মুখোশের ভিতরে মুখ
- মোঃ আবু তালেব
(মুখ ও মুখোশ)
প্রতিদিন সকালে
মানুষটি ঘুম থেকে উঠে
প্রথমে নিজের মুখ দেখে না—
মুখোশটি খোঁজে।
আজ কোন মুখটি পরবে?
হাসির মুখ?
নাকি আত্মবিশ্বাসের?
নাকি সেই মুখটি,
যেটি দেখে সবাই মনে করবে—
তার জীবনে কোনো অভাব নেই।
অফিসে যাওয়ার আগে
সে মুখোশটি ঠিক করে নেয়।
সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করে,
“কী খবর?”
সে হাসে—
“ভালো।”
বন্ধু ফোন করে,
“কেমন আছিস?”
সে আরও স্বাভাবিক গলায় বলে—
“দারুণ আছি।”
কেউ তার কণ্ঠে
একটু ফাটলও খুঁজে পায় না।
কারণ মুখোশ
শুধু মুখ ঢাকে না—
কণ্ঠস্বরও বদলে দেয়।
বাড়িতে ফিরে
সে আরেকটি মুখ পরে।
সেখানে তাকে
দায়িত্বশীল হতে হয়,
শক্ত হতে হয়,
সবকিছুর উত্তর জানতে হয়।
কেউ জানে না,
দিনের শেষে
নিজের ঘরে ঢুকে
সে কতক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।
যেন দরজার ওপাশে
পুরো পৃথিবী,
আর এপাশে
শুধু একজন মানুষ।
একদিন রাতে
মুখ ধুতে গিয়ে
সে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
মুখোশটি খুলে ফেলল।
আয়নায় যে মুখটি দেখা গেল,
সেটি খুব সাধারণ।
কোনো হাসি নেই।
কোনো অভিনয় নেই।
কোনো ব্যাখ্যাও নেই।
শুধু দুটি চোখ—
যেন বহুদিন পর
নিজের মালিককে দেখছে।
সে চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে
হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল।
কারণ এতদিন
সে অন্যদের কাছ থেকে
নিজেকে লুকিয়েছিল;
আজ বুঝল—
সে নিজের কাছ থেকেও
নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল।
মুখোশটি মাটিতে পড়ে রইল।
সে তুলল না।
অনেকক্ষণ
নিঃশব্দে বসে থাকল।
তারপর খুব আস্তে বলল—
“আমি ক্লান্ত।”
এই দুটি শব্দ
কাউকে বলা হয়নি
বহু বছর।
কথাগুলো ঘরের দেয়ালে গিয়ে
আর ফিরে এল না।
মানুষটি
প্রথমবার অনুভব করল—
সত্যি কথা বলার জন্য
সবসময় অন্য একজন মানুষ
দরকার হয় না,
কখনো কখনো
নিজের কাছেই
সত্যি হওয়া যথেষ্ট।
পরদিন সকালে
সে আবার বাইরে বেরোল।
মুখোশটি সঙ্গে নিল।
কারণ পৃথিবী
এখনও মুখোশ ছাড়া মানুষকে
সহজে গ্রহণ করতে শেখেনি।
তবু সেদিন
মুখোশের নিচে
একটি ছোট পরিবর্তন ছিল।
এবার সে জানত—
মুখোশটি সে পরে আছে,
মুখোশটি সে নয়।
আর এই সামান্য জ্ঞানই
তার ভিতরে
একটি দরজা খুলে দিল।
বাইরের মানুষটি
হয়তো আগের মতোই হাসছিল।
কিন্তু মুখোশের ভিতরে
প্রথমবার—
একজন সত্যিকারের মানুষ
নিজের মুখ নিয়ে
বেঁচে ছিল।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।