কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(মানুষ)

পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য প্রাণী
পাখি নয়,
তিমি নয়,
নক্ষত্রও নয়,
মানুষ।

কারণ
সে মাটি দিয়ে তৈরি,
তবু সারাজীবন
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তার শরীরে
নদীর মতো রক্ত,
পাহাড়ের মতো অস্থি,
বাতাসের মতো শ্বাস,
আগুনের মতো ক্ষুধা।

আর এক অদ্ভুত শূন্যতা —
যার কোনো নাম নেই।

মানুষ
একটা জন্ম নিয়ে আসে,
কিন্তু
অসংখ্য মৃত্যুর ভেতর দিয়ে
ধীরে ধীরে
নিজেকে তৈরি করে।

একটা বিশ্বাস মরে,
একটা অহংকার মরে,
একটা প্রেম মরে,
একটা ভয় মরে,
একটা স্বপ্ন মরে।
তবু
সে প্রতিটা ভাঙনের পরে
নিজের ভেতর
আরেকটা ভোর আবিষ্কার করে।

এই জন্যই
মানুষকে
কোনো অভিধান দিয়ে
সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
একজন মানুষ
একটা চলমান মহাবিশ্ব।
তার চোখে
যতটা জল,
তার চেয়েও বেশি
অদেখা সমুদ্র।

তার নীরবতায়
যতটা অন্ধকার,
তার চেয়েও বেশি
অজন্মা ভাষা।
তার হাসিতে
যতটা আনন্দ,
তার চেয়েও বেশি
বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত।

আমি
একজন মানুষের হাত ধরেছিলাম।
হাতটা
শীতের সকালে
পুরোনো গাছের বাকলের মতো রুক্ষ।
তবু
সেই হাতের উষ্ণতায়
আমি বুঝলাম,
ত্বক
কোনোদিন
মানুষের শেষ পরিচয় নয়।

আরেকদিন
একজন অপরিচিত মানুষের কান্না শুনে
আমার নিজের চোখ ভিজে উঠল।
সেদিন
প্রথম জানলাম,
রক্তের সম্পর্কেরও
একটা সীমা আছে।
কিন্তু
ব্যথার সম্পর্কের
কোনো সীমানা নেই।

একটা শিশু
প্রথমবার
মাটিতে পড়ে গিয়ে
আবার উঠে দাঁড়ায়।
একজন বৃদ্ধ
শেষবার
বিছানা থেকে উঠতে না পেরে
জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
দুই দৃশ্যের মাঝখানে
পুরো মানবসভ্যতা।
একটা ওঠা।
একটা না-ওঠা।
তবু
দুজনের চোখেই
একই আলো।

আমরা
মানুষকে
তার নাম দিয়ে ডাকি।
পেশা দিয়ে ডাকি।
ধর্ম দিয়ে ডাকি।
জাতি দিয়ে ডাকি।
পাসপোর্ট দিয়ে ডাকি।
কিন্তু
পৃথিবী
এভাবে কাউকে চেনে না।

বৃষ্টি
কোনো ধর্মে পড়ে না।
সূর্য
কোনো ভাষায় ওঠে না।
মৃত্যু
কোনো সীমান্তে থামে না।
তাহলে
মানুষ কেন
নিজেকে
এত ছোট ছোট দেয়ালে
ভাগ করে?

হয়তো
সে ভুলে গেছে,
তার প্রথম পরিচয়
কোনো নাম ছিল না।
ছিল
একটা কান্না।
আর শেষ পরিচয়ও
কোনো নাম হবে না।
হবে
একটা দীর্ঘ নীরবতা।

এই দুই নীরবতার মাঝখানে
সে
একটা জীবন পায়।
এই সামান্য সময়ে
সে ঘর বানায়।
আবার ভেঙে ফেলে।
সে ভালোবাসে।
আবার হারায়।
সে যুদ্ধ শুরু করে।
আবার শান্তির জন্য
সন্তানের নাম রাখে।
সে গাছ কাটে।
আবার
মৃত মানুষের নামে
একটা চারা রোপণ করে।
সে ভুল করে।
তারপর
ক্ষমা চাইতে শেখে।
সে কাঁদে।
তারপর
অন্যের চোখ মুছে দেয়।

এই দ্বন্দ্বের নামই
মানুষ।
সে অসম্পূর্ণ।
তাই সুন্দর।
সে ভঙ্গুর।
তাই স্পর্শযোগ্য।
সে ক্ষণস্থায়ী।
তাই মূল্যবান।

আমি বহুদিন
মানুষকে খুঁজেছি
বইয়ের ভেতর।
মন্দিরে।
মসজিদে।
গির্জায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে।
যুদ্ধক্ষেত্রে।
আদালতে।
কবিতায়।

শেষে
একদিন
একটা ক্ষুধার্ত শিশু
নিজের রুটির অর্ধেক
আরও ক্ষুধার্ত একটা কুকুরকে
দিয়ে দিল।
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।

