দালালির মহাফেজখানা
- মোঃ আবু তালেব
বাইরে তখন পিচঢালা রাজপথে
একটা আঠারো বছরের শরীর
উপুড় হয়ে পড়ে আছে;
মাথার খুলি চিরে চুইয়ে পড়া রক্তে
ভিজে যাচ্ছে রিকশার পাটাতন,
আর পকেটের ভেতর অবিরাম বেজে চলেছে
এক নামহীন ফোন—
স্ক্রিনে কেবল ফুটে উঠছে দুটো অক্ষর: ‘মা’।
ঠিক সেই মুহূর্তে,
তোমাদের নিউজরুমের এসি চলছে ১৮ ডিগ্রিতে।
টেবিলের ওপর কফির ধোঁয়া,
আর বার্তা সম্পাদকের স্ক্রিনে
জ্বলজ্বল করছে গোপন নির্দেশ—
‘লাশের কোনো খবর স্ক্রলে যাবে না।’
মেকআপ রুমে লাল লিপস্টিক আর
ফাউন্ডেশনের প্রলেপ দিয়ে মুখ চকচকে করে
উপস্থাপক তখন ক্যামেরার লেন্সে
চোখ রেখে নির্লজ্জ মুখে পাঠ করছে—
“সারাদেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে,
নাশকতাকারীদের দমন করা হয়েছে।”
মেট্রোরেলের কাচ ভাঙা আর
পোড়া টোলপ্লাজার সামনে গিয়ে
তোমাদের ক্যামেরার লেন্স
আহাজারিতে ভিজে উঠেছিল!
টকশোতে বসে তোমাদের ভাড়াটে সুশীলরা
ইট-সিমেন্টের ক্ষতি মাপতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা
বাতাস ভারী করল,
অথচ মর্গের বারান্দায় বরফহীন মেঝেতে পড়ে থাকা
সারি সারি তাজা লাশের দিকে
তোমাদের একটা মাইক্রোফোন
এগিয়ে দেওয়ার সাহস হলো না!
তোমাদের কাছে ফ্লাইওভারের কংক্রিট
মহামূল্যবান সম্পদ,
আর একটা মায়ের বুক খালি হওয়া
স্রেফ একটি তুচ্ছ পরিসংখ্যান!
আর ওহে রাজপ্রাসাদের দরবারে ঝুলে থাকা
পদকলোভী কবি, নাট্যকার আর বুদ্ধিজীবীর দল—
এতকাল মঞ্চে দাঁড়িয়ে যারা মুক্তচিন্তা আর
প্রগতির স্লোগান বেচে রুটি-রুজি কামিয়েছ,
যখন ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা
নিষ্পাপ শিশুর চোখের মণি গুলিতে উড়ে গেল,
তখন তোমাদের সেই বিবেক
কোন নর্দমার গর্তে মুখ গুঁজে পড়েছিল?
পূর্বাচলের প্লট, বাৎসরিক অনুদান আর
জাতীয় পদকের তাম্রলিপির লোভে
তোমরা শিল্পকলার মুখোশ পরে
আসলে স্বৈরাচারের কসাইখানা পাহারা দিয়েছ!
খুনির হাত থেকে চুইয়ে পড়া রক্ত তোমরা ঢেকে দিয়েছ
‘উন্নয়ন আর অসাম্প্রদায়িকতার’ রঙিন চাদরে!
তোমরা দাবি করো তোমরা ‘নিরপেক্ষ’?
থুতু ফেলি তোমাদের এই সুশীল নিরপেক্ষতার মুখে!
যেখানে একদিকে জল্লাদের ভারী বুট আর
অন্যদিকে বুক পেতে দেওয়া খালি হাত,
সেখানে নিরপেক্ষ সাজার ভান করাটাই হলো
সবচেয়ে দামি দালালি।
আসলে তোমরা প্রেসকার্ড গলায় ঝুলিয়ে
খুনির গা থেকে রক্তের দাগ মোছার তোয়ালে।
তোমরা ভেবেছ এই সব নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতা মানুষ ভুলে যাবে?
ভেবেছ লাইভ সম্প্রচার বন্ধ হলেই অপরাধের দাগ ধুয়ে যাবে?
না!
জনতার স্মৃতিতে গড়ে উঠেছে তোমাদের
সব পাপের এক জীবন্ত মহাফেজখানা।
কোন চ্যানেলের প্রাইমটাইমে কত বড় মিথ্যার স্ক্রিপ্ট গিলেছিল,
কোন চাটুকার কলামে নরহত্যাকারীকে ‘ত্রাতা’ সাজানো হয়েছিল,
আর কোন সুশীলের নীরবতা জল্লাদের হাতকে আরও শক্ত করেছিল—
সব ফুটেজ, সব স্ক্রিনশট, সব দলদাসের নাম
সেখানে জ্বলন্ত অক্ষরে জমা আছে!
টেলিপ্রম্পটারের আলো চিরকাল জ্বলে না।
স্টুডিওর বাতি একদিন ঠিকই নিভবে,
বসের ফোন বন্ধ হয়ে যাবে,
আর স্পনসরের দামি স্যুট খুলে দাঁড়াতে হবে
একলা বিবেকের সামনে।
সেদিন যখন সন্তানহারা মা
তোমাদের কলার চেপে ধরে জানতে চাইবে—
“আমার বুকের মানিকটা যখন মরছিল,
তখন কাকে খুশি করতে তোরা মিথ্যা স্ক্রিপ্ট পড়ছিলি?”
তখন কোনো মেকআপ
তোমাদের লজ্জা ঢাকতে পারবে না,
কোনো এডিটিং সফটওয়্যার
তোমাদের এই ঐতিহাসিক কলঙ্ক
মুছে ফেলতে পারবে না!
ইতিহাসের পাতায় তোমরা কোনোদিন
'বুদ্ধিজীবী', ‘লেখক’ বা ‘সাংবাদিক’ হয়ে বাঁচবে না;
ইতিহাস তোমাদের চিনে রাখবে সত্যের গলা টিপে ধরা
একদল মেরুদণ্ডহীন, ঘৃণ্য কসাইয়ের দালাল হিসেবে!
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।