ভেতরের সমুদ্র

ভেতরের সমুদ্র

- মোঃ আবু তালেব

(অপ্রকাশ)

মানুষের ভেতরে
একটা সমুদ্র থাকে।
তার কোনো মানচিত্র নেই,
কোনো তীর নেই,
কোনো জাহাজ
সেখানে পৌঁছায় না।
তবু সারাজীবন
আমরা সেই সমুদ্র নিয়েই
হেঁটে বেড়াই।

ছোটবেলায় ভাবতাম,
মানুষের গভীরতা
তার জ্ঞানে,
পরে ভাবলাম,
তার অভিজ্ঞতায়।
এখন মনে হয়,
মানুষের গভীরতা
সে কতটুকু অনুভব করেছে,
আর কতটুকু
কাউকে বলতে পারেনি —
তার মধ্যে।

আমি অনেক মানুষ দেখেছি,
যারা নদীর মতো কথা বলে।
আবার কিছু মানুষ আছে,
যারা সমুদ্রের মতো,
তাদের নীরবতা
তাদের ভাষার চেয়েও বিশাল।

তুমি কি কখনো
কারও চোখের দিকে তাকিয়ে
হঠাৎ অনুভব করেছ —
সে কিছুই বলছে না,
তবু তার ভেতরে
একটা ঝড় বইছে?
আমি করেছি।
তখন বুঝেছি,
চোখ শুধু আলো দেখে না।
কখনো কখনো
অপ্রকাশও দেখে।

আমার ভেতরের সমুদ্র
একদিনে তৈরি হয়নি।
একটা প্রত্যাখ্যান
একটু জল এনেছে।
একটা ভালোবাসা
একটু লবণ।
একটা মৃত্যু
একটু গভীরতা।
একটা ক্ষমা
একটু জোয়ার।
একটা না-বলা বাক্য
আরও একটা অন্ধকার স্রোত।
এভাবেই
আমি অজান্তে
নিজের ভেতরে
একটা সমুদ্র তৈরি করেছি।

অদ্ভুত বিষয় —
সমুদ্র যত গভীর,
তার উপরিভাগ
তত শান্ত দেখায়।
হয়তো সেই কারণেই
সবচেয়ে ভেঙে পড়া মানুষটাও
অনেক সময়
সবচেয়ে স্থির দেখায়।

আমরা মানুষের মুখ পড়তে শিখি,
মনও পড়তে পারি।
তার পোশাক,
তার পরিচয়,
তার সাফল্য।
কিন্তু কেউ শেখায় না,
কীভাবে
একজন মানুষের নীরবতার
গভীরতা পড়তে হয়।

একদিন আমি নিজের ভেতরে
ডুব দিতে চেয়েছিলাম।
ভাবলাম,
আমি নিজেকে চিনি।
কিছুদূর নামতেই দেখলাম,
এখানে এমন অনেক স্মৃতি আছে,
যাদের কথা
আমি বহু বছর ভাবিনি।
এমন অনেক ভয়,
যারা এখনো বেঁচে আছে।
এমন অনেক ভালোবাসা,
যারা কখনো মরেনি।

আমি আরও নিচে নামলাম।
সেখানে
কোনো শব্দ ছিল না।
কোনো নামও না।
শুধু একটা অনুভূতি —
আমি
আমি নই,
আমি আমার সব অভিজ্ঞতার
অদৃশ্য জলরাশি।

সেদিন প্রথম বুঝলাম,
মানুষের ভেতরের সমুদ্র
কাউকে দেখানোর জন্য নয়।
নিজেকে হারিয়ে
আবার খুঁজে পাওয়ার জন্য।

আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে,
"তোমার সবচেয়ে বড় সম্পদ কী?"
আমি কোনো বইয়ের কথা বলব না।
কোনো অর্জনেরও নয়।
আমি বলব —
আমার ভেতরের সমুদ্র।
কারণ সেখানে
আমার সব কান্না আছে,
যেগুলো কেউ দেখেনি।
সব ভালোবাসা,
যেগুলো কেউ জানেনি।
সব ক্ষমা,
যেগুলো উচ্চারিত হয়নি।
সব প্রশ্ন,
যেগুলোর উত্তর পাইনি।
আর আছে
একটা ছোট্ট আলো।
যে আলো
প্রতিটি ঝড়ের পরেও
নিভে যায়নি।

হয়তো মানুষকে
বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
যেমন
সমুদ্রকে
তীরে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় না।
ডুব দিতে হয়।
ঝুঁকি নিতে হয়।
নিজের শ্বাসও
কিছুক্ষণ ভুলে যেতে হয়।
তারপর একসময়
অন্ধকারের গভীরে
একটা মুক্তো দেখা যায়।
আমি জানি,
সেই মুক্তোটার নাম
সত্য নয়।
সুখও নয়।

তার নাম —
"অপ্রকাশ।"

কারণ মানুষের ভেতরে
যা সবচেয়ে গভীর,
তা কখনো সম্পূর্ণ
ভাষায় ভেসে ওঠে না।

সে শুধু
নিঃশব্দে
সমুদ্র হয়ে থাকে।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।