হাসির শহর

হাসির শহর

- মোঃ আবু তালেব

(মুখ ও মুখোশ)

এই শহরে
মানুষ খুব হাসে।

বাসের ভিড়ে হাসে,
অফিসের করিডরে হাসে,
রেস্তোরাঁর টেবিলে হাসে,
মোবাইলের পর্দায় হাসে,
ছবির নিচে লিখে—
“ভালো আছি।”
শহরও বিশ্বাস করে!

সকালে যে মানুষটি
ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে
নিজের শেষ সঞ্চয় তুলে নেয়,
বিকেলে সেই মানুষটিই
বন্ধুর সামনে বসে
হেসে বলে—
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”

যে মেয়েটি
সারারাত মায়ের অসুখ নিয়ে জেগেছে,
সে অফিসে এসে
সহকর্মীর কৌতুকে হাসে।

যে ছেলেটি
চাকরি হারিয়ে বাড়ি ফিরেছে,
সে রাতের খাবারের টেবিলে
বাবাকে বলে—
“চিন্তা কোরো না।”
এই শহরে
মানুষ তার কষ্টকে
ঘরের ভেতর রেখে বের হয়।
যেমন মানুষ
ভেজা ছাতা
দরজার পাশে রেখে যায়।

একদিন একটি ক্যাফেতে
দেখেছিলাম—
চারজন বন্ধু
একসঙ্গে বসে আছে।
টেবিলে কফি।
কথা।
হাসি।
ছবিও তুলল তারা।
সেই ছবিতে
চারটি উজ্জ্বল মুখ ছিল।

ছবির বাইরে
চারটি আলাদা দুশ্চিন্তা।
একজনের বাবার অপারেশন।
একজনের সংসার ভাঙছে।
একজন ঋণে ডুবে আছে।
আরেকজন
প্রতিদিন ভোরে উঠে
নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার কারণ খোঁজে।
কেউ কাউকে কিছু বলেনি।

শহর এমনই।
এখানে মানুষ
নিজের ক্ষতগুলো
জামার ভেতর লুকিয়ে রাখে।
শুধু কখনো কখনো
রাত গভীর হলে
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষকে দেখে
মনে হয়—
সে কি আকাশ দেখছে,
নাকি
নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকু
কাউকে না দেখিয়ে
একটু বাতাসে শুকিয়ে নিচ্ছে?

এই শহরে
অনেক আলো আছে।
অনেক দোকান।
অনেক উৎসব।
অনেক মুখ।
অনেক হাসি।
তবু আশ্চর্য—
কেউ কারও চোখের দিকে
দীর্ঘক্ষণ তাকায় না।
কারণ চোখের ভেতর
হাসির চেয়ে বড় কিছু থাকে।

সেখানে থাকে
একটি অপূর্ণতা,
একটি ভয়,
একটি না-বলা কথা,
একটি দীর্ঘ ক্লান্তি।

আজকাল আমি
মানুষের হাসি দেখলে
সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করি না।
আমি একটু অপেক্ষা করি।
চোখের দিকে তাকাই।
কারণ আমি জানি—
এই শহরে
সবাই হাসতে জানে,
কিন্তু খুব কম মানুষ
অন্যের কষ্ট দেখতে জানে।

আর যেদিন
একজন মানুষ
অন্য একজন মানুষের
হাসির ভিতর লুকিয়ে থাকা দুঃখটুকু
দেখতে শিখবে,
সেদিন হয়তো
এই শহর
সত্যিই মানুষের শহর হবে।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।