আরেকদিন
একজন নার্স
সারা রাত
একজন অচেনা বৃদ্ধের হাত ধরে
বসে ছিলেন।
ভোর হলে
বৃদ্ধটি আর জাগলেন না।
তবু
নার্সের হাত
অনেকক্ষণ ছাড়েনি,
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।

আবার
একজন বন্দি
বহু বছর পরে
কারাগার থেকে বেরিয়ে
প্রথমে
আকাশের দিকে তাকাল।
কোনো অভিযোগ করল না।
শুধু
গভীর শ্বাস নিল।
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।

আজ
আমি জানি,
মানুষ
কোনো উত্তর নয়।

মানুষ,
স্রষ্টারও
সবচেয়ে সাহসী প্রশ্ন।
যার উত্তর
একটা জীবনে
সম্পূর্ণ লেখা যায় না।
তাই
প্রতিটা নবজাতক
সেই উত্তর
আবার লিখতে আসে।

আর
প্রতিটা মৃত্যু
অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির মতো
নীরবে
বন্ধ হয়ে যায়।

হয়তো
এই কারণেই
মানুষ
পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
অলৌকিক ঘটনা।
কারণ
সে জানে —
সে একদিন চলে যাবে।
তবু
সে একটা গাছ লাগায়।
একটা সন্তানকে
সত্য শেখায়।
একটা কবিতা লেখে।
একটা অচেনা মানুষকে
ক্ষমা করে।
একটা প্রদীপ জ্বালায়।
আর
নিজের সমস্ত ক্ষণস্থায়িত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
নিঃশব্দে ঘোষণা করে —

"আমি ছিলাম।
আমি ভালোবেসেছিলাম।
আমি সম্পূর্ণ হতে পারিনি।
তবু আমি মানুষ-ই ছিলাম।"

মানুষ

(মানুষ)

শেষ পর্যন্ত
মানুষ
যেখানে ফিরে যায়,
সেটা কোনো বাড়ি নয়।
কোনো শহরও নয়।
কোনো মুখ,
কোনো নাম,
কোনো ইতিহাসও নয়।

সে ফিরে যায়
একটা নীরবতায়।
যে নীরবতা
তার জন্মেরও আগে
তার জন্য অপেক্ষা করছিল।

আমি বহুদিন
শব্দের ভেতর বাস করেছি।
করতালির ভেতর।
বিতর্কের ভেতর।
জয়ের ভেতর।
পরাজয়ের ভেতর।
অসংখ্য বাক্যের মধ্যে
নিজেকে খুঁজেছি।
শেষে দেখলাম —
শব্দগুলো
আমাকে বহন করেনি।
আমি-ই
তাদের কাঁধে করে
এতদূর এনেছি।

একদিন
রাতের শেষ প্রহরে
আমি জেগে উঠলাম।
জানালার বাইরে
কোনো বাতাস ছিল না।
পাতাও নড়ছিল না।
চাঁদ
একটা পুরোনো সন্ন্যাসীর মতো
আকাশের ধারে
চুপচাপ বসে ছিল।

সেই নীরবতায়
হঠাৎ শুনতে পেলাম
নিজের হৃদয়ের শব্দ।
না —
রক্তের নয়।
অনেক বছর ধরে
নিজেকে ক্ষমা করতে না-পারা
একজন মানুষের
ধীর স্পন্দন।

আমরা সারাজীবন
অন্যদের ক্ষমা করতে শিখি।
নিজেকে ক্ষমা করতে
শিখি না।
তাই
আমাদের বুকের ভেতর
একটা অদৃশ্য আদালত
দিনরাত বসে থাকে।
সেখানে
বিচারকও আমরা।
অভিযুক্তও আমরা।
সাক্ষীও আমরা।
শাস্তিও আমরা।

সেদিন
আমি সেই আদালত
ভেঙে দিলাম।
কোনো যুক্তি দিয়ে নয়।
কোনো ঘোষণা দিয়ে নয়।
শুধু
চুপ করে বসে রইলাম।
দীর্ঘক্ষণ।
এত দীর্ঘ,
যে সময়
আমার পাশে এসে
নিজের ঘড়ি খুলে রাখল।

তারপর
অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল।
আমার ভেতরে
যাদের এতদিন
আলাদা মানুষ বলে মনে হতো —
শিশুটা,
যুবকটা,
প্রেমিকটা,
পথহারা মানুষটা,
ক্ষমাহীন মানুষটা,
কবিটা,
ভীত মানুষটা —
ধীরে ধীরে
একজন হয়ে গেল।
যেন
অনেক নদী
দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে
নিজেদের নাম ভুলে
সমুদ্রে মিশে যায়।

আমি তখন বুঝলাম,
নীরবতা
কখনো শব্দের অনুপস্থিতি নয়।
নীরবতা হলো
বিচ্ছিন্ন সত্তাগুলোর
একটামাত্র হৃদস্পন্দনে
মিলিত হওয়া।

ভোর হতে লাগল।
পূর্ব আকাশে
এক ফালি আলো উঠল।
পাখিরা
এখনো গান শুরু করেনি।
গাছেরা
এখনো আলোকে
সম্পূর্ণ গ্রহণ করেনি।
পৃথিবী
একটা শ্বাস নিচ্ছিল।

আমি অনুভব করলাম,
এই তো —
এমনই ছিল
আমার প্রথম সকাল।
যখন
আমি কোনো ভাষা জানতাম না।
কোনো পরিচয় ছিল না।
কোনো অর্জন ছিল না।
শুধু
একটা স্পন্দন ছিল।
একটা বিস্ময়।
একটা নিঃশব্দ উপস্থিতি।

হয়তো
মানুষের সমস্ত যাত্রার
গোপন উদ্দেশ্য
নতুন কিছু পাওয়া নয়।
বরং
এত দূর ঘুরে এসে
আবার
সেই প্রথম নীরবতাকে
চিনে নেওয়া।

আজ
আমি আর
নীরবতাকে ভয় পাই না।
কারণ জানি,
সেখানে
কোনো শূন্যতা নেই।
সেখানে
আমার প্রথম কান্না
এখনো উষ্ণ।
মায়ের নিঃশ্বাস
এখনো ধীরে দুলছে।
বাবার হাত
এখনো আমার কাঁধে।
অদেখা সব ভালোবাসা
এখনো আলো হয়ে আছে।

আর আমি —
যে এতদিন
নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে
অন্য প্রান্তে হেঁটেছি —
শেষে এসে দেখি,
আমি কোথাও ফিরিনি।
আমি শুধু
প্রথমবারের মতো
নিজের ভেতরে
পৌঁছেছি।

সেইখানে
কোনো শব্দ নেই।
কোনো দাবি নেই।
কোনো প্রমাণ নেই।

শুধু
একটা আদিম নীরবতা —
যেখানে
সব কবিতার জন্ম,
সব অশ্রুর বিশ্রাম,
সব মানুষের
অপ্রকাশিত মুখ
চিরকাল
আলোর আগে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করে।

প্রথম নীরবতায় ফেরা

(মানুষ)

শেষ প্রশ্নটি
মৃত্যুর আগে আসে না,
সে সারা জীবন
আমাদের পাশে হাঁটে।
আমরা
শুধু তাকে চিনতে পারি না।

শৈশবে
সে এসেছিল
একটা ভাঙা খেলনার পাশে।
আমি খেলনাটা বুকে চেপে
অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
মনে হয়েছিল,
ভেঙে যাওয়া মানেই
শেষ হয়ে যাওয়া।
প্রশ্নটা তখন
আমার কাঁধে হাত রেখেছিল।
আমি ফিরে তাকাইনি।

কৈশোরে
সে এসেছিল
প্রথম প্রত্যাখ্যানের রাতে।
জানালার ওপারে চাঁদ ছিল।
ভেতরে
একটা দীর্ঘ নীরবতা।
আমি ভেবেছিলাম,
যে চলে যায়,
সে-ই আমার সবকিছু নিয়ে যায়।
প্রশ্নটা
আমার পাশে বসে ছিল।
আমি তাকে
অন্ধকার ভেবেছিলাম।

যৌবনে
সে অফিসের ব্যস্ত সিঁড়িতে,
ট্রেনের ভিড়ে,
হাসির আড্ডায়,
অভিনন্দনের করতালিতে,
এমনকি
সফলতার ছবির ভেতরেও
চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি
অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি।
শুধু
তার সঙ্গে নয়।

তারপর একদিন
হাসপাতালের করিডোরে
একটা শিশু জন্ম নিল।
একই করিডোরের অন্য প্রান্তে
একজন বৃদ্ধ
শেষবারের মতো
চোখ বন্ধ করলেন।
দুই দরজার মাঝখানে
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো,
পৃথিবী
একটা নিঃশ্বাস নিল।
তারপর
আবার চলতে শুরু করল।

আমরা
জন্মকে উৎসব বলি।
মৃত্যুকে শোক।
সময়
দুটোকেই
একই আকাশের নিচে
একই নীরবতায় রাখে।

সেই দিন
প্রশ্নটা
প্রথমবার
নিজের মুখ দেখাল।
তার চোখে
কোনো বিচার ছিল না।
কোনো ধর্ম ছিল না।
কোনো পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি নয়।
কোনো শাস্তির ভয়ও নয়।
সে শুধু
একটা প্রশ্ন করল —

"তুমি কি সত্যিই দেখেছিলে?"

আমি উত্তর দিতে পারিনি।

আমি কি
বৃষ্টিকে দেখেছি,
নাকি শুধু ভিজেছি?
আমি কি
মায়ের মুখ দেখেছি,
নাকি শুধু তার উপস্থিতিকে
স্বাভাবিক ভেবেছি?
আমি কি
ভালোবেসেছি,
নাকি
ভালোবাসা পাওয়ার অপেক্ষাতেই
জীবন কেটে গেছে?
আমি কি
একটা গাছের নিচে বসে
তার নীরবতা শুনেছি?
আমি কি
কখনো
একজন অপরিচিত মানুষের চোখে
নিজের মুখ চিনেছি?
আমি কি
ক্ষমা করেছি,
নাকি
শুধু সময়কে
ক্ষতের ওপর ঘাস জন্মাতে দিয়েছি?

প্রশ্নটা
আর কিছু বলল না।
সে জানত,
সবচেয়ে গভীর উত্তর
শব্দে জন্মায় না।

সেদিন রাতে
আমি আকাশের দিকে তাকালাম।
তারারা
একটা শব্দও বলেনি।
তবু
তাদের নীরবতায়
অসংখ্য উত্তর জ্বলছিল।

আমি বুঝলাম,
শেষ প্রশ্নের
কোনো ভাষা নেই।
তার আছে
একটা আয়না।
সেখানে
মানুষ
নিজের জীবনের দিকে
শেষবারের মতো তাকায়।
এবং
হঠাৎ দেখে —
সে যত পথ হেঁটেছে,
তার চেয়ে বড়
যে পথগুলো
সে কখনো হাঁটেনি।
সে যত কথা বলেছে,
তার চেয়ে গভীর
যে কথাগুলো
সে চিরকাল
অপ্রকাশ রেখেছে।

হয়তো
শেষ প্রশ্নটা
স্রষ্টা করেন না।
মৃত্যুও না।
শেষ প্রশ্নটা
মানুষ নিজেই
নিজেকেই করে।

আর যদি
সেই মুহূর্তে
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে
নিঃশব্দে বলতে পারে —

"আমি সম্পূর্ণ ছিলাম না।
তবু আমি সত্য ছিলাম।"

তবে
সেই উত্তরই
সমস্ত প্রশ্নের পরে
মানুষের
সবচেয়ে শান্ত
এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল
নীরবতা।

শেষ প্রশ্ন

(মানুষ)

আমার ভেতরে
শুধু আমি থাকি না,
আরও কয়েকজন মানুষ থাকে।

একজন
সমুদ্রের ধারে একটা ছোট্ট বাতিঘরে
সারা জীবন
আলো জ্বালিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখত।
আরেকজন
অচেনা শহরের গলিতে
পুরোনো বই বিক্রি করতে চাইত,
যেন প্রতিটি বই
একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঋতু।
আরেকজন
কোনো পাহাড়ি গ্রামে
শিশুদের আকাশের নাম শেখাত।
আরেকজন
প্রতিদিন সন্ধ্যায়
একটা বেহালা বাজিয়ে
অন্ধকারকে একটু কোমল করত।

তারা কেউ
জন্ম নেয়নি।
তারা শুধু
আমার ভেতরে
অপেক্ষা করেছে।
আমি
অন্য একটা জীবন বেছে নিয়েছি।
সকালগুলো
সময়ের কাছে বন্ধক রেখেছি।
বিকেলগুলো
দায়িত্বের কাছে।
রাতগুলো
অপূর্ণতার কাছে।

তবু
মাঝে মাঝে
হঠাৎ কোনো বৃষ্টির গন্ধে,
কোনো ট্রেনের হুইসেলে,
কোনো অচেনা মুখের হাসিতে,
আমার ভেতরের
অন্য মানুষগুলো
ধীরে ধীরে
চোখ খুলে তাকায়।
তারা আমাকে
দোষ দেয় না।
শুধু
এমনভাবে হাসে,
যেন জানে —
একটা জীবনে
সব জীবন বাঁচা যায় না।

একদিন
একটা পুরোনো স্টেশনে
আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
একের পর এক ট্রেন এল।
চলে গেল।
আমি উঠলাম না।
হঠাৎ মনে হলো,
জীবনও এমনই।
আমরা
যে ট্রেনে উঠেছি,
তার জন্যই
অসংখ্য ট্রেন
চিরদিনের মতো
ছেড়ে দিয়েছি।

সেই ছেড়ে দেওয়া ট্রেনগুলোর
জানালায়
আজও হয়তো
আমারই মুখ বসে আছে।
সে অন্য আকাশ দেখেছে।
অন্য নদী।
অন্য ভালোবাসা।
অন্য ব্যর্থতা।
অন্য মৃত্যু।

কখনো কখনো
আমি রাতে
স্বপ্ন দেখি —
আমি এমন একটা বাড়িতে ফিরেছি,
যেখানে আমি
কোনোদিন থাকিনি।
দরজা খুলতেই
একটা শিশু দৌড়ে এসে
আমাকে বাবা বলে জড়িয়ে ধরে।
একজন বৃদ্ধা
আমার জন্য ভাত বাড়েন।
জানালার পাশে
একটা কুকুর
লেজ নাড়ে।
ঘুম ভেঙে যায়।
আমি বুঝি,
ওরা কেউ
বাস্তব নয়।
তবু
তাদের জন্য
আমার বুকের ভেতর
একটা সত্যিকারের শূন্যতা জন্মায়।

হয়তো
মানুষের সবচেয়ে গভীর কান্না
যাদের হারিয়েছি,
তাদের জন্য নয়।
যে জীবনগুলো
আমাদের ভেতরেই
জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায়নি,
তাদের জন্য।
তবু আজ
আমি আর
সেই অজন্মা জীবনগুলোর কাছে
ক্ষমা চাই না।
কারণ
তাদের নীরবতাই
আমাকে মানুষ করেছে।
যে কবিতা লেখা হয়নি,
সে-ই আমাকে
লিখতে শিখিয়েছে।
যে পথে হাঁটিনি,
সে-ই আমাকে
পথের মূল্য বুঝিয়েছে।
যে ভালোবাসা
আমার হয়নি,
সে-ই
আমার হৃদয়ে
স্থান তৈরি করেছে।

আজ আমি জানি,
মানুষ
একটা জীবন নিয়ে জন্মায়,
কিন্তু
অসংখ্য সম্ভাবনার মৃত্যু
বয়ে বেড়ায়।
আমরা
যে জীবন বাঁচি,
তার চেয়েও বড়
যে জীবন বাঁচি না।

কারণ
আমাদের ভেতরে
নিঃশব্দে বসে থাকা
সেই অদেখা মানুষগুলোর চোখেই
হয়তো
ঈশ্বর
প্রতিদিন
আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আর তাই
আমি যখন আয়নায় দেখি,
শুধু নিজের মুখ দেখি না।
দেখি —
অসংখ্য অজন্মা জীবনের
শান্ত, দীপ্ত, ক্ষমাশীল
প্রতিফলন।

অন্য আমি

(মানুষ)

পৃথিবীতে আসার আগে
আমি কোনো ভাষা জানতাম না।
আলো চিনতাম না,
আকাশও না।

শুধু একটা ছন্দ চিনতাম।
ধীর।
উষ্ণ।
অবিরাম।
সে ছিল
আমার মায়ের নিঃশ্বাস।

আমার প্রথম পৃথিবী
কোনো দেশ ছিল না,
কোনো মানচিত্রও নয়।
একটা বুকের ভেতর
জলের মতো দুলতে থাকা
একটা অন্ধকার আশ্রয়।

সেখানে
দিন ছিল না,
রাতও না।
শুধু
একটা নিঃশ্বাসের ওঠানামায়
সময় তার প্রথম দোলনা বানিয়েছিল।

মা কখনো জানেননি,
তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে
আমি পৃথিবীর ব্যাকরণ শিখছিলাম।

কীভাবে ভয় থেমে যায়।
কীভাবে নীরবতাও
একটা আশ্রয় হতে পারে।
কীভাবে
কোনো শব্দ না বলেও
একজন মানুষ
আরেকজন মানুষকে
বাঁচিয়ে রাখে।

জন্মের পরে
আমাকে অনেক ভাষা শেখানো হয়েছে।
বর্ণমালা।
ব্যাকরণ।
ইতিহাস।
রাষ্ট্র।
ধর্ম।

কিন্তু
যে ভাষায়
মা গভীর রাতে
আমার জ্বর ছুঁয়ে বলতেন,
"আমি আছি" —
সেই ভাষার
কোনো অভিধান
আজও লেখা হয়নি।

একদিন লক্ষ্য করলাম,
মায়েরা ক্লান্ত হলে
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন না।
তারা
নিঃশব্দে
আরও ধীরে শ্বাস নেন।
যেন
নিজের ক্লান্তিকে
সন্তানের ঘুমের বাইরে
রেখে আসতে চান।

মায়ের নিঃশ্বাস
বাতাসের মতো নয়।
বাতাস
সবাইকে ছুঁয়ে যায়।
মায়ের নিঃশ্বাস
শুধু একজন মানুষকে
তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব দিয়ে
ডেকে রাখে।

শৈশবে
আমি ঘুমিয়ে পড়তাম
মায়ের বুকের পাশে।
আজ এত বছর পরেও
কোনো অজানা শহরের
হোটেলঘরে
রাতের শেষে
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে
আমি কখনো কখনো
একটা অদৃশ্য ছন্দ শুনতে পাই।

জানালার বাইরে
কেউ নেই,
ঘরের ভেতরেও না।
তবু মনে হয়,
পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে
একটা নিঃশ্বাস
এখনো আমাকে
বাড়ি বলে ডাকে।

সময়
মায়ের চুলে
রূপোর ধুলো ছিটিয়ে দিয়েছে।
হাতের শিরাগুলো
নদীর মতো স্পষ্ট।
হাঁটার ভেতর
ধীরে ধীরে
বিকেলের আলো নেমে এসেছে।
কিন্তু অদ্ভুত —
আমি যখনই
তার পাশে বসি,
মনে হয়,
আমি আবার
একটা অনাগত শিশু।

আমার সব বয়স
তার একটিমাত্র নিঃশ্বাসের কাছে
নীরবে মাথা নত করে।

আমি জানি,
একদিন
এই পৃথিবীতে
মায়ের নিঃশ্বাস থাকবে না,
ঘর থাকবে।
জানালা থাকবে।
তার ব্যবহার করা চশমা,
শাড়ির ভাঁজ,
প্রার্থনার চাদর,
রান্নাঘরের মশলার গন্ধ —
সবই থাকবে।
শুধু
যে অদৃশ্য ছন্দে
আমার প্রথম পৃথিবী দুলেছিল,
সে আর শোনা যাবে না।

সেদিন
পৃথিবীর বাতাস
একই রকম থাকবে।
তবু
আমি বুঝব,
কিছু একটা
চিরতরে বদলে গেছে।
কারণ
মা কখনো
শুধু একজন মানুষ নন।
তিনি
সন্তানের জীবনে
ঈশ্বরের সবচেয়ে নীরব উচ্চারণ।

আর তাঁর নিঃশ্বাস —
সেই প্রথম কবিতা,
যা কোনো কাগজে লেখা হয় না,
কোনো ভাষায়
সম্পূর্ণ অনুবাদ হয় না,
তবু
মানুষ
সারাজীবন
নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে
পুনরায় পড়তে থাকে।

মায়ের নিঃশ্বাস

বাছাইকৃত কবিতা

মানুষ

- মোঃ আবু তালেব

(মানুষ)

পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য প্রাণী
পাখি নয়,
তিমি নয়,
নক্ষত্রও নয়,
মানুষ।

কারণ
সে মাটি দিয়ে তৈরি,
তবু সারাজীবন
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তার শরীরে
নদীর মতো রক্ত,
পাহাড়ের মতো অস্থি,
বাতাসের মতো শ্বাস,
আগুনের মতো ক্ষুধা।

আর এক অদ্ভুত শূন্যতা —
যার কোনো নাম নেই।

মানুষ
একটা জন্ম নিয়ে আসে,
কিন্তু
অসংখ্য মৃত্যুর ভেতর দিয়ে
ধীরে ধীরে
নিজেকে তৈরি করে।

একটা বিশ্বাস মরে,
একটা অহংকার মরে,
একটা প্রেম মরে,
একটা ভয় মরে,
একটা স্বপ্ন মরে।
তবু
সে প্রতিটা ভাঙনের পরে
নিজের ভেতর
আরেকটা ভোর আবিষ্কার করে।

এই জন্যই
মানুষকে
কোনো অভিধান দিয়ে
সংজ্ঞায়িত করা যায় না।
একজন মানুষ
একটা চলমান মহাবিশ্ব।
তার চোখে
যতটা জল,
তার চেয়েও বেশি
অদেখা সমুদ্র।

তার নীরবতায়
যতটা অন্ধকার,
তার চেয়েও বেশি
অজন্মা ভাষা।
তার হাসিতে
যতটা আনন্দ,
তার চেয়েও বেশি
বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত।

আমি
একজন মানুষের হাত ধরেছিলাম।
হাতটা
শীতের সকালে
পুরোনো গাছের বাকলের মতো রুক্ষ।
তবু
সেই হাতের উষ্ণতায়
আমি বুঝলাম,
ত্বক
কোনোদিন
মানুষের শেষ পরিচয় নয়।

আরেকদিন
একজন অপরিচিত মানুষের কান্না শুনে
আমার নিজের চোখ ভিজে উঠল।
সেদিন
প্রথম জানলাম,
রক্তের সম্পর্কেরও
একটা সীমা আছে।
কিন্তু
ব্যথার সম্পর্কের
কোনো সীমানা নেই।

একটা শিশু
প্রথমবার
মাটিতে পড়ে গিয়ে
আবার উঠে দাঁড়ায়।
একজন বৃদ্ধ
শেষবার
বিছানা থেকে উঠতে না পেরে
জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
দুই দৃশ্যের মাঝখানে
পুরো মানবসভ্যতা।
একটা ওঠা।
একটা না-ওঠা।
তবু
দুজনের চোখেই
একই আলো।

আমরা
মানুষকে
তার নাম দিয়ে ডাকি।
পেশা দিয়ে ডাকি।
ধর্ম দিয়ে ডাকি।
জাতি দিয়ে ডাকি।
পাসপোর্ট দিয়ে ডাকি।
কিন্তু
পৃথিবী
এভাবে কাউকে চেনে না।

বৃষ্টি
কোনো ধর্মে পড়ে না।
সূর্য
কোনো ভাষায় ওঠে না।
মৃত্যু
কোনো সীমান্তে থামে না।
তাহলে
মানুষ কেন
নিজেকে
এত ছোট ছোট দেয়ালে
ভাগ করে?

হয়তো
সে ভুলে গেছে,
তার প্রথম পরিচয়
কোনো নাম ছিল না।
ছিল
একটা কান্না।
আর শেষ পরিচয়ও
কোনো নাম হবে না।
হবে
একটা দীর্ঘ নীরবতা।

এই দুই নীরবতার মাঝখানে
সে
একটা জীবন পায়।
এই সামান্য সময়ে
সে ঘর বানায়।
আবার ভেঙে ফেলে।
সে ভালোবাসে।
আবার হারায়।
সে যুদ্ধ শুরু করে।
আবার শান্তির জন্য
সন্তানের নাম রাখে।
সে গাছ কাটে।
আবার
মৃত মানুষের নামে
একটা চারা রোপণ করে।
সে ভুল করে।
তারপর
ক্ষমা চাইতে শেখে।
সে কাঁদে।
তারপর
অন্যের চোখ মুছে দেয়।

এই দ্বন্দ্বের নামই
মানুষ।
সে অসম্পূর্ণ।
তাই সুন্দর।
সে ভঙ্গুর।
তাই স্পর্শযোগ্য।
সে ক্ষণস্থায়ী।
তাই মূল্যবান।

আমি বহুদিন
মানুষকে খুঁজেছি
বইয়ের ভেতর।
মন্দিরে।
মসজিদে।
গির্জায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে।
যুদ্ধক্ষেত্রে।
আদালতে।
কবিতায়।

শেষে
একদিন
একটা ক্ষুধার্ত শিশু
নিজের রুটির অর্ধেক
আরও ক্ষুধার্ত একটা কুকুরকে
দিয়ে দিল।
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।

আরেকদিন
একজন নার্স
সারা রাত
একজন অচেনা বৃদ্ধের হাত ধরে
বসে ছিলেন।
ভোর হলে
বৃদ্ধটি আর জাগলেন না।
তবু
নার্সের হাত
অনেকক্ষণ ছাড়েনি,
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।

আবার
একজন বন্দি
বহু বছর পরে
কারাগার থেকে বেরিয়ে
প্রথমে
আকাশের দিকে তাকাল।
কোনো অভিযোগ করল না।
শুধু
গভীর শ্বাস নিল।
সেদিন
আমি মানুষকে দেখেছিলাম।

আজ
আমি জানি,
মানুষ
কোনো উত্তর নয়।

মানুষ,
স্রষ্টারও
সবচেয়ে সাহসী প্রশ্ন।
যার উত্তর
একটা জীবনে
সম্পূর্ণ লেখা যায় না।
তাই
প্রতিটা নবজাতক
সেই উত্তর
আবার লিখতে আসে।

আর
প্রতিটা মৃত্যু
অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির মতো
নীরবে
বন্ধ হয়ে যায়।

হয়তো
এই কারণেই
মানুষ
পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
অলৌকিক ঘটনা।
কারণ
সে জানে —
সে একদিন চলে যাবে।
তবু
সে একটা গাছ লাগায়।
একটা সন্তানকে
সত্য শেখায়।
একটা কবিতা লেখে।
একটা অচেনা মানুষকে
ক্ষমা করে।
একটা প্রদীপ জ্বালায়।
আর
নিজের সমস্ত ক্ষণস্থায়িত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
নিঃশব্দে ঘোষণা করে —

"আমি ছিলাম।
আমি ভালোবেসেছিলাম।
আমি সম্পূর্ণ হতে পারিনি।
তবু আমি মানুষ-ই ছিলাম।"
বিস্তারিত...

প্রথম নীরবতায় ফেরা

- মোঃ আবু তালেব

(মানুষ)

শেষ পর্যন্ত
মানুষ
যেখানে ফিরে যায়,
সেটা কোনো বাড়ি নয়।
কোনো শহরও নয়।
কোনো মুখ,
কোনো নাম,
কোনো ইতিহাসও নয়।

সে ফিরে যায়
একটা নীরবতায়।
যে নীরবতা
তার জন্মেরও আগে
তার জন্য অপেক্ষা করছিল।

আমি বহুদিন
শব্দের ভেতর বাস করেছি।
করতালির ভেতর।
বিতর্কের ভেতর।
জয়ের ভেতর।
পরাজয়ের ভেতর।
অসংখ্য বাক্যের মধ্যে
নিজেকে খুঁজেছি।
শেষে দেখলাম —
শব্দগুলো
আমাকে বহন করেনি।
আমি-ই
তাদের কাঁধে করে
এতদূর এনেছি।

একদিন
রাতের শেষ প্রহরে
আমি জেগে উঠলাম।
জানালার বাইরে
কোনো বাতাস ছিল না।
পাতাও নড়ছিল না।
চাঁদ
একটা পুরোনো সন্ন্যাসীর মতো
আকাশের ধারে
চুপচাপ বসে ছিল।

সেই নীরবতায়
হঠাৎ শুনতে পেলাম
নিজের হৃদয়ের শব্দ।
না —
রক্তের নয়।
অনেক বছর ধরে
নিজেকে ক্ষমা করতে না-পারা
একজন মানুষের
ধীর স্পন্দন।

আমরা সারাজীবন
অন্যদের ক্ষমা করতে শিখি।
নিজেকে ক্ষমা করতে
শিখি না।
তাই
আমাদের বুকের ভেতর
একটা অদৃশ্য আদালত
দিনরাত বসে থাকে।
সেখানে
বিচারকও আমরা।
অভিযুক্তও আমরা।
সাক্ষীও আমরা।
শাস্তিও আমরা।

সেদিন
আমি সেই আদালত
ভেঙে দিলাম।
কোনো যুক্তি দিয়ে নয়।
কোনো ঘোষণা দিয়ে নয়।
শুধু
চুপ করে বসে রইলাম।
দীর্ঘক্ষণ।
এত দীর্ঘ,
যে সময়
আমার পাশে এসে
নিজের ঘড়ি খুলে রাখল।

