(নিজেকে আবিষ্কার)
জন্মের পর থেকেই মানুষ
আমাকে একটি নাম দিয়েছে,
সেই নাম ধরে আমাকে ডাকা হয়েছে,
আমি সাড়া দিয়েছি।
ধীরে ধীরে বিশ্বাসও করেছি—
এই নামটিই আমি!
তারপর
আমাকে একটি ভাষা দেওয়া হলো,
একটি পরিবার,
একটি দেশ,
একটি ধর্ম,
একটি ইতিহাস,
একটি পরিচয়।
একদিন দেখলাম,
আমার চারপাশে যত পরিচয় জমেছে,
আমার ভেতরের মানুষটি
তত দূরে সরে গেছে।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজের মুখ চিনতে পারি,
কিন্তু এই মুখটিই কি আমি?
একটি পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবি—
সেই ছোট্ট শিশুটি কোথায় গেল?
তার চোখ তো আমারই ছিল,
তার স্বপ্নও,
তার বিস্ময়ও,
তবু সে আমি নয়!
তাহলে আমি কে?
আমি কি আমার শরীর?
শরীর তো প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে।
আমি কি আমার স্মৃতি?
স্মৃতিও তো মুছে যায় প্রতিদিন।
আমি কি আমার সাফল্য?
একদিন সেগুলোরও
আর কোনো মূল্য থাকবে না।
আমি কি আমার ব্যর্থতা?
সেগুলোও তো আমার সঙ্গে জন্মায়নি।
আমি দীর্ঘদিন ভেবেছি,
মানুষ তার অর্জনের সমষ্টি।
আজ মনে হয়,
মানুষ তার হারিয়ে ফেলা
জিনিসগুলোরও যোগফল।
যাদের আর ছুঁতে পারি না,
তারা এখনও আমাকে গড়ে।
যে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি,
তারা এখনও আমাকে জাগিয়ে রাখে।
যে মানুষগুলো চলে গেছে,
তারা এখনও আমার ভেতরে হেঁটে বেড়ায়।
তাহলে আমি কোথায়?
একদিন নদীর ধারে বসেছিলাম,
জল বয়ে যাচ্ছিল,
আমি হাত ডুবিয়ে ভাবলাম,
একই নদীতে কি দ্বিতীয়বার হাত রাখা যায়?
জল বদলে যায়,
হাতও বদলে যায়,
তবু নদীকে আমরা একই নামে ডাকি।
হয়তো মানুষও তেমন,
প্রতিদিন বদলাতে বদলাতে
সে নিজের নামটি বহন করে চলে,
আর ভেবে নেয়—
সে একই মানুষ।
আমি অনেকবার
নিজেকে খুঁজতে বেরিয়েছি—
বইয়ের ভেতর,
ধর্মের ভেতর,
প্রেমের ভেতর,
সাফল্যের ভেতর,
পরাজয়ের ভেতর,
প্রশংসার ভেতর,
নিন্দার ভেতর,
প্রতিবারই কিছু পেয়েছি।
কিন্তু নিজেকে পাইনি।
তারপর একদিন
উত্তর খোঁজা ছেড়ে দিলাম,
চুপচাপ বসে রইলাম,
বাতাস বইছিল,
দূরে একটি পাখি ডাকছিল,
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে
গাছের গায়ে নেমে আসছিল।
সেই প্রথম মনে হলো—
হয়তো আমাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য
দৌড়ানোর দরকার নেই,
থেমে যাওয়ার দরকার।
কারণ মানুষ নিজেকে সামনে খুঁজে পায় না।
নিজেকে পায়
যখন সে আর কোথাও পৌঁছাতে চায় না।
আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে,
"তুমি কে?"
আমি হয়তো আমার নাম বলব,
আমার পেশার কথা বলব,
আমার ঠিকানাও বলব,
কিন্তু জানব,
এসবের কোনোটাই সম্পূর্ণ উত্তর নয়।
আমার ভেতরে এখনও একটি শিশু
আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,
একজন কিশোর
নিজের ছায়াকে বুঝতে শিখছে,
একজন তরুণ প্রথম ভালোবাসার
ভাঙা শব্দ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে,
একজন মানুষ
প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে,
আর তাদের প্রত্যেকেই আমি,
আবার কেউই আমি নই।
হয়তো মানুষ কোনো স্থির পরিচয় নয়,
সে একটি চলমান প্রশ্ন,
একটি অসমাপ্ত যাত্রা,
একটি নদী,
যে সমুদ্রে পৌঁছেও
নিজের উৎসকে ঠিকঠাক মনে রাখে।
তাই আজ আর জানতে চাই না—
আমি কে?
শুধু জানতে চাই—
আমি কি প্রতিদিন
গতকালের চেয়ে
একটু বেশি সত্য হয়ে উঠছি?
কারণ নাম মানুষকে পরিচয় দেয়।
কিন্তু সত্য—
মানুষকে জন্ম দেয়।
হয়তো এটাই আমার উত্তর।
আমি কোনো সম্পূর্ণ মানুষ নই।
আমি সম্পূর্ণ হওয়ার পথে
একটি দীর্ঘ, নীরব,
অবিরাম যাত্রা।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।