মহাপ্লাবনের ইশতেহার

মহাপ্লাবনের ইশতেহার

- মো: আবু তালেব

তোমাদের বুলেটপ্রুফ কাচের ওপাশে বসে
তোমরা যখন মানচিত্রের গায়ে
একের পর এক কাঁটাতার আঁকো,
যখন কন্ট্রোল রুমের লাল বাতি জ্বেলে হিসাব কষো—
আর কত লাশ ফেললে
এই শহর চিরতরে বোবা হয়ে যাবে,
তখন তোমরা শুনতেই পাও না
মাটির গভীরে জমে ওঠা নিস্তব্ধ এক গর্জন!
তোমরা ভেবেছিলে সান্ধ্য আইনের কালো চাদর দিয়ে
ঢেকে দেওয়া যাবে একটা গোটা জাতির সূর্য ওঠার
তীব্র আকুলতা?
ভেবেছিলে সাঁজোয়া বহর আর
বুলেটের ধাতব শব্দে স্তব্ধ করে দেবে
বুকের খাঁচায় হাজার বছর ধরে
পুষে রাখা স্বাধীনতার দাবি?

ভুল!
তোমাদের কাগুজে অঙ্কের খাতা চরম মিথ্যেয় ভরা!
চোখ খুলে চেয়ে দেখো
এই দিগন্তজোড়া রাজপথের দিকে—
এখানে কোনো একক নাম নেই,
কোনো একক নেতার মুখ নেই;
এখানে ধুলোমাখা ময়লা শার্ট পরে
নেমে এসেছে অনাহারী দিনমজুর,
যার পা-ফাটা চলার ছন্দে আজ আছড়ে পড়ছে গণবিদ্রোহের তীব্র বেগ!
এখানে বই খাতা ফেলে
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে অবাধ্য কিশোর,
যার ডায়েরির শেষ পাতায় জ্বলজ্বল করছে—
‘হয় অধিকার, নয় মৃত্যু!’
এখানে রাজপথে নেমে এসেছে সেই নিঃস্ব মা,
যার ঘরে হয়তো একমুঠো ভাত নেই,
কিন্তু চোখের তারায় জ্বলছে স্বৈরাচারের তাসের ঘর
পুড়িয়ে দেওয়ার আগুন!
এখানে কারখানার শ্রমিক,
টিউশনি-হারানো বেকার,
হাসপাতালের রক্ত দেওয়া তরুণ—
সবাই আজ একাকার হয়ে গড়ে তুলেছে
এক অপরাজেয় জীবন্ত প্রাচীর!

তোমরা জলকামান ছুড়েছ—
আমরা ভিজেছি সেই বিষাক্ত গরম জলে,
তোমরা টিয়ারগ্যাস ছুড়েছ—
আমরা চোখ মুছে আবারও সামনে এগিয়েছি,
তোমরা সাঁজোয়া গাড়ি নামিয়েছ—
আমরা তার চাকার সামনে খালি বুক পেতে দিয়েছি!

বলো,
যে প্রজন্ম একবার নিজের জীবন তুচ্ছ করে
মৃত্যুকে হাসিমুখে মেনে নিতে শিখেছে,
তাকে তোমরা কোন নরকের ভয় দেখিয়ে ঘরে ফেরাবে?
তোমাদের হেলমেট,
তোমাদের কালো উর্দি,
তোমাদের কেনা পেটোয়া বাহিনী—
সবকিছু আজ থরথর করে কাঁপছে
এই খালি হাতের জনসমুদ্রের সামনে!
অস্ত্র যার একমাত্র শক্তি,
সে আসলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভীরু;
আর যে মানুষ সত্যের শক্তিতে খালি পায়ে দাঁড়ায়,
সে বুলেটবিদ্ধ হয়েও বিজয়ী হয়!

