হারিয়ে যাওয়া নাম
- মোঃ আবু তালেব
(অপ্রকাশ)
মানুষের প্রথম পরিচয়
তার নাম নয়,
তার কান্না।
জন্মের মুহূর্তে
কেউ আমার নাম জানত না,
তবু সবাই বুঝেছিল —
আমি এসে গেছি,
অনেক পরে
আমাকে একটা নাম দেওয়া হলো।
আমি সেই নামেই বড় হলাম।
সেই নামেই স্কুলে ডাক পড়ল।
সেই নামেই প্রেমপত্র লেখা হলো।
সেই নামেই স্বাক্ষর করলাম
অসংখ্য কাগজে।
একদিন মনে হলো —
এই নামটা কি সত্যিই আমি?
নাকি
আমি শুধু
এই নামটার ভেতরে
বহু বছর ধরে বাস করছি?
একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধের সঙ্গে
দেখা হয়েছিল।
তিনি অনেকক্ষণ
আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন,
হঠাৎ বললেন,
"মুখটা খুব চেনা লাগছে।
নামটা মনে পড়ছে না।"
আমি হেসেছিলাম,
কিন্তু বাড়ি ফিরেও
কথাটা আমার ভেতরে রয়ে গেল।
যদি একদিন
সবাই আমার নাম ভুলে যায়,
তাহলে কি আমি
অদৃশ্য হয়ে যাব?
আমরা নাম ধরে ডাকি,
কিন্তু নামকে কি ভালোবাসি?
মা কখনো
আমার পুরো নাম ধরে ডাকতেন না।
বাবার কণ্ঠেও
নামের চেয়ে
স্নেহ বেশি ছিল।
যারা সত্যিই আমাকে ভালোবেসেছে,
তারা কখনো
আমার নামকে ভালোবাসেনি,
তারা ভালোবেসেছিল
আমার ভয়,
আমার নীরবতা,
আমার অসমাপ্ত বাক্য,
আমার ভুল,
আমার অপেক্ষা।
একদিন পুরোনো একটা ডায়েরি খুলে দেখি,
কিছু নাম,
আজ আর কিছু মুখ মনে পড়ে না।
আবার কিছু মুখ আছে,
যাদের নাম
সময়ের কাছে হারিয়ে গেছে,
তবু তাদের উপস্থিতি
এখনো আমার জীবনে রয়ে গেছে।
তখন বুঝলাম —
স্মৃতি নাম দিয়ে বাঁচে না,
অনুভূতি দিয়ে বাঁচে।
আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই,
আসলে আমরা ভয় পাই —
একদিন কেউ আর
আমাদের নাম উচ্চারণ করবে না।
কিন্তু হয়তো
মানুষের সবচেয়ে দীর্ঘ জীবন
নামের মধ্যে নয়,
কারও আচরণে,
কারও সাহসে,
কারও ক্ষমায়,
কারও রেখে যাওয়া কোমলতায়।
আমি আজ যদি
নিজের নামটা খুলে রাখি,
একটা পুরোনো জামার মতো —
তাহলে কী বাকি থাকবে?
একটা শিশু,
যে প্রথম আকাশ দেখে
বিস্মিত হয়েছিল।
একজন কিশোর,
যে নিজের ছায়াকে ভয় পেয়েছিল।
একজন মানুষ,
যে অনেক কথা বলতে পারেনি।
আর একটা হৃদয়,
যে এখনো
ভালো হতে চায়।
হয়তো এগুলোই
আমার সত্য পরিচয়,
নাম নয়।
সমাধিফলকে
একটা নাম লেখা থাকে,
কিন্তু যারা সত্যিই কাঁদতে আসে,
তারা পাথরের অক্ষর পড়ে না।
তারা মনে করে
একটা কণ্ঠস্বর,
একটা হাসি,
একটা স্পর্শ,
একটা নীরব উপস্থিতি।
আজ আমি আর
আমার নামকে
ধরে রাখতে চাই না।
আমি চাই,
যেদিন আমার নাম
পৃথিবী ভুলে যাবে,
সেদিনও
কোনো এক অচেনা মানুষ
আমার একটা বাক্যে,
একটা কবিতায়,
অথবা
কারও প্রতি আমার রেখে যাওয়া
সামান্য মমতায়
নিজেকে চিনে ফেলুক।
কারণ
মানুষের শেষ পরিচয়
তার নাম নয়,
সে অন্য মানুষের হৃদয়ে
কী নামে বেঁচে থাকে —
তাও নয়।
সে আদৌ
কোনো নাম ছাড়াই
বেঁচে থাকতে পারে কি না!—
হয়তো
সেই প্রশ্নের ভেতরেই
একটা জীবনের
সবচেয়ে সত্য উত্তর
লুকিয়ে থাকে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।