আয়নাঘরের দেওয়াললিপি

আয়নাঘরের দেওয়াললিপি

- মো: আবু তালেব

দেওয়াল আসলে বোবা নয়;
দেওয়াল হলো অন্ধকারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত খাতা।
যেখানে দিন আর রাতের সীমানা মুছে যায়
ভারী লোহার কপাটে,
সেখানে মানুষ ক্যালেন্ডার বানায় নিজের নখের আঁচড়ে।

একটি মরচে ধরা তার, ভাঙা চামচের বাঁট কিংবা
বুটের ডগায় ঘষে নেওয়া এক টুকরো পাথর—
এই ছিল লেখার কলম।
পলেস্তারা খসে পড়া স্যাঁতসেঁতে চুনকামের গায়ে
কেউ একজন খোদাই করে গেছে স্রেফ একটি নাম,
কেউ লিখে গেছে সন্তানের জন্মতারিখ,
আর কোনো এক মধ্যরাতে
চোখ বাঁধা অবস্থায় কেউ লিখেছিল—
“মা, আমি কিন্তু কারও সাথে বেইমানি করিনি।”

এই লাইনটা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়,
অথচ পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ে
এর ওজন বেশি।

যারা মানুষকে নম্বর বানিয়ে খাঁচায় পুরে রাখে,
তারা ভেবেছিল আলো নিভিয়ে দিলেই
একটি জীবনের অস্তিত্ব মুছে ফেলা যায়।
তারা গণিতের সহজ হিসাবটুকু বোঝেনি—
একটি শরীরকে হয়তো দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা যায়,
কিন্তু তার রেখে যাওয়া অনুপস্থিতির দাগকে
কখনো মুছে ফেলা যায় না।
এই চার দেয়ালের নিস্তব্ধতা কোনো শূন্যতা নয়;
এটা পাথরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস,
যা যেকোনো সুরক্ষিত দুর্গের চেয়েও
অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী।

তোমরা বাতাস আটকে রাখতে পারো,
চোখের ওপর বাঁধতে পারো কালো কাপড়ের অন্ধ পট্টি,
কিন্তু মানুষের স্মৃতির কোষে যে আলো জ্বলে—
তাকে গুম করার মতো
কোনো গোপন সেল এখনও তৈরি হয়নি পৃথিবীতে।
যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের ছায়াকে পর্যন্ত ভয় পায়,
সে আসলে নিজের মসনদের তলায়
প্রতিদিন একটি করে গোপন খাদ তৈরি করে।

ইতিহাস কোনো সাজানো প্রেসনোটে বাঁচে না,
স্তাবকদের কেনা কলমেও ইতিহাস লেখা থাকে না।
ইতিহাস বেঁচে থাকে নখের আঁচড়ে
ক্ষতবিক্ষত ওই এক ইঞ্চি পোড়া প্লাস্টারে।
যেদিন ঐ তালাবদ্ধ লোহার দরজা খুলে দেওয়া হবে,
সেদিন কোনো কাগুজে প্রমাণের প্রয়োজন পড়বে না—
এই দেওয়াল নিজেই আদালতে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেবে,
আর প্রতিটি দাগ থেকে উচ্চারিত হবে
ক্ষমতার মুখে এক আজন্ম চপেটাঘাত।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।