শেষ প্রশ্ন
- মোঃ আবু তালেব
(মানুষ)
শেষ প্রশ্নটি
মৃত্যুর আগে আসে না,
সে সারা জীবন
আমাদের পাশে হাঁটে।
আমরা
শুধু তাকে চিনতে পারি না।
শৈশবে
সে এসেছিল
একটা ভাঙা খেলনার পাশে।
আমি খেলনাটা বুকে চেপে
অনেকক্ষণ বসে ছিলাম।
মনে হয়েছিল,
ভেঙে যাওয়া মানেই
শেষ হয়ে যাওয়া।
প্রশ্নটা তখন
আমার কাঁধে হাত রেখেছিল।
আমি ফিরে তাকাইনি।
কৈশোরে
সে এসেছিল
প্রথম প্রত্যাখ্যানের রাতে।
জানালার ওপারে চাঁদ ছিল।
ভেতরে
একটা দীর্ঘ নীরবতা।
আমি ভেবেছিলাম,
যে চলে যায়,
সে-ই আমার সবকিছু নিয়ে যায়।
প্রশ্নটা
আমার পাশে বসে ছিল।
আমি তাকে
অন্ধকার ভেবেছিলাম।
যৌবনে
সে অফিসের ব্যস্ত সিঁড়িতে,
ট্রেনের ভিড়ে,
হাসির আড্ডায়,
অভিনন্দনের করতালিতে,
এমনকি
সফলতার ছবির ভেতরেও
চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি
অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি।
শুধু
তার সঙ্গে নয়।
তারপর একদিন
হাসপাতালের করিডোরে
একটা শিশু জন্ম নিল।
একই করিডোরের অন্য প্রান্তে
একজন বৃদ্ধ
শেষবারের মতো
চোখ বন্ধ করলেন।
দুই দরজার মাঝখানে
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো,
পৃথিবী
একটা নিঃশ্বাস নিল।
তারপর
আবার চলতে শুরু করল।
আমরা
জন্মকে উৎসব বলি।
মৃত্যুকে শোক।
সময়
দুটোকেই
একই আকাশের নিচে
একই নীরবতায় রাখে।
সেই দিন
প্রশ্নটা
প্রথমবার
নিজের মুখ দেখাল।
তার চোখে
কোনো বিচার ছিল না।
কোনো ধর্ম ছিল না।
কোনো পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি নয়।
কোনো শাস্তির ভয়ও নয়।
সে শুধু
একটা প্রশ্ন করল —
"তুমি কি সত্যিই দেখেছিলে?"
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
আমি কি
বৃষ্টিকে দেখেছি,
নাকি শুধু ভিজেছি?
আমি কি
মায়ের মুখ দেখেছি,
নাকি শুধু তার উপস্থিতিকে
স্বাভাবিক ভেবেছি?
আমি কি
ভালোবেসেছি,
নাকি
ভালোবাসা পাওয়ার অপেক্ষাতেই
জীবন কেটে গেছে?
আমি কি
একটা গাছের নিচে বসে
তার নীরবতা শুনেছি?
আমি কি
কখনো
একজন অপরিচিত মানুষের চোখে
নিজের মুখ চিনেছি?
আমি কি
ক্ষমা করেছি,
নাকি
শুধু সময়কে
ক্ষতের ওপর ঘাস জন্মাতে দিয়েছি?
প্রশ্নটা
আর কিছু বলল না।
সে জানত,
সবচেয়ে গভীর উত্তর
শব্দে জন্মায় না।
সেদিন রাতে
আমি আকাশের দিকে তাকালাম।
তারারা
একটা শব্দও বলেনি।
তবু
তাদের নীরবতায়
অসংখ্য উত্তর জ্বলছিল।
আমি বুঝলাম,
শেষ প্রশ্নের
কোনো ভাষা নেই।
তার আছে
একটা আয়না।
সেখানে
মানুষ
নিজের জীবনের দিকে
শেষবারের মতো তাকায়।
এবং
হঠাৎ দেখে —
সে যত পথ হেঁটেছে,
তার চেয়ে বড়
যে পথগুলো
সে কখনো হাঁটেনি।
সে যত কথা বলেছে,
তার চেয়ে গভীর
যে কথাগুলো
সে চিরকাল
অপ্রকাশ রেখেছে।
হয়তো
শেষ প্রশ্নটা
স্রষ্টা করেন না।
মৃত্যুও না।
শেষ প্রশ্নটা
মানুষ নিজেই
নিজেকেই করে।
আর যদি
সেই মুহূর্তে
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে
নিঃশব্দে বলতে পারে —
"আমি সম্পূর্ণ ছিলাম না।
তবু আমি সত্য ছিলাম।"
তবে
সেই উত্তরই
সমস্ত প্রশ্নের পরে
মানুষের
সবচেয়ে শান্ত
এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল
নীরবতা।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।