তারপর
অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল।
আমার ভেতরে
যাদের এতদিন
আলাদা মানুষ বলে মনে হতো —
শিশুটা,
যুবকটা,
প্রেমিকটা,
পথহারা মানুষটা,
ক্ষমাহীন মানুষটা,
কবিটা,
ভীত মানুষটা —
ধীরে ধীরে
একজন হয়ে গেল।
যেন
অনেক নদী
দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে
নিজেদের নাম ভুলে
সমুদ্রে মিশে যায়।

আমি তখন বুঝলাম,
নীরবতা
কখনো শব্দের অনুপস্থিতি নয়।
নীরবতা হলো
বিচ্ছিন্ন সত্তাগুলোর
একটামাত্র হৃদস্পন্দনে
মিলিত হওয়া।

ভোর হতে লাগল।
পূর্ব আকাশে
এক ফালি আলো উঠল।
পাখিরা
এখনো গান শুরু করেনি।
গাছেরা
এখনো আলোকে
সম্পূর্ণ গ্রহণ করেনি।
পৃথিবী
একটা শ্বাস নিচ্ছিল।

আমি অনুভব করলাম,
এই তো —
এমনই ছিল
আমার প্রথম সকাল।
যখন
আমি কোনো ভাষা জানতাম না।
কোনো পরিচয় ছিল না।
কোনো অর্জন ছিল না।
শুধু
একটা স্পন্দন ছিল।
একটা বিস্ময়।
একটা নিঃশব্দ উপস্থিতি।

হয়তো
মানুষের সমস্ত যাত্রার
গোপন উদ্দেশ্য
নতুন কিছু পাওয়া নয়।
বরং
এত দূর ঘুরে এসে
আবার
সেই প্রথম নীরবতাকে
চিনে নেওয়া।

আজ
আমি আর
নীরবতাকে ভয় পাই না।
কারণ জানি,
সেখানে
কোনো শূন্যতা নেই।
সেখানে
আমার প্রথম কান্না
এখনো উষ্ণ।
মায়ের নিঃশ্বাস
এখনো ধীরে দুলছে।
বাবার হাত
এখনো আমার কাঁধে।
অদেখা সব ভালোবাসা
এখনো আলো হয়ে আছে।

আর আমি —
যে এতদিন
নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে
অন্য প্রান্তে হেঁটেছি —
শেষে এসে দেখি,
আমি কোথাও ফিরিনি।
আমি শুধু
প্রথমবারের মতো
নিজের ভেতরে
পৌঁছেছি।

সেইখানে
কোনো শব্দ নেই।
কোনো দাবি নেই।
কোনো প্রমাণ নেই।

শুধু
একটা আদিম নীরবতা —
যেখানে
সব কবিতার জন্ম,
সব অশ্রুর বিশ্রাম,
সব মানুষের
অপ্রকাশিত মুখ
চিরকাল
আলোর আগে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করে।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4606
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1683
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1646
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1572
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1565
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1498
মানুষ মোঃ আবু তালেব 1459
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1449
রমণী মোঃ আবু তালেব 1428
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1393
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1393
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1392
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1355
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1352
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1349
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1348
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1346
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1331
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1321
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1317
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
মানুষ মোঃ আবু তালেব 0
প্রথম নীরবতায় ফেরা মোঃ আবু তালেব 20
শেষ প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 21
অন্য আমি মোঃ আবু তালেব 22
মায়ের নিঃশ্বাস মোঃ আবু তালেব 22
শেষ চুম্বন মোঃ আবু তালেব 30
বৃদ্ধের বিকেল মোঃ আবু তালেব 29
ভিখারির রাজ্য মোঃ আবু তালেব 86
সকল মানুষের মুখ মোঃ আবু তালেব 34
অপ্রকাশ মোঃ আবু তালেব 36
ভেতরের সমুদ্র মোঃ আবু তালেব 39
নীরব যুদ্ধ মোঃ আবু তালেব 43
হারিয়ে যাওয়া নাম মোঃ আবু তালেব 75
যে ক্ষমা পাইনি মোঃ আবু তালেব 37
যে ক্ষমা চাইনি মোঃ আবু তালেব 36
অসমাপ্ত চিঠি মোঃ আবু তালেব 50
গোপন প্রেম মোঃ আবু তালেব 49
অদেখা কান্না মোঃ আবু তালেব 47
যে কথাটি বলিনি মোঃ আবু তালেব 40
আমি কে? মোঃ আবু তালেব 75
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 66
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 57
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 70
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 66
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 71
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 115
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 139
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 137
ভালো মানুষ ইবনে আলী 239
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 138
শিকল ইবনে আলী 213
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 265
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 223
বসন্ত জয়দীপ রায় 243
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 160
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 304
জীবন ও বৃক্ষ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 278
মানবতা বনাম স্বার্থপরতা: এক যুদ্ধাহত পৃথিবীর আর্তনাদ! শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 290
সোনার দেশ শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 311
মুসলিম সংখ্যালঘু শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 252
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে