কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

(মুখ ও মুখোশ)

এই শহরে
মানুষ খুব হাসে।

বাসের ভিড়ে হাসে,
অফিসের করিডরে হাসে,
রেস্তোরাঁর টেবিলে হাসে,
মোবাইলের পর্দায় হাসে,
ছবির নিচে লিখে—
“ভালো আছি।”
শহরও বিশ্বাস করে!

সকালে যে মানুষটি
ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে
নিজের শেষ সঞ্চয় তুলে নেয়,
বিকেলে সেই মানুষটিই
বন্ধুর সামনে বসে
হেসে বলে—
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”

যে মেয়েটি
সারারাত মায়ের অসুখ নিয়ে জেগেছে,
সে অফিসে এসে
সহকর্মীর কৌতুকে হাসে।

যে ছেলেটি
চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরেছে,
সে রাতের খাবারের টেবিলে
বাবাকে বলে—
“চিন্তা কোরো না।”
এই শহরে
মানুষ তার কষ্টকে
ঘরের ভেতর রেখে বের হয়।
যেমন মানুষ
ভেজা ছাতা
দরজার পাশে রেখে যায়।

একদিন একটি ক্যাফেতে
দেখেছিলাম—
চারজন বন্ধু
একসঙ্গে বসে আছে।
টেবিলে কফি।
কথা।
হাসি।
ছবিও তুলল তারা।
সেই ছবিতে
চারটি উজ্জ্বল মুখ ছিল।

ছবির বাইরে
চারটি আলাদা দুশ্চিন্তা।
একজনের বাবার অপারেশন।
একজনের সংসার ভাঙছে।
একজন ঋণে ডুবে আছে।
আরেকজন
প্রতিদিন ভোরে উঠে
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কারণ খোঁজে।
কেউ কাউকে কিছু বলেনি।

শহর এমনই।
এখানে মানুষ
নিজের ক্ষতগুলো
জামার ভেতর লুকিয়ে রাখে।
শুধু কখনো কখনো
রাত গভীর হলে
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে
মনে হয়—
সে কি আকাশ দেখছে,
নাকি
নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকু
কাউকে না দেখিয়ে
একটু বাতাসে শুকিয়ে নিচ্ছে?

এই শহরে
অনেক আলো আছে।
অনেক দোকান।
অনেক উৎসব।
অনেক মুখ।
অনেক হাসি।
তবু আশ্চর্য—
কেউ কারও চোখের দিকে
দীর্ঘক্ষণ তাকায় না।
কারণ চোখের ভেতর
হাসির চেয়ে বড় কিছু থাকে।

সেখানে থাকে
একটি অপূর্ণতা,
একটি ভয়,
একটি না-বলা কথা,
একটি দীর্ঘ ক্লান্তি।

আজকাল আমি
মানুষের হাসি দেখলে
সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করি না।
আমি একটু অপেক্ষা করি।
চোখের দিকে তাকাই।
কারণ আমি জানি—
এই শহরে
সবাই হাসতে জানে,
কিন্তু খুব কম মানুষ
অন্যের কষ্ট দেখতে জানে।

আর যেদিন
একজন মানুষ
অন্য একজন মানুষের
হাসির ভিতর লুকিয়ে থাকা দুঃখটুকু
দেখতে শিখবে,
সেদিন হয়তো
এই শহর
সত্যিই মানুষের শহর হবে।

হাসির শহর

(মুখ ও মুখোশ)

সভ্য মানুষেরা
খুব সুন্দর করে কথা বলে।

তারা কাউকে হাতে মারে না—
শুধু এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করে
যাতে মানুষটি
নিজের ভিতরেই
ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

তারা রক্ত দেখতে পছন্দ করে না;
তাই ক্ষত তৈরি করে
কাগজে,
স্বাক্ষরে,
নিয়মে,
একটি ছোট্ট “না”-তে।

তাদের টেবিলে
ফুল থাকে।
কাঁচের গ্লাসে পানি থাকে।
দেয়ালে
মানবতার ছবি ঝোলে।
আর দরজার বাইরে
একজন বৃদ্ধ
সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভেতরের মানুষটি
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে—
“আজ সম্ভব হবে না।”

সভ্য মানুষেরা
ক্ষুধার্ত মানুষকে
খাবার দেওয়ার আগে
তার পরিচয় জানতে চায়।
তারপর
তার কাগজ দেখে।
তার পোশাক দেখে।
তার ভাষা দেখে।
তারপর সিদ্ধান্ত নেয়—
সে কতটুকু মানুষ!

