প্রথম নীরবতায় ফেরা
- মোঃ আবু তালেব
(মানুষ)
শেষ পর্যন্ত
মানুষ
যেখানে ফিরে যায়,
সেটা কোনো বাড়ি নয়।
কোনো শহরও নয়।
কোনো মুখ,
কোনো নাম,
কোনো ইতিহাসও নয়।
সে ফিরে যায়
একটা নীরবতায়।
যে নীরবতা
তার জন্মেরও আগে
তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
আমি বহুদিন
শব্দের ভেতর বাস করেছি।
করতালির ভেতর।
বিতর্কের ভেতর।
জয়ের ভেতর।
পরাজয়ের ভেতর।
অসংখ্য বাক্যের মধ্যে
নিজেকে খুঁজেছি।
শেষে দেখলাম —
শব্দগুলো
আমাকে বহন করেনি।
আমি-ই
তাদের কাঁধে করে
এতদূর এনেছি।
একদিন
রাতের শেষ প্রহরে
আমি জেগে উঠলাম।
জানালার বাইরে
কোনো বাতাস ছিল না।
পাতাও নড়ছিল না।
চাঁদ
একটা পুরোনো সন্ন্যাসীর মতো
আকাশের ধারে
চুপচাপ বসে ছিল।
সেই নীরবতায়
হঠাৎ শুনতে পেলাম
নিজের হৃদয়ের শব্দ।
না —
রক্তের নয়।
অনেক বছর ধরে
নিজেকে ক্ষমা করতে না-পারা
একজন মানুষের
ধীর স্পন্দন।
আমরা সারাজীবন
অন্যদের ক্ষমা করতে শিখি।
নিজেকে ক্ষমা করতে
শিখি না।
তাই
আমাদের বুকের ভেতর
একটা অদৃশ্য আদালত
দিনরাত বসে থাকে।
সেখানে
বিচারকও আমরা।
অভিযুক্তও আমরা।
সাক্ষীও আমরা।
শাস্তিও আমরা।
সেদিন
আমি সেই আদালত
ভেঙে দিলাম।
কোনো যুক্তি দিয়ে নয়।
কোনো ঘোষণা দিয়ে নয়।
শুধু
চুপ করে বসে রইলাম।
দীর্ঘক্ষণ।
এত দীর্ঘ,
যে সময়
আমার পাশে এসে
নিজের ঘড়ি খুলে রাখল।
তারপর
অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল।
আমার ভেতরে
যাদের এতদিন
আলাদা মানুষ বলে মনে হতো —
শিশুটা,
যুবকটা,
প্রেমিকটা,
পথহারা মানুষটা,
ক্ষমাহীন মানুষটা,
কবিটা,
ভীত মানুষটা —
ধীরে ধীরে
একজন হয়ে গেল।
যেন
অনেক নদী
দীর্ঘ ভ্রমণের শেষে
নিজেদের নাম ভুলে
সমুদ্রে মিশে যায়।
আমি তখন বুঝলাম,
নীরবতা
কখনো শব্দের অনুপস্থিতি নয়।
নীরবতা হলো
বিচ্ছিন্ন সত্তাগুলোর
একটামাত্র হৃদস্পন্দনে
মিলিত হওয়া।
ভোর হতে লাগল।
পূর্ব আকাশে
এক ফালি আলো উঠল।
পাখিরা
এখনো গান শুরু করেনি।
গাছেরা
এখনো আলোকে
সম্পূর্ণ গ্রহণ করেনি।
পৃথিবী
একটা শ্বাস নিচ্ছিল।
আমি অনুভব করলাম,
এই তো —
এমনই ছিল
আমার প্রথম সকাল।
যখন
আমি কোনো ভাষা জানতাম না।
কোনো পরিচয় ছিল না।
কোনো অর্জন ছিল না।
শুধু
একটা স্পন্দন ছিল।
একটা বিস্ময়।
একটা নিঃশব্দ উপস্থিতি।
হয়তো
মানুষের সমস্ত যাত্রার
গোপন উদ্দেশ্য
নতুন কিছু পাওয়া নয়।
বরং
এত দূর ঘুরে এসে
আবার
সেই প্রথম নীরবতাকে
চিনে নেওয়া।
আজ
আমি আর
নীরবতাকে ভয় পাই না।
কারণ জানি,
সেখানে
কোনো শূন্যতা নেই।
সেখানে
আমার প্রথম কান্না
এখনো উষ্ণ।
মায়ের নিঃশ্বাস
এখনো ধীরে দুলছে।
বাবার হাত
এখনো আমার কাঁধে।
অদেখা সব ভালোবাসা
এখনো আলো হয়ে আছে।
আর আমি —
যে এতদিন
নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে
অন্য প্রান্তে হেঁটেছি —
শেষে এসে দেখি,
আমি কোথাও ফিরিনি।
আমি শুধু
প্রথমবারের মতো
নিজের ভেতরে
পৌঁছেছি।
সেইখানে
কোনো শব্দ নেই।
কোনো দাবি নেই।
কোনো প্রমাণ নেই।
শুধু
একটা আদিম নীরবতা —
যেখানে
সব কবিতার জন্ম,
সব অশ্রুর বিশ্রাম,
সব মানুষের
অপ্রকাশিত মুখ
চিরকাল
আলোর আগে
নিঃশব্দে অপেক্ষা করে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।