কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(শৈশব)

আমার জীবনের প্রথম ছায়া
ছিল একটা হাত।

সেই হাতে কোনো অলৌকিক শক্তি ছিল না।
ছিল না রাজদণ্ড, ছিল না ক্ষমতা,
ইতিহাসের কোনো গৌরব ছিল না।

ছিল শুধু শক্ত হয়ে ওঠা চামড়া,
আঙুলের ফাঁকে জমে থাকা শ্রম,
আর এমন এক নীরবতা —
যা কোনোদিন নিজের কথা বলেনি।

হাঁটতে শেখার আগে
বাবার হাত আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছিল।

আমি পৃথিবীকে চিনতাম না।
তিনি চিনতেন।
তাই আমি পথকে ভয় পাইনি!

কারণ আমি পথে হাঁটিনি —
আমি একটা হাতের ভেতর দিয়ে
পৃথিবীতে ঢুকেছিলাম।

ছোটবেলায় ভাবতাম,
বাবারা কখনো ক্লান্ত হন না।

সকালে বের হন।
রাতে ফেরেন।
খেয়ে নেন।
চুপ করে বসে থাকেন।
আবার ভোর হয়।

জানতাম না,
মানুষের ক্লান্তিরও একটা ভদ্রতা আছে।
যারা সংসারকে ভালোবাসে,
তারা প্রায়ই নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রাখে।

প্রথম বুঝেছিলাম
এক বর্ষার সন্ধ্যায়।
বাবা ভিজে ফিরেছিলেন,
জামা থেকে টপটপ পানি পড়ছিল।
তিনি প্রথমে নিজের কাপড় বদলাননি —
প্রথমে আমার স্কুলব্যাগটা
শুকনো জায়গায় তুলে রেখেছিলেন।

সেদিন দেখেছিলাম —
একজন মানুষ নিজের শরীরের আগে
আরেকজন মানুষের আগামীকাল
বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
বাবারা হয়তো এভাবেই ভালোবাসেন।
শব্দ দিয়ে নয় —
অগ্রাধিকার দিয়ে।

মনে পড়ে,
রাস্তা পার হওয়ার সময়
বাবা আমার হাত ধরতেন।
আজ এত বছর পরে বুঝি —
তিনি আমার হাত ধরতেন না,
তিনি আমার ভয়টা ধরে রাখতেন।

আমি পড়ে গেলে তুলতেন।
কিন্তু কখনো এমনভাবে তুলতেন না,
যাতে আমি হাঁটতে ভুলে যাই।

তিনি জানতেন —
বেশি আশ্রয় মানুষকে দুর্বল করে।
আর সময়মতো ছেড়ে দেওয়া,
সেও ভালোবাসার একটা ভাষা।

বড় হতে হতে
আমরা বাবার হাত ছেড়ে দিই।
ভাবি — এখন একাই পারব।

তারপর একদিন বুঝি —
হাতটা আমরা ছাড়িনি।
সময় ছাড়িয়ে দিয়েছে।

বাবার হাত
ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করে।
যে হাত একদিন আমাকে কাঁধে তুলে
পৃথিবী দেখিয়েছিল,
সেই হাত একদিন
এক গ্লাস পানি ধরতেও
একটু সময় নেয়।

সেদিন পৃথিবী হঠাৎ বদলে যায়।

আমি প্রথমবার বাবার হাত ধরি।
আর অবাক হয়ে দেখি —
তাঁর হাত এখনো আগের মতোই বড়।
শুধু শক্তিটা বদলে গেছে।

তখন বুঝলাম —
শক্তি কখনো মাংসপেশিতে থাকে না।
শক্তি থাকে দায়িত্বে।

একদিন বাবা আমার পাশে থাকবেন না।
এ কথা আমি জানি।

তবু আজও
কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের আগে
অদ্ভুতভাবে মনে হয় —
যদি একবার সেই হাতটা
আমার কাঁধে এসে পড়ত।

কিছু কথা মানুষ সারাজীবন শোনে না।
কিছু হাত মানুষ সারাজীবন ভুলতে পারে না।

জানি না,
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গার নাম কী!
কিন্তু আমার শৈশবে-
তার একটা আকার ছিল।
পাঁচটা আঙুল ছিল।
কঠিন ছিল।
রুক্ষ ছিল।
উষ্ণ ছিল।

সেই হাত আমাকে
শুধু হাঁটতে শেখায়নি।
শিখিয়েছিল —
ভালোবাসা সবসময় কোমল হয় না।

কখনো কখনো ভালোবাসা
একটা রুক্ষ হাত —
যে নিজের সমস্ত ব্যথা লুকিয়ে রেখে
তোমার পড়ে যাওয়ার আগেই
নিঃশব্দে সামনে এগিয়ে আসে।

বাবার হাত

(শৈশব)

আমি পৃথিবীকে দেখার আগে
দুটি চোখ আমাকে দেখে নিয়েছিল।

সেই চোখের ইতিহাস আমি জানি না —
জানি না, আমার জন্মের আগে
কত রাত সে একা জেগেছিল,
কত ভয় নিঃশব্দে গিলে ফেলেছিল,
কত অসমাপ্ত স্বপ্ন ভাঁজ করে
তুলে রেখেছিল আমার জন্য।

শুধু জানি —
আমি যখন প্রথম তাকাই পৃথিবীর দিকে,
পৃথিবী তখন
মায়ের চোখ দিয়েই আমাকে দেখছিল।

শিশু পৃথিবীকে সরাসরি বিশ্বাস করে না।
সে আগে একজন মানুষকে বিশ্বাস করে।

আমার কাছে সেই মানুষ ছিল মা।

তিনি হাসলে
পৃথিবীকে নিরাপদ মনে হতো।
তিনি চুপ হয়ে গেলে
ঘরের বাতাসও ভারী হয়ে আসত।

তখনো আমি দুঃখ শব্দটা জানতাম না।
কিন্তু মায়ের চোখে
দুঃখ চিনতে শিখে গিয়েছিলাম।

মানুষের প্রথম বিদ্যালয় কোনো স্কুল নয়।
মানুষের প্রথম বিদ্যালয়
তার মায়ের চোখ।

সেখানেই সে শেখে —
ভালোবাসা কীভাবে কাউকে ছুঁয়ে থাকে,
অপেক্ষা কীভাবে একটা বিকেলকে দীর্ঘ করে,
আর ভয় কীভাবে
নিজের মুখ লুকিয়ে রাখে।

আমি কখনো মাকে বড় বড় কথা বলতে শুনিনি।
জীবন নিয়ে তিনি কোনো বক্তৃতা দেননি।

শুধু দেখেছি —
ভাত কম পড়লে
নিজের থালাটা নিঃশব্দে ছোট করে নিতেন।

দেখেছি —
জ্বরের রাতে আমার কপালে হাত রেখে
আকাশের দিকে তাকাতেন,
কাউকে কিছু না বলে।

দেখেছি —
সবচেয়ে কঠিন দিনেও
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
সন্ধ্যার আলো নিভে যেতে দেখতেন।

তখন বুঝিনি।
এখন বুঝি —

কেউ কাঁদে চোখের জলে।
কেউ কাঁদে
চোখের ভেতরের আলো
একটু একটু করে নিভিয়ে।

আমার মা ছিলেন দ্বিতীয় দলে।

বড় হতে হতে অনেক চোখ দেখেছি।
সাফল্যের চোখ। অহংকারের চোখ।
লোভের চোখ। প্রেমের চোখ।
পরাজয়ের চোখ।

কিন্তু মায়ের চোখের মতো চোখ
আর দেখিনি।

সেখানে বিচার ছিল না।
ছিল আশ্রয়।

ভুল করলে তিনি প্রথমে রাগ করতেন না —
প্রথমে শুধু তাকিয়ে থাকতেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো
শব্দে করা হয় না।
কিছু প্রশ্ন
শুধু একটা দৃষ্টি হয়ে দাঁড়ায় সামনে।
আর কিছু উত্তর
শুধু মাথা নিচু করে দেওয়া যায়।

আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা
কোনো বাড়ি ছিল না।

ছিল দুটি চোখ —
যেখানে আমি ব্যর্থ হতে পারতাম,
কাঁদতে পারতাম,
ভেঙে পড়তে পারতাম,
তবু আমাকে ছোট হতে হতো না।

