সভ্য মানুষেরা

সভ্য মানুষেরা

- মোঃ আবু তালেব

(মুখ ও মুখোশ)

সভ্য মানুষেরা
খুব সুন্দর করে কথা বলে।

তারা কাউকে হাতে মারে না—
শুধু এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করে
যাতে মানুষটি
নিজের ভিতরেই
ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

তারা রক্ত দেখতে পছন্দ করে না;
তাই ক্ষত তৈরি করে
কাগজে,
স্বাক্ষরে,
নিয়মে,
একটি ছোট্ট “না”-তে।

তাদের টেবিলে
ফুল থাকে।
কাঁচের গ্লাসে পানি থাকে।
দেয়ালে
মানবতার ছবি ঝোলে।
আর দরজার বাইরে
একজন বৃদ্ধ
সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকে।
ভেতরের মানুষটি
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে—
“আজ সম্ভব হবে না।”

সভ্য মানুষেরা
ক্ষুধার্ত মানুষকে
খাবার দেওয়ার আগে
তার পরিচয় জানতে চায়।
তারপর
তার কাগজ দেখে।
তার পোশাক দেখে।
তার ভাষা দেখে।
তারপর সিদ্ধান্ত নেয়—
সে কতটুকু মানুষ!

তারা শিশুকে শেখায়—
“সত্য কথা বলবে।”
তারপর সেই শিশুটি
বড় হয়ে দেখে,
সত্য বললে
চাকরি যায়,
বন্ধু যায়,
সম্মান যায়।
তাই সে শিখে যায়
সত্যের আগে
কীভাবে হাসতে হয়।

সভ্য মানুষেরা
যুদ্ধকে ঘৃণা করে।
তারা যুদ্ধের ছবি দেখে
দুঃখ পায়।
তারপর
ডাইনিং টেবিলে বসে
নির্বিঘ্নে রাতের খাবার খায়।

তাদের শহরে
কেউ ফুটপাথে ঘুমায়।
কেউ হাসপাতালের করিডরে
মায়ের হাত ধরে বসে থাকে।
কেউ দিনের শেষে
একটি ভাতের জন্য
নিজের সম্মান বিক্রি করে।
সভ্য মানুষেরা
তাদের পাশ দিয়ে যায়।
কেউ চোখ নামিয়ে নেয়।
কেউ মোবাইলে তাকায়।

কেউ বলে—
“এরা তো সবসময়ই ছিল।”

এই একটি বাক্য
কত শত মানুষের
ক্ষুধার চেয়েও পুরোনো।

সভ্য মানুষেরা
অপরাধীকে শাস্তি দেয়।
এটি ভালো।
কিন্তু তারা কখনো জিজ্ঞেস করে না—
অপরাধের আগে
কতগুলো দরজা
তার মুখের ওপর বন্ধ হয়েছিল।

তারা চোরকে ঘৃণা করে,
কিন্তু এমন একটি সমাজ তৈরি করে
যেখানে কারও কাছে
চুরি ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।

তারপর
নিজেদের সভ্য বলে।
রাতে তারা
আয়নার সামনে দাঁড়ায়।
পরিষ্কার জামা।
পরিপাটি চুল।
নিরাপদ ঘর।
পাশে ঘুমিয়ে থাকা সন্তান।
আয়না কিছু বলে না।
আয়না শুধু মুখ দেখায়।

কিন্তু যদি কোনোদিন
আয়না মুখের বদলে
হাত দেখাত—
তবে দেখা যেত
কারও হাত স্বাক্ষরে,
কারও হাত নীরবতায়,
কারও হাত
শুধু কিছু না করার অপরাধে
ভারী হয়ে আছে।

তবু সকাল হয়।
সভ্য মানুষেরা
আবার বেরিয়ে পড়ে।
টাই বাঁধে।
জুতো পালিশ করে।
ভদ্রভাবে হাসে।
একজন আরেকজনকে বলে—
“কেমন আছেন?”

কেউ উত্তর দেয় না
সে সত্যিই কেমন আছে।
কারণ
সভ্যতা হয়তো মানুষকে
হিংস্রতা থেকে বাঁচিয়েছে,
কিন্তু মানুষকে
মানুষের কষ্ট থেকে
বাঁচাতে পারেনি এখনও!


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।