তারা শিশুকে শেখায়—
“সত্য কথা বলবে।”
তারপর সেই শিশুটি
বড় হয়ে দেখে,
সত্য বললে
চাকরি যায়,
বন্ধু যায়,
সম্মান যায়।
তাই সে শিখে যায়
সত্যের আগে
কীভাবে থামতে হয়।

সভ্য মানুষেরা
যুদ্ধকে ঘৃণা করে।
তারা যুদ্ধের ছবি দেখে
দুঃখ পায়।
তারপর
ডাইনিং টেবিলে বসে
নির্বিঘ্নে রাতের খাবার খায়।

তাদের শহরে
কেউ ফুটপাথে ঘুমায়।
কেউ হাসপাতালের করিডরে
মায়ের হাত ধরে বসে থাকে।
কেউ দিনের শেষে
ভাতের জন্য
নিজের সম্মান বিক্রি করে।
সভ্য মানুষেরা
তাদের পাশ দিয়ে যায়।
কেউ চোখ নামিয়ে নেয়।
কেউ মোবাইলে তাকায়।

কেউ বলে—
“এরা তো সবসময়ই ছিল।”

এই একটি বাক্য
কত শত মানুষের
ক্ষুধার চেয়েও পুরোনো।

সভ্য মানুষেরা
অপরাধীকে শাস্তি দেয়।
এটি ভালো।
কিন্তু তারা কখনো জিজ্ঞেস করে না—
অপরাধের আগে
কতগুলো দরজা
তার মুখের ওপর বন্ধ হয়েছিল।

তারা চোরকে ঘৃণা করে,
কিন্তু এমন একটি সমাজ তৈরি করে
যেখানে কারও কারও কাছে
চুরি ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।


তারপর
নিজেদের সভ্য বলে,
রাতে তারা
আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
পরিষ্কার জামা।
পরিপাটি চুল।
নিরাপদ ঘর।
পাশে ঘুমিয়ে থাকা সন্তান।
আয়না কিছু বলে না,
শুধু মুখ দেখায়।

কিন্তু কোনোদিন যদি
আয়না মুখের বদলে
হাত দেখাত—
তবে দেখা যেত
কারও হাত স্বাক্ষরে,
কারও হাত নীরবতায়,
কারও হাত
শুধু কিছু না করার অপরাধে
ভারী হয়ে আছে।

তবুও সকাল হয়,
সভ্য মানুষেরা
আবার বেরিয়ে পড়ে।
টাই বাঁধে।
জুতো পালিশ করে।
ভদ্রভাবে হাসে।
একজন আরেকজনকে বলে—
“কেমন আছেন?”

কেউ উত্তর দেয় না
সে সত্যিই কেমন আছে!

কারণ
সভ্যতা হয়তো মানুষকে
হিংস্রতা থেকে বাঁচিয়েছে,
কিন্তু মানুষকে
মানুষের কষ্ট থেকে
বাঁচাতে পারেনি এখনও!

সভ্য মানুষেরা

প্রিয় নবীর ছবি আমি আঁকছি কবিতায়,
দেখতে হলে তাকাও তোমার হৃদয়ের আয়নায়।

চাঁদের মতো মুখখানি তাঁর, কাজল কালো চোখ,
ঈষৎ বাঁকা ভ্রু ছিল তার, পশম ভরা বুক।

ঢেউ খেলানো কেশ ছিল তার, লতি ও কাঁধ তক,
বড় ছিল মাপ মতো তাঁর মাথা মোবারক।

চোখের পাতায় পলক ছিল অতি দীর্ঘকায়,
রক্তিম রেখার টান ছিল তাঁর চোখের শুভ্রতায়।

চমকাতো নূর সর্বদা তাঁর উন্নত নাক-কান,
মূর্তির মতো মসৃণ তার গলা ও গর্দান।

স্ফীত এক রগ ছিল তাঁর ললাট প্রশস্তে,
রাগের সময় উঠত ফুলে ভীষণ ধীরস্থে।

সামনের দুই দন্ত মাঝে ছিল খানিক ফাঁক,
দন্তরাজির জন্য ছিল সুন্নতি মিসওয়াক।

ঈষৎ গোলের মুখখানি তার, গোস্তে গণ্ড ফোলা,
ছিল না তার রঙ চেহারার তামাটে বা ধলা।

চিকন-চিকন দাঁত ছিল তার ভীষণ চমৎকার,
কথার সময় চমকাতো নূর, জমকালো মুখ তাঁর।

ডোরাকাটা লালরঙা এক চাদর ছিল তার,
মাঝারি তার গড়ন ছিল, পরনে ইযার।

সবার থেকে উঁচু তাঁরে দেখলে মনে হয়,
ঝুঁকে ঝুঁকে পা ফেলিতেন, বুক ফুলিয়ে নয়।

হাতের তালুর মতোই ছিল মাংসল পায়ের পাত,
কাঁধের মাঝে ছিল তাঁহার মোহরে নবুওয়াত।

শৌর্যে-বীর্যে প্রভাবশালীর পেট-বক্ষ সমান,
রূপার মতো ছিল তাহার চকচকে গর্দান।

অনাবৃত হইলে তাঁরে লাগত চমৎকার,
সেই চেহারা এঁকে দেবার শব্দ নেই আমার।

হাত-পায়ে তাঁর আঙুল ছিল দীর্ঘ মানানসই,
কবজি হতে কনুই ছিল হুবহু এর মতোই।

হাতের মতো মাংসে ভরা উভয় পায়ের নল,
হাড়ের জোড়া শক্ত ছিল, বাহুর যেমন বল।

রূপ-লাবণ্যে নবী আমার পূর্ণিমারি চাঁদ,
তাঁর প্রতি মোর ভালোবাসা জন্মেছে অগাধ।

তাঁর চেহারার মতো আজও হয় না কোনোই তুল,
তাঁরচে ছিলেন ইউসুফ নবী সুন্দর অপ্রতুল।

শুভ্র হয়নি চুল-দাড়ি তাঁর, হয় যদি এক কুড়ি,
বডি তাহার ছিল বিল্ডার, হয়নি মোটা ভুঁড়ি।

চল্লিশে হন নবী আমাদের, তেষট্টিতে যান চলে,
এই তেইশ বছরের মধ্য দিয়েই দুনিয়া ঝলমলে।

কবির কলমে নবির ছবি - Kobir Kolome Nobir Chobi

(মুখ ও মুখোশ)

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মানুষ প্রথম যে মুখটি দেখে,
সেটি তার নিজের নয়—
সারাদিন পৃথিবীকে দেখানোর জন্য
তৈরি করা একটি মুখ।

আমি দেখেছি তাকে
অফিসের লিফটে,
বাসের ভিড়ে,
চায়ের দোকানের বেঞ্চে,
বিয়ের আসরে,
শোকের ঘরে।

সবাই খুব সুন্দর করে
নিজেকে বহন করে।

যে মানুষটি গতরাতে
বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল,
সকালবেলা সে-ই
সহকর্মীকে বলে—

“ভালো আছি।”

যে বাবা
মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে পারেনি,
সে সন্তানের সামনে
হেসে বলে—
“আগামী মাসে হয়ে যাবে।”

যে নারী
সারাদিন অপমান সহ্য করে,
সন্ধ্যায় অতিথির সামনে
চা বাড়িয়ে দেয়
শান্ত মুখে।

কেউ মিথ্যা বলে না—
তবু শহরটা
মিথ্যায় ভরে থাকে।

কারণ সত্যেরও
একটি সময় আছে,
একটি পোশাক আছে,
একটি সামাজিক অনুমতি আছে।

সব সত্য
টেবিলে রাখা যায় না।
সব কান্না
মানুষের সামনে কাঁদা যায় না।
সব ক্ষুধা
ভদ্রলোকের ভাষায় বলা যায় না।