সময় বড় নিষ্ঠুর।

একদিন সন্তান বড় হয়ে যায়।
মায়ের হাত কাঁপতে থাকে,
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।

যে চোখ একদিন আমাকে পথ চিনিয়েছিল,
সে-ই একদিন
আমার মুখ চিনতে একটু সময় নেয়।

সেদিন মানুষের ভেতরে
আরেকটা শৈশব জন্মায়।
সে প্রথমবার বোঝে —
যার চোখে ভর করে সে পৃথিবী দেখেছিল,
আজ সেই চোখই
তার ভরসা খুঁজছে।

মাঝে মাঝে আয়নায়
নিজের চোখের দিকে তাকাই।
অদ্ভুত লাগে —

আমার চোখের ভেতরে
ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে
আরেক জোড়া চোখ।

তখন বুঝি,
মানুষ শুধু রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না।
সে বহন করে
দৃষ্টিরও উত্তরাধিকার।

হয়তো একদিন
আমার চোখেও কেউ আশ্রয় খুঁজবে।
হয়তো সেদিন বুঝব —

একজন মা
সন্তানের জন্ম শুধু শরীরে দেন না।
তিনি তাঁর চোখের ভেতরেও
আরেকটা পৃথিবীর জন্ম দেন।

আর সেই পৃথিবী —
মা চলে যাওয়ার বহু বছর পরেও —
সন্তানের ভেতরে
আলো জ্বালিয়ে রাখে।

মায়ের চোখ

(শৈশব)

কথা বলতে শেখার আগেই
আমি পৃথিবীকে চিনতাম।

মায়ের বুকে মাথা রাখলে
যে নিশ্চিন্ততা নামত —
তার কোনো নাম ছিল না।
বাবার কোলে যে নিরাপত্তা
চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত —
তার কোনো অভিধান ছিল না।

ভোরের আলো
জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকত,
আমি তাকিয়ে থাকতাম।
আলো আমাকে কিছু বলত না,
আমিও তাকে কিছু বলতাম না —
তবু আমাদের ভুল হতো না কখনো।

শিশু ক্ষুধার কথা বলতে পারে না,
তবু মা বুঝে যায়।

বৃদ্ধ মুখে হাসি রাখেন,
তবু মেয়ে তাঁর হাত ছুঁয়ে বোঝে —
বাবা আজ বড় ক্লান্ত।

দুই বন্ধু হাঁটে পাশাপাশি,
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো কথা নেই;
তবু বিদায়ের বেলায় মনে হয় —
সব কথা হয়ে গেছে।

পৃথিবীর গভীরতম ভাষাগুলোর
কোনো বর্ণমালা নেই।

আমরা বড় হই।
শব্দ শিখি, বাক্য শিখি, যুক্তি শিখি।

তারপর একদিন —
যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি
তার সামনে দাঁড়িয়ে
একটি কথাও বলতে পারি না।
শব্দ গলায় এসে জমে যায়,
অথচ বুকের ভেতর তখন
একটা গোটা মহাবিশ্ব কথা বলছে।

ভাষা সবসময় পাশে থাকে না।
অনুভব থাকে।

আজ আমার কাছে অনেক শব্দ।
চাইলে একটা বই লিখে ফেলতে পারি।
তবু আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য মুহূর্তগুলোর
কোনো ভাষা নেই।

মায়ের শেষবার আমার দিকে তাকানো।
বাবার নীরবে কাঁধে হাত।
প্রথম ভালোবাসার বিদায়।
বন্ধুর অকারণে চলে যাওয়া।
সন্তানের প্রথম হাসি।

এসবের কিছুই
শব্দে সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না।
শব্দ শুধু চারপাশে ঘোরে —
ভেতরে ঢুকতে পারে না।

হয়তো তাই
পৃথিবীর সব কবিতা শেষমেশ
একটা হারানো ভাষাকেই খোঁজে।

সেই ভাষা,
জন্মের আগে যা আমরা জানতাম।
যেখানে ধর্ম ছিল না, জাতি ছিল না,
অহংকার ছিল না —
ছিল শুধু
একটা হৃদয়ের কাছে
আরেকটা হৃদয়ের
ধীরে ধীরে খুলে যাওয়া।

মানুষ মারা গেলে কোথায় যায় —
জানি না।

শুধু বিশ্বাস করতে চাই,
যদি কোথাও ফিরে যাওয়া বলে কিছু থাকে,
আমরা কোনো নতুন ভাষা শিখতে যাই না।

আমরা ফিরে যাই
সেই প্রথম ভাষায় —

যেখানে একটা স্পর্শ
একটা বইয়ের চেয়েও দীর্ঘ,
এক ফোঁটা অশ্রু
একটা জীবনের চেয়েও সত্য,

আর নীরবতা —
সমস্ত উচ্চারণের আগে —
মানুষের প্রথম মাতৃভাষা।

যে ভাষা ছিল না

(শৈশব)

আমার জীবনের প্রথম ভাষা
কোনো শব্দ ছিল না।
মা বলতেন, জন্মের পর নাকি
খুব কেঁদেছিলাম আমি—
আমার মনে নেই।
শুধু আজ, এত বছর পরে বুঝি,
সেদিন আমি পৃথিবীর কাছে কিছু চাইনি;
পৃথিবীই আমাকে প্রশ্ন করেছিল প্রথম—
বাঁচতে পারবি তো?
আমার কান্নাই ছিল উত্তর।
শিশু কাঁদে বলে ভাবি সে দুর্বল,
অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী শব্দ
সম্ভবত এক নবজাতকের কান্না।
সে জানে না বিশ্বাসঘাতকতা কী,
শোক কী, বিচ্ছেদ কী—
তবু শ্বাস নেয়,
তবু বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
তারপর মানুষ বড় হয়।
হাসতে শেখে, কথা বলতে শেখে,
মিথ্যা বলতে শেখে,
নিজের কান্না লুকোতে শেখে।
একদিন এমনও হয়—
চোখ ভেজা, মুখে হাসি।
সেদিনই শৈশব শেষ।
কত মুখ দেখলাম—
ভদ্রতা ছিল, সাফল্য ছিল, সম্মানও;
শুধু প্রথম কান্নার সেই নির্মল সাহস
খুব কম মুখেই।
বড় হতে হতে আমরা কান্না হারাই না,
হারাই কান্নার সততা।
মানুষের সবচেয়ে সত্য কথাটি
উচ্চারিত হয়ে যায় জন্মের প্রথম মুহূর্তে—
বাকি জীবন আমরা লিখি তার অনুবাদ:
কেউ কবিতায়, কেউ প্রার্থনায়,
কেউবা নীরবতায়।
আর মৃত্যুর ঠিক আগে,
যখন শেখা ভাষারা ঝরে পড়ে একে একে,
মানুষ হয়তো ফিরতে চায়
সেই প্রথম ভাষাতেই—
এক শব্দহীন, ভেজালহীন,
সম্পূর্ণ মানুষের কান্নায়।

প্রথম কান্না

(জন্মের আগের নীরবতা)

আমার জন্মদিন সবাই জানে।
কিন্তু আমি যে হাজার বছর ধরে
এই পৃথিবীর অপেক্ষায় ছিলাম—
সেই অপেক্ষার কোনো ক্যালেন্ডার নেই।

হয়তো—
আমি একদিন কোনো নদীর স্বপ্ন ছিলাম।
কোনো গাছের পাতায় জমে থাকা
শিশিরের ইচ্ছা ছিলাম।
হয়তো কোনো মৃত মানুষের
অসমাপ্ত প্রার্থনা হয়ে বাতাসে ভেসে ছিলাম।
তারপর একদিন একটি শিশু হয়ে জন্ম নিলাম।

আমি জন্মকে শুরু মনে করি না।
জন্ম কেবল দৃশ্যমান হওয়ার দিন।
আমার অদৃশ্য যাত্রা
তারও অনেক আগে শুরু হয়েছিল।
আজও মনে হয়,
আমি এখনো জন্ম নিচ্ছি।
প্রতিটি ভালোবাসায়,
প্রতিটি ক্ষতিতে,
প্রতিটি ক্ষমায়,
প্রতিটি কবিতায়—
আমি আবার জন্মাই।

মানুষ তো আসলে কোনো ফুরিয়ে যাওয়া গল্প নয়,
সে তো এক অনন্ত রূপান্তর!

জন্মের পূর্বে

বাছাইকৃত কবিতা

বাবার হাত

- মোঃ আবু তালেব

(শৈশব)

আমার জীবনের প্রথম ছায়া
ছিল একটা হাত।

সেই হাতে কোনো অলৌকিক শক্তি ছিল না।
ছিল না রাজদণ্ড, ছিল না ক্ষমতা,
ইতিহাসের কোনো গৌরব ছিল না।

ছিল শুধু শক্ত হয়ে ওঠা চামড়া,
আঙুলের ফাঁকে জমে থাকা শ্রম,
আর এমন এক নীরবতা —
যা কোনোদিন নিজের কথা বলেনি।

হাঁটতে শেখার আগে
বাবার হাত আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছিল।

আমি পৃথিবীকে চিনতাম না।
তিনি চিনতেন।
তাই আমি পথকে ভয় পাইনি!

কারণ আমি পথে হাঁটিনি —
আমি একটা হাতের ভেতর দিয়ে
পৃথিবীতে ঢুকেছিলাম।

ছোটবেলায় ভাবতাম,
বাবারা কখনো ক্লান্ত হন না।

সকালে বের হন।
রাতে ফেরেন।
খেয়ে নেন।
চুপ করে বসে থাকেন।
আবার ভোর হয়।

জানতাম না,
মানুষের ক্লান্তিরও একটা ভদ্রতা আছে।
যারা সংসারকে ভালোবাসে,
তারা প্রায়ই নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রাখে।

প্রথম বুঝেছিলাম
এক বর্ষার সন্ধ্যায়।
বাবা ভিজে ফিরেছিলেন,
জামা থেকে টপটপ পানি পড়ছিল।
তিনি প্রথমে নিজের কাপড় বদলাননি —
প্রথমে আমার স্কুলব্যাগটা
শুকনো জায়গায় তুলে রেখেছিলেন।

সেদিন দেখেছিলাম —
একজন মানুষ নিজের শরীরের আগে
আরেকজন মানুষের আগামীকাল
বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
বাবারা হয়তো এভাবেই ভালোবাসেন।
শব্দ দিয়ে নয় —
অগ্রাধিকার দিয়ে।

মনে পড়ে,
রাস্তা পার হওয়ার সময়
বাবা আমার হাত ধরতেন।
আজ এত বছর পরে বুঝি —
তিনি আমার হাত ধরতেন না,
তিনি আমার ভয়টা ধরে রাখতেন।

আমি পড়ে গেলে তুলতেন।
কিন্তু কখনো এমনভাবে তুলতেন না,
যাতে আমি হাঁটতে ভুলে যাই।

তিনি জানতেন —
বেশি আশ্রয় মানুষকে দুর্বল করে।
আর সময়মতো ছেড়ে দেওয়া,
সেও ভালোবাসার একটা ভাষা।

বড় হতে হতে
আমরা বাবার হাত ছেড়ে দিই।
ভাবি — এখন একাই পারব।

তারপর একদিন বুঝি —
হাতটা আমরা ছাড়িনি।
সময় ছাড়িয়ে দিয়েছে।

বাবার হাত
ধীরে ধীরে কাঁপতে শুরু করে।
যে হাত একদিন আমাকে কাঁধে তুলে
পৃথিবী দেখিয়েছিল,
সেই হাত একদিন
এক গ্লাস পানি ধরতেও
একটু সময় নেয়।

সেদিন পৃথিবী হঠাৎ বদলে যায়।

আমি প্রথমবার বাবার হাত ধরি।
আর অবাক হয়ে দেখি —
তাঁর হাত এখনো আগের মতোই বড়।
শুধু শক্তিটা বদলে গেছে।

তখন বুঝলাম —
শক্তি কখনো মাংসপেশিতে থাকে না।
শক্তি থাকে দায়িত্বে।

একদিন বাবা আমার পাশে থাকবেন না।
এ কথা আমি জানি।

তবু আজও
কোনো কঠিন সিদ্ধান্তের আগে
অদ্ভুতভাবে মনে হয় —
যদি একবার সেই হাতটা
আমার কাঁধে এসে পড়ত।

কিছু কথা মানুষ সারাজীবন শোনে না।
কিছু হাত মানুষ সারাজীবন ভুলতে পারে না।

জানি না,
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গার নাম কী!
কিন্তু আমার শৈশবে-
তার একটা আকার ছিল।
পাঁচটা আঙুল ছিল।
কঠিন ছিল।
রুক্ষ ছিল।
উষ্ণ ছিল।

সেই হাত আমাকে
শুধু হাঁটতে শেখায়নি।
শিখিয়েছিল —
ভালোবাসা সবসময় কোমল হয় না।

কখনো কখনো ভালোবাসা
একটা রুক্ষ হাত —
যে নিজের সমস্ত ব্যথা লুকিয়ে রেখে
তোমার পড়ে যাওয়ার আগেই
নিঃশব্দে সামনে এগিয়ে আসে।
বিস্তারিত...

মায়ের চোখ

- মোঃ আবু তালেব

(শৈশব)

আমি পৃথিবীকে দেখার আগে
দুটি চোখ আমাকে দেখে নিয়েছিল।

সেই চোখের ইতিহাস আমি জানি না —
জানি না, আমার জন্মের আগে
কত রাত সে একা জেগেছিল,
কত ভয় নিঃশব্দে গিলে ফেলেছিল,
কত অসমাপ্ত স্বপ্ন ভাঁজ করে
তুলে রেখেছিল আমার জন্য।

শুধু জানি —
আমি যখন প্রথম তাকাই পৃথিবীর দিকে,
পৃথিবী তখন
মায়ের চোখ দিয়েই আমাকে দেখছিল।

শিশু পৃথিবীকে সরাসরি বিশ্বাস করে না।
সে আগে একজন মানুষকে বিশ্বাস করে।

আমার কাছে সেই মানুষ ছিল মা।

তিনি হাসলে
পৃথিবীকে নিরাপদ মনে হতো।
তিনি চুপ হয়ে গেলে
ঘরের বাতাসও ভারী হয়ে আসত।

তখনো আমি দুঃখ শব্দটা জানতাম না।
কিন্তু মায়ের চোখে
দুঃখ চিনতে শিখে গিয়েছিলাম।

মানুষের প্রথম বিদ্যালয় কোনো স্কুল নয়।
মানুষের প্রথম বিদ্যালয়
তার মায়ের চোখ।

সেখানেই সে শেখে —
ভালোবাসা কীভাবে কাউকে ছুঁয়ে থাকে,
অপেক্ষা কীভাবে একটা বিকেলকে দীর্ঘ করে,
আর ভয় কীভাবে
নিজের মুখ লুকিয়ে রাখে।

আমি কখনো মাকে বড় বড় কথা বলতে শুনিনি।
জীবন নিয়ে তিনি কোনো বক্তৃতা দেননি।

শুধু দেখেছি —
ভাত কম পড়লে
নিজের থালাটা নিঃশব্দে ছোট করে নিতেন।

দেখেছি —
জ্বরের রাতে আমার কপালে হাত রেখে
আকাশের দিকে তাকাতেন,
কাউকে কিছু না বলে।

দেখেছি —
সবচেয়ে কঠিন দিনেও
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে
সন্ধ্যার আলো নিভে যেতে দেখতেন।

তখন বুঝিনি।
এখন বুঝি —

কেউ কাঁদে চোখের জলে।
কেউ কাঁদে
চোখের ভেতরের আলো
একটু একটু করে নিভিয়ে।

আমার মা ছিলেন দ্বিতীয় দলে।

বড় হতে হতে অনেক চোখ দেখেছি।
সাফল্যের চোখ। অহংকারের চোখ।
লোভের চোখ। প্রেমের চোখ।
পরাজয়ের চোখ।

কিন্তু মায়ের চোখের মতো চোখ
আর দেখিনি।

সেখানে বিচার ছিল না।
ছিল আশ্রয়।

ভুল করলে তিনি প্রথমে রাগ করতেন না —
প্রথমে শুধু তাকিয়ে থাকতেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো
শব্দে করা হয় না।
কিছু প্রশ্ন
শুধু একটা দৃষ্টি হয়ে দাঁড়ায় সামনে।
আর কিছু উত্তর
শুধু মাথা নিচু করে দেওয়া যায়।

আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা
কোনো বাড়ি ছিল না।

ছিল দুটি চোখ —
যেখানে আমি ব্যর্থ হতে পারতাম,
কাঁদতে পারতাম,
ভেঙে পড়তে পারতাম,
তবু আমাকে ছোট হতে হতো না।

সময় বড় নিষ্ঠুর।

একদিন সন্তান বড় হয়ে যায়।
মায়ের হাত কাঁপতে থাকে,
দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।

যে চোখ একদিন আমাকে পথ চিনিয়েছিল,
সে-ই একদিন
আমার মুখ চিনতে একটু সময় নেয়।

সেদিন মানুষের ভেতরে
আরেকটা শৈশব জন্মায়।
সে প্রথমবার বোঝে —
যার চোখে ভর করে সে পৃথিবী দেখেছিল,
আজ সেই চোখই
তার ভরসা খুঁজছে।

মাঝে মাঝে আয়নায়
নিজের চোখের দিকে তাকাই।
অদ্ভুত লাগে —

আমার চোখের ভেতরে
ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে
আরেক জোড়া চোখ।

তখন বুঝি,
মানুষ শুধু রক্তের উত্তরাধিকার বহন করে না।
সে বহন করে
দৃষ্টিরও উত্তরাধিকার।

হয়তো একদিন
আমার চোখেও কেউ আশ্রয় খুঁজবে।
হয়তো সেদিন বুঝব —

একজন মা
সন্তানের জন্ম শুধু শরীরে দেন না।
তিনি তাঁর চোখের ভেতরেও
আরেকটা পৃথিবীর জন্ম দেন।

আর সেই পৃথিবী —
মা চলে যাওয়ার বহু বছর পরেও —
সন্তানের ভেতরে
আলো জ্বালিয়ে রাখে।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4557
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1644
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1620
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1534
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1533
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1455
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1430
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1422
রমণী মোঃ আবু তালেব 1398
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1361
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1360
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1354
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1322
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1321
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1320
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1318
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1312
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1292
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1290
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1280
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
বাবার হাত মোঃ আবু তালেব 11
মায়ের চোখ মোঃ আবু তালেব 10
যে ভাষা ছিল না মোঃ আবু তালেব 16
প্রথম কান্না মোঃ আবু তালেব 33
জন্মের পূর্বে মোঃ আবু তালেব 37
নামহীন স্পন্দন মোঃ আবু তালেব 38
প্রথম অন্ধকার মোঃ আবু তালেব 40
মায়ের নীরবতা মোঃ আবু তালেব 51
পৃথিবীর আগে মোঃ আবু তালেব 54
তোমার প্রতি মোঃ আবু তালেব 64
জুলাইয়ের কংক্রিট ও নক্ষত্রের ইশতেহার মো: আবু তালেব 108
ভাঙা মাটির খেলা মো: আবু তালেব 119
মানচিত্রের কাটা দাগ মো: আবু তালেব 131
মহাজাগতিক ইশতেহার ও এক নশ্বরের চিৎকার মো: আবু তালেব 150
মৃণ্ময়ী মোঃ আবু তালেব 254
ইশকের তুফান মোঃ আবু তালেব 293
আদিকথা মো: আবু তালেব 178
রূহের তৃষা মো: আবু তালেব 262
মায়ার নদী মো: আবু তালেব 278
মায়ার বাঁধন মো: আবু তালেব 278
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 30
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 70
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 114
কিংবদন্তির বাহন আজাহার রাজা 103
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 102
ভালো মানুষ ইবনে আলী 199
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 119
শিকল ইবনে আলী 179
পৃথিবীতে কেবল ক্ষুধাই সত্য আজাহার রাজা 188
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 203
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 192
বসন্ত জয়দীপ রায় 208
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 140
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 273
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 248
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 257
সোনার দেশ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 279
মুসলিম সংখ্যালঘু শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 226
বাদলের দিন শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 295
তুমি হীনা জান্নাত চাইনা কবি মোঃ নিজাম গাজী 276
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে