(মানুষ)
পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য প্রাণী
পাখি নয়,
তিমি নয়,
নক্ষত্রও নয়,
মানুষ।
কারণ
সে মাটি দিয়ে তৈরি,
তবু সারাজীবন
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার শরীরে
নদীর মতো রক্ত,
পাহাড়ের মতো অস্থি,
বাতাসের মতো শ্বাস,
আগুনের মতো ক্ষুধা।
আর এক অদ্ভুত শূন্যতা —
যার কোনো নাম নেই।
মানুষ
একটা জন্ম নিয়ে আসে,
কিন্তু
অসংখ্য মৃত্যুর ভেতর দিয়ে
ধীরে ধীরে
নিজেকে তৈরি করে।
একটা বিশ্বাস মরে,
একটা অহংকার মরে,
একটা প্রেম মরে,
একটা ভয় মরে,
একটা স্বপ্ন মরে।
তবু
সে প্রতিটা ভাঙনের পরে
নিজের ভেতর
আরেকটা ভোর আবিষ্কার করে।
এই জন্যই
মানুষকে
কোনো অভিধান দিয়ে
সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
একজন মানুষ
একটা চলমান মহাবিশ্ব।
তার চোখে
যতটা জল,
তার চেয়েও বেশি
অদেখা সমুদ্র।
তার নীরবতায়
যতটা অন্ধকার,
তার চেয়েও বেশি
অজন্মা ভাষা।
তার হাসিতে
যতটা আনন্দ,
তার চেয়েও বেশি
বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত।
আমি
একজন মানুষের হাত ধরেছিলাম।
হাতটা
শীতের সকালে
পুরোনো গাছের বাকলের মতো রুক্ষ।
তবু
সেই হাতের উষ্ণতায়
আমি বুঝলাম,
ত্বক
কোনোদিন
মানুষের শেষ পরিচয় নয়।
আরেকদিন
একজন অপরিচিত মানুষের কান্না শুনে
আমার নিজের চোখ ভিজে উঠল।
সেদিন
প্রথম জানলাম,
রক্তের সম্পর্কেরও
একটা সীমা আছে।
কিন্তু
ব্যথার সম্পর্কের
কোনো সীমানা নেই।
একটা শিশু
প্রথমবার
মাটিতে পড়ে গিয়ে
আবার উঠে দাঁড়ায়।
একজন বৃদ্ধ
শেষবার
বিছানা থেকে উঠতে না পেরে
জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
দুই দৃশ্যের মাঝখানে
পুরো মানবসভ্যতা।
একটা ওঠা।
একটা না-ওঠা।
তবু
দুজনের চোখেই
একই আলো।
আমরা
মানুষকে
তার নাম দিয়ে ডাকি।
পেশা দিয়ে ডাকি।
ধর্ম দিয়ে ডাকি।
জাতি দিয়ে ডাকি।
পাসপোর্ট দিয়ে ডাকি।
কিন্তু
পৃথিবী
এভাবে কাউকে চেনে না।
বৃষ্টি
কোনো ধর্মে পড়ে না।
সূর্য
কোনো ভাষায় ওঠে না।
মৃত্যু
কোনো সীমান্তে থামে না।
তাহলে
মানুষ কেন
নিজেকে
এত ছোট ছোট দেয়ালে
ভাগ করে?
হয়তো
সে ভুলে গেছে,
তার প্রথম পরিচয়
কোনো নাম ছিল না।
ছিল
একটা কান্না।
আর শেষ পরিচয়ও
কোনো নাম হবে না।
হবে
একটা দীর্ঘ নীরবতা।
এই দুই নীরবতার মাঝখানে
সে
একটা জীবন পায়।
এই সামান্য সময়ে
সে ঘর বানায়।
আবার ভেঙে ফেলে।
সে ভালোবাসে।
আবার হারায়।
সে যুদ্ধ শুরু করে।
আবার শান্তির জন্য
সন্তানের নাম রাখে।
সে গাছ কাটে।
আবার
মৃত মানুষের নামে
একটা চারা রোপণ করে।
সে ভুল করে।
তারপর
ক্ষমা চাইতে শেখে।
সে কাঁদে।
তারপর
অন্যের চোখ মুছে দেয়।
এই দ্বন্দ্বের নামই
মানুষ।
সে অসম্পূর্ণ।
তাই সুন্দর।
সে ভঙ্গুর।
তাই স্পর্শযোগ্য।
সে ক্ষণস্থায়ী।
তাই মূল্যবান।
আমি বহুদিন
মানুষকে খুঁজেছি
বইয়ের ভেতর।
মন্দিরে।
মসজিদে।
গির্জায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে।
যুদ্ধক্ষেত্রে।
আদালতে।
কবিতায়।
শেষে
একদিন
একটা ক্ষুধার্ত শিশু
নিজের রুটির অর্ধেক
আরও ক্ষুধার্ত একটা কুকুরকে
দিয়ে দিল।
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।
আরেকদিন
একজন নার্স
সারা রাত
একজন অচেনা বৃদ্ধের হাত ধরে
বসে ছিলেন।
ভোর হলে
বৃদ্ধটি আর জাগলেন না।
তবু
নার্সের হাত
অনেকক্ষণ ছাড়েনি,
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।
আবার
একজন বন্দি
বহু বছর পরে
কারাগার থেকে বেরিয়ে
প্রথমে
আকাশের দিকে তাকাল।
কোনো অভিযোগ করল না।
শুধু
গভীর শ্বাস নিল।
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।
আজ
আমি জানি,
মানুষ
কোনো উত্তর নয়।
মানুষ,
স্রষ্টারও
সবচেয়ে সাহসী প্রশ্ন।
যার উত্তর
একটা জীবনে
সম্পূর্ণ লেখা যায় না।
তাই
প্রতিটা নবজাতক
সেই উত্তর
আবার লিখতে আসে।
আর
প্রতিটা মৃত্যু
অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির মতো
নীরবে
বন্ধ হয়ে যায়।
হয়তো
এই কারণেই
মানুষ
পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
অলৌকিক ঘটনা।
কারণ
সে জানে —
সে একদিন চলে যাবে।
তবু
সে একটা গাছ লাগায়।
একটা সন্তানকে
সত্য শেখায়।
একটা কবিতা লেখে।
একটা অচেনা মানুষকে
ক্ষমা করে।
একটা প্রদীপ জ্বালায়।
আর
নিজের সমস্ত ক্ষণস্থায়িত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
নিঃশব্দে ঘোষণা করে —
"আমি ছিলাম।
আমি ভালোবেসেছিলাম।
আমি সম্পূর্ণ হতে পারিনি।
তবু আমি মানুষ-ই ছিলাম।"
বিস্তারিত...