তাই আমরা মুখ বানাই।
একটি মুখ
মায়ের জন্য,
একটি সন্তানের জন্য,
একটি অফিসের জন্য,
একটি প্রেমের জন্য,
একটি সমাজের জন্য।
আর গভীর রাতে,
সব দরজা বন্ধ হলে,
আলো নিভে গেলে
মানুষ নিজের মুখগুলো
এক এক করে খুলে রাখে।

তখন আয়নায়
যে মুখটি দেখা যায়,
তার কোনো পরিচয় নেই।
সে শুধু ক্লান্ত।
তার চোখের নিচে
ঘুমহীন রাতের দাগ,
ঠোঁটে আটকে থাকা
অনেকগুলো অসমাপ্ত কথা।

আমি একদিন
সেই মুখটির দিকে তাকিয়ে
ভয় পেয়েছিলাম।
কারণ তাকে
আমি চিনতে পারিনি।
এত বছর ধরে
নিজের মুখ বহন করতে করতে
নিজেকেই ভুলে গিয়েছিলাম।

সেদিন বুঝলাম—
মানুষের সবচেয়ে বড় মুখোশ
মুখের ওপর থাকে না;
সে থাকে
নিজের সম্পর্কে
নিজের বিশ্বাসের ভেতর।
আমরা বলি—
আমি ভালো মানুষ।
আমি সৎ।
আমি সাহসী।
আমি কাউকে ঘৃণা করি না।

কিন্তু সুযোগ এলে
আমাদের ভিতরের অন্ধকার
আস্তে করে দরজা খোলে।
তখন দেখা যায়—
মুখের নিচে আরেক মুখ,
তার নিচে আরও একটি।

শেষে
কোনো মুখ নেই।
শুধু একজন মানুষ
দাঁড়িয়ে আছে—
নগ্ন,
ভীত,
অসহায়,
এবং প্রথমবার
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে
ভাবছে—
পৃথিবীর কাছে নয়,
নিজের কাছেই
আমি এতদিন
কিসের অভিনয় করে গেলাম?

মুখের নিচে মুখ

বাছাইকৃত কবিতা

হাসির শহর

- মোঃ আবু তালেব

(মুখ ও মুখোশ)

এই শহরে
মানুষ খুব হাসে।

বাসের ভিড়ে হাসে,
অফিসের করিডরে হাসে,
রেস্তোরাঁর টেবিলে হাসে,
মোবাইলের পর্দায় হাসে,
ছবির নিচে লিখে—
“ভালো আছি।”
শহরও বিশ্বাস করে!

সকালে যে মানুষটি
ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে
নিজের শেষ সঞ্চয় তুলে নেয়,
বিকেলে সেই মানুষটিই
বন্ধুর সামনে বসে
হেসে বলে—
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”

যে মেয়েটি
সারারাত মায়ের অসুখ নিয়ে জেগেছে,
সে অফিসে এসে
সহকর্মীর কৌতুকে হাসে।

যে ছেলেটি
চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরেছে,
সে রাতের খাবারের টেবিলে
বাবাকে বলে—
“চিন্তা কোরো না।”
এই শহরে
মানুষ তার কষ্টকে
ঘরের ভেতর রেখে বের হয়।
যেমন মানুষ
ভেজা ছাতা
দরজার পাশে রেখে যায়।

একদিন একটি ক্যাফেতে
দেখেছিলাম—
চারজন বন্ধু
একসঙ্গে বসে আছে।
টেবিলে কফি।
কথা।
হাসি।
ছবিও তুলল তারা।
সেই ছবিতে
চারটি উজ্জ্বল মুখ ছিল।

ছবির বাইরে
চারটি আলাদা দুশ্চিন্তা।
একজনের বাবার অপারেশন।
একজনের সংসার ভাঙছে।
একজন ঋণে ডুবে আছে।
আরেকজন
প্রতিদিন ভোরে উঠে
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কারণ খোঁজে।
কেউ কাউকে কিছু বলেনি।

শহর এমনই।
এখানে মানুষ
নিজের ক্ষতগুলো
জামার ভেতর লুকিয়ে রাখে।
শুধু কখনো কখনো
রাত গভীর হলে
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে
মনে হয়—
সে কি আকাশ দেখছে,
নাকি
নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকু
কাউকে না দেখিয়ে
একটু বাতাসে শুকিয়ে নিচ্ছে?

এই শহরে
অনেক আলো আছে।
অনেক দোকান।
অনেক উৎসব।
অনেক মুখ।
অনেক হাসি।
তবু আশ্চর্য—
কেউ কারও চোখের দিকে
দীর্ঘক্ষণ তাকায় না।
কারণ চোখের ভেতর
হাসির চেয়ে বড় কিছু থাকে।

সেখানে থাকে
একটি অপূর্ণতা,
একটি ভয়,
একটি না-বলা কথা,
একটি দীর্ঘ ক্লান্তি।

আজকাল আমি
মানুষের হাসি দেখলে
সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করি না।
আমি একটু অপেক্ষা করি।
চোখের দিকে তাকাই।
কারণ আমি জানি—
এই শহরে
সবাই হাসতে জানে,
কিন্তু খুব কম মানুষ
অন্যের কষ্ট দেখতে জানে।

আর যেদিন
একজন মানুষ
অন্য একজন মানুষের
হাসির ভিতর লুকিয়ে থাকা দুঃখটুকু
দেখতে শিখবে,
সেদিন হয়তো
এই শহর
সত্যিই মানুষের শহর হবে।
বিস্তারিত...

সভ্য মানুষেরা

- মোঃ আবু তালেব

(মুখ ও মুখোশ)

সভ্য মানুষেরা
খুব সুন্দর করে কথা বলে।

তারা কাউকে হাতে মারে না—
শুধু এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করে
যাতে মানুষটি
নিজের ভিতরেই
ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

তারা রক্ত দেখতে পছন্দ করে না;
তাই ক্ষত তৈরি করে
কাগজে,
স্বাক্ষরে,
নিয়মে,
একটি ছোট্ট “না”-তে।

তাদের টেবিলে
ফুল থাকে।
কাঁচের গ্লাসে পানি থাকে।
দেয়ালে
মানবতার ছবি ঝোলে।
আর দরজার বাইরে
একজন বৃদ্ধ
সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভেতরের মানুষটি
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে—
“আজ সম্ভব হবে না।”

সভ্য মানুষেরা
ক্ষুধার্ত মানুষকে
খাবার দেওয়ার আগে
তার পরিচয় জানতে চায়।
তারপর
তার কাগজ দেখে।
তার পোশাক দেখে।
তার ভাষা দেখে।
তারপর সিদ্ধান্ত নেয়—
সে কতটুকু মানুষ!

তারা শিশুকে শেখায়—
“সত্য কথা বলবে।”
তারপর সেই শিশুটি
বড় হয়ে দেখে,
সত্য বললে
চাকরি যায়,
বন্ধু যায়,
সম্মান যায়।
তাই সে শিখে যায়
সত্যের আগে
কীভাবে থামতে হয়।

সভ্য মানুষেরা
যুদ্ধকে ঘৃণা করে।
তারা যুদ্ধের ছবি দেখে
দুঃখ পায়।
তারপর
ডাইনিং টেবিলে বসে
নির্বিঘ্নে রাতের খাবার খায়।

তাদের শহরে
কেউ ফুটপাথে ঘুমায়।
কেউ হাসপাতালের করিডরে
মায়ের হাত ধরে বসে থাকে।
কেউ দিনের শেষে
ভাতের জন্য
নিজের সম্মান বিক্রি করে।
সভ্য মানুষেরা
তাদের পাশ দিয়ে যায়।
কেউ চোখ নামিয়ে নেয়।
কেউ মোবাইলে তাকায়।

কেউ বলে—
“এরা তো সবসময়ই ছিল।”

এই একটি বাক্য
কত শত মানুষের
ক্ষুধার চেয়েও পুরোনো।

সভ্য মানুষেরা
অপরাধীকে শাস্তি দেয়।
এটি ভালো।
কিন্তু তারা কখনো জিজ্ঞেস করে না—
অপরাধের আগে
কতগুলো দরজা
তার মুখের ওপর বন্ধ হয়েছিল।

তারা চোরকে ঘৃণা করে,
কিন্তু এমন একটি সমাজ তৈরি করে
যেখানে কারও কারও কাছে
চুরি ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।


