ভিখারির রাজ্য
- মোঃ আবু তালেব
(মানুষ)
শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত মোড়ে
একজন ভিখারি বসে ছিল।
তার সামনে
একটা টিনের বাটি।
আকাশের মতো ফাঁকা।
তবু
সেই ফাঁকা বাটির ভেতর
কত মানুষের মুখ
এসে পড়ছিল।
কেউ একটা মুদ্রা ফেলল।
কেউ চোখ ফিরিয়ে নিল।
কেউ পকেট হাতড়ে
নিজের অস্বস্তিকে খুঁজল।
কেউ আবার
এক মুহূর্তের জন্য
নিজের ভেতরের মানুষটাকে দেখল —
তারপর দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।
ভিখারির দিকে নয় —
তার চারপাশে
যে অদৃশ্য রাজ্যটা তৈরি হয়েছে,
তার দিকে।
আমরা ভাবি,
সে ভিক্ষা চায়।
আমি দেখলাম,
সে মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে
তার ভেতরের শব্দ শুনছে।
একটা শিশুর হাত
তার দিকে বাড়ল।
মায়ের হাত
শিশুটাকে টেনে নিল।
মুদ্রাটা
বাটিতে পড়ল না।
কিন্তু শিশুটার চোখে
একটা প্রশ্ন
সারাজীবনের জন্য থেকে গেল।
সেদিন
দারিদ্র্য
ভিখারির পাশে বসেনি।
সে দাঁড়িয়েছিল
আমাদের ভেতরে।
ভিখারির গায়ে
ছেঁড়া কাপড়।
কিন্তু
তার আকাশটা
আমার চেয়ে ছোট ছিল না।
সে একই সূর্য পায়।
একই বৃষ্টি।
একই চাঁদ।
একই মৃত্যু।
শুধু
আমরা তাকে
একই সম্মান দিই না।
একটা কাক
উড়ে এসে
তার পাশে বসে
রুটির টুকরো কুড়োতে লাগল।
ভিখারি
হেসে
শেষ টুকরোটাও
কাকটার দিকে ছুড়ে দিল।
আমি হঠাৎ বুঝলাম —
যার কিছুই নেই,
তারও
দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে।
আর
যার সবকিছু আছে,
সে কখনো কখনো
একটা দৃষ্টিও দিতে পারে না।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভাব
রুটির নয়।
চোখের।
যে চোখ
আরেকজন মানুষকে
মানুষ বলে দেখতে
ভুলে গেছে।
সন্ধ্যা নামছিল।
রাস্তার বাতিগুলো
এক এক করে জ্বলে উঠল।
ভিখারির মুখে
একটা অদ্ভুত আলো পড়ল।
মনে হলো,
সে যেন
কোনো সিংহাসনে বসে আছে।
তার রাজ্য
মুদ্রার নয়।
মানুষের বিবেকের।
প্রতিদিন
হাজার মানুষ
সেই রাজ্যের ভেতর দিয়ে যায়।
কেউ কর দেয়।
কেউ ঋণ বাড়ায়।
কেউ
নিজের দারিদ্র্য
আরও গোপন করে চলে যায়।
আমি তখন বুঝলাম,
ভিখারি
রাস্তার ধারে বসে থাকে না।
সে বসে থাকে
মানুষের আত্মার দরজায়।
সে হাত বাড়ায়
টাকার জন্য নয়।
একটা প্রশ্নের জন্য।
**"তোমার ভেতরে
এখনো কতটা মানুষ
বেঁচে আছে?"**
যেদিন
এই প্রশ্নের উত্তর
আমরা সহজে দিতে পারব,
সেদিন
পৃথিবীতে
কোনো ভিখারির রাজ্য থাকবে না।
কারণ
সেদিন
কেউ কারও কাছে
রুটি চাইবে না।
আর কেউ
কারও কাছ থেকে
মানুষ হওয়ার অনুমতিও
চাইবে না।
ততদিন পর্যন্ত
শহরের ব্যস্ত মোড়ে
একটা টিনের বাটি
নিঃশব্দে পড়ে থাকবে।
মানুষ ভাববে,
ওখানে কয়েন জমছে।
আমি জানি —
ওখানে
জমে থাকে
সভ্যতার অসমাপ্ত বিবেক।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।