কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(ভালবাসা)

ভালোবাসার পরে
পৃথিবী আর আগের মতো থাকে না—
যদিও
ধানক্ষেত ঠিকই সবুজ হয়,
নদী ঠিকই
বিকেলের আলো বহন করে,
শালিকেরা
পুরোনো অভ্যাসে
বাড়ি ফেরে।

শুধু
একজন মানুষ
পৃথিবীর দিকে তাকানোর
পুরোনো চোখটি
হারিয়ে ফেলে।

সেই সন্ধ্যায়
তুমি চলে গিয়েছিলে।
পথের ধারে
শিউলি ঝরছিল;
মনে হচ্ছিল,
গাছটি যেন
তার সমস্ত সাদা স্মৃতি
মাটির কাছে
ফেলে দিচ্ছে।
আমি তোমাকে ডাকিনি।
কিছু বিদায়
ডাকলে ফিরে আসে না—
বরং
আরও দূরে চলে যায়।

তুমি চলে গেলে
নদীর ওপারে
কুয়াশা উঠেছিল।
একটি নৌকা
ধীরে ধীরে
অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তারপর বুঝলাম,
মানুষও বোধহয়
নৌকার মতো—
একটি তীর ছেড়ে
অন্য তীরে যায়,
আর মাঝখানের জলটুকু
কেউ নিজের বলে
রাখতে পারে না।

ভালোবাসার আগে
আমি ভাবতাম,
একজন মানুষকে পাওয়া মানেই
তার সঙ্গে থাকা।
ভালোবাসার পরে
জেনেছি—
কখনো কখনো
একজন মানুষকে ভালোবাসা মানে
তার অনুপস্থিতির মধ্যেও
তার জন্য
একটি জায়গা রেখে দেওয়া।
যেমন
পুরোনো বাড়ির উঠোনে
একটি গাছ থাকে,
যার ছায়ায়
আর কেউ বসে না,
তবু
বিকেল হলেই
ছায়াটি
মাটিতে নেমে আসে।

তোমার জন্য
আমার ভেতরেও
একটি ছায়া আছে।
আমি সেখানে
প্রতিদিন যাই না।
কিন্তু
বর্ষার রাতে,
জ্যোৎস্নার ভেতর,
অথবা
শীতের কুয়াশায়
হঠাৎ
সেই পথটি
আমার সামনে খুলে যায়।
দূরে
কোনো অচেনা পাখি ডাকে।
মনে হয়,
তুমি কি তবে
এইমাত্র
আমার নাম উচ্চারণ করলে?

তারপর বুঝি—
না।
এ শুধু রাতের শব্দ।

তবু
মানুষ কেন
অচেনা শব্দের ভেতরেও
পরিচিত মানুষকে
খুঁজে বেড়ায়?
হয়তো
ভালোবাসা শেষ হয় না,
তার শুধু
বাসস্থান বদলে যায়।

একদিন
সে থাকে
দুটি মানুষের চোখে।
তারপর
একজনের স্মৃতিতে।
তারপর
একটি পুরোনো গন্ধে।
একটি না-শোনা গানে।
একটি ফাঁকা চেয়ারে।
একটি শীতের বিকেলে
হঠাৎ থেমে যাওয়া বাতাসে।

আর শেষে
মানুষের স্বভাবের মধ্যে।
তুমি চলে যাওয়ার পরে
আমি দেখলাম,
আমি আগের চেয়ে
ধীরে হাঁটি।
অপরিচিত মানুষের দুঃখ
আরও সহজে দেখি।
বৃদ্ধের কাঁপা হাত
আরও কিছুক্ষণ
মনে থাকে।

শিশুর হাসি
হঠাৎ
আমাকে থামিয়ে দেয়।

একটি মৃত পাখি
রাস্তার পাশে পড়ে থাকলে
আমি
চোখ ফিরিয়ে নিতে পারি না।

হয়তো
ভালোবাসা
মানুষকে
যাকে ভালোবাসে
শুধু তার কাছে নিয়ে যায় না;
পৃথিবীর সমস্ত
অসহায় জীবনের কাছেও
একটু কাছে নিয়ে যায়।

সেই জন্যই
তোমাকে হারিয়ে
আমি শুধু
তোমাকে হারাইনি।
আমার ভেতরে
একটি পুরোনো মানুষও
মরে গেছে—
যে মানুষ
ভাবত,
পৃথিবীকে পুরোপুরি
নিজের করে পাওয়া যায়।
তার জায়গায়
যে মানুষটি জন্মেছে,
সে জানে—
কোনো নদীকে
মুঠোয় ধরা যায় না,
কোনো সন্ধ্যাকে
চিরকাল রাখা যায় না,
কোনো মানুষকে
সম্পূর্ণ নিজের বলা যায় না।

তবু
নদীর পাশে দাঁড়াতে হয়।
সন্ধ্যার দিকে তাকাতে হয়।
মানুষকে ভালোবাসতে হয়।
হারানোর জেনেও
আজ
অনেক বছর পরে
সেই পুরোনো পথ দিয়ে
একদিন হেঁটে গেলাম।

শিউলি গাছটি
আর নেই।
ধানক্ষেতের জায়গায়
নতুন বাড়ি উঠেছে।
নদীর ঘাটে
কেউ বসে নেই।

শুধু
পশ্চিম আকাশে
একটি ম্লান আলো
ধীরে ধীরে
ডুবে যাচ্ছিল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

তোমার কথা
মনে পড়ল না।
অথবা
এত গভীরে মনে পড়ল
যে তাকে আর
আলাদা করে চিনতে পারলাম না।

সেদিন বুঝলাম—
ভালোবাসার পরে
মানুষ কাউকে ভুলে যায় না।

সে শুধু
একদিন এমন জায়গায় পৌঁছে যায়,
যেখানে
স্মৃতি আর ব্যথা থাকে না;
থাকে
একটি নরম আলো।

যেমন
সন্ধ্যার পরে
ধানক্ষেতের ওপর
শেষ পাখিটিও
উড়ে গেলে
কিছুক্ষণ
আকাশে
তার উড়ে যাওয়ার রেখা
থেকে যায়।

তারপর
রাত নামে।
পৃথিবী
নিজের অন্ধকারে
ফিরে যায়।
আর মানুষ
তার সমস্ত হারানো ভালোবাসা নিয়ে
নিঃশব্দে
আবার
বেঁচে থাকে।

ভালোবাসার পরে

(ভালোবাসা)

তুমি চলে যাওয়ার পর
ঘরটি
আর ছোট হয়নি,
শুধু
তার ভেতর থেকে
একটি শব্দ কমে গেছে।

সকালে জানালা খুললে
আগের মতোই
রোদ এসে পড়ে।
টেবিলের ওপর
একটি কাপ থাকে।
বাইরে
রিকশার ঘণ্টা বাজে,
দূরের মসজিদ থেকে
ভেসে আসে আজানের ধ্বনি,
ছাদের কার্নিশে
একটি শালিক
তার নিজের দিনের
খবর নিয়ে বসে থাকে।

কিছুই বদলায়নি।

শুধু
এই পৃথিবীটাকে
দেখার জন্য
আমার পাশে
তুমি নেই।
তোমার অনুপস্থিতি
কোনো দরজা বন্ধ করে যায়নি।
সে বরং
সব দরজা খুলে দিয়েছে—
যাতে বাতাস আসে,
আলো আসে,
বৃষ্টি আসে,
আর তোমার না-থাকার
খবরটি
প্রতিদিন
নতুন করে
আমার ঘরে ঢোকে।

একদিন
বৃষ্টির পর
বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মাটির গন্ধ উঠছিল।
হঠাৎ মনে হলো,
তুমি এই গন্ধটিকে
খুব পছন্দ করতে।
স্মৃতি কী অদ্ভুত—
একটি গন্ধ
একটি মুখ হয়ে যায়,
একটি বিকেল
একটি কণ্ঠ হয়ে যায়,
একটি নির্জন রাস্তা
হঠাৎ
কারও হাতের উষ্ণতা
মনে করিয়ে দেয়।