তারপর
নিজেদের সভ্য বলে,
রাতে তারা
আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
পরিষ্কার জামা।
পরিপাটি চুল।
নিরাপদ ঘর।
পাশে ঘুমিয়ে থাকা সন্তান।
আয়না কিছু বলে না,
শুধু মুখ দেখায়।

কিন্তু কোনোদিন যদি
আয়না মুখের বদলে
হাত দেখাত—
তবে দেখা যেত
কারও হাত স্বাক্ষরে,
কারও হাত নীরবতায়,
কারও হাত
শুধু কিছু না করার অপরাধে
ভারী হয়ে আছে।

তবুও সকাল হয়,
সভ্য মানুষেরা
আবার বেরিয়ে পড়ে।
টাই বাঁধে।
জুতো পালিশ করে।
ভদ্রভাবে হাসে।
একজন আরেকজনকে বলে—
“কেমন আছেন?”

কেউ উত্তর দেয় না
সে সত্যিই কেমন আছে!

কারণ
সভ্যতা হয়তো মানুষকে
হিংস্রতা থেকে বাঁচিয়েছে,
কিন্তু মানুষকে
মানুষের কষ্ট থেকে
বাঁচাতে পারেনি এখনও!
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4627
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1709
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1659
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1587
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1579
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1516
কর্মফল মোঃ আবু তালেব 1504
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1471
রমণী মোঃ আবু তালেব 1440
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1414
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1412
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1405
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1368
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1368
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1367
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1362
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1360
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1343
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1338
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1330
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
হাসির শহর মোঃ আবু তালেব 1
সভ্য মানুষেরা মোঃ আবু তালেব 17
মুখের নিচে মুখ মোঃ আবু তালেব 23
ভালোবাসার শেষ দরজা মোঃ আবু তালেব 28
তোমাকে ছাড়া তোমার কাছে মোঃ আবু তালেব 31
যে প্রেম কথা বলেনি মোঃ আবু তালেব 26
আমাদের মাঝখানে রাত মোঃ আবু তালেব 33
অপেক্ষার ঘর মোঃ আবু তালেব 36
তুমি যে ছিলে মোঃ আবু তালেব 39
একটি মানুষকে হারানোর আগে মোঃ আবু তালেব 43
ভালোবাসার পরে মো: আবু তালেব 62
তোমার অনুপস্থিতি মোঃ আবু তালেব 57
যে হাতটি ধরিনি মোঃ আবু তালেব 55
অলৌকিক দুপুর মো: আবু তালেব 43
অস্থায়ী অনন্ত মোঃ আবু তালেব 56
প্রথম নীরবতায় ফেরা মোঃ আবু তালেব 63
শেষ প্রশ্ন মোঃ আবু তালেব 64
অন্য আমি মোঃ আবু তালেব 62
মায়ের নিঃশ্বাস মোঃ আবু তালেব 60
শেষ চুম্বন মোঃ আবু তালেব 73
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
বায়তুল মাক্বদিস ফেরদাউস সরকার 13
কবির কলমে নবির ছবি - Kobir Kolome Nobir Chobi কবি ফেরদাউস সরকার 31
প্রত্যাবর্তন রাফাত আহমেদ 46
মৃত্যুদিন শ্রীমল্লার 62
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 84
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 68
হাসান বলছি আল আমিন ইসলাম 83
নীল নিঃশব্দের ভেতর আল আমিন ইসলাম 85
চাঁদ হয়ে তুমি আসো মুহিববুল্লাহ আল মামুন 86
পানি লাগবে পানি ফেরদৌস রায়হান 128
মোরা বাংলাদেশী আজহারুল ইসলাম তালহা 145
নিজের শত্রু নিজেই আজহারুল ইসলাম তালহা 151
ভালো মানুষ ইবনে আলী 258
দুনিয়া তো ক্ষণিকের ইবনে আলী 148
শিকল ইবনে আলী 237
নতুন দিনের পৃথিবী যে তোমার অপেক্ষায় ক্ষুদ্রলেখক মোঃ রাকিবুল হাসান 280
জাগরণের ডাক শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 233
বসন্ত জয়দীপ রায় 252
বসন্ত হবো মানব মন্ডল 169
তাহাদের প্রতি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ 323
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে