মায়ের নিঃশ্বাস

মায়ের নিঃশ্বাস

- মোঃ আবু তালেব

(মানুষ)

পৃথিবীতে আসার আগে
আমি কোনো ভাষা জানতাম না।
আলো চিনতাম না,
আকাশও না।

শুধু একটা ছন্দ চিনতাম।
ধীর।
উষ্ণ।
অবিরাম।
সে ছিল
আমার মায়ের নিঃশ্বাস।

আমার প্রথম পৃথিবী
কোনো দেশ ছিল না,
কোনো মানচিত্রও নয়।
একটা বুকের ভেতর
জলের মতো দুলতে থাকা
একটা অন্ধকার আশ্রয়।

সেখানে
দিন ছিল না,
রাতও না।
শুধু
একটা নিঃশ্বাসের ওঠানামায়
সময় তার প্রথম দোলনা বানিয়েছিল।

মা কখনো জানেননি,
তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে
আমি পৃথিবীর ব্যাকরণ শিখছিলাম।

কীভাবে ভয় থেমে যায়।
কীভাবে নীরবতাও
একটা আশ্রয় হতে পারে।
কীভাবে
কোনো শব্দ না বলেও
একজন মানুষ
আরেকজন মানুষকে
বাঁচিয়ে রাখে।

জন্মের পরে
আমাকে অনেক ভাষা শেখানো হয়েছে।
বর্ণমালা।
ব্যাকরণ।
ইতিহাস।
রাষ্ট্র।
ধর্ম।

কিন্তু
যে ভাষায়
মা গভীর রাতে
আমার জ্বর ছুঁয়ে বলতেন,
"আমি আছি" —
সেই ভাষার
কোনো অভিধান
আজও লেখা হয়নি।

একদিন লক্ষ্য করলাম,
মায়েরা ক্লান্ত হলে
দীর্ঘশ্বাস ফেলেন না।
তারা
নিঃশব্দে
আরও ধীরে শ্বাস নেন।
যেন
নিজের ক্লান্তিকে
সন্তানের ঘুমের বাইরে
রেখে আসতে চান।

মায়ের নিঃশ্বাস
বাতাসের মতো নয়।
বাতাস
সবাইকে ছুঁয়ে যায়।
মায়ের নিঃশ্বাস
শুধু একজন মানুষকে
তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব দিয়ে
ডেকে রাখে।

শৈশবে
আমি ঘুমিয়ে পড়তাম
মায়ের বুকের পাশে।
আজ এত বছর পরেও
কোনো অজানা শহরের
হোটেলঘরে
রাতের শেষে
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে
আমি কখনো কখনো
একটা অদৃশ্য ছন্দ শুনতে পাই।

জানালার বাইরে
কেউ নেই,
ঘরের ভেতরেও না।
তবু মনে হয়,
পৃথিবীর সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে
একটা নিঃশ্বাস
এখনো আমাকে
বাড়ি বলে ডাকে।

সময়
মায়ের চুলে
রূপোর ধুলো ছিটিয়ে দিয়েছে।
হাতের শিরাগুলো
নদীর মতো স্পষ্ট।
হাঁটার ভেতর
ধীরে ধীরে
বিকেলের আলো নেমে এসেছে।
কিন্তু অদ্ভুত —
আমি যখনই
তার পাশে বসি,
মনে হয়,
আমি আবার
একটা অনাগত শিশু।

আমার সব বয়স
তার একটিমাত্র নিঃশ্বাসের কাছে
নীরবে মাথা নত করে।

আমি জানি,
একদিন
এই পৃথিবীতে
মায়ের নিঃশ্বাস থাকবে না,
ঘর থাকবে।
জানালা থাকবে।
তার ব্যবহার করা চশমা,
শাড়ির ভাঁজ,
প্রার্থনার চাদর,
রান্নাঘরের মশলার গন্ধ —
সবই থাকবে।
শুধু
যে অদৃশ্য ছন্দে
আমার প্রথম পৃথিবী দুলেছিল,
সে আর শোনা যাবে না।

সেদিন
পৃথিবীর বাতাস
একই রকম থাকবে।
তবু
আমি বুঝব,
কিছু একটা
চিরতরে বদলে গেছে।
কারণ
মা কখনো
শুধু একজন মানুষ নন।
তিনি
সন্তানের জীবনে
ঈশ্বরের সবচেয়ে নীরব উচ্চারণ।

আর তাঁর নিঃশ্বাস —
সেই প্রথম কবিতা,
যা কোনো কাগজে লেখা হয় না,
কোনো ভাষায়
সম্পূর্ণ অনুবাদ হয় না,
তবু
মানুষ
সারাজীবন
নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে
পুনরায় পড়তে থাকে।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।