অলৌকিক দুপুর
- মো: আবু তালেব
(মানুষ)
সেদিন দুপুরটা
অন্য সব দুপুরের মতোই ছিল।
সূর্য ছিল।
গাছ ছিল।
একটি কাক
বিদ্যুতের তারে বসে
নিজের কালো নিঃসঙ্গতাকে
ঠোঁট দিয়ে আঁচড়াচ্ছিল।
তবু
সেদিন পৃথিবীতে
এমন কিছু ঘটেছিল,
যা কোনো সংবাদপত্র লেখেনি।
একটি শিশু
রাস্তার ধারে
একটি শুকিয়ে যাওয়া পাতাকে
দুই হাতে তুলে নিল।
তারপর
পাতাটিকে বলল,
"চলো,
আজ তুমি উড়তে শিখবে।"
সে দৌড়াতে শুরু করল।
পাতাটিও
তার হাতের বাতাসে
কেঁপে কেঁপে উঠল।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে ভাবলাম—
পৃথিবীর সমস্ত উড়ান
ডানায় শুরু হয় না,
কিছু উড়ান
বিশ্বাসে শুরু হয়।
শিশুটি
একটি পাথরের পাশে বসে
অনেকক্ষণ
একটি পিঁপড়েকে দেখছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
"কী দেখছ?"
সে বলল,
"ও খুব ব্যস্ত।
হয়তো,
ওর মা অপেক্ষা করছে।"
আমি চুপ করে গেলাম।
একটি পিঁপড়েরও
কেউ অপেক্ষা করে—
এই কথাটি
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়
আমাকে শেখায়নি।
দুপুর আরও গভীর হলো।
একটি কুকুর
ছায়ার ভেতর ঘুমিয়ে পড়ল।
শিশুটি
নিজের পানির বোতল খুলে
মাটিতে
দু-ফোঁটা পানি ঢেলে দিল।
আমি বললাম,
"কেন?"
সে উত্তর দিল,
"মাটিরও তো পিপাসা লাগে।"
সেদিন
আমি প্রথম বুঝলাম,
করুণা
কোনো শিক্ষা নয়।
করুণা
দেখার একটি পদ্ধতি।
আমরা
যত বড় হই,
তত কম দেখি।
আমরা গাছ দেখি,
কিন্তু তার অপেক্ষা দেখি না।
আমরা নদী দেখি,
কিন্তু তার ক্লান্তি দেখি না।
আমরা মানুষের মুখ দেখি,
কিন্তু তার অদৃশ্য কান্না দেখি না।
শিশুটি
একটি ভাঙা খেলনা
বুকের কাছে টেনে নিল।
বলল,
"এটা একা হয়ে গেছে।"
আমি অবাক হলাম।
আমরা
ভাঙা জিনিস ফেলে দিই।
শিশুরা
ভাঙা জিনিসকে
আরও কাছে টেনে নেয়।
হয়তো
এই কারণেই
তাদের পৃথিবীতে
এখনও
কিছুই পুরোপুরি পরিত্যক্ত নয়।
হঠাৎ
বৃষ্টি এলো।
খুব অল্প।
কয়েকটি ফোঁটা।
শিশুটি
আকাশের দিকে মুখ তুলে
চোখ বন্ধ করল।
তার মুখে
এমন এক শান্তি,
যেন
সে বৃষ্টিতে ভিজছে না—
বৃষ্টি
তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে।
আমি বুঝলাম,
অলৌকিক ঘটনা
আকাশ ভেঙে নামে না।
সমুদ্র দু-ভাগ হয় না।
মৃত মানুষ ফিরে আসে না।
অলৌকিকতা
ঘটে তখনই,
যখন
একটি মানুষ
পৃথিবীকে
প্রথমবারের মতো
দেখতে শেখে।
দুপুর শেষে
শিশুটি
একটি প্রজাপতির পেছনে
দৌড়াতে দৌড়াতে
দূরে হারিয়ে গেল।
তার হাতে
কিছুই ছিল না।
তবু
মনে হলো,
সে
সমস্ত পৃথিবীকে
সঙ্গে করে নিয়ে গেল।
আমি
সেই পথেই
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর
নিচু হয়ে
রাস্তার ধারে পড়ে থাকা
একটি শুকনো পাতা
তুলে নিলাম।
অদ্ভুত—
পাতাটি
আগের মতোই হালকা ছিল।
ভারী হয়ে উঠেছিল
আমার চোখ।
সেদিন
আমি কোনো নতুন সত্য পাইনি।
কোনো উত্তরও নয়।
শুধু
একটি হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতা
ফিরে পেয়েছিলাম—
বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা।
আর তখনই বুঝলাম,
মানুষের জীবনে
অলৌকিক দুপুর
একবারই আসে না।
যখনই
কেউ পৃথিবীকে
ব্যবহার করার আগে
ভালোবাসতে শেখে,
ব্যাখ্যা করার আগে
অবাক হতে শেখে,
আর নাম দেওয়ার আগে
স্পর্শ করতে শেখে—
সেই মুহূর্তেই
তার ভেতর
আবার
একটি অলৌকিক দুপুর
নেমে আসে।
নিঃশব্দে।
কোনো ঘোষণা ছাড়া।
যেমন
একটি ফুল
ফোটার শব্দ
কেউ কোনোদিন
শুনতে পায় না,
তবু
সকল বাগান
তার সাক্ষী।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।