শোনো হে অন্ধ মসনদের স্বঘোষিত নরপশুরা,
ইতিহাসের তপ্ত পাতা কোনোদিন
কোনো স্বৈরাচারের তোষামোদে লেখা থাকে না।
চূর্ণ হয়েছিল রোমের অহংকার,
ধসে পড়েছিল প্রতাপশালী ফেরাউনের রাজপ্রাসাদ,
বাঙ্কারের অন্ধকারেই রচিত হয়েছিল
হিটলারের চূড়ান্ত পরিণতি!
তোমরা কি ভেবেছ
তোমরাই কেবল প্রকৃতির অলঙ্ঘ্য নিয়মের বাইরে?
তোমরা কি ভেবেছ
কোটি মানুষের তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে
তোমাদের এই শোষণের সাম্রাজ্য অমরত্ব পেয়ে যাবে?
না!
প্রতিটি শহীদের রক্তাক্ত নখরে আজ
খোদাই হয়ে গেছে তোমাদের পতনের শেষ তারিখ!
যে পিচঢালা রাস্তায় তোমরা
আমার ভাইয়ের মগজ ছিটকে ফেলেছিলে,
সেই রাজপথের প্রতিটি ধূলিকণা আজ
একেকটি আগ্নেয়গিরি হয়ে ফেটে পড়ছে!

আমরা কোনো করজোড়ে ক্ষমা চাইতে আসিনি,
আমরা কোনো সাজানো গোলটেবিলে
কৃত্রিম ভিক্ষা নিতে আসিনি।
টেলিভিশনের পর্দায় প্রচারিত মিথ্যা বিবৃতি আর
সুশীলদের মেকি সালিশি—
আমরা এক নিমেষে ছুড়ে ফেলে দিলাম
ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে!
যেখানে রক্তের চটচটে দাগ
আজও রাজপথের কালো অ্যাসফল্টে শুকোয়নি,
যেখানে গুমঘরের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে
আজও গোঙায় সহস্র ভাইয়ের নিঃশ্বাস,
সেখানে কোনো রক্তমাখা সমঝোতার খসড়া
লেখা হতে পারে না!

আমাদের দাবি একটাই—
পূর্ণ মুক্তি, পূর্ণ অধিকার,
আর খুনির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে
প্রতিটি অপরাধীর চূড়ান্ত বিচার!

ঐ শোনো—
বাতাসের বুকে কোটি কোটি কণ্ঠে
আছড়ে পড়ছে একতার অবিচল গর্জন!
লাখো মানুষের পদভারে কেঁপে উঠছে
তোমাদের সুরক্ষিত অট্টালিকা,
ভেঙে পড়ছে ভয়ের ব্যারিকেড,
চুরমার হচ্ছে দম্ভের শেষ কেল্লা!
এই মহাপ্লাবনকে থামানোর মতো
কোনো বাঁধ এই পৃথিবীতে কোনোদিন তৈরি হয়নি,
এই জনজোয়ারকে রুখে দেওয়ার মতো
কোনো বুলেট কোনো কারখানায় জন্মায়নি!
আমরা আসছি—
সমস্ত ভয়ের শেকল ভেঙে চূর্ণ করে,
সমস্ত অন্ধকারকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে,
বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে একটি মুক্ত,
নির্ভীক সকাল ছিনিয়ে আনতে!

আজ এই গণঅভ্যুত্থানের তপ্ত সূর্যকে
সাক্ষী রেখে আমরা জানিয়ে গেলাম—
রাজপথ জনতার ছিল,
রাজপথ জনতারই থাকবে!
এই মানচিত্র মুক্ত মানুষের,
এই মাটি কোনো অহংকারী শাসকের কেনা সম্পত্তি নয়!
শহীদের পবিত্র রক্তের শপথ—
আমরা আর এক চুলও পিছু হটব না,
আমরা থামব না,
যতক্ষণ না এই মুক্ত বাতাসে রচিত হয়
মানুষের চিরন্তন বিজয়ের মহাকাব্য!


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।