পরিচয়ের কারাগার
- মোঃ আবু তালেব
(মুখ ও মুখোশ)
আমার নাম জিজ্ঞেস করো না—
নামটি আমি জন্মের দিন পাইনি,
পেয়েছি কোন প্রিয় মানুষের মুখ থেকে।
তারা আমাকে একটি নাম দিল,
তারপর নামটির চারপাশে
চারটি দেয়াল বানাল।
তারপর জিজ্ঞেস করল—
“তুমি কী?”
আমি বললাম—
“আমি মানুষ।”
তারা হাসল।
বলল,
“না, সেটা যথেষ্ট নয়।”
তাই আমার কপালে এটে দিল
ধর্মের সীল,
বুকে ঝুলিয়ে দিল শ্রেণির পরিচয়,
হাতে ধরিয়ে দিল পেশার সনদ,
পকেটে গুঁজে দিল অর্থের হিসাব।
তারপর বলল—
“এবার তুমি কে—
তা আমরা বুঝতে পারছি।”
আমি চুপ করে রইলাম!
কারণ তারা বুঝতে পারেনি—
আমার ভেতরে যে মানুষটি আছে,
সে কোনো ফর্মের ঘরে
টিক চিহ্ন দেওয়ার মতো নয়।
আমি যখন শিশু ছিলাম,
আমার কোনো পেশা ছিল না,
কোনো পদ ছিল না,
কোনো সম্পদ ছিল না,
কোনো শ্রেণি ছিল না।
তবু আমি পূর্ণ ছিলাম।
বড় হতে হতে
মানুষ আমাকে পরিচয় দিল—
আর প্রতিটি পরিচয়ের সঙ্গে
আমার ভেতর থেকে
একটি করে জানালা বন্ধ হয়ে গেল।
একদিন দেখলাম,
আমি আর আকাশ দেখি না,
দেখি শুধু
আমার পরিচয়ের ছাদ।
আমি আর মানুষ দেখি না,
দেখি—
কে আমার,
কে পর।
কে ধনী,
কে দরিদ্র।
কে শিক্ষিত,
কে অশিক্ষিত।
কে উচ্চ,
কে নিচু।
কে আমাদের,
কে তাদের।
অদ্ভুত এই কারাগারে
লোহার শিক নেই—
আছে শুধু শব্দ।
“তুমি এই।”
“তুমি ওই।”
“তুমি আমাদের।”
“তুমি ওদের।”
মানুষ শব্দ দিয়ে
মানুষকে বন্দি করে,
তারপর সেই বন্দিত্বের নাম দেয়—
পরিচয়।
একদিন আমি
সব পরিচয়ের জামা খুলে
নগ্ন হয়ে দাঁড়ালাম
একটি আয়নার সামনে।
আয়না কিছু বলল না।
শুধু একজন মানুষকে দেখাল।
নামহীন নয়—
নামের চেয়েও বড়।
ধর্মহীন নয়—
ধর্মের দেয়ালের চেয়েও বিস্তৃত।
গরিব নয়, ধনী নয়—
শ্রেণির মাপের বাইরে।
পেশাহীন নয়—
পেশার আগের সেই মানুষ।
আমি তখন বুঝলাম—
পরিচয় আমাদের জানায়
আমরা কে নই।
আর নীরবতা
প্রথমবার জিজ্ঞেস করে—
“তুমি আসলে কে?”
সেই প্রশ্নের সামনে
আমার সব পরিচয়
একদিন করে ভেঙে পড়ল।
নামটি পড়ে রইল মাটিতে।
পেশাটি দরজার বাইরে।
ধর্মটি দেয়ালের পাশে।
অর্থটি টেবিলের ওপর।
শ্রেণিটি সিঁড়ির নিচে।
আর আমি—
সবকিছুর ভেতর দিয়ে
প্রথমবার
নিজের কাছে ফিরে এলাম।
সেদিন বুঝলাম,
কারাগারটি বাইরে ছিল না।
আমি নিজেই
আমার পরিচয়গুলোর
কারারক্ষী ছিলাম।
আর মুক্তির প্রথম দরজা
খুলেছিল—
যেদিন আমি
নিজেকে কোনো বাক্সে
রাখতে অস্বীকার করেছিলাম।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।