মুখের নিচে মুখ
- মোঃ আবু তালেব
(মুখ ও মুখোশ)
সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মানুষ প্রথম যে মুখটি দেখে,
সেটি তার নিজের নয়—
সারাদিন পৃথিবীকে দেখানোর জন্য
তৈরি করা একটি মুখ।
আমি দেখেছি তাকে
অফিসের লিফটে,
বাসের ভিড়ে,
চায়ের দোকানের বেঞ্চে,
বিয়ের আসরে,
শোকের ঘরে।
সবাই খুব সুন্দর করে
নিজেকে বহন করে।
যে মানুষটি গতরাতে
বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল,
সকালবেলা সে-ই
সহকর্মীকে বলে—
“ভালো আছি।”
যে বাবা
মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে পারেনি,
সে সন্তানের সামনে
হেসে বলে—
“আগামী মাসে হয়ে যাবে।”
যে নারী
সারাদিন অপমান সহ্য করে,
সন্ধ্যায় অতিথির সামনে
চা বাড়িয়ে দেয়
শান্ত মুখে।
কেউ মিথ্যা বলে না—
তবু শহরটা
মিথ্যায় ভরে থাকে।
কারণ সত্যেরও
একটি সময় আছে,
একটি পোশাক আছে,
একটি সামাজিক অনুমতি আছে।
সব সত্য
টেবিলে রাখা যায় না।
সব কান্না
মানুষের সামনে কাঁদা যায় না।
সব ক্ষুধা
ভদ্রলোকের ভাষায় বলা যায় না।
তাই আমরা মুখ বানাই।
একটি মুখ
মায়ের জন্য,
একটি সন্তানের জন্য,
একটি অফিসের জন্য,
একটি প্রেমের জন্য,
একটি সমাজের জন্য।
আর গভীর রাতে,
সব দরজা বন্ধ হলে,
আলো নিভে গেলে
মানুষ নিজের মুখগুলো
এক এক করে খুলে রাখে।
তখন আয়নায়
যে মুখটি দেখা যায়,
তার কোনো পরিচয় নেই।
সে শুধু ক্লান্ত।
তার চোখের নিচে
ঘুমহীন রাতের দাগ,
ঠোঁটে আটকে থাকা
অনেকগুলো অসমাপ্ত কথা।
আমি একদিন
সেই মুখটির দিকে তাকিয়ে
ভয় পেয়েছিলাম।
কারণ তাকে
আমি চিনতে পারিনি।
এত বছর ধরে
নিজের মুখ বহন করতে করতে
নিজেকেই ভুলে গিয়েছিলাম।
সেদিন বুঝলাম—
মানুষের সবচেয়ে বড় মুখোশ
মুখের ওপর থাকে না;
সে থাকে
নিজের সম্পর্কে
নিজের বিশ্বাসের ভেতর।
আমরা বলি—
আমি ভালো মানুষ।
আমি সৎ।
আমি সাহসী।
আমি কাউকে ঘৃণা করি না।
কিন্তু সুযোগ এলে
আমাদের ভিতরের অন্ধকার
আস্তে করে দরজা খোলে।
তখন দেখা যায়—
মুখের নিচে আরেক মুখ,
তার নিচে আরও একটি।
শেষে
কোনো মুখ নেই।
শুধু একজন মানুষ
দাঁড়িয়ে আছে—
নগ্ন,
ভীত,
অসহায়,
এবং প্রথমবার
নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে
ভাবছে—
পৃথিবীর কাছে নয়,
নিজের কাছেই
আমি এতদিন
কিসের অভিনয় করে গেলাম?
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।