আমি তোমাকে
খুঁজিনি।
তবু
তুমি ছিলে।

একটি পুরোনো বইয়ের
মাঝখানে চাপা পড়া
শুকনো ফুলের মতো।
একটি অপ্রেরিত চিঠির
ভাঁজে।

বালিশের পাশে
রাখা একটি দীর্ঘশ্বাসে।
রাত গভীর হলে
ঘড়ির কাঁটা
শুধু সময় দেখায় না—
মনে করিয়ে দেয়,
কতটা সময়
একজন মানুষকে ছাড়া
বেঁচে থাকা যায়।

আমি শিখেছি।
সত্যিই শিখেছি।
মানুষ
অনুপস্থিতির সঙ্গেও
সংসার করতে পারে।
শুধু
তার জন্য
একটি আলাদা ঘর লাগে।

সেই ঘরের
কোনো দরজা নেই।
কোনো জানালাও না।
সেখানে
শুধু স্মৃতি ঢোকে।

আর
বেরিয়ে যাওয়ার সময়
আমাকে একটু
আরও একা করে যায়।
কখনো
রাস্তার ভিড়ে
তোমার মতো কাউকে দেখি।
এক মুহূর্তের জন্য
হৃদয়
নিজের পুরোনো ভুল করে বসে।

তারপর বুঝি—
না,
তুমি নও।
মানুষের চোখ
কত সহজে
নিজের হারানো মানুষকে
অন্যের মুখে
ফিরিয়ে আনে।

তখন
আমি হাঁটতে থাকি।
কারণ
থেমে গেলে
স্মৃতি আমাকে ধরে ফেলবে।

তবু
কিছু সন্ধ্যায়
আমি ইচ্ছে করেই ধীরে হাঁটি।
শহর তখন
আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে
একটি অসমাপ্ত কবিতার মতো।

দূরে
কোনো ট্রেন চলে যায়।
কোনো অচেনা জানালায়
হলুদ আলো জ্বলে ওঠে।
কেউ একজন
কাউকে ফোন করে বলে,
"কোথায় তুমি?"

আমি শুনি।

আর মনে হয়,
পৃথিবীর সব ভাষায়
অনুপস্থিতির
একটিই অর্থ।
*কেউ নেই।*

তবু
তোমার অনুপস্থিতি
শুধু "কেউ নেই" নয়।
তুমি নেই—
কিন্তু
তোমার জন্য
আমার ভেতরে যে মানুষটি
জেগে উঠেছিল,
সে তো এখনও আছে।
এই মানুষটি
তোমাকে ছাড়া
অন্যরকম।

সে এখন
বৃষ্টিকে একটু বেশি বোঝে।
নীরবতাকে একটু বেশি শোনে।
বিদায়ের আগে
একটি মুখের দিকে
আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
কারও হাত
সহজে ছেড়ে দেয় না।

হয়তো
এটাই তোমার
শেষ উপস্থিতি।
তুমি আমাকে
তোমার অনুপস্থিতি দিয়ে
শিখিয়ে গেছ—
কেউ চলে গেলে
শূন্যতা আসে না।
আসে
একটি অদৃশ্য মানুষ,
যে সারাজীবন
আমাদের সঙ্গে হাঁটে।

তার কোনো ছায়া নেই।
কোনো শরীর নেই।
শুধু
একটি নীরব স্পর্শ আছে।
আর কোনো কোনো রাতে
জানালার বাইরে
চাঁদ উঠলে
আমি বুঝতে পারি—
তোমাকে আমি
ভুলিনি।
শুধু
তোমার অনুপস্থিতির সঙ্গে
বাঁচতে শিখেছি।

তবু
যদি কোনোদিন
এই পৃথিবীর সমস্ত পথ
হঠাৎ আবার
সেই পুরোনো সন্ধ্যার দিকে ফিরে যায়,
আমি তোমাকে
কিছুই বলব না।

শুধু
একটু দূরে দাঁড়িয়ে
দেখব—
তুমি আছ কি না।
কারণ
কিছু মানুষকে
ফিরে পাওয়ার জন্য নয়,
ভালোবাসার শেষ সত্যটুকু
অক্ষত রাখার জন্য
দূর থেকেই
মনে রাখতে হয়।

তোমার অনুপস্থিতি

(ভালোবাসা)

সেদিন সন্ধ্যায়
নদীর ওপর
ধীর আলো নেমেছিল।
মনে হচ্ছিল,
দিনটি থেমে আছে, আর—
কেবল
নিজের মুখটি
জলের মধ্যে রেখে
চুপ করে আছে।

তুমি আমার পাশে ছিলে।
এত কাছে,
যে তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা
আমার হাতের পিঠে
আলোর মতো পড়ছিল।

তবু
আমি তোমার হাত ধরিনি।
কেন—
আজও জানি না।
হয়তো
মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়
কাউকে হারানো নয়;
কাউকে পেয়ে
নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

তোমার হাতটি
তখন আমার দিকে
অল্প একটু এগিয়ে ছিল।
একটি শুকনো পাতার মতো—
হালকা,
অসহায়,
অপেক্ষমাণ।
আমি দেখেছিলাম।
তবু
আমার হাত
নিজের কাছেই রয়ে গেল।

সন্ধ্যা নামল।
নদীর ওপারে
একটি নৌকা
ধীরে ধীরে
অন্ধকারের ভিতর ঢুকে গেল।

আমরা কেউ
কিছু বললাম না।
কিছু কিছু বিদায়
শব্দ দিয়ে শুরু হয় না।
একটি হাত
অন্য হাতের কাছে এসে
ফিরে যায়—
সেখানেই
একটি জীবন
চুপচাপ অন্যদিকে
বেঁকে যায়।

তারপর
অনেক বছর কেটে গেছে।
শহর বদলেছে।
রাস্তার পাশে
নতুন বাড়ি উঠেছে।
যে গাছটির নিচে
আমরা দাঁড়িয়েছিলাম,
সে গাছও হয়তো
এখন আর নেই।

তবু
কখনো কখনো
বর্ষার রাতে
জানালায় বৃষ্টির শব্দ শুনলে
আমার মনে হয়,
তুমি এখনও
সেই সন্ধ্যার পাশে দাঁড়িয়ে আছ।

তোমার হাতটি
এখনও
একটু এগিয়ে।
আর আমি
এখনও
সেই মানুষ,
যে এক মুহূর্তের ভয়ে
একটি সম্পূর্ণ জীবনের দরজা
খোলিনি।

আমি পরে অনেক হাত ধরেছি।
বন্ধুর হাত।
সন্তানের হাত।
মায়ের কাঁপা হাত।
একজন বৃদ্ধের বিদায়ী হাত।
কিন্তু
তোমার হাতের মতো
কোনো হাত
আমাকে কখনো
এত গভীর প্রশ্ন করেনি।

কারণ
তোমার হাতটি
শুধু আমাকে ডাকেনি।
সে ডাকছিল
আমার সেই মানুষটিকে,
যে মানুষটি
তোমার সঙ্গে
হয়তো জন্ম নিতে পারত।

আজ বুঝি,
আমরা শুধু মানুষ হারাই না।
আমরা হারাই
মানুষের সঙ্গে জন্ম নিতে পারত
আমাদের অন্য জীবনগুলোও।

তুমি চলে গেলে।
আমি রয়ে গেলাম।
দুজনেই
নিজ নিজ জীবনে
সম্ভবত বেঁচে আছি।
কিন্তু
একটি বিকেল
আমাদের মাঝখানে
আজও দাঁড়িয়ে আছে।

সেই বিকেল
কোনো স্মৃতি নয়।
একটি অসমাপ্ত দরজা।
কখনো কখনো
মনে হয়,
জীবন আসলে
আমাদের দেওয়া সুযোগগুলোর নাম নয়;
বরং
যে সুযোগগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে
আমরা ভয়ে
হাত বাড়াইনি—
তাদের দীর্ঘ ছায়ার নাম।

তাই আজ
যখন কোনো মানুষ
আমার দিকে
একটু হাত বাড়িয়ে দেয়,
আমি আর
সহজে ফিরিয়ে নিই না।
কারণ জানি,
সব হাত
দ্বিতীয়বার আসে না।
সব সন্ধ্যা
আবার নামে না।
সব মানুষ
অন্য কোনো জীবনে
ফিরে আসে না।

আর কিছু কিছু হাত—
ধরার জন্য নয়,
সারা জীবন
মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আসে
যে একদিন
আমরা ধরিনি।
সেই হাতটি

আজ কোথায়,
আমি জানি না।
শুধু জানি,
আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ
নিঃশব্দ স্পর্শ
হয়তো সেই হাতেরই—
যে হাতটি
আমি
কোনোদিন
ধরিনি।

যে হাতটি ধরিনি

বাছাইকৃত কবিতা

ভালোবাসার পরে

- মো: আবু তালেব

(ভালবাসা)

ভালোবাসার পরে
পৃথিবী আর আগের মতো থাকে না—
যদিও
ধানক্ষেত ঠিকই সবুজ হয়,
নদী ঠিকই
বিকেলের আলো বহন করে,
শালিকেরা
পুরোনো অভ্যাসে
বাড়ি ফেরে।

শুধু
একজন মানুষ
পৃথিবীর দিকে তাকানোর
পুরোনো চোখটি
হারিয়ে ফেলে।

সেই সন্ধ্যায়
তুমি চলে গিয়েছিলে।
পথের ধারে
শিউলি ঝরছিল;
মনে হচ্ছিল,
গাছটি যেন
তার সমস্ত সাদা স্মৃতি
মাটির কাছে
ফেলে দিচ্ছে।
আমি তোমাকে ডাকিনি।
কিছু বিদায়
ডাকলে ফিরে আসে না—
বরং
আরও দূরে চলে যায়।

তুমি চলে গেলে
নদীর ওপারে
কুয়াশা উঠেছিল।
একটি নৌকা
ধীরে ধীরে
অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি অনেকক্ষণ
তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
তারপর বুঝলাম,
মানুষও বোধহয়
নৌকার মতো—
একটি তীর ছেড়ে
অন্য তীরে যায়,
আর মাঝখানের জলটুকু
কেউ নিজের বলে
রাখতে পারে না।

ভালোবাসার আগে
আমি ভাবতাম,
একজন মানুষকে পাওয়া মানেই
তার সঙ্গে থাকা।
ভালোবাসার পরে
জেনেছি—
কখনো কখনো
একজন মানুষকে ভালোবাসা মানে
তার অনুপস্থিতির মধ্যেও
তার জন্য
একটি জায়গা রেখে দেওয়া।
যেমন
পুরোনো বাড়ির উঠোনে
একটি গাছ থাকে,
যার ছায়ায়
আর কেউ বসে না,
তবু
বিকেল হলেই
ছায়াটি
মাটিতে নেমে আসে।

তোমার জন্য
আমার ভেতরেও
একটি ছায়া আছে।
আমি সেখানে
প্রতিদিন যাই না।
কিন্তু
বর্ষার রাতে,
জ্যোৎস্নার ভেতর,
অথবা
শীতের কুয়াশায়
হঠাৎ
সেই পথটি
আমার সামনে খুলে যায়।
দূরে
কোনো অচেনা পাখি ডাকে।
মনে হয়,
তুমি কি তবে
এইমাত্র
আমার নাম উচ্চারণ করলে?

তারপর বুঝি—
না।
এ শুধু রাতের শব্দ।

তবু
মানুষ কেন
অচেনা শব্দের ভেতরেও
পরিচিত মানুষকে
খুঁজে বেড়ায়?
হয়তো
ভালোবাসা শেষ হয় না,
তার শুধু
বাসস্থান বদলে যায়।

একদিন
সে থাকে
দুটি মানুষের চোখে।
তারপর
একজনের স্মৃতিতে।
তারপর
একটি পুরোনো গন্ধে।
একটি না-শোনা গানে।
একটি ফাঁকা চেয়ারে।
একটি শীতের বিকেলে
হঠাৎ থেমে যাওয়া বাতাসে।

আর শেষে
মানুষের স্বভাবের মধ্যে।
তুমি চলে যাওয়ার পরে
আমি দেখলাম,
আমি আগের চেয়ে
ধীরে হাঁটি।
অপরিচিত মানুষের দুঃখ
আরও সহজে দেখি।
বৃদ্ধের কাঁপা হাত
আরও কিছুক্ষণ
মনে থাকে।

শিশুর হাসি
হঠাৎ
আমাকে থামিয়ে দেয়।

একটি মৃত পাখি
রাস্তার পাশে পড়ে থাকলে
আমি
চোখ ফিরিয়ে নিতে পারি না।

হয়তো
ভালোবাসা
মানুষকে
যাকে ভালোবাসে
শুধু তার কাছে নিয়ে যায় না;
পৃথিবীর সমস্ত
অসহায় জীবনের কাছেও
একটু কাছে নিয়ে যায়।

সেই জন্যই
তোমাকে হারিয়ে
আমি শুধু
তোমাকে হারাইনি।
আমার ভেতরে
একটি পুরোনো মানুষও
মরে গেছে—
যে মানুষ
ভাবত,
পৃথিবীকে পুরোপুরি
নিজের করে পাওয়া যায়।
তার জায়গায়
যে মানুষটি জন্মেছে,
সে জানে—
কোনো নদীকে
মুঠোয় ধরা যায় না,
কোনো সন্ধ্যাকে
চিরকাল রাখা যায় না,
কোনো মানুষকে
সম্পূর্ণ নিজের বলা যায় না।

তবু
নদীর পাশে দাঁড়াতে হয়।
সন্ধ্যার দিকে তাকাতে হয়।
মানুষকে ভালোবাসতে হয়।
হারানোর জেনেও
আজ
অনেক বছর পরে
সেই পুরোনো পথ দিয়ে
একদিন হেঁটে গেলাম।

শিউলি গাছটি
আর নেই।
ধানক্ষেতের জায়গায়
নতুন বাড়ি উঠেছে।
নদীর ঘাটে
কেউ বসে নেই।

শুধু
পশ্চিম আকাশে
একটি ম্লান আলো
ধীরে ধীরে
ডুবে যাচ্ছিল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

তোমার কথা
মনে পড়ল না।
অথবা
এত গভীরে মনে পড়ল
যে তাকে আর
আলাদা করে চিনতে পারলাম না।

সেদিন বুঝলাম—
ভালোবাসার পরে
মানুষ কাউকে ভুলে যায় না।

সে শুধু
একদিন এমন জায়গায় পৌঁছে যায়,
যেখানে
স্মৃতি আর ব্যথা থাকে না;
থাকে
একটি নরম আলো।

যেমন
সন্ধ্যার পরে
ধানক্ষেতের ওপর
শেষ পাখিটিও
উড়ে গেলে
কিছুক্ষণ
আকাশে
তার উড়ে যাওয়ার রেখা
থেকে যায়।

তারপর
রাত নামে।
পৃথিবী
নিজের অন্ধকারে
ফিরে যায়।
আর মানুষ
তার সমস্ত হারানো ভালোবাসা নিয়ে
নিঃশব্দে
আবার
বেঁচে থাকে।
বিস্তারিত...

তোমার অনুপস্থিতি

- মোঃ আবু তালেব

(ভালোবাসা)

তুমি চলে যাওয়ার পর
ঘরটি
আর ছোট হয়নি,
শুধু
তার ভেতর থেকে
একটি শব্দ কমে গেছে।

সকালে জানালা খুললে
আগের মতোই
রোদ এসে পড়ে।
টেবিলের ওপর
একটি কাপ থাকে।
বাইরে
রিকশার ঘণ্টা বাজে,
দূরের মসজিদ থেকে
ভেসে আসে আজানের ধ্বনি,
ছাদের কার্নিশে
একটি শালিক
তার নিজের দিনের
খবর নিয়ে বসে থাকে।

কিছুই বদলায়নি।

শুধু
এই পৃথিবীটাকে
দেখার জন্য
আমার পাশে
তুমি নেই।
তোমার অনুপস্থিতি
কোনো দরজা বন্ধ করে যায়নি।
সে বরং
সব দরজা খুলে দিয়েছে—
যাতে বাতাস আসে,
আলো আসে,
বৃষ্টি আসে,
আর তোমার না-থাকার
খবরটি
প্রতিদিন
নতুন করে
আমার ঘরে ঢোকে।

একদিন
বৃষ্টির পর
বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
মাটির গন্ধ উঠছিল।
হঠাৎ মনে হলো,
তুমি এই গন্ধটিকে
খুব পছন্দ করতে।
স্মৃতি কী অদ্ভুত—
একটি গন্ধ
একটি মুখ হয়ে যায়,
একটি বিকেল
একটি কণ্ঠ হয়ে যায়,
একটি নির্জন রাস্তা
হঠাৎ
কারও হাতের উষ্ণতা
মনে করিয়ে দেয়।

আমি তোমাকে
খুঁজিনি।
তবু
তুমি ছিলে।

একটি পুরোনো বইয়ের
মাঝখানে চাপা পড়া
শুকনো ফুলের মতো।
একটি অপ্রেরিত চিঠির
ভাঁজে।

বালিশের পাশে
রাখা একটি দীর্ঘশ্বাসে।
রাত গভীর হলে
ঘড়ির কাঁটা
শুধু সময় দেখায় না—
মনে করিয়ে দেয়,
কতটা সময়
একজন মানুষকে ছাড়া
বেঁচে থাকা যায়।

আমি শিখেছি।
সত্যিই শিখেছি।
মানুষ
অনুপস্থিতির সঙ্গেও
সংসার করতে পারে।
শুধু
তার জন্য
একটি আলাদা ঘর লাগে।

সেই ঘরের
কোনো দরজা নেই।
কোনো জানালাও না।
সেখানে
শুধু স্মৃতি ঢোকে।

আর
বেরিয়ে যাওয়ার সময়
আমাকে একটু
আরও একা করে যায়।
কখনো
রাস্তার ভিড়ে
তোমার মতো কাউকে দেখি।
এক মুহূর্তের জন্য
হৃদয়
নিজের পুরোনো ভুল করে বসে।

তারপর বুঝি—
না,
তুমি নও।
মানুষের চোখ
কত সহজে
নিজের হারানো মানুষকে
অন্যের মুখে
ফিরিয়ে আনে।

তখন
আমি হাঁটতে থাকি।
কারণ
থেমে গেলে
স্মৃতি আমাকে ধরে ফেলবে।

তবু
কিছু সন্ধ্যায়
আমি ইচ্ছে করেই ধীরে হাঁটি।
শহর তখন
আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে
একটি অসমাপ্ত কবিতার মতো।

দূরে
কোনো ট্রেন চলে যায়।
কোনো অচেনা জানালায়
হলুদ আলো জ্বলে ওঠে।
কেউ একজন
কাউকে ফোন করে বলে,
"কোথায় তুমি?"

আমি শুনি।

আর মনে হয়,
পৃথিবীর সব ভাষায়
অনুপস্থিতির
একটিই অর্থ।
*কেউ নেই।*

তবু
তোমার অনুপস্থিতি
শুধু "কেউ নেই" নয়।
তুমি নেই—
কিন্তু
তোমার জন্য
আমার ভেতরে যে মানুষটি
জেগে উঠেছিল,
সে তো এখনও আছে।
এই মানুষটি
তোমাকে ছাড়া
অন্যরকম।

সে এখন
বৃষ্টিকে একটু বেশি বোঝে।
নীরবতাকে একটু বেশি শোনে।
বিদায়ের আগে
একটি মুখের দিকে
আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
কারও হাত
সহজে ছেড়ে দেয় না।

হয়তো
এটাই তোমার
শেষ উপস্থিতি।
তুমি আমাকে
তোমার অনুপস্থিতি দিয়ে
শিখিয়ে গেছ—
কেউ চলে গেলে
শূন্যতা আসে না।
আসে
একটি অদৃশ্য মানুষ,
যে সারাজীবন
আমাদের সঙ্গে হাঁটে।

তার কোনো ছায়া নেই।
কোনো শরীর নেই।
শুধু
একটি নীরব স্পর্শ আছে।
আর কোনো কোনো রাতে
জানালার বাইরে
চাঁদ উঠলে
আমি বুঝতে পারি—
তোমাকে আমি
ভুলিনি।
শুধু
তোমার অনুপস্থিতির সঙ্গে
বাঁচতে শিখেছি।

তবু
যদি কোনোদিন
এই পৃথিবীর সমস্ত পথ
হঠাৎ আবার
সেই পুরোনো সন্ধ্যার দিকে ফিরে যায়,
আমি তোমাকে
কিছুই বলব না।

শুধু
একটু দূরে দাঁড়িয়ে
দেখব—
তুমি আছ কি না।
কারণ
কিছু মানুষকে
ফিরে পাওয়ার জন্য নয়,
ভালোবাসার শেষ সত্যটুকু
অক্ষত রাখার জন্য
দূর থেকেই
মনে রাখতে হয়।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4612
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1693
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1653
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1578
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1571
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1505
কর্মফল মোঃ আবু তালেব 1484
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1457
রমণী মোঃ আবু তালেব 1432
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1403
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1399
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1394
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1361
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1356
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1355
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1353
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1351
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1334
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1327
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1319
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
ভালোবাসার পরে মো: আবু তালেব 1
তোমার অনুপস্থিতি মোঃ আবু তালেব 14
যে হাতটি ধরিনি মোঃ আবু তালেব 28
অলৌকিক দুপুর মো: আবু তালেব 27
অস্থায়ী অনন্ত মোঃ আবু তালেব 37
প্রথম নীরবতায় ফেরা মোঃ আবু তালেব 40
শেষ প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 48
অন্য আমি মোঃ আবু তালেব 46
মায়ের নিঃশ্বাস মোঃ আবু তালেব 45
শেষ চুম্বন মোঃ আবু তালেব 62
বৃদ্ধের বিকেল মোঃ আবু তালেব 55
ভিখারির রাজ্য মোঃ আবু তালেব 100
সকল মানুষের মুখ মোঃ আবু তালেব 47
অপ্রকাশ মোঃ আবু তালেব 56
ভেতরের সমুদ্র মোঃ আবু তালেব 61
নীরব যুদ্ধ মোঃ আবু তালেব 64
হারিয়ে যাওয়া নাম মোঃ আবু তালেব 91
যে ক্ষমা পাইনি মোঃ আবু তালেব 52
যে ক্ষমা চাইনি মোঃ আবু তালেব 45
অসমাপ্ত চিঠি মোঃ আবু তালেব 66
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
প্রত্যাবর্তন রাফাত আহমেদ 14
মৃত্যুদিন শ্রীমল্লার 36
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 70
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 62
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 73
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 69
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 78
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 122
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 141
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 139
ভালো মানুষ ইবনে আলী 248
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 143
শিকল ইবনে আলী 217
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 272
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 226
বসন্ত জয়দীপ রায় 246
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 164
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 314
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 282
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 294
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে