টং দোকানের বাংলাদেশ

টং দোকানের বাংলাদেশ

- মো: আবু তালেব

টিনের চালার নিচে ফুটন্ত কেটলির ধোঁয়া,
কনডেন্সড মিল্কের খালি টিন
আর কাচের ভাঙা বৈয়াম—
এখানে এসে বসলে আস্ত একটা দেশের
নাড়ির স্পন্দন শোনা যায়।
পাঁচ টাকার লাল চায়ে একটা মৃদু চুমুক দিয়ে
ক্লান্ত রিকশাওয়ালা যখন উদাস চোখে বলে—
“দেশটারে শ্যাষ কইরা দিলো রে ভাই!”
তখন কোনো কাগুজে পরিসংখ্যানের প্রয়োজন পড়ে না,
বোঝা যায় জিডিপির মেকি চাদরের নিচে
কতখানি পুঁজ জমছে!

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কাচের স্টুডিওতে বসে
যখন টাই-পরা সুশীলরা চামচামির ব্যাকরণ সাজায়,
তখন এই আধভাঙা কাঠের বেঞ্চে বসে
দিনমজুর, টিউশনি-হারানো বেকার তরুণ আর কারখানার শ্রমিক
খবরের কাগজের ভাঁজ খুলে বের করে আনে আসল সত্য।
এখানে কোনো সেন্সরশিপ খাটে না,
এখানে কোনো তোষামোদের মেকআপ নেই;
চায়ের কাপের টুংটাং শব্দের ভেতর এরা চিনে ফেলে
কার পকেটে কার রক্ত,
কোন লুটেরার সুইস ব্যাংকে কার ভাতের টাকা!

হয়তো ওরা একটু নামিয়ে কথা বলে,
কারণ পাশের প্লাস্টিকের টুলে কান খাড়া করে বসে থাকে ক্ষমতার কোনো চ্যালা,
তবুও কথা তো থামে না!
কেরোসিনের স্টোভের আগুনের চেয়েও বেশি তাপে
এখানে প্রতি মুহূর্তে ফুটতে থাকে বঞ্চিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
চাল-ডাল-তেলের আগুন দাম, ভোট চুরির নির্লজ্জ তামাশা,
আর রাতের আঁধারে গুম হয়ে যাওয়া
ভাইয়ের হাহাকার—
সব এসে এক মোহনায় মেশে এই ধোঁয়াটে আড্ডায়।

এই টং দোকান কোনো সাধারণ আস্তানা নয়,
এটা হলো জনতার আসল আদালত,
অলিখিত এক ব্যালট বাক্স!
যেখানে শাসকের গালভরা মিথ্যে ভাষণকে
চুবিয়ে খেয়ে ফেলা হয় বাসি টোস্ট বিস্কুটের মতো!
যেখানে ভয়ের চাবুককে তাচ্ছিল্য করে
রক্তচক্ষুর সামনে উড়িয়ে দেওয়া হয়
বিড়ির ধোঁয়ার মতো একরাশ অবজ্ঞা!

শোনো ওহে কাচের মহলে বসে থাকা অন্ধ শাসকেরা—
তোমাদের তোষামোদকারীদের ড্রয়িংরুম আসল বাংলাদেশ নয়!
আসল বাংলাদেশ জেগে থাকে মধ্যরাতে,
ফুটপাতের এই টং দোকানে।
যেদিন এই চায়ের কাপের ঝড়
রাস্তার অ্যাসফল্ট কাঁপিয়ে গণমিছিলে রূপ নেবে—
সেদিন তোমাদের ওই কোটি টাকার মসনদ
টংয়ের ভাঙা কাঠের তক্তার মতোই
গুঁড়িয়ে ভেঙে পড়বে!


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।