর ধরে
একটা বাক্য লুকিয়ে রেখেছিল।

আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলি —
"হ্যাঁ,
ভুলটা আমারই ছিল।"

অদ্ভুতভাবে
এই স্বীকারোক্তির পর
পৃথিবী বদলায় না।
আকাশ একই থাকে।
বাতাসও।

শুধু বুকের ভেতর
একটা বন্ধ দরজা
ধীরে ধীরে খুলে যায়।

হয়তো
ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্য
অতীত বদলানো নয় —
নিজের ভবিষ্যৎকে
একটু কম ভারী করা।

আর মানুষ
যেদিন প্রথম
নির্ভয়ে বলতে পারে —
"আমি দুঃখিত"—

সেদিনই
সে অন্যের কাছে নয়,
নিজের কাছেই
ফিরে আসতে শুরু করে।

যে ক্ষমা চাইনি

(অপ্রকাশ)

আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ চিঠিটি
কোনোদিন শেষ হয়নি।

আজও তার শেষ বাক্যের পরে
একটা সাদা জায়গা রয়ে গেছে।
সেই শূন্যটুকুই
হয়তো আমার সবচেয়ে সত্য লেখা।

চিঠিটি আমি কাকে লিখছিলাম,
এখন আর নিশ্চিত নই।
হয়তো মাকে,
হয়তো বাবাকে,
হয়তো এমন একজনকে,
যার কাছে পৌঁছানোর সাহস
আমার কোনোদিন হয়নি,
হয়তো নিজের কাছেই।

মানুষ যখন চিঠি লেখে,
সে আসলে
কাগজের সঙ্গে কথা বলে না,
সে সময়ের সঙ্গে কথা বলে।
সে বলতে চায় —
"যদি কোনোদিন আমি আর না থাকি,
তবু এই কথাগুলো
কোথাও বেঁচে থাকুক।"

প্রথম লাইন লিখেছিলাম
অনেক সহজভাবে,
তারপর দ্বিতীয়।
তারপর তৃতীয়।

কিন্তু যত গভীরে গিয়েছি,
তত বুঝেছি —
সবচেয়ে সত্য কথাগুলোর
কোনো ভাষা নেই,
কলম থেমে গেছে,
কাগজ অপেক্ষা করেছে।

আমি জানালার বাইরে তাকিয়েছি।
সন্ধ্যা নেমেছে।
তারপর রাত।
তারপর আরও অনেক বছর।

চিঠিটি আর শেষ হয়নি।

আমরা ভাবি,
অসমাপ্ত জিনিস মানেই ব্যর্থতা।
আমি তা মনে করি না।
কিছু অসমাপ্ততা
ইচ্ছাকৃত নয়,
তারা এত গভীর হয়
যে ভাষা তাদের
শেষ পর্যন্ত বহন করতে পারে না।

একজন বৃদ্ধ
ছেলের জন্য একটা বাক্য
বলতে চেয়েছিলেন,
বলেননি।
একজন মা
মেয়ের কপালে হাত রেখে
অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলেন,
সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল।
একজন প্রেমিক
বিদায়ের আগে
একটা শব্দ খুঁজছিল,
নীরবতাই আগে এসে দাঁড়িয়েছিল।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগারে
যদি কোনোদিন
সব অসমাপ্ত চিঠি
একত্র করা হয় —
তবে হয়তো দেখা যাবে,
মানুষ যা লিখেছে,
তার চেয়ে অনেক বেশি
সে লিখতে পারেনি।

আমার সেই চিঠির
শেষ পাতাটি আজও খালি।
মাঝে মাঝে সেটা খুলে বসি।
নতুন কিছু লিখি না।
শুধু সাদা অংশটার দিকে
তাকিয়ে থাকি।

আজ বুঝি,
চিঠির মূল্য
তার শেষ বাক্যে নয়,
তার সাহসে।
যে মানুষ
নিজের হৃদয়ের সামনে
একটা সাদা কাগজ খুলে বসতে পারে,
সে ইতিমধ্যেই
একটা সত্য উচ্চারণ করেছে।

চিঠিটি পাঠানো হয়নি,
তবু সে পৌঁছেছে।
ডাকবাক্সে নয় —
একটা জীবনের ভেতরে।

আমি এখন আর
চিঠিটি শেষ করতে চাই না,
কারণ কিছু লেখা
অসমাপ্ত বলেই সম্পূর্ণ।
যদি শেষ বাক্যটি লিখে ফেলি,
তবে হয়তো
তার ভেতরের অপেক্ষাটা
মরে যাবে।
আর মানুষ
অপেক্ষা ছাড়া
কখনো সত্যিকারের
ভালোবাসতে পারে না।

আজ আমার টেবিলের ড্রয়ারে
সেই পুরোনো কাগজটা আছে।
কালি কিছুটা ফিকে,
কাগজ কিছুটা হলুদ।
কিন্তু শেষের সাদা অংশটা
এখনো উজ্জ্বল।

সেখানে কোনো শব্দ নেই।
তবু আমি জানি,
আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য বাক্যটি
সেখানেই লেখা আছে —

যে বাক্যটি
আমি কোনোদিন লিখিনি।

অসমাপ্ত চিঠি

(অপ্রকাশ)

আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সম্পর্কটির
কোনো ইতিহাস নেই,
কোনো ছবি নেই,
কোনো চিঠি নেই,
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
শুধু একটা নীরবতা আছে,
যা আজও আমার সঙ্গে হাঁটে।

আমি তাকে কখনো বলিনি —
আমি তোমাকে ভালোবাসি।
সে-ও কোনোদিন জানতে চায়নি।
তবু আমাদের মাঝখানে
একটা সম্পূর্ণ জীবন
নিঃশব্দে পার হয়ে গেছে।

পৃথিবী মনে করে,
ভালোবাসা মানেই প্রকাশ।
আমি তা মনে করি না।
কিছু ভালোবাসা
উচ্চারণের মুহূর্তেই
ছোট হয়ে যায়।
তারা দূরত্বে বাঁচে,
নীরবতায় বাঁচে,
অসম্পূর্ণতায় বাঁচে।

একদিন বিকেলে
আমরা পাশাপাশি হাঁটছিলাম।
কথা হচ্ছিল অন্য বিষয় নিয়ে।
আকাশের কথা,
বৃষ্টির কথা,
বইয়ের কথা।
কেউ ভালোবাসার কথা বলেনি,
তবু বাড়ি ফিরে
আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি।

সেদিন প্রথম বুঝলাম,
কিছু অনুভূতি
ভাষার চেয়ে দ্রুত
হৃদয়ে পৌঁছে যায়।

জীবনে অনেক মানুষের সঙ্গে
দেখা হয়,
কেউ পাশে থাকে,
কেউ চলে যায়।
কিন্তু খুব কম মানুষ আছে,
যাদের অনুপস্থিতিও
এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে থাকে।

সে আমার জীবনে ছিল না,
তবু ছিল।
আমি তার কোনো অধিকার চাইনি,
কোনো প্রতিশ্রুতি না।
শুধু চাইতাম —
সে পৃথিবীতে ভালো থাকুক।
অদ্ভুত ব্যাপার —
মানুষ কখনো কখনো
নিজের সুখের চেয়েও
অন্যের শান্তি বেশি ভালোবাসে,
হয়তো সেই মুহূর্তেই
প্রেম
ভালো লাগাকে অতিক্রম করে।

অনেক বছর পরে
একটা ভিড়ের মধ্যে
আমি তাকে দেখেছিলাম।
সে আমাকে দেখেছিল কি না,
জানি না।
আমি এগিয়ে যাইনি।
সে-ও আসেনি।
আমাদের মাঝখানে
কয়েক কদম দূরত্ব ছিল,
আর কয়েকটা জন্মের নীরবতা।
আমি বুঝলাম,
সব সাক্ষাতের উদ্দেশ্য
কাছে আসা নয়,
কিছু সাক্ষাৎ
শুধু মনে করিয়ে দেয় —
হৃদয় কখনো ভুল করে না,
আমরা ভুলে যাই।

একদিন কেউ জিজ্ঞেস করেছিল,
"তুমি কি কোনোদিন
সত্যি ভালোবেসেছ?"
আমি হেসেছিলাম।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর
হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া যায় না,
কিছু উত্তর
মানুষ সারাজীবন বয়ে বেড়ায়।
আমিও বয়ে বেড়াচ্ছি।
তার নাম নয়,
তার মুখ নয়,
একটা অনুভূতি।

যে অনুভূতির কোনো ঠিকানা নেই,
তবু সে প্রতিদিন
আমার ভেতরে ফিরে আসে।
আজ বুঝি,
সব প্রেমের শেষ
একসঙ্গে থাকা নয়,
কিছু প্রেমের শেষ কৃতজ্ঞতা,
কিছু প্রেমের শেষ প্রার্থনা,
আর কিছু প্রেমের শেষ
একটা নীরব আশীর্বাদ —
"তুমি সুখে থেকো।
আমার প্রয়োজন নেই,
তোমার শান্তিই যথেষ্ট।"

হয়তো এ কারণেই
আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রেমটি
কোনো সম্পর্ক হয়ে ওঠেনি,
সে একটা আলো হয়ে থেকেছে।
দূরে।
নিভে যায়নি।
ছুঁয়ে দেখিনি।

তবু তার আলোয়
আমার ভেতরের অনেক অন্ধকার
পথ চিনে নিয়েছে।
আজও যখন
নিজেকে প্রশ্ন করি —
সবচেয়ে সত্য ভালোবাসা কোনটি?
আমি কোনো নাম মনে করি না,
শুধু একটা নীরব উপস্থিতি
অনুভব করি।

যে আমাকে কখনো পায়নি,
আমিও তাকে পাইনি।
তবু আমরা
একে অপরের জীবনে
সবচেয়ে দীর্ঘ
অপ্রকাশিত বাক্য হয়ে
রয়ে গেছি।

গোপন প্রেম

(অপ্রকাশ)

সব কান্নার শব্দ হয় না।
সব অশ্রু চোখ দিয়ে নামে না।

মানুষের সবচেয়ে গভীর কান্নাগুলো
প্রায়ই মুখে হাসি নিয়ে
বেঁচে থাকে।

ছোটবেলায় ভাবতাম,
যে কাঁদে, সেই দুঃখী।

পরে দেখলাম —
অনেক মানুষ কাঁদে না বলেই
তাদের দুঃখ সবচেয়ে দীর্ঘ হয়।

একবার বাবাকে দেখেছিলাম
একটা পুরোনো চেয়ারে
চুপ করে বসে থাকতে।

তার চোখে জল ছিল না।
কিন্তু সেদিন ঘরের নীরবতাই
তার হয়ে কেঁদেছিল।

একবার মাকে দেখেছিলাম,
রান্না করতে করতে
হঠাৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে।
কয়েক মুহূর্ত।
তারপর আবার
আগের মতো কাজে ফিরে গেলেন।

সেদিন বুঝিনি,
আজ বুঝি —
কিছু মানুষ
কান্নার জন্যও সময় পায় না।

আমরা মানুষের চোখ দেখি,
কিন্তু তার ভেতরের সমুদ্র দেখি না।

আমরা তার হাসি শুনি,
কিন্তু সেই হাসির নিচে
কতগুলো ভাঙা স্বপ্ন
চাপা পড়ে আছে,
তার হিসাব রাখি না!

পৃথিবীতে সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষটা
সে নয়,
যার পাশে কেউ নেই।
সে —
যার কান্না দেখার মতো
একজন মানুষও নেই।

একদিন খুব ইচ্ছে করছিল কাঁদতে।
কারণও ছিল।
শব্দও ছিল।
অশ্রুও ছিল।

কিন্তু চারপাশে এত মানুষ ছিল
যে আমি কাঁদতে পারিনি।
সেদিন প্রথম বুঝলাম —
ভিড়ও মানুষের কান্না চুরি করে।

সেই রাতে
আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম,
চোখ দুটো শুকনো।
তবু মনে হচ্ছিল,
আমার ভেতরে কোথাও
অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে
মানুষ কান্নার
নতুন নতুন পদ্ধতি শিখে ফেলে।

কেউ অতিরিক্ত কাজ করে,
কেউ সারারাত জেগে থাকে,
কেউ অকারণে হেসে ওঠে,
কেউ হঠাৎ খুব নীরব হয়ে যায়।

আমরা ভাবি,
তারা শুধু বদলে গেছে।
আসলে তারা কাঁদছে —
শুধু চোখ দিয়ে নয়,
জীবন দিয়ে।

আমি এখন বিশ্বাস করি,
অশ্রু মানুষের একমাত্র কান্না নয়,
একটা অসমাপ্ত চিঠিও কান্না,
একটা ফাঁকা চেয়ারও কান্না,
পুরোনো জামার পকেটে পাওয়া
একটা বাসের টিকিটও কান্না,
বহু বছর পর হঠাৎ
একটা পরিচিত গন্ধে
থেমে যাওয়াও কান্না।

মানুষ যতদিন ভালোবাসবে,
ততদিন কাঁদবে।
আর যতদিন কাঁদবে,
ততদিন সব কান্না
পৃথিবী দেখতে পাবে না।
কারণ কিছু কান্না
স্রষ্টার জন্য নয়,
মানুষের জন্যও নয়।

সেগুলো জন্মায়
একটা হৃদয়ের গভীরে,
এবং সেখানেই
নিঃশব্দে মিশে যায়।

আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে,
আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর কান্না কোনটি?
আমি কোনো দিনের কথা বলব না।
কোনো মানুষের নামও না।

আমি শুধু বলব —
সেই কান্নাটি,
যার কথা কেউ জানে না,
যে কান্নার কোনো ছবি নেই,
কোনো সাক্ষী নেই,
কোনো সমবেদনা নেই,
তবু সেই কান্নাই
আমাকে সবচেয়ে বেশি
মানুষ করেছে।

হয়তো মানুষ
চোখের জলে বড় হয় না,
মানুষ বড় হয়
তার অদেখা কান্নাগুলোর
ভেতর দিয়ে।

আর সেই কান্নাগুলোই
নিঃশব্দে
তার আত্মার ভাষা
লিখে যায়।

অদেখা কান্না

বাছাইকৃত কবিতা

যে ক্ষমা পাইনি

- মোঃ আবু তালেব

(অপ্রকাশ)

সব ভুলের বিচার হয় না।
সব অপরাধের শাস্তি হয় না।
আর সব ক্ষমাও
মানুষের ভাগ্যে লেখা থাকে না।

অনেক বছর আগে
একদিন সাহস করে বলেছিলাম —
"ক্ষমা করো।"
শব্দটা বলার আগে
আমার অহংকার ভেঙেছিল।
শব্দটা বলার পরে পৃথিবী দেখেছিল
আমার নীরবতা।

সে দীর্ঘক্ষণ
আমার দিকে তাকিয়ে ছিল,
তার চোখে রাগ ছিল না,
ঘৃণাও না,
ছিল শুধু এমন এক ক্লান্তি,
যা অনেকদিন ধরে
অপেক্ষা করতে করতে জন্মায়।

সে কিছুক্ষণ পরে বলল,
"আমি পারছি না।"
শুধু এই তিনটা শব্দ।
কোনো অভিযোগ নয়,
কোনো তর্ক নয়,
শুধু —
"আমি পারছি না।"
সেদিন প্রথম বুঝলাম,
ক্ষমা
কাউকে বাধ্য করে
আদায় করা যায় না,
ক্ষমা
ভালোবাসার মতোই স্বাধীন।

যে দিতে পারে,
সে দেয়।
যে পারে না,
তারও একটা ইতিহাস থাকে।

আমি অনেকদিন
তার ওপর অভিমান করেছিলাম।
ভাবতাম —
আমি তো ভুল স্বীকার করেছি,
তবু কেন?
আজ বুঝি —
ক্ষমা চাওয়া আমার কাজ।
ক্ষমা করা তার স্বাধীনতা।

মানুষ প্রায়ই
নিজের অনুতাপকে
অন্যের দায়িত্ব বানিয়ে ফেলে,
আমিও করেছিলাম।
আমরা ভুলে যাই,
যে ক্ষত আমি একদিন দিয়েছি,
তার ব্যথার সময়সূচি
আমার হাতে নয়।

আমি তো শুধু
একটা বাক্য বলেছি।
সে বহন করেছে
অনেকগুলো রাত,
অনেকগুলো নিঃশব্দ সকাল,
অনেকগুলো ভাঙা বিশ্বাস।
তাহলে
তার না-পারা কি অন্যায়?

একদিন নদীর ধারে বসে ছিলাম।
দেখলাম,
একটা শুকনো পাতা
বারবার জলে ভাসতে চায়,
কিন্তু একটা পাথরের পাশে
আটকে যাচ্ছে,
নদী তাকে টানছে,
পাথর তাকে ধরে রাখছে।

হয়তো মানুষের হৃদয়ও তেমন,
কিছু মানুষ
ক্ষমা করতে চায়,
কিন্তু স্মৃতি
তাদের হাত ছাড়ে না।

আজ আমি
সেই মানুষটার জন্য
আর কোনো অভিযোগ রাখি না।
কারণ আমি জানি,
যে ক্ষমা পাইনি,
সেটাও আমার শিক্ষকের মতো।
সে আমাকে শিখিয়েছে —
ভুল করার আগে দুবার ভাবতে।
কারণ
সব ভাঙা জিনিস জোড়া লাগে না।
সব ফিরে আসা
ফিরে পাওয়া নয়।

আজও
কখনো কখনো
সেই মুখটা মনে পড়ে।
তবে আমি আর মনে মনে বলি না —
"সে কেন আমাকে ক্ষমা করল না?"
আমি শুধু ভাবি —
"আমি যেন আর
কাউকে এমন জায়গায় না পৌঁছে দিই,
যেখানে ক্ষমা করাও
তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে যায়।"

হয়তো মানুষ
ক্ষমা পেয়েই বড় হয় না,
কখনো কখনো
না-পাওয়া ক্ষমার ভার নিয়েও
সে আরও বিনয়ী হয়ে ওঠে।
আজ আমার ভেতরে
একটা পুরোনো দরজা
চিরদিনের মতো বন্ধ।
আমি আর তাকে খুলি না।
দরজার ওপাশে
একজন মানুষ আছে,
যে আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি।
আর এপাশে
আমি আছি —
যে অবশেষে শিখেছে,
সব অনুতাপের শেষ
ক্ষমা নয়।

কিছু অনুতাপের শেষ দায়িত্ব হলো
নিজেকে এমন মানুষে পরিণত করা,
যার জন্য
আর কোনোদিন কাউকে বলতে না হয় —
"আমি পারছি না।"
বিস্তারিত...

যে ক্ষমা চাইনি

- মোঃ আবু তালেব

(অপ্রকাশ)

মানুষের জীবনে কিছু শব্দ
অদ্ভুতভাবে দেরি করে আসে।

তার মধ্যে সবচেয়ে ভারী শব্দটি —
"ক্ষমা করো।"

শব্দটা ছোট,
কিন্তু কখনো কখনো
একটা পুরো জীবনও
তার জন্য যথেষ্ট হয় না।

আমি অনেক ভুল করেছি,
কিছু ভুল বুঝে,
কিছু না বুঝে,
কিছু রাগে,
কিছু অহংকারে,
আর কিছু —
শুধু নীরব থেকে।

পৃথিবী আমাকে শিখিয়েছিল,
ভুল করলে যুক্তি দাও,
নিজেকে ব্যাখ্যা করো,
নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করো।
কিন্তু কেউ শেখায়নি,
কখন মাথা নিচু করতে হয়।

একদিন একজন মানুষকে
অকারণে কষ্ট দিয়েছিলাম।
সে কিছু বলেনি,
শুধু একটু চুপ হয়ে গিয়েছিল।
আমি ভেবেছিলাম,
চুপ থাকা মানেই
সব ঠিক হয়ে যাওয়া।
আজ বুঝি —
মানুষের সবচেয়ে গভীর ক্ষত
প্রায়ই শব্দহীন হয়।

আমি বলতে পারতাম —
"ক্ষমা করো।",
বলিনি।

ভাবলাম,
সময় নিজেই সব ঠিক করে দেবে।
সময় অনেক কিছু বদলায়,
কিন্তু সব ক্ষত সারায় না।
কিছু ক্ষত
সময়ের ভেতরেই
আরও গভীরে শিকড় গাড়ে।
আমার জীবনে
কিছু মুখ আছে,
যাদের সামনে দাঁড়ালে
আজও মনে হয় —
আমি একটা বাক্য
বহু বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি,
তারা হয়তো
আমাকে ভুলেই গেছে,
কিন্তু আমি
নিজেকে ভুলতে পারিনি।

ক্ষমা চাওয়া
নিজেকে ছোট করা নয়।
বরং
নিজের অহংকারকে
নিজের চেয়ে ছোট করে দেওয়া।
এই কথাটা বুঝতে
আমার অনেক বছর লেগেছে।
আমি দেখেছি
মানুষ ভাঙা সম্পর্ক জোড়ার জন্য
অনেক চেষ্টা করে,
কিন্তু একটা আন্তরিক
"আমি ভুল করেছি"
বলতে পারে না,
কারণ আমরা
হারানোর চেয়ে
নম্র হতে বেশি ভয় পাই।

আজ মনে হয়,
আমার জীবনের সবচেয়ে বড়
ব্যর্থতাগুলোর একটা
কোনো স্বপ্ন অপূর্ণ থাকা নয় —
কোনো মানুষের কাছে
সময় থাকতে
ক্ষমা না চাওয়া।
যাদের কাছে আমি দুঃখিত ছিলাম,
তাদের সবার কাছে
হয়তো আর পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কেউ দূরে চলে গেছে,
কেউ অন্য জীবনে,
কেউ হয়তো
এই পৃথিবীতেই নেই।
তবু আমি জানি,
সত্যিকারের ক্ষমা
শুধু অন্যের কাছে চাওয়া হয় না।
নিজের কাছেও চাইতে হয়।

কারণ অপরাধবোধ
মানুষকে শাস্তি দেয় না।
অস্বীকার করে।

আজ আমি
আমার ভেতরের সেই মানুষটার সামনে দাঁড়াই,
যে এত বছর ধরে
একটা বাক্য লুকিয়ে রেখেছিল।

আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলি —
"হ্যাঁ,
ভুলটা আমারই ছিল।"

অদ্ভুতভাবে
এই স্বীকারোক্তির পর
পৃথিবী বদলায় না।
আকাশ একই থাকে।
বাতাসও।

শুধু বুকের ভেতর
একটা বন্ধ দরজা
ধীরে ধীরে খুলে যায়।

হয়তো
ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্য
অতীত বদলানো নয় —
নিজের ভবিষ্যৎকে
একটু কম ভারী করা।

আর মানুষ
যেদিন প্রথম
নির্ভয়ে বলতে পারে —
"আমি দুঃখিত"—

সেদিনই
সে অন্যের কাছে নয়,
নিজের কাছেই
ফিরে আসতে শুরু করে।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4597
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1671
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1642
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1562
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1558
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1485
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1451
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1443
রমণী মোঃ আবু তালেব 1420
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1385
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1383
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1383
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1345
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1341
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1340
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1339
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1338
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1322
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1312
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1310
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
যে ক্ষমা পাইনি মোঃ আবু তালেব 5
যে ক্ষমা চাইনি মোঃ আবু তালেব 10
অসমাপ্ত চিঠি মোঃ আবু তালেব 19
গোপন প্রেম মোঃ আবু তালেব 17
অদেখা কান্না মোঃ আবু তালেব 18
যে কথাটি বলিনি মোঃ আবু তালেব 17
আমি কে? মোঃ আবু তালেব 61
প্রথম নীরবতা মোঃ আবু তালেব 50
প্রথম মিথ্যা মোঃ আবু তালেব 53
প্রথম লজ্জা মোঃ আবু তালেব 48
একা হওয়ার দিন মোঃ আবু তালেব 53
যে আমাকে কেউ দেখেনি মোঃ আবু তালেব 53
আমার ছায়া মোঃ আবু তালেব 61
আয়নার ভেতরের মানুষ মোঃ আবু তালেব 63
প্রথম প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 70
প্রথম ভয় মোঃ আবু তালেব 77
প্রথম আকাশ মোঃ আবু তালেব 92
বাবার হাত মোঃ আবু তালেব 71
মায়ের চোখ মোঃ আবু তালেব 67
যে ভাষা ছিল না মোঃ আবু তালেব 63
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 48
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 52
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 61
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 56
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 66
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 102
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 134
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 131
ভালো মানুষ ইবনে আলী 231
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 132
শিকল ইবনে আলী 204
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 235
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 219
বসন্ত জয়দীপ রায় 239
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 155
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 293
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 271
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 284
সোনার দেশ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 303
মুসলিম সংখ্যালঘু শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 248
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে