অপেক্ষার ঘর
- মোঃ আবু তালেব
(ভালবাসা)
বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে বহুদিন।
নতুন মালিক দেয়ালে সাদা রং করেছে,
পুরোনো ক্যালেন্ডার নামিয়ে
তার জায়গায় টাঙিয়েছে অন্য একটি বছর।
শুধু রান্নাঘরের তাকের কোণে
একটি নীল কাপ পড়ে আছে—
কেউ জানে না,
কার জন্য।
আমি জানি...
এক দুপুরে
তুমি সেই কাপে চা খেতে খেতে বলেছিলে,
“চিনি একটু কম হয়েছে।”
আমি হেসে বলেছিলাম,
“তবু তো খাচ্ছ।”
তুমি বলেছিলে,
“তোমার বানানো বলে।”
কথাটা এত সাধারণ ছিল
যে সেদিন
তার ভেতরে কোনো ভবিষ্যৎ খুজিনি।
এখন বুঝি,
জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বাক্যগুলো
সাধারণ কথার পোশাক পরেই আসে।
সেই বাড়িতে
একটি ঘড়ি ছিল।
ঘড়িটি এখনো চলছে কি না জানি না।
কিন্তু মাঝরাতে কখনো কখনো
আমার মনে হয়,
তার কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছে
সেই একই দেয়ালের ওপর দিয়ে
যেখানে তুমি শেষবার
তোমার ওড়না শুকোতে দিয়েছিলে।
কত অদ্ভুত—
মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তার ব্যবহার করা জিনিসগুলো
কিছুদিন পৃথিবীর কাছে
তার হয়ে বেঁচে থাকে।
একটি কাপ,
একটি চিরুনি,
বালিশের নিচে ভুলে যাওয়া চুলের ক্লিপ,
বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে যাওয়া একটি পাতা।
তারপর একদিন
এসবও অচেনা হয়ে যায়,
শুধু অপেক্ষা ছাড়া!
আজও কোনো দরজায়
দুবার কড়া নাড়ার শব্দ শুনলে
আমার বুকের ভেতর
একটি পুরোনো ঘর জেগে ওঠে,
আমি দরজা খুলি না।
কারণ জানি,
যে মানুষটির জন্য
দরজা একদিন খুলতে চেয়েছিলাম,
সে এখন আর আমার দরজার
ঠিকানা জানে না।
তবু আশ্চর্য—
কোনো কোনো বিকেলে
সূর্যের আলো যখন
মেঝের ওপর এসে পড়ে,
আমি সেই আলোর মধ্যে
একটি চেয়ার দেখি।
চেয়ারটি খালি।
তবু মনে হয়
কেউ বসে আছে।
হয়তো স্মৃতি এমনই—
যাকে আমরা হারিয়েছি
তার শরীর নয়,
তার বসে থাকার ভঙ্গিটুকু
আমাদের মধ্যে রেখে যায়।
সন্ধ্যা নামে।
দোকানগুলো
এক এক করে বন্ধ হয়।
কেউ বাড়ি ফেরে
সবজি হাতে,
কেউ শিশুর হাত ধরে,
কেউ দিনের ক্লান্তি
কাঁধে নিয়ে।
আর আমি ভাবি—
একটি মানুষকে হারানোর পর
তার জন্য অপেক্ষা করা
আসলে কি তার ফিরে আসার আশা?
নাকি
নিজের জীবনের সেই ঘরটিতে
শেষবারের মতো ফিরে যাওয়া,
যেখানে একদিন
আমরা দুজনেই ছিলাম?
আজ দরজায় তালা।
চাবিটা আমার কাছে নেই।
তবু মাঝে মাঝে
স্বপ্নের মধ্যে
আমি সেই বাড়িতে ঢুকে পড়ি।
নীল কাপটি টেবিলে।
জানালা খোলা।
চুলোর ওপর
চা ফুটছে।
তুমি অন্য ঘর থেকে বলছ—
“এত দেরি করলে কেন?”
আমি কোনো উত্তর দিই না,
শুধু দাঁড়িয়ে থাকি।
কারণ ঘুম ভাঙার আগে
আমি জানি—
এইবারও
আমার যাবার সময় হয়ে গেছে।
বিস্তারিত...